leadT1ad

কনটেন্টের আড়ালে বাড়ছে প্রাণী নির্যাতন, নেই প্রতিকার

‘এমডি আলামিন’ নামের পেজের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কুকুরের পা ধরে ঘোরাচ্ছেন একজন। আরেকটি ভিডিওতে শূকরের পা টেনে ধরে পেছনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন এক ব্যক্তি।

স্ট্রিম গ্রাফিক

ইঁদুরের লেজে বাঁধা গ্যাস বেলুন। প্রাণ বাঁচাতে প্রাণীটি দৌড়াচ্ছে; পেছনে যুবক ছুটছেন। কুকুরের পা ধরে ঘুরিয়ে বন্য উল্লাসে মত্ত একদল মানুষ। সামাজিক মাধ্যমে প্রাণীর সঙ্গে এমন নিষ্ঠুর আচরণের অসংখ্য ভিডিও ঘুরছে। এসব ভিডিও যারা করছেন, অনলাইনে তাদের পরিচয় ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’।

আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বর্তমানে প্রাণী নির্যাতনই হয়ে উঠছে বেশির ভাগ কনটেন্টের প্রধান উপজীব্য। কনটেন্ট নির্মাতাদের মূল লক্ষ্য ভিউ বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন। অথচ দেশের প্রচলিত আইনে কোনো প্রাণীকে বিনোদন বা ক্রীড়া ক্ষেত্রে ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। এমনকি অকারণে প্রাণীকে আঘাত বা নির্যাতনেও রয়েছে শাস্তির বিধান।

‘শামীম ফানি ১এম’ ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজটির অনুসারী ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি। এখানে পোস্ট করা ৬২৫টি ভিডিওর বেশির ভাগই প্রাণী নির্যাতনের। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক বা একাধিক ব্যক্তি বানরবে বিরক্ত করছেন। তারা কৌশলে বানরকে কাছে ডাকছেন। এরপর মুখে জমিয়ে রাখা ময়দা বানরের মুখে ছুঁড়ে তা ভিডিও করছেন। বানর নির্যাতনের এই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ দেখছেন, মন্তব্য করছেন।

কৌশলে বানরকে কাছে ডেকে মুখে জমিয়ে রাখা ময়দা তার মুখে ছুড়ে করা হচ্ছে ভিডিও। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
কৌশলে বানরকে কাছে ডেকে মুখে জমিয়ে রাখা ময়দা তার মুখে ছুড়ে করা হচ্ছে ভিডিও। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

এমনই আরেকটি পেজ ‘জুয়েল বিনোদন ০২’। ৭৭ হাজার অনুসারীর পেজটি পরিচালনা করেন গাজীপুরের মোহাম্মদ জুয়েল। এক বছর ধরে তিনি কৌশলে বানর ডেকে তার মুখে আটা ও ময়দা ছুড়ার কন্টেট নির্মাণ করছেন।

স্ট্রিমকে জুয়েল বলেন, ‘প্রতিদিন ভিডিও করা সম্ভব হয় না। এজন্য টাঙ্গাইল যেতে হয়। বানরবে কাছে আনতে খাবার কিনতে হয়। এ জন্য কিছুদিন পর পর গিয়ে অনেক ভিডিও করে এনে বাসায় বসে আপলোড করি।’ মুখে ময়দা ছুঁড়লে বানরের কোনো ক্ষতি হয় কিনা– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ আটা ছুঁড়ে মারার পর খাবার দিলে বানর আবার খেতে আসে।’

অবশ্য জুয়েল প্রাণী কল্যাণ আইন সম্পর্কে জানেন না। তাঁর কার্যক্রম যে প্রাণীর ওপর নির্যাতন, তাও তিনি মানতে নারাজ। জুয়েল বলেন, ‘আমি বানরকে নির্যাতন করি না। ওদের খাবার দিই, সেটি ভিডিও করি।’

‘এমডি এখলাস উদ্দিন’ নামের পেজ ময়মনসিংহ থেকে পরিচালনা করেন মোহাম্মদ এখলাস উদ্দিন। তাঁর এই পেজে নানা রকম ফানি কন্টেন্ট আপলোড করা হয়। এর মধ্যে একটিতে দেখা যায়, একটি ইঁদুরের লেজে গ্যাস বেলুন বেঁধে ছেড়ে দিয়েছেন। পেছন থেকে তিনিসহ কয়েকজন তাড়া করছেন। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে ইঁদুরটি। ‘এমডি আলামিন’ নামের পেজের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কুকুরের পা ধরে ঘোরাচ্ছেন একজন। আরেকটি ভিডিওতে শূকরের পা টেনে ধরে পেছনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন এক ব্যক্তি।

ইঁদুরের লেজে গ্যাস বেলুন বেঁধে ভিডিও করার মতো নিষ্ঠুর কাজ করছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
ইঁদুরের লেজে গ্যাস বেলুন বেঁধে ভিডিও করার মতো নিষ্ঠুর কাজ করছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ

প্রাণী সুরক্ষায় কাজ করা ‘অভয়ারণ্য-বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা রুবাইয়া আহমেদ এ ধরনের কনটেন্ট নির্মাণের কারিগরকে ‘মানসিক অসুস্থ’ উল্লেখ করেছেন। এগুলো সামনে এলে শেয়ার না করে ওই পেজ বা আইডির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার পরামর্শ দেন তিনি।

স্ট্রিমকে রুবাইয়া আহমেদ বলেন, ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এখন ভিউয়ের জন্য যা খুশি তাই করছেন। ভাইরাল হতে গিয়ে ছেলে-মেয়েরা মরে যাচ্ছে; ট্রেনের নিচে চাপা পড়ছে। ভিউ ব্যবসা এখন খুবই লুক্রেটিভ এবং এটি করতে গিয়ে প্রাণীদের ব্যবহার করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রাণী কল্যাণের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। তরুণরা এগিয়ে আসছে। এই প্রচেষ্টা সাংগঠনিক রূপ না পেলে প্রাণী নির্যাতন কমবে না। এ ধরনের ভিডিও সামনে এলে সংশ্লিষ্ট পেজ ও আইডির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রাণী নির্যাতন কমাতে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাকিব মাহবুব। স্ট্রিমকে ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব বলেন, প্রাণী কল্যাণ আইন যুগান্তকারী অবশ্যই। এই আইনে প্রাণী নির্যাতন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কী করলে নির্যাতন হবে– কিছু দিকনির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো– এই আইনে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। সরকারই শুধু ব্যবস্থা নিতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, প্রাণী নির্যাতনের কোনো ঘটনা দেখলে নাগরিক হিসেবে আপনার মামলা করার সুযোগ নেই। কারণ আইনে বলা আছে, এই মামলা সরকারের পক্ষে প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর করতে পারবে। আপনি শুধু অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়ে জানাতে পারবেন। দুঃখের বিষয়, অভিযোগ গ্রহণে অধিদপ্তরের এ রকম কোনো সেল নেই।

আইনে কী আছে

‘প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯’ অনুযায়ী, কোনো প্রাণীকে বিনোদন বা ক্রীড়া ক্ষেত্রে ব্যবহার বা কোনো আইনের প্রতি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ করলে বা সহযোগিতা করলে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ধারা ৬ এর (৩), ধারা ৭ এর (২), ধারা ৮ এর (২), ধারা ৯ এর (৩), ধারা ১২ এর (৬) এবং ধারা ১৩ এর (৩) অনুযায়ী, কোনো অপরাধ সংঘটন করলে অথবা অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

আইনে আরও বলা হয়, ধারা ১০ এর (১) এবং ধারা ১১ এর (১) অনুযায়ী, কোনো অপরাধ সংঘটন করলে অথবা অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ২ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত