ad

এখনো কোমর তাঁতে কাপড় বোনেন থানচির হাঁবৈরুং ত্রিপুরা, কিন্তু আর কতদিন?

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বান্দরবান

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০: ১২
হাঁবৈরুং ত্রিপুরা। স্ট্রিম ছবি
হাঁবৈরুং ত্রিপুরা। স্ট্রিম ছবি

বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হাঁনারাং। শঙ্খ (সাঙ্গু) নদীতীরের এই গ্রামে মূলত ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষেরা বসবাস করেন।

এই গ্রামের একজন বাসিন্দা হাঁবৈরুং ত্রিপুরা। সকালের রান্নাবান্না-সাংসারিক কাজ আগেভাগেই সেরে নিয়েছেন৷ এখন কোমর তাঁতে বসবেন। তাঁতটি কোমরের সঙ্গে বাঁধা থাকে বলে একে এই নামেই ডাকা হয়।

হাঁবৈরুং কোমরের সঙ্গে তাঁত বাঁধলেন। সামনে সুতা। দুই হাতের টানে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে বুনন। কিছুক্ষণ পরপর থেমে সুতা ঠিক করে নিচ্ছেন। তারপর আবার শুরু করছেন নতুন করে।

ছোটবেলা থেকেই বাড়ির উঠানে বসে কাপড় বোনেন হাঁবৈরুং। তাঁর কাছে কাজটি নতুন নয়। এভাবেই বাড়ির নারীদের দেখে এসেছেন। শিখেছেন তাঁদের কাছেই। কিন্তু এখন চারপাশে তাকালে আগের মতো তাঁত চোখে পড়ে না।

স্থানীয়রা মনে করেন, শুধু ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে কোমর তাঁতকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। এর সঙ্গে আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

হাঁবৈরুংয়ের সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে পাহাড়ের জীবনও। এখন আর প্রতিটি বাড়ির উঠানে কোমর তাঁতের শব্দ শোনা যায় না। একসময় পাহাড়ি নারীদের ঘরে কোমর তাঁত থাকা ছিল খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। নিজেদের পরনের কাপড় নিজেরাই বুনতেন তাঁরা। জুমের কাজ, ঘরের কাজ সব সামলে অবসরে তাঁত নিয়ে বসতেন। কাপড় বুনতে সময় লাগলেও সেই অপেক্ষার মধ্যেই তৈরি হতো নিজের হাতে বানানো পোশাক। কাপড়ের সঙ্গে তৈরি হতো নিজেদের আলাদা পরিচয়।

পাহাড়ের মানুষের পোশাকে যে রং, নকশা আর বুনন দেখা যায়, তার অনেকটাই এসেছে এমন হাতের কাজ থেকে। কোন নকশা কীভাবে বসাতে হবে, সুতার রং কী হবে, বুননের ধরন কেমন হবে—এসব শেখানো হতো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে। মায়ের কাছ থেকে মেয়ে শিখতেন। পরিবারের অন্য নারীরাও শিখতেন।

একসময় তাদের সম্প্রদায়ের মেয়েদের বিয়ের জন্যও তাঁতে কাপড় বোনার দক্ষতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হতো। নিজের কাপড় নিজে তৈরি করতে পারা ছিল সংসারজীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা।

কোমর তাঁত। বাংলাদেশ ফ্যাশন আর্কাইভের ছবি
কোমর তাঁত। বাংলাদেশ ফ্যাশন আর্কাইভের ছবি

আধুনিক পৃথিবীর ছোঁয়া লেগেছে পাহাড়েও। বাজারে এখন নানা ধরনের কাপড় পাওয়া যায়। ফলে দিনের পর দিন সময় দিয়ে কোমর তাঁতে কাপড় বোনার প্রয়োজন কমেছে। যারা তৈরি পোশাক কিনেই কাজ চালিয়ে নিতে পারছেন, তাঁদের কাছে এই দীর্ঘ পরিশ্রমের কাজটি অনেক সময় আর জরুরি মনে হয় না। এর প্রভাব পড়েছে নতুন প্রজন্মের ওপরও।

অনেক নারীই আর কোমর তাঁত বুনতে শেখেন না। কারণ শিখলেও এই কাজ থেকে আয় কতটা হবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। বাজারে নিয়মিত বিক্রিবাট্টা নেই। ফলে আগ্রহ থাকলেও অনেকের পক্ষে কাজটি ধরে রাখা কঠিন।

হাঁবৈরুং ত্রিপুরা অবশ্য এখনো হাল ছাড়েননি। তাঁর উঠানে বসলে বোঝা যায়, কোমর তাঁত খুব সাধারণ কাঠামোর হলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও হাতের দক্ষতা। সুতা টানতে হয়, বুনন ঠিক রাখতে হয়, নকশা মিলিয়ে নিতে হয়। ভুল হলে আবার ঠিক করতে হয়। তাঁতের কাপড়ে যে নকশা উঠত, তার মধ্যেও থাকত পাহাড়ি জীবনের ছাপ। রঙের ব্যবহার, নকশার ধরন কিংবা কাপড়ের বুনন; সবকিছুতেই ছিল নিজস্বতা। সেই কাজের মধ্য দিয়ে টিকে থাকতো পাহাড়ের মানুষের সংস্কৃতি আর জীবনধারা।

এছাড়া একসময় পাহাড়ি নারীদের বাজারের ওপর এতটা নির্ভরতাও ছিল না। নিজের পোশাকের জন্য কাপড় নিজেকেই তৈরি করতে হতো। জুম চাষ ছিল জীবিকার বড় ভরসা। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও কৃষিকাজ করতেন। ঘরের কাজও তাঁদেরই সামলাতে হতো। এর মধ্যেই সময় বের করে তাঁত বুনতেন তাঁরা। ফলে কোমর তাঁতের সঙ্গে মিশে আছে পাহাড়ি নারীর জীবনের গল্পও।

এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে স্থানীয়ভাবে তেমন কোনো উদ্যোগও গড়ে ওঠেনি। কারিগরদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা কিংবা তৈরি কাপড় বিক্রির স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। ফলে তাঁতে কাজ করা অনেকটাই নির্ভর করছে ব্যক্তিগত আগ্রহের ওপর। অথচ কোমর তাঁতের বাজার তৈরি করা গেলে ছবিটা বদলাতে পারে।

ভ্রমণপিপাসু পর্যটক ও ঢাকা কলেজের শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছেন। তাঁর চোখে এখনো পাহাড়ি নারীদের হাতে বোনা কাপড়ের আলাদা আকর্ষণ আছে। তিনি বলেন, একসময় কোমর তাঁত পাহাড়ি জীবনের অংশ ছিল। আধুনিকতার কারণে এর ব্যবহার কমে গেলেও শহরের মানুষ ও পর্যটকদের কাছে পাহাড়ি তাঁতের পণ্যের আগ্রহ রয়েছে। নিয়মিত বিক্রি ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা গেলে কারিগররা ভালো দাম পেতে পারেন। এতে কাজটিও টিকে থাকার সুযোগ পাবে।

পর্যটকদের কাছে স্থানীয়ভাবে তৈরি ঐতিহ্যবাহী পণ্য তুলে ধরতে নিয়মিত বিক্রয় ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলে কারিগররা যেমন ন্যায্য মূল্য পাবেন, তেমনি বাড়বে উৎপাদন ও আগ্রহ।

কামাল উদ্দিনের কথায় সম্ভাবনার দিকটিও আছে। পাহাড়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে স্থানীয়ভাবে তৈরি কাপড় ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করা গেলে একটি বাজার তৈরি হতে পারে। পর্যটনকেন্দ্রে বিক্রয়কেন্দ্র করা যেতে পারে। নিয়মিত মেলা বা প্রদর্শনীর আয়োজনও হতে পারে।

বিশেষ করে পাহাড়ের পর্যটন শিল্প সম্প্রসারণের সঙ্গে কোমর তাঁতের কাপড়কে যুক্ত করা গেলে নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। পর্যটকদের কাছে স্থানীয়ভাবে তৈরি ঐতিহ্যবাহী পণ্য তুলে ধরতে নিয়মিত বিক্রয় ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলে কারিগররা যেমন ন্যায্য মূল্য পাবেন, তেমনি বাড়বে উৎপাদন ও আগ্রহ।

এতে একদিকে কারিগররা সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন, অন্যদিকে বাইরের মানুষও পাহাড়ের এই পুরোনো কাজটি কাছ থেকে জানার সুযোগ পাবেন।

স্থানীয়রা মনে করেন, শুধু ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে কোমর তাঁতকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। এর সঙ্গে আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারিগরদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সহজ শর্তে সহায়তা দিতে হবে। পুরোনো নকশার পাশাপাশি নতুন নকশায় পণ্য তৈরির সুযোগ দিতে হবে। শহরের বাজারেও এসব পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে কোমর তাঁত আবার আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

হাঁবৈরুং ত্রিপুরার মতো কেউ কেউ এখনো পুরোনো অভ্যাসকে জীবনের সঙ্গী করে তাঁত বুনে চলেছেন। তাঁদের হাতের প্রতিটি বুননের সঙ্গে থেকে যাচ্ছে নিজেদের পরিচয় আর ঐতিহ্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে হয়তো থেমে যেতে পারে কোমর তাঁতের গল্প।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত