জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

হাতিয়ায় গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ধুম্রজাল

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নোয়াখালী

নারী নির্যাতন। স্ট্রিম গ্রাফিক

নোয়াখালীর হাতিয়ায় তিন সন্তানের জননী এক গৃহবধূকে তাঁর নিজ ঘরে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ওই নারী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর দাবি করেন, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। চিকিৎসক বিষয়টি জানার পরপরই পরীক্ষার জন্য তাঁকে গাইনি ওয়ার্ডে স্থানান্তর করেন।

নোয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমার কাছে হাতিয়া থেকে আসা একজন রোগী (৩২) অভিযোগ করেছেন যে গতকাল (শুক্রবার) রাত ১১টার দিকে তাকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন (যৌন হয়রানি) করা হয়েছে। আমরা তৎক্ষণাৎ রোগীকে ভর্তি করেছি এবং শারীরিক পরীক্ষার জন্য গাইনি বিভাগে পাঠিয়েছি। গাইনি বিভাগের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত ফলাফল জানাবেন।’

ডা. মোস্তাফিজুর আরও বলেন, ‘উনি আমাকে প্রথমে মারামারির কথা বলেছেন। পরবর্তী সময়ে আবার বলেছেন, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সেজন্য আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে উনাকে আমাদের গাইনি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি করিয়েছি।’

অভিযোগকারী ওই নারীর দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, গত রাত ১১টার দিকে তিন ব্যক্তি তাঁর ঘরে প্রবেশ করে। এদের মধ্যে ‘কালা এমরান’ নামের একজন এবং অজ্ঞাতনামা আরেকজন দরজায় পাহারায় ছিলেন, আর ‘রহমান’ নামের এক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেন। এ সময় তার স্বামীকে বেঁধে রাখা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে স্থানীয় যুবক রহমান তার বিরুদ্ধে আনা ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। উল্টো প্রতিপক্ষের লোকজন তার উপরে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন। তাঁর দেওয়া একটি ভিডিও বার্তা এরই মধ্যে বিএনপি ভেরিফায়েড পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছে। সেখানে তিনি বলছেন, ‘আমি এটা করিনি। এসব বানোয়াট, সব মিথ্যা মামলা, সব ষড়যন্ত্র চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুক্রবার রাত ৮টায় এনসিপির লোকজন আক্রমণ করে আমাকে আহত করে। আমি স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে রাত সাড়ে ১০টায় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হই। তাহলে রাত ১১টায় কীভাবে আমি ধর্ষণ করলাম, তা বুঝতেছি না।’

এদিকে নির্বাচনের পর হাতিয়াজুড়ে হামলা নির্যাতনসহ ধর্ষণের অভিযোগ তুলে ১১ দলীয় জোট থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ বলেন, ‘হাতিয়ার মানুষ বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে বসবাস করে। এখানে মাহবুবের রহমান শামীমের নির্দেশে নব্য বিএনপির লোকজন তাণ্ডব চালাচ্ছে। আমি উনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। আমার সব এজেন্টকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, আমাদের নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী, আমাদের দল ক্ষমতায়, হান্নান মাসউদ কিছু করতে পারবে না। এই ধর্ষণের ঘটনা তারই একটি অংশ।’

হাতিয়ায় নির্বাচনের পর দুটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘দুই-দুইটা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। শুধু শাপলা কলিতে ভোট দেওয়াই তাদের অপরাধ। এই ব্যাপারে প্রশাসনকে বারবার বলার পরও প্রশাসন কোনও অ্যাকশন নিচ্ছে না। হাতিয়াতে অতি দ্রুত সেনাবাহিনী মোতায়ন করে অস্ত্র উদ্ধার করা দরকার।’

এ ব্যাপারে নোয়াখালী-৬ আসনের পরাজিত বিএনপির প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম হামলার ঘটনা অস্বীকার করে ধর্ষণের বিষয়ে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কিনা প্রশাসনকে জিজ্ঞেস করেন। এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নাই।’

এদিকে ঘটনার রেশ এসে পড়েছে জাতীয় রাজনীতিতেও। এরইমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগকারী নারীর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছেন । জামায়াতের আমির ওই নারীকে জানিয়েছেন, তাঁকে দেখতে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) নোয়াখালী আসছেন। তাঁর সঙ্গে নাহিদ ইসলামেরও হাতিয়া আসার কথা রয়েছে।

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে ২৫০ শয্যার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই নারীর সঙ্গে পৃথকভাবে ভিডিও কলে কথা বলেন এই দুই নেতা। এসময় সেখানে উপস্থিত নোয়াখালী-৬ আসনে সংসদ সদস্য পদে বিজয়ী এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম-মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ ও নোয়াখালী-৪ আসনে পরাজিত জেলা জামায়াতের আমির ইসহাক খন্দকার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

জেলা জামায়াতের আমির ইসহাক খন্দাকার বলেন, ‘‘আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান নির্যাতিতার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছেন। এসময় তিনি ওই নারীকে নিজের বোন আখ্যা দিয়ে বলেছেন, আমি সোমবার তাকে দেখতে নোয়াখালী আসবো। পৃথক কলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও ওই নারীকে মা বলে সম্বোধন করে বলেছেন, পুরো বাংলাদেশ আপনার সঙ্গে আছে। আমিও আপনাকে দেখতে আসবো।’’

অন্যদিকে বিএনপির ভেরিফায়েড পেজ থেকে এ ঘটনার একাধিক পোস্ট করা হয়েছে। একটি পোস্টে পুলিশের হাতিয়া সার্কেলের এএসপি মো. নুরুল আনোয়ারের সঙ্গে এক সাংবাদিকের কথোপকথনের একটি অডিও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে এই পুলিশ কর্মকর্তা ধর্ষণের অভিযোগটিকে ‘অতিরঞ্জন’ বলে মন্তব্য করেছেন । তিনি ওই সাংবাদিককে বলছেন, ‘এটা (ধর্ষণের অভিযোগ) জাস্ট এক্সাজারেশন, অতিরঞ্জন এবং প্রোপাগান্ডা।’

কী হয়েছিল, জানতে চাইলে জবাবে তিনি বলেন, ‘একটু সম্পত্তি-টম্পতি নিয়ে আগের ঝামেলা ছিল, এগুলো থেকে টুকটাক ব্যাপার-স্যাপার হয়েছে আরকি। বাট যেভাবে আপনাদের কাছে এটাকে ফোকাস করা হয়েছে, নট দ্যাট।’

অভিযোগটি তদন্ত করা হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের চেক হইছে... ওখানে আরও সিনিয়র লেভেলের অফিসাররা আসছেন।’ এই অভিযোগ নিয়ে একটি ইস্যু তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এসব বিষয়ে আজ রোববার নোয়াখালী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে এখন পর্যন্ত লিখিত কেউ অভিযোগ জানাননি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরে ঘটনার তদন্তে আমাদের একজন এডিশনাল এসপি এবং একজন ইনসপেক্টর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। স্থানীয় লোকজন ধর্ষণের বিষয়ে কিছু জানেন না, তারা সন্ধ্যায় মারামারির কথা বলেছেন।’

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই নারীর সঙ্গেও পুলিশ কর্মকর্তারা কথা বলেছেন বলে জানান তিনি। যে হাসপাতালে ওই নারী চিকিৎসাধীন একই হাসপাতালে অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই সময় চিকিৎসাধীন বলে জানান এএসপি আরিফ হোসেন।

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। যেহেতু এধরনের ঘটনায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা করার বিধান আছে। মামলা করলে আমরা তদন্তে যাবো। যেহেতু আমরা মামলা করার আগেই জানতে পেরেছি, তাই প্রাথমিক অনুসন্ধানের কাজগুলো সম্পন্ন করছি।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত