ককরোচদের আন্দোলনে ‘নড়বড়ে’ মোদি, রাজ্য নির্বাচনে চ্যালেঞ্জে বিজেপি

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৭: ০০
জেন-জিদের মাত্র কয়েক দিনের আন্দোলনে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী। ছবি: রয়টার্স

ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে তরুণদের আন্দোলনে চ্যালেঞ্জে পড়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) কয়েক দিনের আন্দোলনে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।

গত ২৩ জুলাই রাতে ইনস্টাগ্রামে সেলফি ভিডিও প্রকাশ করে ৭৫ বছর বয়সী নরেন্দ্র মোদি শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগে দুঃখ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। তবে দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো বিক্ষোভকারীর কাছে মোদির এই বার্তা যথেষ্ট ছিল না। কারণ, কয়েক দিন আগেই তাঁরা পুলিশের কঠোর দমন–পীড়নের মুখে পড়েছিল। পরে তাদের আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে সমর্থন দেয়। পরে আন্দোলনের মুখে শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এরপর আরও দাবি জানিয়ে আন্দোলন স্থগিত করে সিজেপি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সিজেপির স্পষ্ট রাজনৈতিক বিজয়। সংগঠনের তরুণ সমর্থকেরা র‍্যাপ গান, পোস্টার ও দেয়াল লিখনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে নরেন্দ্র মোদিকে ব্যঙ্গ করেছেন। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে এমন দৃশ্য কখনো দেখা যায়নি।

লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্বের অধ্যাপক সঞ্জয় শ্রীবাস্তব বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই আগে মোদির সমর্থক ছিলেন। সমাজের বড় অংশ এখন প্রশ্ন তুলছে। বিজেপি দেশের জন্য সব সময়ই ভালো– এই ধারণা এখন আর টিকছে না।

প্রতিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে তরুণদের দীর্ঘদিনের হতাশা ও বেকারত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সিজেপি রাজনৈতিক দল না হলেও বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। তারা শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে। তরুণদের ক্ষোভের প্রথম রাজনৈতিক প্রভাব আগামী বছর উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও গুজরাটের রাজ্য নির্বাচনে দেখা যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিতাভ তিওয়ারি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল কেবলই উপলক্ষ। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তরুণদের উদ্বেগ, ক্ষোভ, হতাশা ও অনিশ্চয়তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত উদ্বেগ বোঝা, দ্রুত তা সমাধান করা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে শুনে পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার।

অমিতাভ তিওয়ারি জানান, ভারতের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৪০। বর্তমানে লোকসভার মাত্র ১০ শতাংশ সদস্য এই বয়সসীমার। অথচ ১৯৫০-এর দশকে এই হার ছিল দ্বিগুণের বেশি। বর্তমান কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যদের গড় বয়সও ৬০ বছরের বেশি।

সিজেপি রাজনৈতিক দল না হলেও বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। তারা শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে। তরুণদের ক্ষোভের প্রথম রাজনৈতিক প্রভাব আগামী বছর উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও গুজরাটের রাজ্য নির্বাচনে দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। উত্তর প্রদেশ ও গুজরাট— দুই রাজ্যই বিজেপি শাসিত।

তবে আরও বড় প্রশ্ন ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে। সিজেপি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল হলে, সেটি মোদির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যদিও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন তরুণ ভোটারদের বড় অংশ ধর্ম কিংবা জাতপাতের ভিত্তিতে ভোট দিলেও, সেই প্রবণতা বদলাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে জনপ্রিয়তার জোরে বিরোধী জোট সমর্থিত অভিনেতা বিজয় থালাপতি মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন।

লেখক অনুরাগ ভার্মার মতে, ককরোচদের আন্দোলন মোদি সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। সরকার জেন-জি প্রজন্মের চাহিদা ও মনোভাব থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আগে বিজেপির ডিজিটাল প্রচারের কেন্দ্র ছিল এক্স। কিন্তু রাজনৈতিক আলোচনার বড় অংশ এখন ইনস্টাগ্রামে চলে গেছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে।

সিজেপি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল হলে, সেটি মোদির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যদিও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন।

নিজেদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল দাবি করলেও বিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারী প্রায় ১ কোটি, যা সিজেপির কয়েক দিনে পাওয়া অনুসারীর অর্ধেকেরও কম। যদিও মোদির ব্যক্তিগত সামাজিক মাধ্যমের অনুসারী এক্স, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম মিলে ১০ কোটির বেশি।

কলামিস্ট সন্তোষ দেশাইয়ের মতে, ইনস্টাগ্রামে সফল হতে হলে স্বতঃস্ফূর্ততা প্রয়োজন। আগে থেকে সাজানো ও পরিমার্জিত রাজনৈতিক বার্তা এখানে তেমন কার্যকর হয় না। এই প্ল্যাটফর্ম মূলত তরুণ প্রজন্মের এবং তারাই এর ভাষা ও সংস্কৃতি নির্ধারণ করছে।

বিগত এক দশক ধরে মোদি নিজেকে দৃঢ় ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। খুব কম ক্ষেত্রেই ভুল স্বীকার করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখেও তাঁর সরকার মন্ত্রী অপসারণে রাজি হয়নি। ২০২১ সালে কৃষকদের প্রায় এক বছরের আন্দোলনের পর বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল বিজেপি সরকার।

অমিতাভ তিওয়ারির মতে, মানুষের কথা শুনতে প্রস্তুত থাকা নেতারাই এখন বেশি গ্রহণযোগ্য হবেন। মোদিও এখন সেই বার্তাই দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

সূত্র: রয়টার্স

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত