leadT1ad

বিশেষ সাক্ষাৎকার/আমাদের ডাবল অ্যালবাম মহাশ্মশান রিলিজ হয়নি, আসলে আমরাই রিলিজ হয়েছি

নতুন অ্যালবাম প্রকাশ করেছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডদল ‘সোনার বাংলা সার্কাস’। এটি একটি ডাবল অ্যালবাম। ‘মহাশ্মশান’ নামের এই কনসেপ্টচ্যুয়াল অ্যালবামে গান আছে ১৭টি। এই অ্যালবাম নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যান্ডের ভোকালিস্ট ও লিরিসিস্ট প্রবর রিপন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা স্ট্রিমের গৌতম কে শুভ।

নতুন অ্যালবাম প্রকাশ করেছে ব্যান্ডদল ‘সোনার বাংলা সার্কাস’। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

স্ট্রিম: কোনো প্রচারণা ছাড়াই হুট করে অ্যালবাম রিলিজ দিলেন। এমন সিদ্ধান্তের কারণ?

প্রবর রিপন: আমরা দুই বছর আগেই ‘মহাশ্মশান’-এর ঘোষণা দিয়েছিলাম। এরপর প্রতিদিন ভক্তরা প্রশ্ন করেছে, অ্যালবাম কবে আসবে, কবে আসবে। সেই অর্থে বলা যায়, অ্যালবামটা অলরেডি প্রমোটেড। আর আরেকটা জিনিস হলো প্রমোশন দিয়ে অনেক গিমিক তৈরি করা যায়।

কিন্তু আমরা আসলে আমাদের যে আর্টওয়ার্ক, মানে আমাদের গান, এটার শক্তিটা আমরা দেখতে চাই। বলা হয় মিউজিক ভিডিও লাগবে, এটা করা লাগবে, ওটা করা লাগবে, মানে এস্টাবলিশমেন্ট যে কথাগুলো বলে, সেই কথাগুলোকে না শুনেই আমরা এটা করছি। আর ভক্তদের সারপ্রাইজ দিতে চাওয়াও এর একটা কারণ।

স্ট্রিম: স্ট্রিমিংয়ের যুগে অ্যালবামকে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু আপনারা দিলেন ডাবল অ্যালবাম, ১৭টা গান। এখন তো প্রায় সবাই সিঙ্গেল দেয়।

প্রবর রিপন: আমাদের ১৭টা গান দেওয়ার সামর্থ্য আছে, তাই ডাবল অ্যালবাম করেছি। আর আমাদের পছন্দের প্রায় প্রতিটা ব্যান্ডের ডাবল অ্যালবাম আছে। আমাদেরও ইচ্ছা ছিল একটা ডাবল অ্যালবাম করার।

আরেকটা ব্যাপার, আমাদের যেহেতু কনসেপ্টচ্যুয়াল অ্যালবাম, তাই একটা করে গান রিলিজ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এক গান থেকে আরেক গানে কীভাবে গেলাম, পুরো এই জিনিসটা-এই গল্পটা সিঙ্গেল রিলিজের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।

স্ট্রিম: ‘মহাশ্মশান’ কি সময় নিয়ে তৈরি করার কারণেই দেরিতে এল, নাকি পরিকল্পনার বাইরে কিছু অনিবার্য পরিস্থিতি ছিল?

প্রবর রিপন: আসলে এই অ্যালবামটা শুনলে বুঝতে পারবেন যে আসলে কেন দেরি হয়েছে। কারণ, এই অ্যালবামটা একটা প্রপার বাংলা রক মিউজিক। রক মিউজিক যেহেতু পাশ্চাত্য থেকে আসা, তাই পাশ্চাত্যের সাউন্ডের ব্যাপারগুলো তো থাকবেই। তবে পৃথিবীর যে এলাকায় বড় হয়েছি, সেই এলাকার অনেক বাদ্যযন্ত্র এই অ্যালবামে ব্যবহার করেছি। এই ক্ষেত্রে আমরা সফল হতে পেরেছি নাকি পারিনি, সেটা শ্রোতারা বলবেন। তবে আমরা চেষ্টা করছি।

কিন্তু আমরা আসলে আমাদের যে আর্টওয়ার্ক, মানে আমাদের গান, এটার শক্তিটা আমরা দেখতে চাই।

আর আমাদের কনসার্টের অনেক ব্যস্ততাও ছিল। আমরা অত ধনী ব্যান্ডও না যে কনসার্ট না করে রেকর্ডিংয়ের কাজ করব। কনসার্টের ফাঁকে ফাঁকে অ্যালবামের কাজ করেছি। সবকিছু মিলেই আমাদের সময় লেগেছে।

স্ট্রিম: একদিকে প্রথম অ্যালবাম জনপ্রিয় হওয়ার পর শ্রোতাদের প্রত্যাশা। অন্যদিকে নতুন অ্যালবামের জন্য তাঁদের অপেক্ষা। এসব কি আপনাদের ওপর চাপ তৈরি করেছে বা আরও দায়বদ্ধ করেছে?

প্রবর রিপন: আমি এমন একজন শিল্পী যে নিজের কাছে ছাড়া কারো কাছে শিল্পের জন্য দায়বদ্ধ না। কে আমাকে প্রেশার দিচ্ছে, কে আমার কাছে কী চাচ্ছে, এগুলো ভাবি না আমি। আমি ভাবি আমার আত্মা কী চাচ্ছে। বা আমাদের ব্যান্ডের পারসপেক্টিভে যদি বলি, ব্যান্ড কী চাচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা চেয়েছি একটা প্রপার সাউন্ড থাকবে, সবকিছু ঠিকঠাক মতো হবে, রেকর্ডিংটা ঠিকঠাক মতো হবে, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংটা ঠিকঠাক হবে। এইসব জায়গা থেকেই আসলে এভাবেই করা।

স্ট্রিম: আপনাদের প্রথম অ্যালবাম ‘হায়েনা এক্সপ্রেস’-এর মতো নতুন অ্যালবামও কনসেপ্টচ্যুয়াল। ‘মহাশ্মশান’-এর গল্পটা জানতে চাই।

প্রবর রিপন: হায়েনা এক্সপ্রেসে কিন্তু আমাদের ক্যারেক্টারটা মারা গিয়েছিল, শেষ গান এপিটাফের ভেতর দিয়ে। এখন মহাশ্মশান হলো তার পুনরুত্থান। আগের অ্যালবামটাতে আমাদের ক্যারেক্টার পৃথিবী যেভাবে তাকে মেরে ফেলে, সে সেভাবে মারা যায়। এই অ্যালবামেও সে মারা যায়। কিন্তু হয়ত সে আবার পুনর্জন্ম নেবে পরের অ্যালবামে।

নতুন অ্যালবাম 'মহাশ্মশান'।  ছবি ব্যান্ডের সৌজন্যে
নতুন অ্যালবাম 'মহাশ্মশান'। ছবি ব্যান্ডের সৌজন্যে

এবারের অ্যালবামে আমাদের গানের যে মেইন চরিত্র, যে গাচ্ছে, তার নাম দ্রোহ। দ্রোহ এবার বিদ্রোহ ঘোষণা করে মানুষের বিরুদ্ধে। এর ফলাফল হিসেবে পৃথিবী মহাশ্মশানে রূপান্তরিত হয়। কারণ, সে যখন সমস্ত প্রাণীকুলকে নিয়ে মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য যখন যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন মানুষের রাজা দেখে যে সমস্ত পশুপাখির সঙ্গে মানুষের জেতার সামর্থ্য নেই। তখন পারমাণবিক বোমা ফাটায় এবং পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়।

আর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে সেখান থেকে শকুন নেমে আসে। দিস ইজ দ্য লাস্ট সং ‘প্রেম ও শকুন’। মানুষের প্রতি এই প্রতিশোধেরই গল্প এটা। এই প্রতিশোধ নিতে গেলে মানুষ এভাবে পারমাণবিক বোমা দিয়ে পৃথিবীটা ধ্বংস করে ফেলবে, সেখান থেকেই মহাশ্মশান।

স্ট্রিম: এতদিন ধরে এই অ্যালবামটা বানানো—এই পুরো সময়ের অ্যাক্টিভিটিগুলো আসলে কেমন ছিল?

প্রবর রিপন: আসলে অ্যালবাম রিলিজ হয়নি, আমরা রিলিজ হয়েছি। কারণ, অনেক গান, ১৭টা ট্র্যাক। আটটা গান হলে হয়ত আরো দুই বছর আগে অ্যালবামটা বের হয়ে যেত। অনেক কাজ করতে হয়েছে। মানে রেগুলার এত এত ধরণের কাজ। আমরা শুধু চারজন বাজাইনি, গেস্ট আর্টিস্টরাও বাজিয়েছেন এখানে। প্রায় আরো আট-নয় জন সবমিলে। গেস্ট আর্টিস্টদের বাজানো রেকর্ড করা, ব্যান্ডের বাজানো রেকর্ড করা, সেই জিনিসগুলোকে কম্পাইল করা, ওইটাকে আবার মিক্স করা। প্রায় এক বছর ধরে মিক্সিংই করেছি। তারপরে মাস্টারিং করা, আর্টওয়ার্ক প্রস্তুত করা।

আপনারা চেষ্টা করবেন কানে হেডফোন দিয়ে ‘পুনরুত্থান’ থেকে ‘প্রেম ও শকুন’ একটানা শুনতে। এটা কনসেপ্টচ্যুয়াল অ্যালবাম, আলাদা আলাদা গান শুনলে এই পুরো গল্পটা টের পাওয়া যায় না।

আজ সবমিলে আমার অনুভূতিহীন লাগছে। আনন্দও লাগছে না, আবার বিষাদও লাগছে না। মানুষের প্রশংসা বা কোনো কিছুই আমাকে খুব বেশি ছুঁতে পারছে না। কারণ, আমার মনে হচ্ছে, যাক কালকে থেকে আর মহাশ্মশান নিয়ে কাজ করতে হবে না। এখন থেকে আর এই গানগুলো আমি শুনবো না। গত তিন বছরে আমার যা শোনা হয়েছে জীবনে, কোনো শ্রোতাও বোধহয় এতবার শুনতে পারবে না কোনোদিন।

আর আরেকটা জিনিস অনেকে বলতে পারবে যে ২০২০-এ আমরা একটা অ্যালবাম বের করে আবার ২০২৬-এ পরের অ্যালবাম, প্রায় ছয় বছরের ব্যবধান। আসলে ছয় বছরের গ্যাপ আপনাদের মনে হচ্ছে। কিন্তু আমরা মূলত এই অ্যালবামের কাজ শুরু করি প্রথম অ্যালবামের আড়াই বছরের মাথায়।

আরেকটা ব্যাপার, এটা ডাবল অ্যালবাম। মানে আপনাদেরকে দুইটা অ্যালবাম দিচ্ছি আমরা। ব্যাসিক্যালি আমাদের ছয় বছরে তিনটা অ্যালবাম বের হলো। দুই বছর পর পর একটা অ্যালবাম বের হওয়া খুব বেশি অলসের লক্ষণ না।

অবশ্য আরও অ্যালবাম করা উচিত, যেহেতু আমাদের অনেক গান আছে। আমরা নেক্সট অ্যালবামগুলো চেষ্টা করবো কম গান দিয়ে অনেক দ্রুত বের করতে। প্রতি বছর একটা করে অ্যালবাম রিলিজ করার চিন্তা আমাদের আছে, দেখি আমরা পারি নাকি। এইতো।

স্ট্রিম: গেস্ট আর্টিস্টদের কথা বললেন। এই অ্যালবামে কারা কারা বাজিয়েছেন গেস্ট হিসেবে?

প্রবর রিপন: নয়ন ভাই ঢোল বাজিয়েছেন, সোহেল বাজিয়েছে সমস্ত পারকাশন—খমক, একতারা, ডুবকি, মন্দিরা, শঙ্খসহ আরো অনেক কিছু। কাবিল ভাই ট্রাম্পেট বাজিয়েছেন। বিল রে, একজন আমেরিকান ড্রামার, তিনি ড্রামস বাজিয়েছেন। সিমন ভায়োলিন বাজিয়েছে। সিমন অনেক সুন্দর ভায়োলিন বাজিয়েছে। সবাই-ই দুর্দান্ত বাজিয়েছেন।

সোনার বাংলা সার্কাস। ছবি ব্যান্ডের সৌজন্যে
সোনার বাংলা সার্কাস। ছবি ব্যান্ডের সৌজন্যে

এর বাইরে আরও গেস্ট আছেন। অনেকে নানাভাবে কাজ করেছে। অনেক নাম। কিন্তু যাদের নাম বললাম, তাঁরা অলমোস্ট প্রায় সব গানেই বাজিয়েছেন।

স্ট্রিম: নতুন অ্যালবাম নিয়ে শ্রোতা-ভক্তদের উদ্দেশ্যে কী বলতে চান?

প্রবর রিপন: আপনারা চেষ্টা করবেন কানে হেডফোন দিয়ে ‘পুনরুত্থান’ থেকে ‘প্রেম ও শকুন’ একটানা শুনতে। এটা কনসেপ্টচ্যুয়াল অ্যালবাম, আলাদা আলাদা গান শুনলে এই পুরো গল্পটা টের পাওয়া যায় না। আপনারা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন আশা করি। গানগুলো ভালো না লাগলে আর শুনবেন না। আর ভালো লাগলে কী করবেন সেটা আপনাদের ব্যাপার।

আর লিরিক খেয়াল করবেন অনেক বেশি। এবং যেটা ট্র্যাডিশনাল মানে ব্যালাড ঘরনার, যেগুলো আপনাদের বেশি ভালো লাগে, এর বাইরে যে আমরা যে এক্সপেরিমেন্টগুলো করছি, এই এক্সপেরিমেন্টগুলোতে একটু কান পাতবেন। তাহলে আপনি দেখবেন যে আসলেই আমরা একটা নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছি, সফল হয়েছি কিনা এটা জানি না। তবে চেষ্টা করছি আমরা।

আপনারা একটু মনোযোগ দিয়ে শুনবেন নতুনত্বগুলো, রক মিউজিকের সঙ্গে ঢোল, খমক, একতারা, দোতারা দিয়ে কেমন হয়েছে। এছাড়া আর কিছু বলার নেই গান নিয়ে।

এই গানগুলো এখন আর আমাদের না। এটা এখন পৃথিবীর গান, বাতাসের গান। গান এখন নিজেই একটা ক্যারেক্টার হয়ে গেছে, সে নিজেই একটা অস্তিত্ব হয়ে গেছে। তার সঙ্গে আপনাদের কথাবার্তা হোক। আমাদের সঙ্গে আর কোনো কথাবার্তা নেই।

দুই মাস পর আমরা দেশজুড়ে সলো কনসার্ট ‘মহাশ্মশান যাত্রা’ শুরু করবো, ‘হায়েনা এক্সপ্রেস এক্সপেরিয়েন্স’র মতো। আমরা ব্যাসিক্যালি নতুন অ্যালবামের গানগুলো সেখানেই গাইব, তারপর থেকে সমস্ত কনসার্টে গাইব।

স্ট্রিম: আপনাকে ধন্যবাদ, আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।

প্রবর রিপন: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত