leadT1ad

উত্তরাঞ্চলে জাতীয় পার্টির ‘নির্বাচনী মিথ’ তছনছ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রংপুর, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর ও গাইবান্ধা

স্ট্রিম গ্রাফিক

ভোটের রাজনীতিতে উত্তরাঞ্চল আর জাতীয় পার্টি (জাপা) সমার্থক। ১৯৯১ সালের পর প্রায় প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে দলটির জয়ী মোট আসনের অর্ধেক এখানকার। দিন বদলেছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে ভেঙে যেতে বসেছে তাদের নিয়ে তৈরি ‘নির্বাচনী মিথ’।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দিশাহারা নেতাকর্মী। তাদের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ তকমার কারণে দলটির প্রার্থীরা পর্যন্ত ভোটাদের এড়িয়ে চলছেন। ফলে তারা নির্বাচনী লড়াই থেকে ছিটকে পড়ছেন।

জাতীয় পার্টি রংপুর বিভাগের আট জেলার ৩০ আসনে প্রার্থী দিলেও স্মরণকালের নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এরশাদের জন্মস্থান রংপুর-৩ এবং দু-একটির বাইরে কোনো আসনে আলোচনায় নেই দলটির প্রার্থীরা। প্রচারেও নিষ্প্রাণ। ফলে উত্তরবঙ্গ থেকে জাপা কোনো আসন না পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে মনে করছেন ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

পরিসংখ্যানেও উত্তরাঞ্চলে জাপার ভঙ্গুর অবস্থা স্পষ্ট। জাতীয় নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন জাপার প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনেও রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত উত্তরের জেলাগুলোতে ১৮টি আসনে (মোট আসনের অর্ধেকের বেশি) জয় পায় জাপা। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে উত্তরাঞ্চলে আসন পায় যথাক্রমে ২১ ও ২০টি।

এরপর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘ক্ষমতার সমঝোতায়’ থাকলেও উত্তরাঞ্চলে জাপার আসন ক্রমান্বয়ে কমেছে। ২০১৪ সালে বিএনপি ছাড়া নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৪টি আসন পেলেও রংপুরের জেলাগুলোতে ছিল মাত্র ১৩টি। ২০১৮ সালে যা নেমে আসে ৯টিতে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী রংপুর ও কুড়িগ্রামে মাত্র ৫টিতে জয় পায় জাপা। অথচ চব্বিশের একতরফা নির্বাচনে জাপাকে জায়গা দিতে বিভাগের ২৬টি আসনে নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অন্যের ওপর ভর করে রাজনীতি করা, এলাকাবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা, নিজস্ব ভোট ব্যাংক স্পষ্ট না করা, ক্ষমতার ভাগাভাগি, দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা, দলের প্রতীক অন্যের কাছে বিক্রি, তরুণদের পদবঞ্চিত করা, হরহামেশাই বক্তব্য পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে আস্থা সংকটে ভুগছেন জাপা। এতে নিজেদের ঘাঁটিতেই অপাঙতেয় হয়ে উঠেছে দলটি।

ইলেকশন ওয়ার্কিং এলায়েন্সের দিনাজপুর-৪ (চিরিরবন্দর-খানসামা) আসনের পর্যবেক্ষক মঞ্জুর আলী শাহ বলেন, জাতীয় পার্টি আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে গৃহপালিত বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। বিষয়টি ধোঁকাবাজি হিসেবে নিয়েছে জনগণ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও তারা গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এটাও জনগণ ভালোভাবে নেয়নি।

রংপুরে সিটি রাখার চেষ্টা, চারটি আসনে শঙ্কা

এরশাদের জন্মস্থান রংপুরকে জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি বলা হয়। এবার জেলার ছয়টি আসনের পাঁচটিতে প্রার্থী দিয়েছে দলটি। তবে দলের সামগ্রিক অবস্থান বেশ দুর্বল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রার্থী হয়েছেন রংপুর-৩ (রংপুর সদর) আসনে। ১৯৮৬ সাল থেকেই আসনটি জাতীয় পার্টির। তবে এখানেও জিএম কাদেরের জিততে ঘাম ছুটতে পারে। এর বাইরে জেলার কোনো আসনেই জাপার প্রার্থীরা আলোচনায় নেই।

রংপুর-২ আসনে (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) জাপার প্রার্থী হয়েছেন সাবেক এমপি আনিছুল ইসলাম মণ্ডল। তিনি প্রচারে থাকলেও আলোচনায় আছেন জামায়াতের এ টি এম আজহারুল ইসলাম এবং বিএনপির মোহাম্মাদ আলী সরকার। রংপুর-৪ আসনেও (কাউনিয়া-পীরগাছা) একই অবস্থা। জাপা প্রার্থী আবু নাসের মাহবুবার রহমান প্রচার চালালেও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মাদ এমদাদুল হক ভরসা ও এনসিপির আখতার হোসেন। অন্যদিকে রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে এসএম ফখর উজ জামান এবং রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে নূর আলম যাদু মিয়ার প্রচার দৃশ্যমান নয়।

রংপুরে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেই ভরাডুবি হয়েছিল জাপার। জেলার ছয় আসনের পাঁচটিতেই হারেন লাঙ্গলের প্রার্থীরা। তিনজন জামানতও হারান। তৃণমূলের নেতাকর্মী বলছেন, রংপুর-৩ আসন ছাড়া জেলার বাকি পাঁচ আসনে দীর্ঘদিন সক্রিয় রাজনীতির অভাব আছে। এছাড়া আগের হেভিওয়েট প্রার্থীদের অনেকেই এবার মাঠে নেই। এতেও মাঠপর্যায়ে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে।

কুড়িগ্রামের এক আসনে ভালো, দুটিতে পিছিয়ে

কুড়িগ্রাম-১ (নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী) আসন থেকে এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান পাঁচবার লাঙ্গল প্রতীকে এমপি হয়েছেন। এবারও মাঠে তাঁর অবস্থা ভালো। তবে স্থানীয় রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম ও বিএনপির সাইফুর রহমান রানার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে তাঁর।

কুড়িগ্রাম-২ (সদর, ফুলবাড়ী, রাজারহাট) আসনে পনির উদ্দিন আহমেদ আগেও জাপা থেকে এমপি হয়েছেন। এবার প্রার্থী হলেও তার অবস্থান বিএনপি ও এনসিপির পরে বলে জানা গেছে।

কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে জাপার প্রার্থী আব্দুস সোবাহান মাঠে অবস্থানই তৈরি করতে পারেননি। যদিও আব্দুস সোবাহান বলেন, ‘মাঠে ভালো সাড়া পাচ্ছি। ১২ তারিখ রেজাল্টের পর বাকিটা দেখা যাবে।’

এছাড়া কুড়িগ্রাম-৪ (রৌমারী, রাজিবপুর, চিলমারী) আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জাপার প্রার্থী ফজলুল হক মণ্ডলের অবস্থা একেবারেই নাজুক।

ঠাকুরগাঁওয়ে হাফিজ উদ্দিনের আসন রক্ষাই চ্যালেঞ্জ

১৯৮৮ সালের পর ২০০১ ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-৩ (রাণীশংকৈল ও পীরগঞ্জ) আসনের এমপি নির্বাচিত হন হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ। ২০২৩ সালে উপনির্বাচনে ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনেও জয় পান। তবে এবার তাঁর আসনটি ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ জাপার।

এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাংগী, হরিপুর, রাণীশংকৈলের একাংশ) আসনে জাপা প্রার্থী নূরুন নাহার বেগম প্রচারে তেমন প্রভাবই ফেলতে পারেননি।

ঠাকুরগাঁও সুজনের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে যথারীতি সাবেক এমপি হিসেবে হাফিজ উদ্দিনের প্রচার আছে। তবে অন্যান্য নির্বাচনের মতো তাদের প্রচার চোখে পড়ছে না।’

নীলফামারী-১-এ প্রার্থীকেই চেনেন না ভোটার

নীলফামারীতে সংসদীয় চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে প্রার্থী দিয়েছে জাপা। তাঁদের মধ্যে নীলফামারী-৪ আসনের (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য সিদ্দিকুল আলম প্রচারে অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন। তবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীদের সঙ্গে তাঁর লড়াই সহজ হবে না।

এর বাইরে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে জাপা প্রার্থী তসলিম উদ্দিন ও নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে রোহান চৌধুরীর প্রচার নেই বললেই চলে।

জলঢাকা শহরের রিকশাচালক আজগার আলী বলেন, ‘এ পর্যন্ত লাঙ্গলের প্রার্থীকে চোখে দেখি নাই। অন্য প্রার্থীরা যেমন আমাদের সাথে হাত মেলাচ্ছে, ভোট চাচ্ছে, কিন্তু লাঙ্গলের প্রার্থীকে চোখে পড়েনি।’ তাঁর নাম পর্যন্ত অনেকে জানেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দিনাজপুরে তিন দশকের শূন্যতা কাটানোই চ্যালেঞ্জ

১৯৯১-পরবর্তী কোনো নির্বাচনে দিনাজপুরের ছয়টি আসনের একটিতেও জয় পায়নি জাপা। তিন দশকের সেই শূন্যতা কাটানোর সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

এবারের নির্বাচনে দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে দলের জেলা সভাপতি আহমেদ শফি রুবেল ও দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসনে জেলার সাধারণ সম্পাদক জুলফিকার হোসেন মাঠে বেশ সক্রিয়। এর বাইরে শুধু দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের প্রার্থী দলের উপজেলার সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর ইসলাম প্রচারে আছেন।

ইলেকশন ওয়ার্কিং এলায়েন্সের দিনাজপুর-৪ (চিরিরবন্দর-খানসামা) আসনের পর্যবেক্ষক মঞ্জুর আলী শাহ বলেন, দিনাজপুরে জাপার অবস্থান এমনিতেই নড়বড়ে। তার ওপর দলটির বর্তমান অবস্থানের কারণে নির্বাচনে এখানে ভালো করার কোনো সুযোগ দেখছি না।

গাইবান্ধায় পাঁচটি আসনেই মাঠে সাড়া নেই

গাইবান্ধায় পাঁচটি আসনই একসময় জাতীয় পার্টির দখলে থাকত। তবে এখন অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন তারা। দলের ভেতর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর দৃশ্যমান উন্নয়ন না করায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ভোটাররা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতেই দলের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ ও গাইবান্ধা-৫ আসন থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন। এছাড়া গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনে আবদুর রশিদ সরকার, গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ি–সাদুল্লাপুর) আসনে ময়নূর রাব্বি চৌধুরী রুমান ও গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে কাজী মশিউর রহমান জাপার প্রার্থী হয়েছেন।

তবে মহাসচিব শামীম পাটোয়ারী ভোটের মাঠে দলের প্রতীকের ভোট চাওয়ার চেয়ে গণভোট ‘না’র পক্ষে প্রচার বেশি করছেন। দলের নেতাকর্মীদেরও ‘না’ ভোটের প্রচারের পরামর্শ দিচ্ছেন।

শামীম পাটোয়ারীর আসন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভোটার তাজমল আলী বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের বিদায়ের পর জাতীয় পার্টির অবস্থা হয়েছে মা-হারা সন্তানের মতো। নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও এখনো জাতীয় পার্টির পক্ষে কোনো প্রচার নেই। বোঝাই যাচ্ছে, এবার এত সহজে মানুষ জাতীয় পার্টিকে ভোট দেবে না।’

শামীম হায়দার পাটোয়ারীর পক্ষে সবশেষ নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা এক নেতা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, এর আগে আওয়ামী লীগই জাতীয় পার্টিকে জেতানোর জন্য মাঠে কাজ করেছিল। এবার সেই সুযোগ না থাকায় ভোট টানতে পারবে বলে মনে হয় না।

এ ছাড়া লালমনিরহাটে তিনটি ও পঞ্চগড়ে একটি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়েছে। তবে সেখানেও প্রচার বা আলোচনা কোনোটাতেই নেই জাপার প্রার্থীরা।

রাজনীতির পর্যবেক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতির দলগুলো গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচার করলেও জাতীয় পার্টির ‘না’ প্রচারের কার্যক্রম সাধারণ মানুষের ভালোভাবে নিচ্ছে না। দীর্ঘদিনের জোট সঙ্গী আওয়ামী লীগের পক্ষে এখনো টেনে কথা বলছে দলটি। জনবিচ্ছিন্ন এসব নীতির কারণে জাপা প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। এতে ‘দূর্গ’ থেকেই খালি হাতে ফিরতে হতে পারে দলটিকে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত