বাংলাদেশে বর্তমানে ৭ কোটিরও বেশি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়, যা প্রযুক্তির এক বিশাল জয়যাত্রা। কিন্তু এই অগ্রগতির সমান্তরালে হানা দিয়েছে ‘ডিপফেক’ নামক এক ভয়ংকর ডিজিটাল আতঙ্ক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি করা বিকৃত কনটেন্ট এখন সুস্থ রাজনীতির জন্য প্রধান অন্তরায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে ভাইরাল হওয়া কথিত ডিপফেক ভিডিও এর জ্বলন্ত প্রমাণ। এটি কেবল প্রযুক্তিগত জালিয়াতি নয়, বরং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নারীবিদ্বেষী প্রচারণার এক নতুন অস্ত্র। প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অন্ধকার দিকটি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি গণতন্ত্রকে অস্থিতিশীল করছে। যখন সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করে।
প্রযুক্তির অপব্যবহার: রাজনৈতিক হাতিয়ার যখন বিকৃত ভিডিও
বর্তমানে ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একজনের অবয়বে অন্যজনের মুখ কিংবা কণ্ঠস্বর নিখুঁতভাবে প্রতিস্থাপন করে তৈরি করা হচ্ছে ভয়ংকর সব অপপ্রচার। সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা গেছে, জাইমা রহমানের ব্যক্তিগত সামাজিক জীবনকে কেন্দ্র করে বিকৃত ভিডিও তৈরি করে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি কেবল একটি সাধারণ ভিডিও জালিয়াতি নয়, বরং এটি স্পষ্টত একটি ‘জেন্ডারড পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স’, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নারীর শরীর ও চরিত্রকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের বিকৃত কনটেন্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল করার মাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হচ্ছে। এই সুপরিকল্পিত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা কেবল ব্যক্তিকে নয়, বরং জনমনে নারী নেতৃত্বের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরির এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
ডিজিটাল কনটেন্ট বনাম সত্যের অপমৃত্যু
বর্তমানে তথ্যের অবাধ প্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গুজব ও বিকৃতির হার। এই বিশাল জনপদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে আবেগের বশবর্তী হয়ে কনটেন্ট শেয়ার করে, যা সমাজ ও রাজনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
পরিচয় সংকট
জাইমা রহমানের নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে, অনুসন্ধানে দেখা গেছে সেখানে আসলে জনৈক এলেনা হোল্ডার নামের এক তরুণীর ক্লিপ ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। এই ধরণের পরিচয় জালিয়াতি সাধারণ ব্যবহারকারীকে বিভ্রান্ত করার এক চরম উদাহরণ, যা ডিজিটাল মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা মুছে দেয়। অন্যের ব্যক্তিগত ভিডিওকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার এই নোংরা প্রবণতা কেবল অনৈতিক নয়, বরং এটি ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদাকে ধ্বংস করার এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তথ্য যাচাই না করে এমন স্পর্শকাতর কনটেন্ট শেয়ার করার ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষ—উভয়ই এক ভয়াবহ ডিজিটাল সংকটের শিকার হচ্ছে।
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও অনলাইন হয়রানি
আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিদ্যমান ‘অ্যালগরিদমিক পিতৃতন্ত্র’ পুরুষ ও নারীর জন্য সামাজিক মানদণ্ডকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করে, যা চরম দ্বিমুখী আচরণের প্রতিফলন। একজন পুরুষ রাজনীতিবিদ যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেন, তাকে ‘স্মার্ট’ ও ‘ব্যালেন্সড’ বলা হলেও; নারী একই স্পেসে পশ্চিমা পোশাকে থাকলেই তাঁর ‘চরিত্র’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এই লৈঙ্গিক ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ডিজিটাল দুনিয়ায় নারীদের জন্য এক বৈরী ও অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে নারীর ব্যক্তিগত পছন্দকে সবসময় নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। মূলত নারীর শরীর ও পোশাককে কেন্দ্র করে এই অনলাইন হয়রানি আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই এক বিষাক্ত বহিঃপ্রকাশ।
আইনের শাসন ও প্রস্তাবিত সমাধান
বাংলাদেশে বর্তমানে ডিপফেক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল গুজবের যে ভয়াবহ বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা বিদ্যমান সাধারণ আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত মর্যাদা নয়, বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও হুমকির মুখে ফেলে। প্রযুক্তির এই অন্ধকার দিক মোকাবিলা করতে এবং নাগরিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। যেমন-
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
ডিজিটাল অপরাধের ধরন যেহেতু প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, তাই এআই এবং ডিপফেক সংক্রান্ত জটিল অপরাধের দ্রুত ও নিখুঁত বিচার নিশ্চিত করতে দেশে ‘স্পেশাল সাইবার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। প্রচলিত বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি এই বিশেষায়িত আদালত শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার সংক্রান্ত মামলাগুলো তদারকি করবে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে গতিশীল ও কার্যকর করবে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি আধুনিক ‘সাইবার সিকিউরিটি আইন’ এবং ‘ডিজিটাল কনটেন্ট নীতিমালা’ প্রণয়ন করা জরুরি, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বিকৃত তথ্য প্রচার রোধে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। একইসঙ্গে সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে সেগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো নাগরিকের সম্মানহানি হলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়।
ডিজিটাল লিটারেসি
বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর প্রায় ৭৫ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণ, যারা মূলত স্মার্টফোনের মাধ্যমে ডিজিটাল জগতের সঙ্গে যুক্ত। তবে এই বিশাল সংখ্যাতাত্ত্বিক অগ্রগতির বিপরীতে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের সক্ষমতা বা ‘ডিজিটাল লিটারেসি’র চরম অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় যেখানে ৩০-৩৫ শতাংশ তরুণ মন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে এবং ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, সেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট চেনার দক্ষতা থাকা অপরিহার্য। রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষী দেয়, আলতাফ হোসেন চৌধুরীর মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তির একটি অসতর্ক বাক্যও জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে; সেখানে ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়ানো বিকৃত কনটেন্ট সমাজকে ভুল পথে পরিচালিত করার বিশাল ঝুঁকি রাখে। জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে টিকটকের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে মাথায় রেখে এই ডিজিটাল সাক্ষরতা কার্যক্রমকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এছাড়াও দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তিদের শব্দচয়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জনগণের জন্য আসল ও নকল তথ্যের পার্থক্য বুঝতে পারা আধুনিক গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত। গুজব ও ডিপফেক ভাইরাসের হাত থেকে রাষ্ট্রকে বাঁচাতে কেবল কঠোর নীতি নয়, বরং প্রতিটি ব্যবহারকারীর সচেতনতাই হতে পারে চূড়ান্ত প্রতিরক্ষা দেয়াল।
প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা
ফেসবুক ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর বাংলাদেশে বিশাল আধিপত্যের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের সরাসরি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৭ কোটি ৩৩ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী এবং ১ কোটি ৮০ লাখ টিকটক ব্যবহারকারীর বিশাল বাজারে কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কনটেন্ট মডারেশন সম্ভব নয়। তাই এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাদেশে সক্রিয় স্থানীয় অফিস স্থাপনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ডিপফেক বা ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তথ্যের অবাধ বিকৃতি রুখতে এবং জাতীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাষ্ট্র ও এসব প্রযুক্তি জায়ান্টদের মধ্যে সরাসরি সমন্বয় থাকা আবশ্যক। মূলত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে ডিজিটাল অপরাধের বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
রাজনীতি হওয়া উচিত নীতি ও আদর্শের লড়াই। কারও ব্যক্তিগত জীবনের ভিডিও বিকৃত করার নোংরা খেলা নয়। ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ আর ‘অপপ্রচারের’ মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা থাকা আজ সময়ের দাবি। ২০২৬ সালের ডিজিটাল বাংলাদেশে জাইমা রহমানের মতো ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্য করে চালানো ডিপফেক আক্রমণ প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের নৈতিক ভিত্তিকে কতটা নড়বড়ে করে দিচ্ছে। যদি এখনই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং তৃণমূল পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসির সমন্বয় না ঘটে, তবে এই ‘ডিপফেক ভাইরাস’ কেবল রাজনীতি নয়, আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দেবে।
সুমন সুবহান: কবি ও কথাশিল্পী