দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পোস্টার ও ব্যানার ছাড়া শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা মৌলভীবাজারের নির্বাচনী মাঠে এক দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। চিরচেনা দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা গাছপালায় এবার নেই কোনো ঝুলন্ত পোস্টার। এতে একদিকে যেমন নির্বাচনের চিরাচরিত জৌলুস ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভাটা পড়েছে, অন্যদিকে রাস্তাঘাট ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করছেন সচেতন ভোটাররা।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কঠোর বিধিনিষেধের কারণে এবার ডিজিটাল ও পরিবেশবান্ধব প্রচারণায় অভ্যস্ত হতে হচ্ছে প্রার্থীদের। ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, গত ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রচারণা চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত। অপচনশীল দ্রব্য যেমন—পলিথিন, প্লাস্টিক বা রেক্সিন ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া দেয়াল, গাছ বা যানবাহনে কোনো ধরনের ফেস্টুন বা পোস্টার লাগানোও দণ্ডনীয় অপরাধ।
সরেজমিনে মৌলভীবাজারের চারটি সংসদীয় আসন ঘুরে দেখা গেছে, প্রার্থীরা মূলত উঠান বৈঠক, মাইকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিলির মাধ্যমে ভোট চাচ্ছেন। তবে পোস্টার না থাকায় প্রান্তিক ও বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
মৌলভীবাজার-৩ আসনের রাজনগর উপজেলার কৃষক মজবিল মিয়া বলেন, ‘আগে পোস্টার দেখলেই বুঝতাম কে প্রার্থী। এখন তেমন কিছু চোখে পড়ে না। বয়স্ক মানুষের জন্য বিষয়টা কঠিন হয়ে গেছে।’
মৌলভীবাজার-৪ আসনের শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের চা শ্রমিক শুভ গোয়ালা জানান, স্মার্টফোন না থাকায় তিনি অনলাইনে প্রার্থীদের চিনতে পারছেন না। একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মৌলভীবাজার-১ এর ভোটার মফিজ মিয়া এবং দিনমজুর শফিক মিয়া।
মৌলভীবাজার-২ আসনের প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া শিল্পী রানী বলেন, ‘ফেসবুক না দেখলে কে প্রার্থী বা কোন মার্কা তা বোঝা যায় না। নতুন ভোটার হিসেবে যে জৌলুস পাওয়ার কথা ছিল, তা পাচ্ছি না।’ তবে তাঁর সমবয়সী রাতুল হক মনে করেন, পোস্টার শুধু টাকা নষ্ট করে; ফেসবুক আর উঠান বৈঠকই প্রচারের জন্য যথেষ্ট।
কলেজ শিক্ষার্থী রেশমি জাহান বলেন, ‘পোস্টার না থাকায় পরিবেশ নোংরা হচ্ছে না। রাস্তাঘাট পরিষ্কার থাকছে।’
পোস্টারবিহীন এই নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক সোহেল শ্যাম বলেন, ‘পোস্টার না থাকায় এবার গাছ ও দেয়ালগুলো সুরক্ষিত আছে।’ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘এটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। নির্বাচনের পর আগে যে বর্জ্যের পাহাড় তৈরি হতো, এবার তা এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।’
প্রার্থীরা এই নতুন পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলেও ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন। মৌলভীবাজার-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের ভোটাররা সচেতন। তারা সঠিক প্রার্থীকে ভোট দিবে। পোস্টার দিয়ে পরিচয় করানোর প্রয়োজন নেই, কারণ আমরা তাদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাচ্ছি।’