জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইলেকশন না সিলেকশন: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন ভোর

প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৪১
এআই জেনারেটেড ছবি

সামনে নির্বাচন। জুলাই-আগস্টের এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র মেরামতের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। দীর্ঘ দেড় দশকের একদলীয় ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার পর জাতি এখন এক বিশেষ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—আসন্ন নির্বাচন কি কেবল ‘আনুষ্ঠানিকতা’র নির্বাচন হবে, নাকি জনগণের ইচ্ছার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে? আমরা কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখব, নাকি নতুন কোনো ভোরের সাক্ষী হব?

আমরা সবাই জানি ইলেকশন একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যেখানে ভোটাররা স্বাধীনভাবে একাধিক বিকল্প থেকে তাদের পছন্দ বেছে নেন। এর মূল শর্ত হলো—বিকল্প থাকা এবং ভয়হীন পরিবেশ। রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় নির্বাচন বা ‘ইলেকশন’ কেবল একটি ভোট প্রদানের দিন নয়। যখন একজন ভোটার ব্যালট পেপারে একাধিক বিকল্প থেকে নিজের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা পান, তখনই তাকে নির্বাচন বলা যায়।

অন্যদিকে, ‘সিলেকশন’ হলো এমন একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা, যেখানে ফলাফল ভোটের আগেই নির্ধারিত থাকে। এখানে ভোটাররা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নন, বরং একটি পূর্ব-পরিকল্পিত নাটকের কুশীলব মাত্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ একে প্রায়ই নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র বলে অভিহিত করেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ কিংবা ২০২৪ সালের ‘ডামি নির্বাচন’—এই প্রতিটি অধ্যায়কেই বিশ্লেষকরা সিলেকশনের ভিন্ন ভিন্ন মডেল হিসেবে দেখেন। প্রশ্ন হলো, আগামী নির্বাচনেও কি আমরা একই ছকের পুনরাবৃত্তি দেখব?

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড: শুরু নাকি শেষ

নির্বাচন নিয়ে আলোচনার সময় ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ শব্দবন্ধটি বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু এর ব্যাপ্তি ঠিক কতটুকু? এটি কি কেবল ভোটের দিন কেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট বাক্সে সিল মারা? নাকি এর শিকড় আরও গভীরে?

প্রকৃত নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগের পরিবেশ প্রয়োজন হয় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় থেকেই। গণ-অভ্যুত্থানের পর একটা বিষয় পরিষ্কার। কোনো ভবন বা বিদেশী শক্তি এবার সহজে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে তেমন সুবিধা সম্ভবত করতে পারবে না।

যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি: পরিপক্বতা বনাম অধিকার

তবে ইলেকশনের বিপরীতে সিলেকশনের বিতর্কের মূলে দুটি প্রবল বয়ান বা ন্যারেটিভ কাজ করে। একটি পক্ষ মনে করে, কিছুটা হলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একটা অংশ এখনো রাজনৈতিকভাবে ততটা পরিপক্ব নয়। তাদের যুক্তি হলো—সম্পূর্ণ ছেড়ে দিলে পেশিশক্তি আর কালো টাকার জোরে ‘খারাপ মানুষ’ বা ‘দুর্নীতিবাজরা’ জিতে আসবে। তাই রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখতে এবং ‘সঠিক’ মানুষদের ক্ষমতায় বসাতে নির্বাচনের ওপর কিছুটা ‘নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘গাইডেন্স’ থাকা জরুরি। এই বয়ানটি মূলত সিলেকশনকে জায়েজ করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ঢাল।

অন্যপক্ষ, যারা প্রকৃত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, তাদের যুক্তি অত্যন্ত সোজাসাপ্টা। তারা মনে করেন, জনগণ কাকে ভোট দেবে সেটা একান্তই তাদের অধিকার। এমনকি জনগণ যদি ভুল মানুষকেও ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে, তবে সেই ভুল করার অধিকারও তাদের আছে। কারণ, ব্যালট বক্সে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন না থাকলে রাষ্ট্র তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। সিলেকশন যখন নির্বাচনের ছদ্মবেশ নেয়, তখন তা জনবিচ্ছিন্ন এক শাসক শ্রেণি তৈরি করে, যারা জনগণের কাছে নয়, বরং তাদের ‘সিলেক্টর’ বা নির্বাচকদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে।

আমরা কি শুধুই দর্শক

একটি জাতি হিসেবে আমরা এখন এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচারের জন্য। সেই আকাঙ্ক্ষার মূল স্তম্ভই ছিল নিজের প্রতিনিধি নিজে নির্বাচন করার ক্ষমতা ফিরে পাওয়া।

নির্বাচন আসছে। কিন্তু মানুষের মন থেকে ভয় পুরোপুরি কাটেনি। অতীতের সেই ‘সাজানো নাটক’ দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের জনস্মৃতিতে এখনো টাটকা। প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত রূঢ়—আমরা কি এবার সত্যিই ভোট দেওয়ার পরিবেশ পাব? ভোটের ব্যালটে যাকে খুশি তাকে ভোটটা দিতে পারব? গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আমাদের ভূমিকা কি একজন ‘অ্যাক্টর’ বা সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর হবে, নাকি আমরা কেবল পরিসংখ্যানের অংশ হয়ে থাকব?

সরকার যদিও বারবার বলছে ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেরই থাকবে। তবুও ১৭ বছরের বিনা-ভোটের দেশে শঙ্কা কি কাটছে পুরোপুরি?

উত্তরটি আপনার চিন্তার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত