বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সাধারণত শান্তিপূর্ণ হলেও অর্থরাজনীতি ও জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা আনফ্রেল।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) অনলাইনে প্রকাশিত এক অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন (আনফ্রেল) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন কারিগরিভাবে সফল। তবে নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্রচার পর্যায়ে সহিংসতা লক্ষ করা গেছে। প্রতিবেদনে দৃশ্যমান নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং ডিজিটাল নজরদারিসহ প্রযুক্তির ব্যবহারকে ভোটগ্রহণের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একই দিনে নির্বাচন ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট আয়োজন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মাইলফলক ছিল। তবে লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা ও শিক্ষার অভাবে বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে ভোটারদের মধ্যে ব্যালটের রঙ ও প্রশ্নের পরিধি নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা গেছে। আনফ্রেল এই জটিল নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পরবর্তী সময়ে আরও সহজবোধ্য ও তথ্যনির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছে।
জবাবদিহির ঘাটতি ও অর্থরাজনীতি
আনফ্রেলের প্রতিবেদনে টিআইবির অনুসন্ধানের বরাতে বলা হয়, অনেক প্রার্থী নির্ধারিত ব্যয়সীমা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করেছেন। বিশেষ করে আর্থিক সক্ষমতা এখনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে এবং অনিয়ম করলে শাস্তির আওতায় আসার সম্ভাবনা কম থাকায় ভোটারদের মাঝে অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের দিন অর্থরাজনীতিকে বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। ভোটকেন্দ্রের পাশে দলীয় বুথ থেকে প্রার্থীর ছবিযুক্ত ভোটার স্লিপ বিতরণ করা এবং ভোটাররা তা পোলিং এজেন্টদের দেখানোর বিষয়টি পর্যবেক্ষকদের নজরে এসেছে। আনফ্রেল সতর্ক করে বলেছে, এটি ভোট কেনাবেচা বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হতে পারে, যা ভোটারের স্বাধীন ভোটাধিকার প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে।
সহিংসতা ও নিরাপত্তা
সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচনের দিন সহিংসতা কমানো সম্ভব হলেও প্রচারণা পর্যায়ে ‘পেশিশক্তি’ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আনফ্রেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে এসব সহিংসতার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮৩ জন নারী ছিলেন, যা প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বড় বৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের প্রবেশগম্যতা নিয়েও প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে।
সামাজিকমাধ্যম ও পর্যবেক্ষণ
আনফ্রেল জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারে সামাজিকমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হলেও এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর ঝুঁকি দেখা গেছে। অনলাইন পর্যবেক্ষণে ৭৬ হাজারের বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোটার শিক্ষার চেয়ে প্রচারণামূলক কনটেন্টই বেশি ছিল। এ ছাড়া পর্যবেক্ষকদের দেরিতে অনুমোদন দেওয়ার সমালোচনা করে সংস্থাটি ভবিষ্যতে প্রাক-নির্বাচন পর্যায় থেকেই পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে।