জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

গ্রাম আদালত আইন বাতিল চেয়ে রিট

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৩৪
হাইকোর্ট ভবন। ছবি: সংগৃহীত

‘গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬’-এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান।

রিটে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের বিচারিক ক্ষমতা, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার খর্ব, উচ্চ আদালতের তদারকি না থাকাসহ বিভিন্ন যুক্তিতে আইনটিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল (আল্ট্রা ভাইরিজ) ঘোষণার আরজি জানানো হয়েছে।

আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে বিবাদী করা হয়েছে। রিটে ‘গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬’ কেন সংবিধানের ৭, ২২, ২৭, ৩১, ৩৩, ৩৫, ১০৯ এবং ১১৬-ক অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না– তা জানতে রুল চাওয়া হয়েছে।

নির্বাহী ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ

রিটে অন্যতম প্রধান যুক্তি হিসেবে সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখা বাধ্যতামূলক। আপিল বিভাগ বিখ্যাত মাসদার হোসেন মামলায় সুস্পষ্ট রায় দিয়েছেন যে, বিচারিক কাজ অবশ্যই একটি স্বাধীন জুডিশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে, যা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকবে।

অথচ গ্রাম আদালত আইনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের হাতে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে নির্বাহী ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তাদের হাতে বিচারিক ক্ষমতা ন্যস্ত করা সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। রাজনৈতিক পরিচয়ধারী জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিচার পরিচালনা ন্যায়বিচারের ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আইনজীবী নিয়োগের অধিকার খর্ব

সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেপ্তার বা অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার একটি সাংবিধানিক রক্ষাকবচ। কিন্তু গ্রাম আদালত আইনের ১৪ ধারায় গ্রাম আদালতে আইনজীবীর অংশগ্রহণ বা নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রিটে যুক্তি দেখানো হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বিচারপ্রার্থীরা পেশাগত আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা সুষ্ঠু বিচার বা ফেয়ার ট্রায়ালের অপরিহার্য উপাদানকে অস্বীকার করার শামিল।

প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ও বৈষম্য

রিটে বলা হয়েছে, গ্রাম আদালতকে আদালত হিসেবে অভিহিত করা হলেও এটি দেওয়ানি কার্যবিধি (সিপিসি), ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) এবং সাক্ষ্য আইনের (এভিড্যান্স অ্যাক্ট ) মতো মৌলিক আইনি কাঠামোর বাইরে কাজ করে। সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে বিচার পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু গ্রাম আদালতে কোনো প্রশিক্ষিত বিচারক বা জুডিশিয়াল অফিসার নেই। বিচারিক স্বাধীনতার অভাব এবং প্রক্রিয়াগত আইনের প্রয়োগ না থাকায় এটি ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার যোগ্যতা রাখে না।

রিটে উল্লেখ করা হয়, ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে নাগরিকদের বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হচ্ছে, যা সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের (আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার) লঙ্ঘন। শহরের একজন নাগরিক যে আইনি সুরক্ষা ও পদ্ধতিগত সুবিধা পান, গ্রামের একজন নাগরিককে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সেই সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

উচ্চ আদালতের তদারকি ও অবমাননার ক্ষমতা

সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধস্তন সব আদালতের ওপর হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা। কিন্তু রিটে উল্লেখ করা হয়, গ্রাম আদালতগুলোকে বিচারিক আদালতের পরিবর্তে প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে গণ্য করায় এগুলো হাইকোর্টের তদারকির বাইরে রয়ে গেছে। ফলে এসব আদালতের সিদ্ধান্তগুলো জবাবদিহির ঊর্ধ্বে এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী।

এ ছাড়া গ্রাম আদালত আইনের ১১ ধারায় গ্রাম আদালতকে আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। রিটে বলা হয়, যেখানে বিচারিক তদারকি বা পদ্ধতিগত সুরক্ষা নেই, সেখানে অ-বিচারক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে শাস্তিমূলক ক্ষমতা ন্যস্ত করা স্বেচ্ছাচারী এবং আইনের শাসনের লঙ্ঘন।

আবেদনে বলা হয়, গ্রাম আদালত মূলত একটি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থার মতো, যা আপস-মীমাংসার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু এমন একটি ফোরামকে ফৌজদারি এখতিয়ার প্রদান এবং শাস্তির ক্ষমতা দেওয়া সংবিধানসম্মত নয়। এটি সংবিধানের কাঠামোর বাইরে একটি সমান্তরাল বিচারব্যবস্থা তৈরি করেছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত