গত পরশু সন্ধ্যায় শুনলাম বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকার অসুস্থ। বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় শুয়ে আছেন। এই কথা শোনার পর থেকে মনে হচ্ছিল আজকের এই সন্ধ্যাটাকে কেউ নীলপর্দা দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল বর্তমানটাই কেমন যেন অতীত হয়ে যাচ্ছে। মাঘী পূর্ণিমার রাতে ব্রহ্মপুত্র-সুরমা-মেঘনার অববাহিকায় এ বছর সুনীলদা’র ভরাট মায়াবী কণ্ঠ থেকে সুর নামল না। মনের পাখিটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল। গান থেমে যাওয়ার এই দেশে সুনীল কর্মকারও কি থেমে যাচ্ছেন!
যখন থেকে বাউল শুনছি তখন থেকেই সুনীলকে আমি চিনি। আমাদের গ্রাম-গঞ্জের বাজারগুলোর ছিলই আসরীয় গানের উন্মুক্তমঞ্চ। বাজারগুলোতে আকাশ সংস্কৃতির বিনোদন ঢোকার আগে বাউল গানের, পালাগানের, মালজোড়া গানের, কচ্ছাগানের, তামসা গানের চর্চা হতো। হালখাতার অনুষ্ঠানে কিংবা পার্বণ-আচারে গানই ছিল একমাত্র মন পরিচর্যা বিনোদনের মাধ্যম।
আশি কিংবা নব্বই দশকেও গ্রামে গ্রামে সৌখিন কিংবা এমেচার গানের দল ছিল। এই সৌখিন দলের মাধ্যমেই শুরু হতো আয়োজন। তারপরে শেষাংশে থাকত সুনীল কর্মকারের মতো মহাজন। এমেচার দলের শিল্পীরাই ব্যবস্থাপনায় থাকতেন। বায়নায় নিয়ে আসতেন।
দুগিয়ার বাজারেই হয়তো সুনীলদাকে প্রথম শুনেছি। তারপরে কতোবার যে শুনেছি প্রাণপ্রকৃতি বলতে পারবে। তবে অনেক বিশুদবারেই আমি মদনপুরের শাহ সুলতান সাহেবের দরগায় দূরে বসে তাঁকে শুনেছি। রাতের বাতাসে মাজারের পবিত্রতা নিয়ে নেমে আসত তাঁর সুর। আশ্চর্য পবিত্র এই কণ্ঠ। আশ্চর্য ভরাট শীতল শান্তির এই কণ্ঠ। এই কণ্ঠ মর্ম স্পর্শ করে। এই কণ্ঠ মর্ম থেকে ডাকে।
এই বাংলায় কতো জনের কণ্ঠেই তো বাউল শোনা হলো! কিন্তু সুনীলের কণ্ঠটা যেন বাউলের মর্মজ্ঞান নিয়ে নামে। বাউল মূলত একটি দর্শন, একটি পথ। সবাই এই পথকে ধারণ করতে কিংবা গাইতে পারেন না। সমকালে মঞ্চে, বিরাট সাউন্ডযন্ত্রে যারা বাউল গাইতে চেষ্টা করেন তারা কি বাউলতত্ত্বকে বোঝেন? বাউলকে ধারণ করেন। মনে হয় না। বড়জোর তারা পেশাদার গায়ক, পেশাদার শিল্পী। বাউলের মহামঞ্চে এই পেশাদারেরা কেউ না। কারণ এরা কেউ-ই বাউলের মহত্ত্বকে গাইতে কিংবা প্রচার করতে পারেন না।
গান গাওয়ার আগে-পরে সুনীলদা সামান্য দু-একটা কথা বলতেন। এতেই গানের জগতটা হাজির হতো। সুনীল যেন প্রাচীন জ্ঞানের মহাজনদের সুর ও কথাকেই মঞ্চে হাজির করছেন। উপস্থিত সকলের-ই অনুভবের জগতটা খুলে যাচ্ছে। বাংলার মহাজনীয় জ্ঞানের পরম পুরুষ জালাল উদ্দীন খাঁনের গানই বেশি গেয়েছেন তিনি। বলা যেতে পারে তিনি ছিলেন জালালীয় জ্ঞান ও সুরের সর্বশেষ সিদ্ধ পুরুষ।
কবি নূরুল হকের মুখে শুনেছি, জালাল খাঁ যখন মঞ্চে উঠতেন তখন আসরের লোকজন নাকি বলতো এ-যে এখন সিংহের গাঁয়ের সিংহপুরুষ মঞ্চে উঠেছে। তাঁর কণ্ঠ নাকি খুব ভরাট ছিলো কিন্তু সুরেলা ছিলো না। সুনীল কর্মকারের কণ্ঠ ভরাট, আশ্চর্য ও সুরেলা। জালাল খাঁর গানকে তিনি একটা ইউনিক সুরকাঠামো দিয়েছেন। অর্থাৎ সুনীলের গায়কীর মধ্যেই চিহ্নিত হয়ে আছে জালালীয় গানের সুর ও রীতি। ‘চোরেরা খায় কোরমা পোলাও/ সাধু ঘুরে দ্বারে দ্বারে। তাজ্জব হয়ে গেলাম আমি/ দিন দুনিয়ার ব্যবহারে।’-জালাল খাঁর বহু পরিচিত এই গানের ইউনিক রূপটি সুনীলের গায়কিতেই স্পষ্ট আছে।
জালাল খাঁর অনেক গান ভবিষ্যতে অনেকেই গাইবেন। কিন্তু আমার মনে হয় উদ্ধৃত এই গানটি সুনীলের মতো করে আর কেউই গাইতে পারবেন না।
‘কূল নাই দরিয়ার পারে বৃক্ষ একটি মনোহর
এর আগায় বসে সোনার ময়নায় গেয়ে গেল চল্লিশ বৎসর।।
কই গেল সেই তোতা ময়না, কই গেল সেই কোকিলা
যার গানে ঘুম ভাঙ্গিয়া হইত মানুষ উতলা!
দহিছে সে অন্তর জ্বালা, কাঁপে অঙ্গ থরথর।।’
এমন একটা কণ্ঠে, দরদে সুনীল আত্মাটা ঢেলে দিতে থাকেন-মনে হয় না আর কারও পক্ষে এভাবে সম্ভব হবে।
সুনীল ছিলেন এই হাওরাঞ্চলের সন্তান। এখানকার মাটির সুর তাঁর আয়ত্তে ছিল। মাটির সুরকেই তিনি কণ্ঠে ধারণ করতেন, প্রচার করতেন। ভাববাংলার কবিতাকে, মরমি বাংলার কবিতাকে, দেহতত্ত্বের কবিতাকে তিনি প্রচার করতেন। হাওরাঞ্চলের মাটির সুরের পরিপূর্ণ সত্তা হচ্ছেন সুনীল কর্মকার। সমকালে জালাল খাঁর গানকে, বাউল গানকে এমন নিষ্ঠার সাথে কে আর গেয়েছেন কিংবা গাচ্ছেন। গান যে ‘জ্ঞান’ এই কথাটা সমকালের কারা আর ধারণ করেন কিংবা মানেন। গানের ভাব কিংবা দর্শন না জেনে তিনি কোনো গান করতেন না। গানের অর্থ, গানের তত্ত্বকে তিনি সুরের মজমায় হাজির করতেন। সুরের লেন্সে, সাধনার লেন্সে তিনি বাংলার ভাব ও ভাবুকতাকে প্রচার করে গেছেন। জনপদ ঘুরে ঘুরে, দেশে-বিদেশে আসরে আসরে প্রচার করেছেন বাংলার মহাজনদের ভাব-তত্ত্ব-দর্শন। সমকালে জালাল উদ্দিন খাঁ কিংবা বিজয় সরকারের গানের মর্মকে সুনীল কর্মকারের মতো আর কে ধারণ করতে পেরেছেন?
‘উঠলে পড়তে হবে বলে উপরে উঠিনা,
নামলে উঠতে হবে, তাইতো নিচে নামি না।
কাঙ্গাল হতে হবে বলে, রাজা হতে চাহি না।
হাসি দিলে কান্দতে হবে, তাই আমি আছি নীরবে
নাচতে পড়ে থামতে হবে, তাইত নাচিনা।’
মনোমোহন দত্তের এই গান সুনীলের মতো দরদ দিয়ে আর কে গাইবে। লোক মহাজনদের এই গানগুলো সুনীল এমনভাবে গাইতেন যেন তিনি কেবল গান গাইছেন না, গানের মর্মটা গাইছেন। গ্রাম বাংলার সহজ ও সহজিয়া মানুষেরা গানের সেই মর্মে সমর্পিত হচ্ছেন। গানের এই সহজ কথাগুলো মানুষের মনকে সহজ ও শান্ত করে দিচ্ছে।
সুনীল কর্মকার মানুষের মনকে সহজ করে দেয়ার কারবারি ছিলেন। সুফি জ্ঞানের, মহাজনি জ্ঞানের একটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অভিভাবক ছিলেন তিনি। তাঁর প্রস্থানে এক মহা শূন্যতার সৃষ্টি হলো। ময়মনসিংহ অঞ্চলের গণমানুষেরা তাদের সুরের অভিভাবক হারালো। এই অঞ্চলের বৃহত্তর একটা জনগোষ্ঠী পীর-ফকিরদের গান ও লোকাচারকে বিশ্বাস করে। এই অঞ্চলের লোককবিরা বাউলগানে, পালাগানে, মালজোড়া গানে আত্মার অনুভবকে প্রচার করে। পীর-ফকিরের জ্ঞান থেকে, সুফি চর্চা থেকে প্রতিদিনের জীবনের জিজ্ঞাসাকে মীমাংসা করে। গানের জ্ঞানে ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনকে পরিচালিত করে৷ সেই জীবনের একজন মধ্যমণি, বাউল সুনীল কর্মকার।
একটা অসহিষ্ণু সময়ে তিনি প্রস্থান করলেন। তিনি চলে গেলেন এমন এক সময় যখন শত শত মাজার ভাঙা হচ্ছে, হামলা হচ্ছে। পীর-ফকির-বাউলদের হেয় করে সংঘবদ্ধ আক্রমণ করা হচ্ছে। গানের দেশে গান বন্ধ হলে মানুষের বেদনা লাঘব করবে কে?
বাউলজ্ঞানের এই পরম মহাজন জন্মেছিলেন ১৯৫৯ সনের জানুয়ারি মাসের ১৫ তারিখে পূর্ব ময়মনসিংহের বর্তমান নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া থানার বারনাল গ্রামে। পিতা দীনেশ কর্মকার, মাতা কমলা কর্মকারের জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ । ৭ বছর বয়সেই গানের ভেতরে প্রবেশ করেন তিনি।
সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কেন্দুয়ার প্রত্যেকটা গ্রামে তখন গান হতো। মাটির সেই গানের ভেতরেই সমর্পিত হয়েছিলেন। রক্তের প্রতিটি অনুভবকে দখল করে রেখেছিল গান। পাশের গ্রামে বিখ্যাত বাউল সাধক জালাল উদ্দিন খাঁ’র বাড়িতে প্রতিদিনই বিশাল গানের আসর বসত। সুরের টানে গানের আসরে ছুটে যেতেন। যেখানে আসর সেখানেই তিনি। রক্তের ভেতরে ছিলো গান। কিন্তু কপাল খারাপ, হঠাৎ করে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চোখের আলো নিভে গেল। কিন্তু এই অন্ধ ছেলেটির গানের প্রতি এতটুকু আগ্রহ কমেনি।
দৃষ্টিহীন ছেলেটির গানের প্রতি আগ্রহ তখনো কমেনি। গানমগ্ন ছেলেকে পিতা নিয়ে গেলেন পাশের গ্রামের বাউল গায়ক ইস্রাইল মিয়ার কাছে। গানপাগল এই ছেলেটিকে পেয়ে সিংহের গাঁয়ের বাউল ইস্রাইল মিয়াও খুশি হলেন। পরম যত্নে শিষ্যকে শেখাতে শুরু করলেন। শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সিংহের গাঁয়ের ইস্রাইল মিয়ার কাছে শৈশবেই শেখেন বাউলজ্ঞান, জালালজ্ঞান। নিজের পুত্রের মতো লালনপালন করে গুরু নিজেই তাকে সংগীতে হাতেখড়ি দিতে থাকেন। সংগীতের তালিমের সাথে সাথে ওস্তাদের কাছে দোতারাতেও পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ২০২২ সালে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রদত্ত শিল্পকলা পদক লাভ করেন।
‘শুনবে কি বুঝবে কি, ওরে ও মন ধুন্ধা/ এই দুনিয়া মায়া জালে বান্ধা’—বাউল মহাজন রশিদ উদ্দিনের এই গানটিকে কী পরম দরদে তিনি গাইতেন। কী বিচ্ছেদ, কী মালজোড়া, কী বাউলতত্ত্ব, কী বেহালাবিহারে তাঁর মতো পরিশুদ্ধ মননের সুর আর কে আছেন? তিনি অন্ধ ছিলেন কিন্তু মানুষের দুনিয়াটাকে ঠিক দেখতে পারতেন। পৃথিবীটা যে বদলে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারতেন। সাধনা ছাড়া যে সুর হয় না, বাউল হয় না—এই নিয়ে আক্ষেপ করতেন। সুরহীন এই নতুন পৃথিবীতে তাঁর সব আক্ষেপই হয়তো সত্যি হবে। সুরহীন মানুষ আর মানবিক থাকবে না। কিন্তু আমি ভাবছি সুনীলহীন পৃথিবীতে পরিশুদ্ধ জালাল, পরিশুদ্ধ মনোমোহন, পরিশুদ্ধ বিজয় দাস কে আর শুনাবে! গানে গানে কে আর বিজয় দাসের মর্ম ঢেলে দিবে :
‘ক্ষ্যাপারে পাগলরে ভাব না জেনে পীরিত করো না,
এবার সুহৃদ চিনে করো পীরিত কোন অভাব রবে না।।
মানুষ চিনবি রয়ে সয়ে শাহ স্নিগ্ধ স্বভাব লয়ে
দুগ্ধ হোসেন মুগ্ধ হয়ে দুগ্ধে দিয়ে গোচনা।।’
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৪টায় তিনি লোকান্তরিত হলেন। মনে হয়, সুরের মানুষ প্রস্থান করলেন তো সব আয়োজন নিয়েই প্রস্থান করলেন। তাঁর তো অনেক শিষ্য-প্রশিষ্য রেখে গেছেন। তাঁর গানের ধারাকে কি তাঁরা বহন করবেন না? হয়তো করবেন! হয়তো বলছি কেন? অবশ্যই করবেন। গানের ধারাকে অবশ্যই বহন করা যায় এবং করবেনও কিন্তু সাধনার ধারাকে বহন করা মনে হয় একটু কঠিন। সবাই তা পেরে ওঠেন না। তাঁর শিষ্যরা তাঁকে ধরে রাখুক। তাঁর গানকে, তাঁর জ্ঞানকে, তাঁর মহিমা ও সাধনাকে ধরে রাখুক। মহাজনী সুরের পৃথিবীতে সুনীল থাকবেন।