জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’ থেকে অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’: ব্যক্তিসত্তার রূপান্তর

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মদিন ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি। ‘মানুষের দমিত স্পৃহা ও শাণিত সংকল্পকে আবর্জনার ভেতর থেকে খুঁজে বের করে আনার’ কথা বলেছিলেন তিনি। এটাই তাঁর সাহিত্যের বিশেষ দিক।

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০: ২৩
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলা কথাসাহিত্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭) স্বতন্ত্র একটি অভিজ্ঞতার নাম। দুইটি উপন্যাস ও আটাশখানা গল্প নিয়ে তাঁর কথাসাহিত্যের জগত। এর পাশাপাশি আছে ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’ নামে একটি প্রবন্ধের বই। এই হলো তাঁর সাহিত্যকীর্তি। এই অল্পবিস্তর সাহিত্য দিয়েই তিনি কীর্তিমান হয়ে আছেন বাংলা সাহিত্যে। তাঁর সাহিত্যের বিশেষত্বের খোঁজ করা দরকার। তখন জানা যায়, ‘মানুষের দমিত স্পৃহা ও শাণিত সংকল্পকে আবর্জনার ভেতর থেকে খুঁজে বের করে আনার’ কথা বলেছিলেন তিনি। এটাই তাঁর সাহিত্যের বিশেষ দিক।

ঘটনার বিন্যাস ও চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্থান, কাল ও পাত্রকে পুঙ্খানপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছেন। এটাকে অবশ্য কোনো কোনো সমালোচক তাঁর দুর্বলতা হিসেবেও চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। তাঁরা বলেন, এটা পাঠকের কল্পনার জগতকে সংকুচিত করে দেওয়া। কিন্তু ইলিয়াস তো প্রবেশ করতে চান ব্যক্তির মনোজগতে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত আর অবদমিত হয়ে থাকা ব্যক্তির কথা বিস্তারিত না বলে পালানোর উপায় আছে কি?

‘বাংলা ছোট গল্প কি মরে যাচ্ছে?’ প্রবন্ধে ইলিয়াস নিজেই বলেছেন:

কোনো একটি সমস্যাকে কেন্দ্রবিন্দু করে একরৈখিক আলোর মধ্যে তাকে যথাযথভাবে নির্দিষ্ট করার শর্তটি পালন করা সৃজনশীল লেখকের পক্ষে দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে। একটি মানুষকে একটি মাত্র অনুভূতি বা সমস্যা দিয়ে চিহ্নিত করা এখন অসম্ভব। লেখকের কলম থেকে বেরুতে-না-বেরুতে এখনকার চরিত্র বেয়াড়া হয়ে যায়, একটি সমস্যার গয়না তাকে পরিয়ে দেওয়ার জন্য লেখক হাত তুললে সে তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গায়ে তুলে নেয় হাজার সংকটের কাঁটা। লেখকের গলা শুকিয়ে আসে, একটি সমস্যার কথা তুলে ধরার জন্য। এত সংকটের ব্যাখ্যা করার সুযোগ এখানে কোথায়?

ব্যক্তির মনোজগতে বিদ্যমান সংকট আর তা থেকে উত্তরণের যে অবিরত লড়াই কিংবা সংগ্রাম তার ভেতরে চলমান সবটুকু রূপ তো সে বহিঃপ্রকাশ করতে পারে না সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে। কিংবা বলা যায়, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা আর রাষ্ট্রকাঠামো কখনোই ব্যক্তিকে সেই স্থান দেয়নি। যার ফলে ব্যক্তির ভেতরে সৃষ্ট অবদমন থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় সে জানে না। এই ব্যক্তি সর্বদা রাষ্ট্রকে ভয় পায় ও তোয়াজ করে চলে। যদিও সময়ের সাপেক্ষে বলা হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা কিন্তু আদতে তা ফাঁপা বুলি হয়ে ঝুলে থাকে। এমনই একজন ব্যক্তির চরিত্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নির্মাণ করেন ‘রেইনকোট’ (১৯৯৫) গল্পে।

যখন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন বর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মনে একই শর্ত বিরাজ করে তখন তা জাতীয় চেতনার রূপ ধারণ করে। ফলে এক্ষেত্রে অং কিংবা মিন্টু তাদের মাতৃভাষা কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় নির্মাণের যুদ্ধে একই জাতীয় চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছে। নির্মাতা অঞ্জন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একটি নাম অং ব্যবহার করে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকের ঘটনা নিয়ে রেইনকোট গল্প রচিত হয়েছে। প্রচলিত যুদ্ধচিত্রের বাইরে একজন কলেজ শিক্ষকের মধ্যবিত্তীয় মনের যুদ্ধকেন্দ্রিক সৃষ্ট আত্মপরিচয়ের সংকট ও তা থেকে উত্তরণের চিত্র এই গল্পের মূল কাহিনি। যুদ্ধকালীন পর্যায়ে কলেজের প্রিন্সিপাল আব্দুস সাত্তার পাকিস্তানপন্থী ভূমিকা নেয় এবং কলেজের উর্দু শিক্ষকের কাছে উর্দুভাষা চর্চা করে। এই পর্যায়ে রসায়নের লেকচারার নূরুল হুদা যে কিনা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক, সংশয় ও সিদ্ধান্তহীনতায় থাকে তাকে কলেজের পিয়ন ইসহাক মিয়া জরুরি মিটিংয়ের সংবাদ দিতে আসে। পিয়ন ইসহাক বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও উর্দু ভাষায় কথা বলে। এটা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই সে করে। কেন বলে? সে প্রশ্নের মীমাংসা একটু পরে করা যাবে। বৃষ্টিমুখর দিনে নূরুল হুদার মধ্যবিত্ত মন কলেজের মিটিংয়ে যেতে সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানাতে সংশয় বোধ করে। যখন কলেজের অধিকাংশ শিক্ষক শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে তখন নূরুল হুদা তার স্ত্রীর তাগাদা সত্ত্বেও গ্রামে যায়নি। এরকম দিনে নূরুল হুদা তার মুক্তিযোদ্ধা শ্যালক মিন্টুর রেখে যাওয়া রেইনকোট পরে। তখন তার সন্তানেরা বলে, বাবাকে ছোটমামার মতো লাগছে। এরপর থেকেই নূরুল হুদার চারিত্রিক রূপান্তর ঘটে।

কলেজে পৌঁছানোর পর হামলাকারী অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তার যোগসাজেশ রয়েছে এই অভিযোগে পাকিস্তান আর্মি নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের একপর্যায়ে সে বলে, হামলাকারীদের ঠিকানা তার জানা আছে কিন্তু সে বলবে না। এটা ‘রেইনকোট’ গল্পের কাহিনি। এই কাহিনির মূল বিষয়টি হলো একজন ব্যক্তির মনোজগতের রূপান্তর। যে ব্যক্তিটি তার সহকর্মীদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের আলাপ করতে ভয় পায়, রেডিওর ভলিউম কমিয়ে যুদ্ধের সংবাদ শোনে এবং শ্যালকের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কবোধ করে, তার মধ্যে হঠাৎ পরিবর্তন ঘটে। আর এই পরিবর্তন বা রূপান্তরের উৎস হলো মুক্তিযোদ্ধা মিন্টুর রেইনকোট। রেইনকোট পরিধান করার পর থেকেই তার মধ্যে সাহস সঞ্চারিত হতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধার রেইনকোট = সাহসের উৎস। নির্মাতা জাহিদুর রহিম অঞ্জন কি এই গল্পকে সেলুলয়েডে বন্দী করে দর্শকের মধ্যে সাহস সঞ্চার করতে চেয়েছেন? এবার সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করা যাক।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’ গল্প থেকে জাহিদুর রহিম অঞ্জন (১৯৬৪-২০২৫) নির্মাণ করেন ‘মেঘমল্লার’ (১৯১৪) চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের শুরুতে দেখানো হয়, চলমান ট্রাকের সামনে হলুদ মানচিত্র খচিত লাল সবুজের একটি পতাকা। এই দৃশ্যে ক্যামেরার পয়েন্ট অব ভিউ উড়তে থাকা ছোট একটি পতাকা। এই পতাকার রং সময় নির্দেশক একটি প্রতীক। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলার পতাকা হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। তারপর ফ্লাশব্যাকে চলচ্চিত্রের কাহিনি শুরু হয়। আবছা অন্ধকার ও বৃষ্টির মধ্যে একটি নৌকা থেকে চারজন তরুণকে রাইফেল হাতে নামতে দেখা যায়। তাদের মধ্য থেকে রেইনকোট পরিহিত একজন তরুণ তার বোনের বাসায় আসে। বোন আর শিশু ভাগ্নির সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে তার বোন প্রশ্ন করে:

ওখানে তোরা কি খাসরে মিন্টু?

মিন্টু : কোথায় ক্যাম্পে? ... আমরাই রান্না করি। ... আর অপারেশনের সময় গ্রামের লোকেরাই খাওয়ায়।

এই সংলাপে ‘ক্যাম্প’ ও ‘অপারেশন’ শব্দদ্বয়ের মধ্য দিয়ে দর্শক আলোচনার প্রসঙ্গ কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারে। এরপর রাতের দৃশ্যে গুলির আওয়াজ প্রসঙ্গকে আরও কিছুটা খোলাসা করে। আর সকালের দৃশ্যে লেকচারার নুরুল হুদা ও তার স্ত্রী আসমার কথোপকথনে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে, যখন আসমা তাদের গ্রামের বাড়ি দৌলতপুরে চলে যাওয়ার কথা বলে: মিন্টু তো বলেছে, চাইলেই যাওয়া যায়।

মেঘমল্লার সিনেমার একটি দৃশ্য।
মেঘমল্লার সিনেমার একটি দৃশ্য।

প্রতি-উত্তরে নুরুল হুদা বলে: মিন্টুর কথা একদম ভুলে যাও। আমাদের সঙ্গে কেউ নাই। কিসিঞ্জার সাহেব তো পরিষ্কারভাবে বলেই দিয়েছেন, এগুলো পাকিস্তানের ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার। মানুষ মেরে সাফা করে দিচ্ছে, ঘরবাড়ি, বাজার জ্বালিয়ে দিচ্ছে, কারো কোনো মাথাব্যথা নাই, সব পাকিস্তানের ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার!

চলচ্চিত্রের এই পর্যায়ে এসে ঘটনা পুরোপুরি খোলাসা হয় এটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের প্রসঙ্গ। ঘটনা আরও প্রাসঙ্গিক হয়, যখন কলেজের প্রিন্সিপাল মিটিং ডাকে আর তাতে কলেজে উপস্থিত থাকে মাত্র পাঁচ জন শিক্ষক। তাদের মধ্যে দুই জন আলাপরত শিক্ষক বলে: দিন দিন বিচ্ছুগুলো ভয়ংকর হয়ে উঠছে। একটা ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া কি সহজ ব্যাপার? তাও জিপসহ। সাতজন আর্মি...।

অপর শিক্ষক: আমাদের হিস্ট্রির রতন বলে দেখতে ছোটোখাটো একটা ছেলে ছিল না, সে নাকি এখন ওদের কমান্ডার হয়েছে। আশ্চর্য!

: ব্যাংকে নাকি টাকা নেই, না খেয়ে মরতে হবে।

: আর ওদিকে তো উর্দু স্পোকেন ক্লাস চলছে।

চলচ্চিত্রের এই দৃশ্যে দেশের পরিস্থিতি, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে বোঝানোর জন্য যথেষ্ট এই অর্থে যে এখানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব অবস্থাকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। ফলে বাঙালির জন্য লড়াইটা কেন করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তা অতি অল্প সংলাপের ভেতর দিয়েই নির্মাতা তুলে ধরার মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। কলেজের প্রিন্সিপাল উর্দু শিক্ষকের কাছে উর্দুভাষা রপ্ত করছে—এই বিষয়টিকে হিস্ট্রির শিক্ষক ব্যঙ্গ করে বলে, শালা, উর্দুর প্রফেসর না হয়ে কেন যে হিস্ট্রি পড়লাম। এখানে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ‘উর্দুভাষা’ ও ‘হিস্ট্রি’ এই দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ জাতীয় চেতনার দৃষ্টিকোণ থেকে যদি ইতিহাসকে বিবেচনা করা হয় তাহলে লক্ষ করা যায়, উর্দুর বিপরীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাঙালির আত্মত্যাগের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের এই ইতিহাসের বিপরীতে ১৯৭১ সালে আবার কলেজের প্রিন্সিপাল উর্দুভাষা রপ্ত করছে। এটা কি শুধু তার আত্মরক্ষার কৌশল নাকি নতুন আত্মপরিচয় নির্মাণের জন্য প্রস্তুতি? অর্থাৎ যদি পাকিস্তান আর্মি বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করে তাহলে তাকে উর্দুভাষায় কথা বলতে হবে। উর্দুভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রে কলেজের পিয়ন ইসহাককে আরও বেশি উৎসাহী হিসেবে দেখা যায়। ফলে কলেজের সর্বোচ্চ পদধারী এবং সর্বনিম্ন অধস্তন ব্যক্তিটির উর্দুভাষাকে ধারণ করার বিষয়টি শুধু আত্মরক্ষার কৌশল নয় বরং উর্দুভাষাকেন্দ্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ।

বিষয়টি আরও গভীরতা পায় যখন উর্দুভাষার শিক্ষক প্রিন্সিপালকে বলে : ‘স্যার, আপনি তো উর্দুতে ডক্টরেট করতে পারেন, তাহলে ডবল ডক্টরেট হয়ে যাবে।’ বিদ্যমান পরিস্থিতিতে উর্দুতে ডক্টরেট করার প্রস্তাব হলো বাঙালি প্রিন্সিপালের কাছে উর্দুর জন্য সম্মতি আদায়ের চিত্র।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভাষাকেন্দ্রিক এই আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বিষয়টি পরের সিকুয়েন্সে লক্ষ করা যায়, অং নামের একজন আদিবাসী তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে। খেয়াল করা দরকার, অং একজন আদিবাসী যার মাতৃভাষা বাংলা নয়, কিন্তু তার জন্মভূমি বাংলাদেশ। ফলে এক্ষেত্রে তার আত্মপরিচয় একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো যে, কলেজের প্রিন্সিপাল এবং পিয়নের মাতৃভাষা বাংলা হওয়ার পরেও তারা পাকিস্তান আর্মির পক্ষে সমর্থন জোগায় আর অংয়ের মাতৃভাষা বাংলা না-হওয়া সত্ত্বেও সে বাংলাদেশ স্বাধীন করার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। প্রশ্ন জাগে, অংয়ের এই চেতনার উৎস আসলে কী?

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকের ঘটনা নিয়ে রেইনকোট গল্প রচিত হয়েছে। প্রচলিত যুদ্ধচিত্রের বাইরে একজন কলেজ শিক্ষকের মধ্যবিত্তীয় মনের যুদ্ধকেন্দ্রিক সৃষ্ট আত্মপরিচয়ের সংকট ও তা থেকে উত্তরণের চিত্র এই গল্পের মূল কাহিনি।

বলা যায়, যখন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন বর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মনে একই শর্ত বিরাজ করে তখন তা জাতীয় চেতনার রূপ ধারণ করে। ফলে এক্ষেত্রে অং কিংবা মিন্টু তাদের মাতৃভাষা কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় নির্মাণের যুদ্ধে একই জাতীয় চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছে। নির্মাতা অঞ্জন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একটি নাম অং ব্যবহার করে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। আবার আরেকটি দৃশ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবহন ও সংবাদ আদান-প্রদানকারী নৌকার বৃদ্ধ মাঝিকে আসমা প্রশ্ন করে, আপনিও কি মুক্তিযোদ্ধা?

মাঝি উত্তর দেয়: হইতে পারে। তয় আই ট্রেনিং লই নাই, আই হেতাগোরে হার (পার) করি।

এই প্রশ্ন দ্বারা নির্মাতা অঞ্জন আমাদের সামনে মুক্তিযোদ্ধার আইডেনটিটি সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক বিষয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে যারা নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি সহযোগিতা করেছেন তাদের স্বীকৃতি বা পরিচয় আসলে কী হবে?

এবার আসা যাক রেইনকোট পরিধানের পর নূরুল হুদার অবস্থা প্রসঙ্গে। মুক্তিযোদ্ধা মিন্টুর রেইনকোট পরার পর হুদার শিশু কন্যা তাকে বলে, বাবা তোমাকে ছোটমামার মতো লাগছে। এরপর থেকে গল্পে নুরুল হুদার যে রূপান্তর লক্ষ করা যায়, চলচ্চিত্রে সরাসরি তেমনটি নির্মাতা তুলে ধরেননি। তবে শিশুটির সংলাপের মাধ্যমে এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই রেইনকোট আসলে কী? মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তির মতকে সামগ্রিকভাবে রূপান্তরের মাধ্যম হলো এই রেইনকোট। ফলে রেইনকোট পরিধানের পর কলেজে নুরুল হুদাকে যখন পাকিস্তান আর্মি নির্যাতন চালিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করতে চায় তখন সে বলে, আই নোও নাথিং।

পাকিস্তানি আর্মি: হোয়্যার ডিড ইউ টেক ইয়োর ট্রেনিং ফ্রম?

নূরুল হুদা: ট্রেনিং?

পাকিস্তানি আর্মি: ইন্ডিয়া প্রফেসর?

নূরুল হুদা: ইন্ডিয়া মে কাভি নেহি গিয়া, কলেজমে চাকরি কিয়া, অল দিস মান্থস।

পাকিস্তানি আর্মি: ইউ আর এ হার্ড নাট।

বলা যায়, এর পর থেকে নুরুল হুদার রুপান্তর প্রক্রিয়া চরম উৎকর্ষতা পায়। পাকিস্তান আর্মি তার কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে জানতে চায়, তখনও সে বলে, তাদের চেনে না। এরপর রেইনকোট পরিহিত নুরুল হুদাকে যখন হাত বেঁধে ঝুলিযে রাখা হয় তখন তার নির্যাতিত অপর সহকর্মী তাকে অনুরোধ করে, সে যেন মিন্টুর কথা বলে দেয়। তখন পর্যন্ত নুরুল হুদা বলে, সে কিছুই জানে না। এরপর পাকিস্তানি আর্মি আবার তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করে।

তখন নুরুল হুদা বলে: আমি সবকিছু জানি, এভরিথিং, সব জানতা হ্যায়। জয় বাংলা। জয় বাংলা। নেহি বলেগা। সব মুক্তিযোদ্ধা হামার ভাই হ্যায়। আই নোও এভরিথিং।

পাকিস্তানি আর্মি: হোয়াট?

নুরুল হুদা: জয় বাংলা।

এরপর পাকিস্তানি আর্মির গুলিতে তার মৃত্যুর হয়।

এই সিকুয়েন্সটি হলো রেইনকোটের মূল প্রসঙ্গ। পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে নূরুল হুদার মধ্যবিত্ত মন যে আত্মপরিচয়ের সংকট নিয়ে দোদুল্যমানতায় থেকেছে তা ভেঙে সে বেরিয়ে এসে জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছে। এই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান হলো তার আইডেনটিটি নির্ধারণের চূড়ান্ত রূপ। যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জাতীয় চেতনার বৈশিষ্ট্য থেকে জানা যায়, একটি পতাকা, একটি স্লোগান, একটি সংগীত, একজন নেতা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের পরাধীন ও স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বন্ধন সৃষ্টিতে ও ঐক্যবদ্ধ করতে ভূমিকা পালন করে। আর চলচ্চিত্রে তা নির্মাতা দেখিয়েছেন রেইনকোট পরিধানের পর নুরুল হুদার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে।

এবার দেখা যাক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষ্যে এই দৃশ্যটির বর্ণনা :

কিছুক্ষণ পর, কতক্ষণ সে জানে না, মিলিটারি ফিরে এসে ফের বলে, মিসক্রিয়েন্টদের ঠিকানা তো তার জানা আছে। সে ফের জবাব দেয়, ‘হ্যাঁ।’ কিন্তু পরের প্রশ্নের জবাব না পেয়ে মিলিটারি তাকে নিয়ে যায় অন্য-একটি ঘরে। তার বেটেখাঁটো শরীরটাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো ছাদে-লাগানো একটা আংটার সঙ্গে। তার পাছায় চাবুকের বাড়ি সপাৎ সপাৎ করে। তবে বাড়িগুলো বিরতিহীন পড়তে থাকায় কিছুক্ষণের মধ্যে সেগুলো নুরুল হুদার কাছে মনে হয় স্রেফ উৎপাত বলে। মনে হচ্ছে যেন বৃষ্টি পড়ছে মিন্টুর রেইনকোটের ওপর।

‘রেইনকোট’ গল্প কিংবা ‘মেঘমল্লার’ চলচ্চিত্র উভয়ের ভাষ্য মূলত একজন ব্যক্তির আইডেনটিটি তুলে ধরার চিত্র। সংকটে-আবদ্ধ চারপাশে একজন ব্যক্তি যখন নিজের মতো করে থাকতে চেয়েছিল তখনই সে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য লড়াইয়ে নিরপেক্ষ থাকা যায় না, হয় শোষকের পক্ষে না-হয় শোষিতের পক্ষ হয়ে অবস্থান নিতে হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধার রেইনকোট গায়ে দেয়ার পর নুরুল হুদার শরীরে যে-উত্তাপ সৃষ্টি হয় তাতে সে ব্যক্তিবিচ্ছিন্নতার অবস্থা থেকে লড়াইয়ের সামগ্রিকসত্তায় প্রবেশ করে। বিদ্যমান সংকটে তার মুখে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সে তা প্রমাণ করে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

Ad 300x250

সম্পর্কিত