বিএফআইইউর সন্দেহ অর্থপাচার
মাইদুল ইসলাম

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই বিদেশে খোলা হয়েছিল নতুন একটি কোম্পানি। এরপর সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ওই কোম্পানির নামে কেনা হয় একটি জাহাজ। সেই জাহাজ বাংলাদেশে আমদানির জন্য নিজেদের মালিকানাধীন আরেকটি কোম্পানির অনুকূলে ৪১০ কোটি টাকার (৩ কোটি ২৬ লাখ ডলার) ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়। আবার মেঘনা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চে শতভাগ মার্জিনের এই এলসি খোলা নিয়েও রয়েছে ব্যাংকিং বিধিমালা লংঘনের অভিযোগ।
নিজেই নিজের কাছ থেকে জাহাজ আমদানির জন্য এলসিটি খুলেছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ মেঘনা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ। অনুসন্ধান চালিয়ে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া গেছে বলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সংস্থাটির সন্দেহ, মেঘনা গ্রুপ ও মেঘনা ব্যাংক কর্মকর্তাদের পরস্পর যোগসাজশে অর্থপাচারের উদ্দেশ্য থেকেই এলসিটি খোলা হয়েছে।
জাহাজটি আমদানির জন্য মেঘনা ব্যাংক পিএলসিতে খোলা এলসিটির রপ্তানিকারক হিসেবে মূল সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স পিটিই লিমিটেড’। বিএফআইইউর অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ মেঘনা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে ‘এমভি মেঘনা পার্ল’ নামের একটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ আমদানির উদ্দেশ্যে এলসির অনুমোদন দেওয়া হয়। এলসির নম্বর ৩২৫২২৬০১০২২০। এই এলসি খোলার আগে লয়েড’সের ১০ মার্চ প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, জাহাজটি আগে সিএমবি ব্রুয়েগেল নামে পানামায় নিবন্ধিত ছিল। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মেঘনা পার্ল। যদিও ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকেই জাহাজটির কমার্শিয়াল অপারেটর ও নিবন্ধিত স্বত্তাধিকারি মেঘনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ।
পরে লয়েড’সের ৩১ মার্চের প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ। তবে এলসি খোলার ১৪ দিন পর লয়েড’স-এর ১২ এপ্রিলের ভ্যাসেল ট্র্যাকিং রিপোর্টে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। এতে বলা হয়, জাহাজটি ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশের পতাকাবাহী। আর মেঘনা গ্রুপ এটির সুবিধাভোগী মালিক ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে।
২০১৯ সালে জাহাজটি আমাদের কেনার কথা থাকলেও, তখন তা কেনা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক যে তথ্য দিয়েছে, তা সঠিক নয়। পরে রেকর্ডের ভুল স্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংককে আমরা ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য আপডেট করেছি। মোস্তফা কামাল, চেয়ারম্যান ও এমডি, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ
শিল্পগ্রুপটি নিজেও মেঘনা ব্যাংককে দেওয়া এক ই-মেইলে এলসি খোলার আগে থেকেই জাহাজ মালিকানায় থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বিষয়টির উল্লেখ আছে। মেঘনা ব্যাংকে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল দেওয়া এক ই-মেইলে গ্রুপটির পক্ষ থেকে বলা হয়, জাহাজটি গ্রুপটির সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স পিটিই লিমিটেডের নামে পানামার ব্লু সাইপ্রেস লাইন এসএর কাছ থেকে কেনা হয়েছে। জাহাজের নাম পরিবর্তনের আগে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর এর দাম সিঙ্গাপুরের কোম্পানিটির মাধ্যমে ব্লু সাইপ্রেস লাইন এসএকে পরিশোধ করে দেওয়া হয়।
লয়েড’স লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের পাশাপাশি মে ইন্টারন্যাশনাল ও আইএমবির ভ্যাসেল ট্র্যাকিং রিপোর্টের বরাত দিয়ে বিএফআইইউ দাবি করছে, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বরের আগে থেকেই জাহাজটির মালিক মেঘনা গ্রুপ।
বিষয়টি নিয়ে জানতে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বিএফআইইউর প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘২০১৯ সালে জাহাজটি আমাদের কেনার কথা থাকলেও, তখন তা কেনা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক যে তথ্য দিয়েছে, তা সঠিক নয়। পরে রেকর্ডের ভুল স্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংককে আমরা ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য আপডেট করেছি।’
তবে লয়েড’স লিস্টের তথ্য অনুযায়ী অন্তত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে জাহাজটি তাদের মালিকানায় থাকার বিষয় স্বীকার করেন মোস্তফা কামাল। এরপরও নিজেদের মালিকানায় থাকা জাহাজ কিনতে ২০২৬ সালের মার্চে কেন পুনরায় এলসি খোলা হলো– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি অনেক লম্বা ইতিহাস। টেলিফোনে এত কথা বলা যাবে না। আপনার জানার থাকলে সরাসরি অফিসে আসতে পারেন অথবা সঠিক তথ্য সংগ্রহ করেন।’
বিএফআইইউর অভিযোগ, মেঘনা ব্যাংকের কাছে গ্রুপটির হাতে জাহাজের মালিকানা থাকার তথ্য থাকলেও কোনো ধরনের ডিউ ডিলিজেন্স (যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন) ছাড়াই এলসিটি খোলা হয়েছে। মালিকানায় থাকা একটি জাহাজ পুনরায় আমদানির নামে শুধু ৩২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ সিঙ্গাপুরে পাচারের উদ্দেশ্য থেকেই মেঘনা গ্রুপ ও মেঘনা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পরস্পরের যোগসাজশে এই এলসি খোলা হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সরকারের উচিত অবিলম্বে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। আমরা আশা করি, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের আইনানুগ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কঠোর প্রতিরোধক উদাহরণ তৈরি হবে। ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ গোয়েন্দা ইউনিটটির তথ্য অনুযায়ী, ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজের এলসির মার্জিন (শতভাগ) হিসেবে মেঘনা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় তাসনিম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের (মেঘনা গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান) একটি চলতি হিসাবে ৩ কোটি ২৬ লাখ ডলারের সমপরিমাণ প্রায় ৪১০ কোটি টাকা জমা রাখা হয়। তবে এই অর্থ মূল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হিসাব থেকে জমা হয়নি। বরং বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকে থাকা মেঘনা গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে ক্লিয়ারিং চেকের মাধ্যমে নিয়ে এসে এ অর্থ লিয়েন করা হয়েছে। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিষয়টি অস্বাভাবিক ও বিধিবহির্ভূত।
যদিও এলসিটি যথাযথ যাচাই-বাছাই করেই খোলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মিজানুর রহমান। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এত বড় অঙ্কের এলসি বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো ব্যাংকের পক্ষেই খোলা সম্ভব নয়। আমাদের যা যা ডিউ ডিলিজেন্স (যাচাই-বাছাই) করার দরকার ছিল, তা করেই এলসিটি খোলা হয়েছে।’
মেঘনা গ্রুপের আগে থেকেই মালিকানায় থাকা জাহাজের বিপরীতে এলসি খোলা এবং গ্রুপটির সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্লিয়ারিং চেকের মাধ্যমে এলসির মার্জিনের অর্থ (৪১০ কোটি টাকা) লিয়েন করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সৈয়দ মিজানুর বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার সবকিছুর হুবহু বিস্তারিত মনে নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের চিঠিপত্র আদান-প্রদান চলছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়ায় এখনই এই বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়। বিস্তারিত জানতে চাইলে সরাসরি অফিসে এসে কথা বলতে পারেন।’
এলসিতে জাহাজের রপ্তানিকারক হিসেবে উল্লিখিত ‘মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স পিটিই লিমিটেড সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০১৮ সালের ১৮ জুন। নিবন্ধনকালে এর অনুমোদিত মূলধন ছিল ১ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার। শুরুতে কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডার ছিলেন মোস্তফা কামাল, তাঁর তিন মেয়ে তানজিমা বিনতে মোস্তফা, তাহমিনা বিনতে মোস্তফা ও তাসনিম বিনতে মোস্তফা এবং হাসান ইমাম ফিরোজ নামে আরেক ব্যক্তি। পরে এর কর্তৃত্ব মেঘনা সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির পরিচালকদের তালিকায় রয়েছেন মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, তাঁর দুই মেয়ে তানজিমা বিনতে মোস্তফা ও তাহমিনা বিনতে মোস্তফা এবং সিঙ্গাপুরের নাগরিক এস এম শাহান শাহ।
বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়েই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা হচ্ছিল। পরে গোটা বিষয়টি নিয়ে ‘ঘটনত্তোর অনুমোদনের’ আবেদন করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এর অনুমোদন দেয়নি। এছাড়া সিঙ্গাপুরের কোম্পানিটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির আওতায় নিয়ে আসতে এর নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও ব্যবসার অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত হালানাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মেঘনা গ্রুপ তা জমা দেয়নি।
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ‘ডান অ্যান্ড ব্র্যাডস্ট্রিট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কোম্পানিটির চলতি সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৯৮ লাখ মার্কিন ডলার। নিজস্ব কোনো ইনভেন্টরি (মালামাল মজুদ) না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে ২৩ কোটি ৭২ লাখ মার্কিন ডলার এবং ২০২৩ সালে ১৭ কোটি ৮২ লাখ মার্কিন ডলারের ব্যবসায়িক লেনদেন করেছে। মাত্র ১ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার মূলধন শুরু হওয়া কোম্পানির তিন বছরের মাথায় বিপুল অঙ্কের লেনদেনের বিষয়ও সন্দিহান করে তুলেছে বিএফআইইউকে।
সংস্থাটির অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, মোস্তফা কামাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা সিঙ্গাপুরে মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স পিটিই লিমিটেড ছাড়াও আরও দুটি কোম্পানি পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে ‘এশিয়ান গ্রেইন অ্যান্ড কমোডিটি পিটিই লিমিটেড’ নামের কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাব রয়েছে সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক লিমিটেডে। এই হিসাব পরিচালনার জন্য অথরাইজড সিগনেটরি হলেন মোস্তফা কামাল ও তাঁর দুই মেয়ে।
সিঙ্গাপুরে কার্যক্রম চালানো গ্রুপটির আরেক কোম্পানি ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড কমার্স লিমিটেড’ নিবন্ধিত হয়েছে অফশোর ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে পরিচিত মার্শাল আইল্যান্ডসে। সিঙ্গাপুরে কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হচ্ছে ওসিবিসি ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে। এখানেও মোস্তফা কামাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।
এসব ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন উৎস ও ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হওয়ার তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ। বাংলাদেশের তাসনিম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স থেকে সরাসরি আউটওয়ার্ড রেমিট্যান্সের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের ওসিবিসি ব্যাংকে গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড কমার্স লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানো হয়েছে। এছাড়া একই প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক সিঙ্গাপুরের হিসাবে ২০১৯ সালের ২৪ মে থেকে ২০২০ সালের ২৬ মে পর্যন্ত এক বছরে ছয়টি ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সের মাধ্যমে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার জমা হয়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, এই অর্থের মূল উৎস মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী স্ট্রিমকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে কোম্পানি খোলা হলে সেটি সম্পূর্ণ অবৈধ। একটি অবৈধ কোম্পানির কাছ থেকে এলসি খুলে নিজেদের জাহাজ আবার আমদানি করা কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। এখন বড় প্রশ্ন হলো, বিদেশে কোম্পানি খোলার সেই অর্থ কোথা থেকে গেল? মালিক যদি বাংলাদেশি হন, তবে সেখানে অর্থ নেওয়ার তো একটি বৈধ প্রক্রিয়া থাকতে হবে।’
বিএফআইইউর পদক্ষেপ এবং বিচারহীনতার বিষয়ে এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘বিষয়টি যেহেতু বিএফআইইউর নজরে এসেছে। তাই এটি কেবল গল্পের শুরু, শেষ নয়। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা। এই প্রক্রিয়ায় যদি কোনো অবৈধ লেনদেন বা অর্থপাচার প্রমাণিত হয়, তবে এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীদের বিচার না হলে অন্যরাও এমন অবৈধ প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত হবে।’
১৯৭৬ সালে উদ্যোক্তা মোস্তফা কামাল কামাল ট্রেডিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন। পরে ১৯৮৯ সালে মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান এমজিআইয়ের শিল্প কার্যক্রমের শুরু হয়।
ঢাকার গুলশানে গ্রুপটির প্রধান কার্যালয়। এই শিল্পগোষ্ঠীর বর্তমানে ৫৭টির বেশি শিল্প ইউনিট রয়েছে। এতে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
এমজিআইয়ের উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে ফ্রেশ, নম্বর ওয়ান, পিউর, অ্যাকটিফিট ও মেঘনাসিম ডিলাক্স। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিপিং ও জাহাজ নির্মাণ, বিমা, সিকিউরিটিজ, গণমাধ্যম, এভিয়েশনসহ বিভিন্ন খাতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা রয়েছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এমজিআই নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে না। তবে প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট তথ্য অনুযায়ী, তাদের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিএফআইইউর এই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে আবার প্রমাণিত হলো– দেশে মানি লন্ডারিং চক্র এখনো সক্রিয় এবং এর প্রক্রিয়াগুলোও সচল। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের পতনের পরও দেশ থেকে অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে রাষ্ট্রের কাঠামোগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সম্ভাবনার সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না।’
পাচারকারী চক্র যত শক্তিশালীই হোক না কেন, বিএফআইইউ যে বিষয়টি অনুসন্ধান করে সামনে আনতে পেরেছে, তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এই দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘এর ফলে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার রোধে সরকার তথা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেগুলোর অধিকতর সক্রিয়তার অপরিহার্যতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো।’
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের শাস্তির বিধান উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আইন অনুযায়ী এই অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তির ৪ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। এছাড়া অপরাধের সঙ্গে জড়িত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করাসহ দ্বিগুণ পরিমাণ পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রয়েছে। আর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নিবন্ধন বাতিলসহ অনুরূপ জরিমানার বিধান রয়েছে।’
বিদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই কারণেই আমরা পাচার প্রতিরোধের ওপর সব সময় বেশি জোর দিয়ে আসছি। তবে সিঙ্গাপুর থেকে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার সফল অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। যেহেতু বিএফআইইউর মাধ্যমে ঘটনাটি এরই মধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। তাই সরকারের উচিত অবিলম্বে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। আমরা আশা করি, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের আইনানুগ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কঠোর প্রতিরোধক উদাহরণ তৈরি হবে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই বিদেশে খোলা হয়েছিল নতুন একটি কোম্পানি। এরপর সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ওই কোম্পানির নামে কেনা হয় একটি জাহাজ। সেই জাহাজ বাংলাদেশে আমদানির জন্য নিজেদের মালিকানাধীন আরেকটি কোম্পানির অনুকূলে ৪১০ কোটি টাকার (৩ কোটি ২৬ লাখ ডলার) ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়। আবার মেঘনা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চে শতভাগ মার্জিনের এই এলসি খোলা নিয়েও রয়েছে ব্যাংকিং বিধিমালা লংঘনের অভিযোগ।
নিজেই নিজের কাছ থেকে জাহাজ আমদানির জন্য এলসিটি খুলেছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ মেঘনা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ। অনুসন্ধান চালিয়ে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া গেছে বলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সংস্থাটির সন্দেহ, মেঘনা গ্রুপ ও মেঘনা ব্যাংক কর্মকর্তাদের পরস্পর যোগসাজশে অর্থপাচারের উদ্দেশ্য থেকেই এলসিটি খোলা হয়েছে।
জাহাজটি আমদানির জন্য মেঘনা ব্যাংক পিএলসিতে খোলা এলসিটির রপ্তানিকারক হিসেবে মূল সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স পিটিই লিমিটেড’। বিএফআইইউর অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ মেঘনা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে ‘এমভি মেঘনা পার্ল’ নামের একটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ আমদানির উদ্দেশ্যে এলসির অনুমোদন দেওয়া হয়। এলসির নম্বর ৩২৫২২৬০১০২২০। এই এলসি খোলার আগে লয়েড’সের ১০ মার্চ প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, জাহাজটি আগে সিএমবি ব্রুয়েগেল নামে পানামায় নিবন্ধিত ছিল। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মেঘনা পার্ল। যদিও ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকেই জাহাজটির কমার্শিয়াল অপারেটর ও নিবন্ধিত স্বত্তাধিকারি মেঘনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ।
পরে লয়েড’সের ৩১ মার্চের প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ। তবে এলসি খোলার ১৪ দিন পর লয়েড’স-এর ১২ এপ্রিলের ভ্যাসেল ট্র্যাকিং রিপোর্টে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। এতে বলা হয়, জাহাজটি ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশের পতাকাবাহী। আর মেঘনা গ্রুপ এটির সুবিধাভোগী মালিক ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে।
২০১৯ সালে জাহাজটি আমাদের কেনার কথা থাকলেও, তখন তা কেনা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক যে তথ্য দিয়েছে, তা সঠিক নয়। পরে রেকর্ডের ভুল স্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংককে আমরা ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য আপডেট করেছি। মোস্তফা কামাল, চেয়ারম্যান ও এমডি, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ
শিল্পগ্রুপটি নিজেও মেঘনা ব্যাংককে দেওয়া এক ই-মেইলে এলসি খোলার আগে থেকেই জাহাজ মালিকানায় থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বিষয়টির উল্লেখ আছে। মেঘনা ব্যাংকে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল দেওয়া এক ই-মেইলে গ্রুপটির পক্ষ থেকে বলা হয়, জাহাজটি গ্রুপটির সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স পিটিই লিমিটেডের নামে পানামার ব্লু সাইপ্রেস লাইন এসএর কাছ থেকে কেনা হয়েছে। জাহাজের নাম পরিবর্তনের আগে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর এর দাম সিঙ্গাপুরের কোম্পানিটির মাধ্যমে ব্লু সাইপ্রেস লাইন এসএকে পরিশোধ করে দেওয়া হয়।
লয়েড’স লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের পাশাপাশি মে ইন্টারন্যাশনাল ও আইএমবির ভ্যাসেল ট্র্যাকিং রিপোর্টের বরাত দিয়ে বিএফআইইউ দাবি করছে, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বরের আগে থেকেই জাহাজটির মালিক মেঘনা গ্রুপ।
বিষয়টি নিয়ে জানতে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বিএফআইইউর প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘২০১৯ সালে জাহাজটি আমাদের কেনার কথা থাকলেও, তখন তা কেনা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক যে তথ্য দিয়েছে, তা সঠিক নয়। পরে রেকর্ডের ভুল স্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংককে আমরা ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য আপডেট করেছি।’
তবে লয়েড’স লিস্টের তথ্য অনুযায়ী অন্তত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে জাহাজটি তাদের মালিকানায় থাকার বিষয় স্বীকার করেন মোস্তফা কামাল। এরপরও নিজেদের মালিকানায় থাকা জাহাজ কিনতে ২০২৬ সালের মার্চে কেন পুনরায় এলসি খোলা হলো– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি অনেক লম্বা ইতিহাস। টেলিফোনে এত কথা বলা যাবে না। আপনার জানার থাকলে সরাসরি অফিসে আসতে পারেন অথবা সঠিক তথ্য সংগ্রহ করেন।’
বিএফআইইউর অভিযোগ, মেঘনা ব্যাংকের কাছে গ্রুপটির হাতে জাহাজের মালিকানা থাকার তথ্য থাকলেও কোনো ধরনের ডিউ ডিলিজেন্স (যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন) ছাড়াই এলসিটি খোলা হয়েছে। মালিকানায় থাকা একটি জাহাজ পুনরায় আমদানির নামে শুধু ৩২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ সিঙ্গাপুরে পাচারের উদ্দেশ্য থেকেই মেঘনা গ্রুপ ও মেঘনা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পরস্পরের যোগসাজশে এই এলসি খোলা হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সরকারের উচিত অবিলম্বে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। আমরা আশা করি, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের আইনানুগ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কঠোর প্রতিরোধক উদাহরণ তৈরি হবে। ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ গোয়েন্দা ইউনিটটির তথ্য অনুযায়ী, ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজের এলসির মার্জিন (শতভাগ) হিসেবে মেঘনা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় তাসনিম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের (মেঘনা গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান) একটি চলতি হিসাবে ৩ কোটি ২৬ লাখ ডলারের সমপরিমাণ প্রায় ৪১০ কোটি টাকা জমা রাখা হয়। তবে এই অর্থ মূল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হিসাব থেকে জমা হয়নি। বরং বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকে থাকা মেঘনা গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে ক্লিয়ারিং চেকের মাধ্যমে নিয়ে এসে এ অর্থ লিয়েন করা হয়েছে। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিষয়টি অস্বাভাবিক ও বিধিবহির্ভূত।
যদিও এলসিটি যথাযথ যাচাই-বাছাই করেই খোলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মিজানুর রহমান। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এত বড় অঙ্কের এলসি বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো ব্যাংকের পক্ষেই খোলা সম্ভব নয়। আমাদের যা যা ডিউ ডিলিজেন্স (যাচাই-বাছাই) করার দরকার ছিল, তা করেই এলসিটি খোলা হয়েছে।’
মেঘনা গ্রুপের আগে থেকেই মালিকানায় থাকা জাহাজের বিপরীতে এলসি খোলা এবং গ্রুপটির সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্লিয়ারিং চেকের মাধ্যমে এলসির মার্জিনের অর্থ (৪১০ কোটি টাকা) লিয়েন করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সৈয়দ মিজানুর বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার সবকিছুর হুবহু বিস্তারিত মনে নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের চিঠিপত্র আদান-প্রদান চলছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়ায় এখনই এই বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়। বিস্তারিত জানতে চাইলে সরাসরি অফিসে এসে কথা বলতে পারেন।’
এলসিতে জাহাজের রপ্তানিকারক হিসেবে উল্লিখিত ‘মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স পিটিই লিমিটেড সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০১৮ সালের ১৮ জুন। নিবন্ধনকালে এর অনুমোদিত মূলধন ছিল ১ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার। শুরুতে কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডার ছিলেন মোস্তফা কামাল, তাঁর তিন মেয়ে তানজিমা বিনতে মোস্তফা, তাহমিনা বিনতে মোস্তফা ও তাসনিম বিনতে মোস্তফা এবং হাসান ইমাম ফিরোজ নামে আরেক ব্যক্তি। পরে এর কর্তৃত্ব মেঘনা সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির পরিচালকদের তালিকায় রয়েছেন মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, তাঁর দুই মেয়ে তানজিমা বিনতে মোস্তফা ও তাহমিনা বিনতে মোস্তফা এবং সিঙ্গাপুরের নাগরিক এস এম শাহান শাহ।
বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়েই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা হচ্ছিল। পরে গোটা বিষয়টি নিয়ে ‘ঘটনত্তোর অনুমোদনের’ আবেদন করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এর অনুমোদন দেয়নি। এছাড়া সিঙ্গাপুরের কোম্পানিটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির আওতায় নিয়ে আসতে এর নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও ব্যবসার অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত হালানাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মেঘনা গ্রুপ তা জমা দেয়নি।
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ‘ডান অ্যান্ড ব্র্যাডস্ট্রিট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কোম্পানিটির চলতি সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৯৮ লাখ মার্কিন ডলার। নিজস্ব কোনো ইনভেন্টরি (মালামাল মজুদ) না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে ২৩ কোটি ৭২ লাখ মার্কিন ডলার এবং ২০২৩ সালে ১৭ কোটি ৮২ লাখ মার্কিন ডলারের ব্যবসায়িক লেনদেন করেছে। মাত্র ১ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার মূলধন শুরু হওয়া কোম্পানির তিন বছরের মাথায় বিপুল অঙ্কের লেনদেনের বিষয়ও সন্দিহান করে তুলেছে বিএফআইইউকে।
সংস্থাটির অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, মোস্তফা কামাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা সিঙ্গাপুরে মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স পিটিই লিমিটেড ছাড়াও আরও দুটি কোম্পানি পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে ‘এশিয়ান গ্রেইন অ্যান্ড কমোডিটি পিটিই লিমিটেড’ নামের কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাব রয়েছে সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক লিমিটেডে। এই হিসাব পরিচালনার জন্য অথরাইজড সিগনেটরি হলেন মোস্তফা কামাল ও তাঁর দুই মেয়ে।
সিঙ্গাপুরে কার্যক্রম চালানো গ্রুপটির আরেক কোম্পানি ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড কমার্স লিমিটেড’ নিবন্ধিত হয়েছে অফশোর ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে পরিচিত মার্শাল আইল্যান্ডসে। সিঙ্গাপুরে কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হচ্ছে ওসিবিসি ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে। এখানেও মোস্তফা কামাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।
এসব ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন উৎস ও ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হওয়ার তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ। বাংলাদেশের তাসনিম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স থেকে সরাসরি আউটওয়ার্ড রেমিট্যান্সের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের ওসিবিসি ব্যাংকে গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড কমার্স লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানো হয়েছে। এছাড়া একই প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক সিঙ্গাপুরের হিসাবে ২০১৯ সালের ২৪ মে থেকে ২০২০ সালের ২৬ মে পর্যন্ত এক বছরে ছয়টি ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সের মাধ্যমে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার জমা হয়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, এই অর্থের মূল উৎস মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী স্ট্রিমকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে কোম্পানি খোলা হলে সেটি সম্পূর্ণ অবৈধ। একটি অবৈধ কোম্পানির কাছ থেকে এলসি খুলে নিজেদের জাহাজ আবার আমদানি করা কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। এখন বড় প্রশ্ন হলো, বিদেশে কোম্পানি খোলার সেই অর্থ কোথা থেকে গেল? মালিক যদি বাংলাদেশি হন, তবে সেখানে অর্থ নেওয়ার তো একটি বৈধ প্রক্রিয়া থাকতে হবে।’
বিএফআইইউর পদক্ষেপ এবং বিচারহীনতার বিষয়ে এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘বিষয়টি যেহেতু বিএফআইইউর নজরে এসেছে। তাই এটি কেবল গল্পের শুরু, শেষ নয়। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা। এই প্রক্রিয়ায় যদি কোনো অবৈধ লেনদেন বা অর্থপাচার প্রমাণিত হয়, তবে এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীদের বিচার না হলে অন্যরাও এমন অবৈধ প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত হবে।’
১৯৭৬ সালে উদ্যোক্তা মোস্তফা কামাল কামাল ট্রেডিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন। পরে ১৯৮৯ সালে মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান এমজিআইয়ের শিল্প কার্যক্রমের শুরু হয়।
ঢাকার গুলশানে গ্রুপটির প্রধান কার্যালয়। এই শিল্পগোষ্ঠীর বর্তমানে ৫৭টির বেশি শিল্প ইউনিট রয়েছে। এতে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
এমজিআইয়ের উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে ফ্রেশ, নম্বর ওয়ান, পিউর, অ্যাকটিফিট ও মেঘনাসিম ডিলাক্স। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিপিং ও জাহাজ নির্মাণ, বিমা, সিকিউরিটিজ, গণমাধ্যম, এভিয়েশনসহ বিভিন্ন খাতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা রয়েছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এমজিআই নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে না। তবে প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট তথ্য অনুযায়ী, তাদের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিএফআইইউর এই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে আবার প্রমাণিত হলো– দেশে মানি লন্ডারিং চক্র এখনো সক্রিয় এবং এর প্রক্রিয়াগুলোও সচল। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের পতনের পরও দেশ থেকে অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে রাষ্ট্রের কাঠামোগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সম্ভাবনার সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না।’
পাচারকারী চক্র যত শক্তিশালীই হোক না কেন, বিএফআইইউ যে বিষয়টি অনুসন্ধান করে সামনে আনতে পেরেছে, তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এই দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘এর ফলে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার রোধে সরকার তথা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেগুলোর অধিকতর সক্রিয়তার অপরিহার্যতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো।’
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের শাস্তির বিধান উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আইন অনুযায়ী এই অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তির ৪ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। এছাড়া অপরাধের সঙ্গে জড়িত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করাসহ দ্বিগুণ পরিমাণ পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রয়েছে। আর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নিবন্ধন বাতিলসহ অনুরূপ জরিমানার বিধান রয়েছে।’
বিদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই কারণেই আমরা পাচার প্রতিরোধের ওপর সব সময় বেশি জোর দিয়ে আসছি। তবে সিঙ্গাপুর থেকে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার সফল অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। যেহেতু বিএফআইইউর মাধ্যমে ঘটনাটি এরই মধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। তাই সরকারের উচিত অবিলম্বে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। আমরা আশা করি, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের আইনানুগ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কঠোর প্রতিরোধক উদাহরণ তৈরি হবে।’
.png)

শাহ আমানত সাবির (২৩) খুলনাভিত্তিক ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের (এফসিএস) প্রশিক্ষণ প্রধান। গত ৫ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া বালুর মাঠে প্রশিক্ষণের সময় তিনিসহ ছয়জন আটক হন। পরে পুলিশ জানায়, মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনার প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় তাঁরা ধরা পড়েন।
০৯ জুলাই ২০২৬
সন্তান হারানো মায়েরা জানিয়েছেন, ঠান্ডা লাগায় তাদের অনুরোধে এসি বন্ধ করা হয়। সন্তানেরা কান্না শুরুর পর নার্স ডেকে পাননি। বমি শুরুর পর কান্নাকাটি করলেও চিকিৎসক-নার্সের দেখা মেলেনি। তবে এই ঘটনায় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলকে এসব মায়েরা সমর্থন করেন না বলে জানিয়েছেন।
২৮ জুন ২০২৬
ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনার মধ্যে মুফতি হারুন ইজহারের আহ্বানের পর কাকতালীয় হলেও, সারা দেশে উড়ছে সাদা এবং কালো পতাকা। ছবি দেওয়ার পর নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এগুলোর সঙ্গে আল কায়েদা, আইএসআইএস, তালেবান, হিজবুত তাহরীরের মতো সংগঠনের পতাকার নকশার মিলের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
২৩ জুন ২০২৬
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তাদের পক্ষে নিউইয়র্কভিত্তিক ‘গ্লোবাল এআই করপোরেশন’ চুক্তি করে ‘ব্রাউনস্টেইন হায়াত ফারবার শ্রেক’– এর সঙ্গে। তবে মাত্র ৩৭ দিনের মাথায় চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায়।
০৯ জুন ২০২৬