জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আশ্চর্য! শাক-সবজিগুলা রেগে গেল কেন?

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৩৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

ফেসবুক বা ইনস্টা স্ক্রল করলেই ইদানীং কিছু উইয়ার্ড রিল সামনে আসতেছে। যে সবজি বা ফলের পাতে থাকার কথা, তারা এখন স্ক্রিনে আইসা রীতিমতো তুইতোকারি করতেছে! করলা, শসা, আদা বা লেবু আপনার দিকে আঙুল তুইলা বলতেছে সে আপনার শরীরের কী কী উপকার করে, আর আপনি তারে অবহেলা কইরা কী কী ভুল করতেছেন। সবজি বা ফলমূল না খালি, আসতেছে বাহারি ফাস্টফুডেরাও। তারা আইসা দিচ্ছে ক্ষতির খতিয়ান।

ছবি: Etamemeholo?
ছবি: Etamemeholo?

​এআই ইউজ কইরা বানানো এই টকিং অবজেক্ট বা কথা বলা খাবারদাবার এখন ইন্টারনেটের নতুন সেনসেশন। ইউটিউব পুরা ফ্লাডেড হাউ টু মেইক কথা বলা খাবারদাবারের টিউটোরিয়ালে। এইসব কন্টেন্ট মানুষ প্রচুর দেখতেছে, ধুমায়া শেয়ার দিতেছে। কিন্তু আমার কিউরিওসিটি হইতেছে, কেন আমরা এই উইয়ার্ড ভিডিওগুলো এত পছন্দ করতেছি? চলেন বস, ভাইরাল এই ট্রেন্ডটারে হালকা একটু ডিকনস্ট্র্যাক্ট করি।

সবার আগে একটা জিনিস বোঝা দরকার, কেন মানুষ এই ভিডিওগুলা দেখতেছে। এরপর আমরা খুঁজবো কীভাবে আপনার আমার ফ্রেন্ড সার্কেল এই ভিডিওগুলার সাথে কানেকশন ফিল করতেছে। এই জিনিসগুলা সমন্ধে ক্লিয়ার পিকচার থাকলেই আপনি সহজে ধরতে পারবেন, কীভাবে এই টকিং অবজেক্ট ট্রেন্ডটা বর্তমানে ভাইরাল ট্রেন্ড হিসেবে ইন্টারনেট সেনসেশন হইতে পারল।

অ্যানথ্রোপোমর্ফিজম

ছবি: Shan Health Care এর রিলস
ছবি: Shan Health Care এর রিলস

নাম পইড়া দাঁত ভাইঙ্গা গেলেও কন্সেপ্টটা পানির মতো সহজ। মানুষ না এমন কোনো কিছুর ওপর মানুষের নেচার আরোপ করারে অ্যানথ্রোপোমর্ফিজম বলা হয়। ছোটবেলায় রূপকথার গল্পে যে শুনতেন ব্যাঙ বা গাছ কথা কয় ঐ জিনিসগুলাই অ্যানথ্রোপোমর্ফিজম। আদিম যুগে মানুষ যখন গুহার ভিতর থাকত, তখন নিরাপত্তার খাতিরে সে বাতাসের শব্দে বা গাছের ছায়ায় অন্য আরেকটা মানুষের অবয়ব বা কণ্ঠস্বর কল্পনা কইরা নিত। এই অ্যানথ্রোপোমর্ফিজম মানুষের আদিম প্রবৃত্তি।

আজকের ডিজিটাল যুগে সেই একই প্রবৃত্তি কাজ করতেছে এই উইয়ার্ড ভিডিওগুলার ক্ষেত্রে। একটা করলার ওপর যখন এআই দিয়ে চোখ মুখ বসানো হয়, আমাদের সাবকন্সাস মাইন্ড সেইটারে আর পাঁচটা জড় বস্তুর মতো অবজ্ঞা করতে পারে না। আমাদের মিরর নিউরনগুলা এক্টিভ হয়ে ওঠে এবং আমরা সেই সবজির এক্সপ্রেশনের মাঝে নিজেদের আবেগ খুঁজতে থাকি। এই যে একটা নির্জীব বস্তুকে সত্তা হিসেবে দেখার যে কিওরিসিটি, সেটাই আমাদের এই ধরনের ভিডিও দেখতে বাধ্য করে।

থাম্ব স্টপার ইফেক্ট

আমরা এখন আছি একটা এটেনশন ইকোনমির যুগে। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করার সময় আমাদের ব্রেইন ম্যাক্সিমাম টাইমে অটো পাইলট মোডে থাকে। এই মোড ভাঙার জন্য একটা প্যাটার্ন ইন্টারাপ্ট বা ধাক্কার দরকার হয়।

ইউজুয়ালি কোনো ভিডিওতে কেউ যখন ‘আপনি’ বইলা এড্রেস করে, বেশিরভাগ মানুষ ওইটারে অ্যাড ভাইবা স্কিপ করে। কিন্তু একটা আদা বা লেবু যখন অল অন অ্যা সাডেন স্ক্রিনে আইসা সরাসরি ‘তুই’ বইলা সম্বোধন করে, আমাদের ইগো আর সারপ্রাইজ এলিমেন্ট তখন একসাথে ফাংশন করা স্টার্ট করে। ব্রেইন তখন সব্জির তুই তোকারি নিতে না পাইরা অ্যাক্টিভ হয়ে যায়। এই যে ২-৩ সেকেন্ডের একটা শক, এইটাই বর্তমানের গোল্ডফিশের চেয়েও কম অ্যাটেনশন স্প্যানের ভিউয়ার্সদের আটকায় রাখার প্রধান অস্ত্র। এইটারে বলা হয় থাম্ব স্টপার ইফেক্ট, যা আপনার বুড়া আঙুলরে স্ক্রলিং থিকা থামায় রাখে।

ছবি: শান হেলথ কেয়ারের একটা রিল
ছবি: শান হেলথ কেয়ারের একটা রিল

প্যারাসোশ্যাল ইন্টারঅ্যাকশন

বর্তমান সময়ে লেকচার জিনিসটাই একটা ব্যাড বাজের নাম । একজন নিউট্রিশনিস্ট যখন অ্যাপ্রন পইরা সিরিয়াস মুখে সবজি খাইতে বলেন, সেটা আমাদের কাছে খুবই বোরিং আর মনোটোনাস লাগে। কিন্তু খাবার যখন নিজেই নিজের ওকালতি শুরু করে, তখন সেখানে একটা প্যারাসোশাল ইন্টারঅ্যাকশন বা একতরফা সামাজিক যোগাযোগ তৈয়ার হইয়ার হয়।

এইখানে একটা হিউমারাস অথরিটি কাজ করে। মানুষ ভাবে, যার গুণাগুণ সে যেহেতু নিজেই আইসা বলতেছে, এর চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য আর কে হইতে পারে? এই যে খাবারের সাথে একটা ফানি অথচ পার্সোনাল কানেকশন, যেখানে খাবারটা আপনার বন্ধু বা শত্রুর মতো আচরণ করতেছে, এইটা তথ্যের গুরুগাম্ভীর্য কমায়ে সেইটারে অনেক বেশি রিলেটেবল এবং শেয়ারওর্দি কইরা তোলে। সরাসরি উপদেশের চাইতে এই উইয়ার্ড আলাপচারিতা মানুষের মনে আরো দ্রুত গাঁইথা যায়।

কেন মানুষ এই ভিডিওগুলার সাথে কানেকশন ফিল করতেছে?

উইয়ার্ড দেখলেই যে মানুষ এর সাথে কানেক্ট ফিল করে বিষয়টা কিন্তু এমন না। এই টকিং অবজেক্টগুলার সাথে আমাদের কানেকশনের বেশ কয়েকটা কানেকটিং পয়েন্ট আছে। চলেন সেগুলা একটু খুঁজি।

১) আমি গিল্টট্রিপ পেতে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে ছুটে আসি (সরি আইয়ুব বাচ্চু)

শাকসবজি খাওয়া ভালো আর ফাস্টফুড খাওয়া যে খারাপ এইটা কে না জানে? এই ইনফরমেশন আমাদের মাথায় সেভ আছে, কিন্তু মানে কে?

যখন একটা বার্গার স্ক্রিনে আইসা বলে, ‘খায়া নে আমারে, তারপর হার্টে ব্লক নিয়া হাসপাতালে দৌড়াইস!’ —তখন আমাদের অবদমিত অপরাধবোধটা একটা ধাক্কা খায়। মানুষ যখন নিজের ভুলগুলা অন্য কারো (খাবারের) মুখ দিয়া শোনে, তখন সেটার সাথে তার একটা মেন্টাল কানেকশন তৈরি হয়। এইটারে বলে সেলফ ডিপ্রেকেটিং হিউমার। আমরা নিজের ওপর হাসি, আবার একই সাথে অবচেতন মনে ইনফোটারেও হজম করি। এই তিতা সত্যি হজম করার ফানটাই আমাদেরকে ভিডিওটার সাথে কানেক্ট করায়।

২) ক্রিঞ্জ কালচারের বাতাস

এই ভিডিওগুলা প্রথমবার দেখলে আপনার মনে হইতে পারে ‘কী বিশ্রী এডিটিং, একটা বেগুন এইভাবে চিল্লাইতেছে কেন? ewww cringe!’ কিন্তু ঘটনা হইলো, এই ক্রিঞ্জ ফিলিংসটাই আমাদেরকে এইসব ভিডিওর সাথে আঠার মতো আটকায়ে রাখে।

ছবি: ফেসবুক
ছবি: ফেসবুক

এখনকার ইন্টারনেট কালচারে একটা আলাপ বেশ খুব পপুলার, আলাপটা হইতেছে "It’s so cringe that I can't stop watching"।

আপনার মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে কেন এমন হয়। এর পেছনে আছে ভাইকারিয়াস শেইম। মানুষ যখন অন্য কাউরে লজ্জাজনক কিছু করতে দেখে, তখন নিজের ভেতরে একটা এনজয়মেন্ট ফিল করে। এই ভিডিওগুলার মেকিং বা ভয়েস ওভার ইচ্ছা কইরাই একটু লাউড রাখা হয় যাতে আপনার ইগোতে লাগে। আর যখনই আপনার ইগোতে লাগে, আপনি ভিডিওটা নিয়া ট্রল করার জন্য হইলেও ঐটা শেয়ার দেন। এই লাভ-হেইট লুপটাই হইলো ক্রিঞ্জ কালচারের আদি ও আসল চাবিকাঠি।

৩) অসঙ্গতির ফান

আমাদের লাইফ এখন অনেক বেশি সিরিয়াস আর প্রেডিক্টেবল। এই মনোটোনির মধ্যে আমরা যখন দেখি একটা আদা ক্ষেইপা টেইপা আমাদের গালিগালাজ করতেছে, তখন সেই অসংগতি আমাদের আনন্দ দেয়।

গত কয়েক বছর ধইরাই ইন্টারনেটে "So weird that it's good" এর ট্রেন্ড চলতেছে। এই যে লজিকের বাইরে গিয়া একটা জিনিস ঘটা, এই এবসার্ডিস্ট হিউমার আমাদের স্ট্রেস রিলিজ করতে হেল্প করে। আর এই জন্য খালি ভিডিও দেইখাই আমরা থাইমা যাই না। শেয়ার দিয়া ক্যাপশনে লিখি — ‘সময় কতডা খারাপ হইলে লুঙ্গি পরা শশার গালিগালাজ শোনা লাগে।’

ছবি: ফেসবুক
ছবি: ফেসবুক

৪. ইনফোটেইনমেন্ট

মানুষ এখন আর দীর্ঘ আর্টিকেল পইড়া ডায়েট চার্ট বুঝতে চায় না। এই ভিডিওগুলা জটিল সব ইনফোরে ৩০-৪০ সেকেন্ডে একটা মজার ক্যারেক্টারের মাধ্যমে তুইলা আনতেছে। এইটা একপ্রকারের মাইক্রো লার্নিং। যখন ইনফোর সাথে এন্টারটেইনমেন্টরে ব্লেন্ড করে, তখন ভিউয়ার্সরা ঐটারে আর এডুকেশন হিসেবে না নিয়া এক্সপেরিয়েন্স হিসেবে দেখে। এই স্মার্ট প্রেজেন্টেশনটাই ভিউয়ার্সদের সাথে এই ভিডিওগুলার একটা ইনস্ট্যান্ট কানেকশন তৈয়ার কইরা দেয়।

এই ট্রেন্ডের আয়ু কতদিন?

যেকোনো ভাইরাল ট্রেন্ডেরই একটা স্যাচুরেশন পয়েন্ট থাকে। যখন ফিডের প্রতিটা ভিডিওতে শাকসবজি বা ফলমূল আপনারে গালি দেওয়া শুরু করবে, তখন এই শক ফ্যাক্টর আর কাজ করবে না। এটা মেবি এই ধরনের কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা অলরেডি বুঝে ফেলেছেন। এই আন্ডারস্ট্যান্ডিং থেকেই এখন ফিডে নতুন ধরনের কন্টেন্ট আসছে। এই কন্টেন্টগুলোতে শাকসবজি বা ফলমূলের আদালত টাইপের জিনিস দেখা যাচ্ছে।

এই জিনিসও মেবি একটা টাইমে পুরানা হয়ে যাবে। মানুষও হয়তো তখন আবার হিউম্যান টাচ রিয়েল কন্টেন্টের দিকেই ফিরবে।

তবে একটা জিনিস শিওর, এআই যেহেতু আমাদের ইমাজিনেশন আর রিয়েলিটির মাঝামাঝি ওয়ালটা একপ্রকার ব্রেক কইরা ফেলতে পারছে, তাই এআই এর এবসার্ডিটিই এখনকার ডিজিটাল রিয়েলিটি। তাই আপাতত লজিক না খুঁইজা এই উইয়ার্ডনেসরে এনজয় করেন।

কারণ দিনশেষে, একটা আদার গালি খাইয়া যদি আপনার ঠান্ডার সমস্যা কইমা যায়, তাইলে মন্দ কী?

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত