একাডেমিক লেখা বা গবেষণা-প্রবন্ধ সাধারণ মন্তব্য ও অনুভূতি-প্রকাশমূলক লেখা থেকে প্রক্রিয়া ও কাঠামোর দিক থেকে ভিন্ন। এর সুনির্দিষ্ট দার্শনিক ভিত্তি আছে, ইতিহাস আছে, কৌশল আছে। এই সিরিজের প্রথম পর্বে সেই দার্শনিক ভিত্তি ও ঐতিহাসিক শিকড়ের সন্ধান—এরিস্টটল থেকে দেকার্ত, পপার হয়ে আধুনিক গবেষণা-প্রবন্ধ পর্যন্ত।
জগলুল আসাদ

কোনো রিসার্চ আর্টিকেল লিখতে গেলে সেখানে কোনো কিছু ক্লেইম করতে হয়। থিসিস স্টেটমেন্ট লিখতে হয়, রিসার্চ গ্যাপ বের করতে হয়, ক্লেইম বা দাবিকে প্রশ্ন বা সমস্যা আকারে হাজির করতে হয়। দাবিটাকে কনটেস্টেবল হতে হয়। একটা সেন্ট্রাল আর্গুমেন্ট থাকতে হয়, বেশ রিপিটিশন থাকতে হয়, কী করব সেটা থাকতে হয় ভূমিকায়। উপসংহারে বলতে হয় কী করলাম, কীভাবে করলাম, কী বাকি রইল। পদ্ধতি লিখতে হয়, লিটারেচার রিভিউ করতে হয় ইত্যাদি।
পশ্চিমে লেখালেখির একাডেমিক পদ্ধতি বর্তমান রূপে দাঁড়াতে বলা যায় হাজার বছর লেগেছে, গোড়া খুঁজতে গেলে প্রাচীন গ্রিস পর্যন্ত যেতে হবে। নইলে এমনিতে অন্তত আড়াইশ বছরের ইতিহাস এটি। কেউ কেউ পদ্ধতি ও দর্শন দাঁড় করিয়েছেন, কেউ শৈলীনির্মাণে অবদান রেখেছেন। এই নিয়মকানুনের শিকড় মূলত দুটো ধারা থেকে এসেছে। একটা হলো যুক্তি ও পদ্ধতির দর্শন (কীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে দাবি প্রতিষ্ঠা করা লাগে)। আরেকটা হলো জ্ঞান কীভাবে সমষ্টিগতভাবে গড়ে ওঠে ও প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পায় তার ইতিহাস। এই পর্বে প্রথমে আমরা দেখব একাডেমিক লেখার যুক্তি ও পদ্ধতির দর্শন, তারপর দ্বিতীয়টা, অর্থাৎ জ্ঞানসৃষ্টির সামষ্টিক প্রয়াস ও প্রাতিষ্ঠানিকতার ব্যাপারটি।
ধরা যাক, এরিস্টটলের ‘পয়েটিক্স’ বইটার কথা। তিনি প্রথমেই বলে নিচ্ছেন তিনি কী কী আলোচনা করবেন, আর্টের সংজ্ঞায়ন করছেন, প্রকার নির্ধারণ করছেন, আর্টের এক ফর্ম আরেক ফর্ম থেকে কীভাবে আলাদা হয় সেই আলোচনা করছেন। ট্র্যাজেডির উপাদান আলোচনা করছেন, উপাদানসমূহের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—প্লট—নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছেন, ভালো ও কার্যকর প্লট কেমন হয় তা বিদ্যমান অপরাপর ট্র্যাজেডি বিশ্লেষণ করে আরোহী পদ্ধতিতে দেখাচ্ছেন। ট্র্যাজেডির সঙ্গে মহাকাব্যের পার্থক্য নির্দেশ করছেন, আবার এই দুই ফর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর হিসেবে ট্র্যাজেডিকে সাব্যস্ত করছেন!
ট্র্যাজেডির কাজ কী এবং সেই কাজ পূর্ণাঙ্গভাবে করতে হলে প্লটের বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, তা-ই বিশ্লেষণ করছেন। অত্যন্ত ধারাবাহিকভাবে যুক্তির ক্রম সাজিয়েছেন, সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেছেন, বিরোধী পক্ষের যুক্তি খণ্ডন করে ট্র্যাজেডির শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সংজ্ঞায়ন, শ্রেণিকরণ, পার্থক্য নিরূপণ, শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়, ঐতিহাসিক সমীক্ষা চালানো, উৎপত্তির বিবিধ উৎস বা পরম্পরা নির্দেশ—এসবই পরবর্তীকালে একাডেমিক লেখালেখির রীতিতে পরিণত হয়েছে।
তাঁর ‘টপিক্স’ গ্রন্থে এরিস্টটল ‘থিসিস’ শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। এর অর্থ স্থাপন করা। এরিস্টটল থিসিস বলতে বোঝান এমন দাবিকে যা নিয়ে তর্ক করা যায়, অর্থাৎ এটা অনেকটাই এখনকার যুগে কথিত কনটেস্টেবল ক্লেইম-এর কাছাকাছি। কোনো সত্য-দাবি থিসিস হয় না, বরং যা কিছুর বিরুদ্ধে বলা যায়, তর্ক করা যায়, তা-ই থিসিস। যেকোনো গবেষণামূলক লেখায় ‘আমি কী জানি’ তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘আমি কী দেখাতে চাই’।
এরিস্টটলের এই যুক্তি-কাঠামো পরবর্তীকালে আরও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির রূপ পায় দেকার্তের হাতে। ১৬৩৭ সালে প্রকাশিত তাঁর Discourse on Method গ্রন্থে দেকার্ত চারটি নিয়মের কথা বলেন, যা যুক্তিবাদী চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করে: প্রথমত, কোনো কিছু সুস্পষ্ট ও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলে কোনো কিছুকে সত্য বলে গ্রহণ না করা। অর্থাৎ সংশয়কে পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা। দ্বিতীয়ত, জটিল যেকোনো সমস্যাকে যতগুলো সম্ভব ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিবেচনা করা; তৃতীয়ত, সবচেয়ে সরল-সহজ ও জানা বিষয় থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে জটিল বিষয়ের দিকে চিন্তাকে পরিচালিত করা। চতুর্থত, পুরো প্রক্রিয়াকে যৌক্তিকভাবে পুন:নিরীক্ষা করা, কোনো কিছু বাদ পড়ল কি-না, কোনো অনুমান ঢুকে পড়ল কি-না।
এই চারটি নিয়ম আজকের গবেষণা-প্রবন্ধের ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করা যায়, সমস্যাকে ভেঙে অংশে ভাগ করার প্র্যাকটিসটাই আজকের ‘মেথড’ সেকশন, সরল থেকে জটিলে যাওয়ার নিয়মটাই লেখার ভেতরের যুক্তিক্রম বা লজিক্যাল ফ্লো, আর সম্পূর্ণতার দাবিটার ভেতরে পাব লিটারেচার রিভিউ-এর মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার প্রসঙ্গটি। আধুনিক গবেষণা-প্রবন্ধের জন্মের পেছনে যুক্তিবাদী দর্শনের ভূমিকা আছে, দেকার্ত সেই দাবির বেশ স্পষ্ট প্রমাণ। তাছাড়াও দৃষ্টবাদী (পজিটিভিস্ট) দর্শনও আধুনিক রিসার্চ আর্টিকেলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যার বিরোধিতার উপর দাঁড়ানো দৃষ্টবাদী দর্শন। এভাবেও বলা যেতে পারে যে, যা কিছু অদৃষ্টবাদী বা অপ্রত্যক্ষবাদী, দৃষ্টবাদের কুঠারাঘাত সেটির বিরুদ্ধে। পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে সত্য জানা যায়—এটা দৃষ্টবাদের প্রধান দাবি।
যাহোক, দেকার্তের সন্দেহবাদী পদ্ধতি থেকেই আমরা যেতে পারি কার্ল পপারের ‘ফলসিফায়েবিলিটি’ বা মিথ্যা-প্রতিপাদনযোগ্যতার নীতিতে, যা যেকোনো রিসার্চ ক্লেইমের ক্ষেত্রে আজ গুরুত্বপূর্ণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। যাতে মিথ্যা বা ভুল প্রতিপাদনের ঝুঁকি থাকে না, তা কোনো গবেষণার দাবি হতে পারে না—তা ধর্ম হয়ে ওঠে, অর্থাৎ যাকে সর্বদাই সত্য-দাবি আকারে হাজির করতে হয়। সুতরাং কনটেস্টেবল ক্লেইমের এই ধারণা সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটল থেকে দেকার্ত হয়ে কার্ল পপার পর্যন্ত, একই যুক্তিবাদী স্রোতে প্রবাহিত। কোনো দাবিকে যাচাইযোগ্য, খণ্ডনযোগ্য ও আন্তর্ব্যক্তিক হতে হয়, যেন একই পদ্ধতি অবলম্বন করে একই ফল বারবার পাওয়া যায়—বিশেষত বৈজ্ঞানিক দাবির ক্ষেত্রে। কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রে একই টেক্সট একই পদ্ধতি ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন লেজিটিমেট পাঠ হাজির করা সম্ভব, অথবা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন দাবি করা যেতে পারে।
এতক্ষণ আমরা যা বললাম তা হলো একক ব্যক্তির যুক্তি-নির্মাণের পদ্ধতি নিয়ে। কিন্তু কোনো গবেষণাই তো একা দাঁড়ায় না। গুগল স্কলারের হোম পেইজে লেখা আছে, ‘Stand on the shoulders of giants’, অর্থাৎ বিজ্ঞদের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াও, তারপর দেখ ও বিবেচনা কর। আইন্সটাইন রবার্ট হুককে লেখা এক চিঠিতে বলেছিলেন: ‘If I have seen further it is by standing on the shoulders of Giants.’ আমি যদি অন্যদের থেকে বেশি দূরে দেখতে পেয়ে থাকি, তবে তা সম্ভব হয়েছে জ্ঞানীদের কাঁধে দাঁড়িয়ে দেখার ফলেই।
যেকোনো গবেষণামূলক লেখা দাঁড়ায় পূর্বতন গবেষণার উপর ভিত্তি করে। ‘আমিই একমাত্র জানি’, ‘আমা থেকেই এটা শুরু’, ‘আমিই একমাত্র বুঝেছি’—এই ধরনের এরোগেন্স গবেষণা-প্রবন্ধে চলে না; আসলে এই আত্মম্ভরিতার কোনো সারবত্তা জ্ঞানের জগতে নেই। গবেষণা-প্রবন্ধের ভেতরে অন্যের স্বীকৃতি থাকে, চিন্তার ধারাবাহিকতা ও পূর্ববর্তী দাবির ভেতরে নিজেকে যুক্ত করে নিজের দুই পয়সা হাজির করার হিউমিলিটি থাকে। এই জন্যে একাডেমিক লেখায় সাইটেশন বা রেফারেন্স লাগে। রেফারেন্স/সাইটেশন নিজে জ্ঞান না হলেও একাডেমিক হিউমিলিটি ও নর্ম; সাইট বা উদ্ধৃত করা মানে নিজের মতটাকে উটকো বা বিচ্ছিন্ন না দেখিয়ে একটা ‘ইলমি সিলসিলা’র অংশ হিসেবে দেখানো; আর বিশুদ্ধ ‘নিজের কথা’ বলে আসলে কিছু নেই—যা থাকে তা হলো অপরের সঙ্গে নিজেকে সংলাপে সংযুক্ত করে গড়ে ওঠা ভাবনাকে যথাযথভাবে আর্টিকুলেট করা।
এই একই কথা টমাস কুন বলেছেন অন্যভাবে। শূন্য থেকে গবেষণা শুরু হয় না, যেকোনো গবেষককে একটা প্যারাডাইমের ভেতরে কাজ করতে হয়, যাকে বলে ‘নর্মাল সায়েন্স’। প্যারাডাইমের রথী-মহারথী থাকেন, ডমিন্যান্ট চিন্তা থাকে, সেগুলোকে মান্য করেই প্যারাডাইমের বিবিধ জ্ঞানগত পাজল সমাধান করতে হয়। আবার সেই নির্দিষ্ট প্যারাডাইম যদি অধিকাংশ সমস্যা সমাধানে আর সমর্থ না হয়, বা এমন অমোচনীয় গ্যাপ থেকে যায় যা আর পূরণ করা যায় না, তখন নতুন প্যারাডাইমের জন্ম হয়—যাকে কুন বলেন ‘প্যারাডাইম শিফট’। আর কেনেথ বার্ক একই ভাবনাটা রূপ দিয়েছেন একটা রূপক ব্যবহার করে: রিসার্চ হচ্ছে একটা চলমান আড্ডার মতো। কেউ আড্ডায় যুক্ত হতে চাইলে আগে আড্ডার প্রতিপাদ্য জেনে তারপর অংশ নিতে হয়।
পূর্বতন জ্ঞানীব্যক্তিদের কাঁধে দাঁড়ানো, প্যারাডাইমের ভেতরে কাজ করা, আর আড্ডায় যোগ দেওয়া—এই তিনটা রূপকই আসলে একই সত্যকে নির্দেশ করে: জ্ঞান কখনো শূন্য থেকে তৈরি হয় না, বরং একটা চলমান কথোপকথনের অংশ হিসেবে তৈরি হয়। গবেষণা-আর্টিকেল তাই একটা তর্ক-বিতর্ক ও সংলাপের ভেতরে প্রবেশ করা—তারা এই এই বলেছে, আমি এই এই বলছি। গ্রাফ ও বার্কেনস্টাইনের They Say/I Say বইটিতে এ নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আছে।
এই সমষ্টিগত জ্ঞাননির্মাণ কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল, তার একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে রবার্ট বয়েল। বিজ্ঞানীদের মধ্যে আদান-প্রদান ও গবেষণা-সংস্কৃতি তৈরির জন্যে ১৬৬০ সালে রয়্যাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এই সোসাইটির মূল বক্তব্য ছিল ‘নুল্লিয়ুস ইন ভার্বা’—অর্থাৎ মুখের কথায় বিশ্বাস নেই, প্রমাণ দেখাও। রয়্যাল সোসাইটির বৈজ্ঞানিক জার্নাল লেখার রীতি আধুনিক রিসার্চ-আর্টিকেলের কাঠামো ও দর্শন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। বিংশ শতকের প্রথম দিকে IMRaD অর্থাৎ Introduction, Method, Results and Discussion—এই কাঠামোয় একাডেমিক লেখালেখি চালু হয়, বিশেষত বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক লেখায়। খেয়াল করার বিষয়, এই কাঠামোর ‘মেথড’ অংশটা দেকার্তের সেই কোন বিষয় বা সমস্যাকে ভেঙে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেখবার যে নিয়ম, তারই একরকম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সংযোজন হলো জন সোয়ালেসের কাজ। একাডেমিক রাইটিংয়ের পদ্ধতি নির্মাণে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি; তাঁর মডেলকে বলা হয় CARS মডেল, অর্থাৎ Creating a Research Space। এখানে তিনি তিনটি ‘মুভ’-এর কথা বলেন। গবেষণার এলাকার গুরুত্ব বা কেন্দ্রিকতা প্রতিষ্ঠা করা, নলেজ গ্যাপ বা ফাঁক চিহ্নিত করা, এবং সেই ফাঁক পূরণ করা। বলা যেতে পারে, ‘বিজ্ঞদের কাঁধে দাঁড়ানো’ ও ‘আড্ডায় যোগ দেওয়া’র যে দার্শনিক ধারণা কেনেথ বার্ক ও অন্যরা দিয়েছেন, সোয়ালেস সেটাকেই একটা বাস্তবিক ও ধাপে-ধাপে অনুসরণযোগ্য মডেলে রূপান্তরিত করেছেন।
একটি সাধারণ প্রবন্ধ বা লেখা অনেকটা মিউজিয়ামের মতো। সেখানে আমরা বিভিন্ন তাত্ত্বিক, তাঁদের মতবাদ ও সমালোচনাগুলাকে নাম ও ট্যাগ দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখি, যাতে পাঠক দেখেন কে কবে কী বলছেন। কিন্তু একটা ভালো মানের আর্টিকেল বা রিসার্চ পেপার কোনো মিউজিয়াম না। এটাকে বরং তুলনা করা যায় একটা প্রাণবন্ত কোর্টরুমের সাথে। লেখক এই কোর্টরুমের বিচারক। নানা তত্ত্ব ও কেতাবাদি হলো তার ‘সাক্ষী’, বিচারকের যেমন সাক্ষী লাগে।
উঁচু মানের জার্নাল-আর্টিকেল লেখক খালি সাক্ষীদের পরিচয় করিয়ে দেন না; তাঁর কাজ হলো, সাক্ষীদের প্রত্যেককে জেরা করা, তাদের বক্তব্যের সততা ও দুর্বলতা খতিয়ে দেখা, এক সাক্ষীকে আরেক সাক্ষীর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে সংলাপ তৈরি করা, এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত সাক্ষ্য-সাবুদ ও যুক্তি-তর্কের ভিত্তিতে নিজস্ব একটা রায় বা উপসংহার হাজির করা। মিউজিয়ামের যে কিউরেটর, সে কখনও রায় দেয় না, কেবল জিনিসপত্র সংরক্ষণ আর প্রদর্শন করে। কিন্তু আদালতের বিচারক রায় দেন। তো, একটা ভালো আর্টিকেলের অথার হচ্ছেন ওই আদালতের বিচারকের মতোন। মানে, ভালো আর্টিকেল মিউজিয়াম বা তথ্যের গুদামঘর না, একটা ইন্টেলেকচুয়াল সালিশি আর কি! আদালতের বিচারকের মতো তার কাজ৷
এই পর্ব শেষ করতে পারি সেখানে, যেখানে শুরু হয়েছিল, অর্থাৎ এরিস্টটলের কাছে ফিরে। যে দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে লেখা হচ্ছে, তার ভূমিকায়, উপসংহারে ও মূল অংশে সেই যুক্তি ও দাবিকে পুনরাবৃত্তি করতে হয়। যুক্তিক্রমের প্রবাহ বজায় রাখার জন্যে এই রিপিটিশন জরুরি; একই সঙ্গে প্রাচীন রেটরিক অনুসারে পাঠক-শ্রোতাকে বোঝাতে ও লেখার সঙ্গে সংলগ্ন রাখতে এই পুনরাবৃত্তি কাজে দেয়। এরিস্টটল বক্তৃতার কার্যকারিতার জন্যে Ethos, Pathos ও Logos-এর কথা বলেছিলেন। একাডেমিক লেখায় পাঠককে লেখকের খনন ও উন্মোচন প্রক্রিয়ায় সঙ্গী করতে পুনরাবৃত্তি ও স্মরণ-করানো একটা গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইস, ঠিক যেমন এরিস্টটল নিজেই তাঁর যুক্তি বারবার ফিরিয়ে এনে পাঠককে সাথে করে আগান, তাঁর ‘পোয়েটিক্স’ গ্রন্থে।
এই লেখায় মূলত সংক্ষেপে একাডেমিক লেখার ভিত্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করেছি আমরা। অর্থাৎ কোথা থেকে এই রীতিনীতিগুলো এল, কোন দার্শনিক পরম্পরা তাদেরকে গঠন করেছে—তা। কিন্তু এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়, যেগুলো নিয়ে সিরিজের পরের পর্বগুলোতে আলাপ করার ইচ্ছা আছে। যেমন, একাডেমিক লেখা আসলে কোন অর্থে ‘সত্য’ দাবি করে, আর সত্য-দাবি ও যুক্তি-দাবির ভেতরের পার্থক্যটা কোথায়। ক্রিটিক বলতে ঠিক কী বোঝায়—দোষ ধরা, নাকি অন্তর্নিহিত অনুমানকে উন্মোচন করা। রেফারেন্স বা সাইটেশন কেন শুধুই ফরম্যালিটি না, বরং একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক দায়বদ্ধতা। আর একাডেমিক লেখারও যে বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে—বর্ণনামূলক, পুনঃপাঠ ও সৃজনমূলক, জ্ঞানসৃষ্টিমূলক—সেই ভাগগুলো কীসের ভিত্তিতে দাঁড়ায়, সেগুলোও আলোচনার দরকার হবে। এরপর ধীরে ধীরে তত্ত্ব থেকে প্রয়োগের দিকে যাওয়া যাবে—থিসিস ও ক্লেইম কীভাবে লিখতে হয়, নলেজ গ্যাপ বা প্রব্লেমেটাইজেশন কী, লিটারেচার রিভিউ কীভাবে একটা আড্ডায় অংশ নেওয়ার মতো করে লেখা যায়, IMRaD-এর মতো কাঠামো বাস্তবে কীভাবে ব্যবহার করা হয়, এবং যুক্তি নির্মাণ ও রেটরিকের হাতিয়ারগুলো কী।
সবশেষে আমরা দুই-তিনটি উন্নত মানের আর্টিকেল নিয়ে আলোচনা করব, তাদের গড়ন-গঠন বুঝে নিতে চেষ্টা করব। আমাদের এই সিরিজের প্রচেষ্টা থাকবে ধাপে ধাপে, পর্বে পর্বে আগোনো।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

কোনো রিসার্চ আর্টিকেল লিখতে গেলে সেখানে কোনো কিছু ক্লেইম করতে হয়। থিসিস স্টেটমেন্ট লিখতে হয়, রিসার্চ গ্যাপ বের করতে হয়, ক্লেইম বা দাবিকে প্রশ্ন বা সমস্যা আকারে হাজির করতে হয়। দাবিটাকে কনটেস্টেবল হতে হয়। একটা সেন্ট্রাল আর্গুমেন্ট থাকতে হয়, বেশ রিপিটিশন থাকতে হয়, কী করব সেটা থাকতে হয় ভূমিকায়। উপসংহারে বলতে হয় কী করলাম, কীভাবে করলাম, কী বাকি রইল। পদ্ধতি লিখতে হয়, লিটারেচার রিভিউ করতে হয় ইত্যাদি।
পশ্চিমে লেখালেখির একাডেমিক পদ্ধতি বর্তমান রূপে দাঁড়াতে বলা যায় হাজার বছর লেগেছে, গোড়া খুঁজতে গেলে প্রাচীন গ্রিস পর্যন্ত যেতে হবে। নইলে এমনিতে অন্তত আড়াইশ বছরের ইতিহাস এটি। কেউ কেউ পদ্ধতি ও দর্শন দাঁড় করিয়েছেন, কেউ শৈলীনির্মাণে অবদান রেখেছেন। এই নিয়মকানুনের শিকড় মূলত দুটো ধারা থেকে এসেছে। একটা হলো যুক্তি ও পদ্ধতির দর্শন (কীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে দাবি প্রতিষ্ঠা করা লাগে)। আরেকটা হলো জ্ঞান কীভাবে সমষ্টিগতভাবে গড়ে ওঠে ও প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পায় তার ইতিহাস। এই পর্বে প্রথমে আমরা দেখব একাডেমিক লেখার যুক্তি ও পদ্ধতির দর্শন, তারপর দ্বিতীয়টা, অর্থাৎ জ্ঞানসৃষ্টির সামষ্টিক প্রয়াস ও প্রাতিষ্ঠানিকতার ব্যাপারটি।
ধরা যাক, এরিস্টটলের ‘পয়েটিক্স’ বইটার কথা। তিনি প্রথমেই বলে নিচ্ছেন তিনি কী কী আলোচনা করবেন, আর্টের সংজ্ঞায়ন করছেন, প্রকার নির্ধারণ করছেন, আর্টের এক ফর্ম আরেক ফর্ম থেকে কীভাবে আলাদা হয় সেই আলোচনা করছেন। ট্র্যাজেডির উপাদান আলোচনা করছেন, উপাদানসমূহের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—প্লট—নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছেন, ভালো ও কার্যকর প্লট কেমন হয় তা বিদ্যমান অপরাপর ট্র্যাজেডি বিশ্লেষণ করে আরোহী পদ্ধতিতে দেখাচ্ছেন। ট্র্যাজেডির সঙ্গে মহাকাব্যের পার্থক্য নির্দেশ করছেন, আবার এই দুই ফর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর হিসেবে ট্র্যাজেডিকে সাব্যস্ত করছেন!
ট্র্যাজেডির কাজ কী এবং সেই কাজ পূর্ণাঙ্গভাবে করতে হলে প্লটের বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, তা-ই বিশ্লেষণ করছেন। অত্যন্ত ধারাবাহিকভাবে যুক্তির ক্রম সাজিয়েছেন, সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেছেন, বিরোধী পক্ষের যুক্তি খণ্ডন করে ট্র্যাজেডির শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সংজ্ঞায়ন, শ্রেণিকরণ, পার্থক্য নিরূপণ, শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়, ঐতিহাসিক সমীক্ষা চালানো, উৎপত্তির বিবিধ উৎস বা পরম্পরা নির্দেশ—এসবই পরবর্তীকালে একাডেমিক লেখালেখির রীতিতে পরিণত হয়েছে।
তাঁর ‘টপিক্স’ গ্রন্থে এরিস্টটল ‘থিসিস’ শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। এর অর্থ স্থাপন করা। এরিস্টটল থিসিস বলতে বোঝান এমন দাবিকে যা নিয়ে তর্ক করা যায়, অর্থাৎ এটা অনেকটাই এখনকার যুগে কথিত কনটেস্টেবল ক্লেইম-এর কাছাকাছি। কোনো সত্য-দাবি থিসিস হয় না, বরং যা কিছুর বিরুদ্ধে বলা যায়, তর্ক করা যায়, তা-ই থিসিস। যেকোনো গবেষণামূলক লেখায় ‘আমি কী জানি’ তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘আমি কী দেখাতে চাই’।
এরিস্টটলের এই যুক্তি-কাঠামো পরবর্তীকালে আরও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির রূপ পায় দেকার্তের হাতে। ১৬৩৭ সালে প্রকাশিত তাঁর Discourse on Method গ্রন্থে দেকার্ত চারটি নিয়মের কথা বলেন, যা যুক্তিবাদী চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করে: প্রথমত, কোনো কিছু সুস্পষ্ট ও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলে কোনো কিছুকে সত্য বলে গ্রহণ না করা। অর্থাৎ সংশয়কে পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা। দ্বিতীয়ত, জটিল যেকোনো সমস্যাকে যতগুলো সম্ভব ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিবেচনা করা; তৃতীয়ত, সবচেয়ে সরল-সহজ ও জানা বিষয় থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে জটিল বিষয়ের দিকে চিন্তাকে পরিচালিত করা। চতুর্থত, পুরো প্রক্রিয়াকে যৌক্তিকভাবে পুন:নিরীক্ষা করা, কোনো কিছু বাদ পড়ল কি-না, কোনো অনুমান ঢুকে পড়ল কি-না।
এই চারটি নিয়ম আজকের গবেষণা-প্রবন্ধের ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করা যায়, সমস্যাকে ভেঙে অংশে ভাগ করার প্র্যাকটিসটাই আজকের ‘মেথড’ সেকশন, সরল থেকে জটিলে যাওয়ার নিয়মটাই লেখার ভেতরের যুক্তিক্রম বা লজিক্যাল ফ্লো, আর সম্পূর্ণতার দাবিটার ভেতরে পাব লিটারেচার রিভিউ-এর মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার প্রসঙ্গটি। আধুনিক গবেষণা-প্রবন্ধের জন্মের পেছনে যুক্তিবাদী দর্শনের ভূমিকা আছে, দেকার্ত সেই দাবির বেশ স্পষ্ট প্রমাণ। তাছাড়াও দৃষ্টবাদী (পজিটিভিস্ট) দর্শনও আধুনিক রিসার্চ আর্টিকেলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যার বিরোধিতার উপর দাঁড়ানো দৃষ্টবাদী দর্শন। এভাবেও বলা যেতে পারে যে, যা কিছু অদৃষ্টবাদী বা অপ্রত্যক্ষবাদী, দৃষ্টবাদের কুঠারাঘাত সেটির বিরুদ্ধে। পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে সত্য জানা যায়—এটা দৃষ্টবাদের প্রধান দাবি।
যাহোক, দেকার্তের সন্দেহবাদী পদ্ধতি থেকেই আমরা যেতে পারি কার্ল পপারের ‘ফলসিফায়েবিলিটি’ বা মিথ্যা-প্রতিপাদনযোগ্যতার নীতিতে, যা যেকোনো রিসার্চ ক্লেইমের ক্ষেত্রে আজ গুরুত্বপূর্ণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। যাতে মিথ্যা বা ভুল প্রতিপাদনের ঝুঁকি থাকে না, তা কোনো গবেষণার দাবি হতে পারে না—তা ধর্ম হয়ে ওঠে, অর্থাৎ যাকে সর্বদাই সত্য-দাবি আকারে হাজির করতে হয়। সুতরাং কনটেস্টেবল ক্লেইমের এই ধারণা সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটল থেকে দেকার্ত হয়ে কার্ল পপার পর্যন্ত, একই যুক্তিবাদী স্রোতে প্রবাহিত। কোনো দাবিকে যাচাইযোগ্য, খণ্ডনযোগ্য ও আন্তর্ব্যক্তিক হতে হয়, যেন একই পদ্ধতি অবলম্বন করে একই ফল বারবার পাওয়া যায়—বিশেষত বৈজ্ঞানিক দাবির ক্ষেত্রে। কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রে একই টেক্সট একই পদ্ধতি ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন লেজিটিমেট পাঠ হাজির করা সম্ভব, অথবা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন দাবি করা যেতে পারে।
এতক্ষণ আমরা যা বললাম তা হলো একক ব্যক্তির যুক্তি-নির্মাণের পদ্ধতি নিয়ে। কিন্তু কোনো গবেষণাই তো একা দাঁড়ায় না। গুগল স্কলারের হোম পেইজে লেখা আছে, ‘Stand on the shoulders of giants’, অর্থাৎ বিজ্ঞদের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াও, তারপর দেখ ও বিবেচনা কর। আইন্সটাইন রবার্ট হুককে লেখা এক চিঠিতে বলেছিলেন: ‘If I have seen further it is by standing on the shoulders of Giants.’ আমি যদি অন্যদের থেকে বেশি দূরে দেখতে পেয়ে থাকি, তবে তা সম্ভব হয়েছে জ্ঞানীদের কাঁধে দাঁড়িয়ে দেখার ফলেই।
যেকোনো গবেষণামূলক লেখা দাঁড়ায় পূর্বতন গবেষণার উপর ভিত্তি করে। ‘আমিই একমাত্র জানি’, ‘আমা থেকেই এটা শুরু’, ‘আমিই একমাত্র বুঝেছি’—এই ধরনের এরোগেন্স গবেষণা-প্রবন্ধে চলে না; আসলে এই আত্মম্ভরিতার কোনো সারবত্তা জ্ঞানের জগতে নেই। গবেষণা-প্রবন্ধের ভেতরে অন্যের স্বীকৃতি থাকে, চিন্তার ধারাবাহিকতা ও পূর্ববর্তী দাবির ভেতরে নিজেকে যুক্ত করে নিজের দুই পয়সা হাজির করার হিউমিলিটি থাকে। এই জন্যে একাডেমিক লেখায় সাইটেশন বা রেফারেন্স লাগে। রেফারেন্স/সাইটেশন নিজে জ্ঞান না হলেও একাডেমিক হিউমিলিটি ও নর্ম; সাইট বা উদ্ধৃত করা মানে নিজের মতটাকে উটকো বা বিচ্ছিন্ন না দেখিয়ে একটা ‘ইলমি সিলসিলা’র অংশ হিসেবে দেখানো; আর বিশুদ্ধ ‘নিজের কথা’ বলে আসলে কিছু নেই—যা থাকে তা হলো অপরের সঙ্গে নিজেকে সংলাপে সংযুক্ত করে গড়ে ওঠা ভাবনাকে যথাযথভাবে আর্টিকুলেট করা।
এই একই কথা টমাস কুন বলেছেন অন্যভাবে। শূন্য থেকে গবেষণা শুরু হয় না, যেকোনো গবেষককে একটা প্যারাডাইমের ভেতরে কাজ করতে হয়, যাকে বলে ‘নর্মাল সায়েন্স’। প্যারাডাইমের রথী-মহারথী থাকেন, ডমিন্যান্ট চিন্তা থাকে, সেগুলোকে মান্য করেই প্যারাডাইমের বিবিধ জ্ঞানগত পাজল সমাধান করতে হয়। আবার সেই নির্দিষ্ট প্যারাডাইম যদি অধিকাংশ সমস্যা সমাধানে আর সমর্থ না হয়, বা এমন অমোচনীয় গ্যাপ থেকে যায় যা আর পূরণ করা যায় না, তখন নতুন প্যারাডাইমের জন্ম হয়—যাকে কুন বলেন ‘প্যারাডাইম শিফট’। আর কেনেথ বার্ক একই ভাবনাটা রূপ দিয়েছেন একটা রূপক ব্যবহার করে: রিসার্চ হচ্ছে একটা চলমান আড্ডার মতো। কেউ আড্ডায় যুক্ত হতে চাইলে আগে আড্ডার প্রতিপাদ্য জেনে তারপর অংশ নিতে হয়।
পূর্বতন জ্ঞানীব্যক্তিদের কাঁধে দাঁড়ানো, প্যারাডাইমের ভেতরে কাজ করা, আর আড্ডায় যোগ দেওয়া—এই তিনটা রূপকই আসলে একই সত্যকে নির্দেশ করে: জ্ঞান কখনো শূন্য থেকে তৈরি হয় না, বরং একটা চলমান কথোপকথনের অংশ হিসেবে তৈরি হয়। গবেষণা-আর্টিকেল তাই একটা তর্ক-বিতর্ক ও সংলাপের ভেতরে প্রবেশ করা—তারা এই এই বলেছে, আমি এই এই বলছি। গ্রাফ ও বার্কেনস্টাইনের They Say/I Say বইটিতে এ নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আছে।
এই সমষ্টিগত জ্ঞাননির্মাণ কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল, তার একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে রবার্ট বয়েল। বিজ্ঞানীদের মধ্যে আদান-প্রদান ও গবেষণা-সংস্কৃতি তৈরির জন্যে ১৬৬০ সালে রয়্যাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এই সোসাইটির মূল বক্তব্য ছিল ‘নুল্লিয়ুস ইন ভার্বা’—অর্থাৎ মুখের কথায় বিশ্বাস নেই, প্রমাণ দেখাও। রয়্যাল সোসাইটির বৈজ্ঞানিক জার্নাল লেখার রীতি আধুনিক রিসার্চ-আর্টিকেলের কাঠামো ও দর্শন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। বিংশ শতকের প্রথম দিকে IMRaD অর্থাৎ Introduction, Method, Results and Discussion—এই কাঠামোয় একাডেমিক লেখালেখি চালু হয়, বিশেষত বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক লেখায়। খেয়াল করার বিষয়, এই কাঠামোর ‘মেথড’ অংশটা দেকার্তের সেই কোন বিষয় বা সমস্যাকে ভেঙে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেখবার যে নিয়ম, তারই একরকম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সংযোজন হলো জন সোয়ালেসের কাজ। একাডেমিক রাইটিংয়ের পদ্ধতি নির্মাণে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি; তাঁর মডেলকে বলা হয় CARS মডেল, অর্থাৎ Creating a Research Space। এখানে তিনি তিনটি ‘মুভ’-এর কথা বলেন। গবেষণার এলাকার গুরুত্ব বা কেন্দ্রিকতা প্রতিষ্ঠা করা, নলেজ গ্যাপ বা ফাঁক চিহ্নিত করা, এবং সেই ফাঁক পূরণ করা। বলা যেতে পারে, ‘বিজ্ঞদের কাঁধে দাঁড়ানো’ ও ‘আড্ডায় যোগ দেওয়া’র যে দার্শনিক ধারণা কেনেথ বার্ক ও অন্যরা দিয়েছেন, সোয়ালেস সেটাকেই একটা বাস্তবিক ও ধাপে-ধাপে অনুসরণযোগ্য মডেলে রূপান্তরিত করেছেন।
একটি সাধারণ প্রবন্ধ বা লেখা অনেকটা মিউজিয়ামের মতো। সেখানে আমরা বিভিন্ন তাত্ত্বিক, তাঁদের মতবাদ ও সমালোচনাগুলাকে নাম ও ট্যাগ দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখি, যাতে পাঠক দেখেন কে কবে কী বলছেন। কিন্তু একটা ভালো মানের আর্টিকেল বা রিসার্চ পেপার কোনো মিউজিয়াম না। এটাকে বরং তুলনা করা যায় একটা প্রাণবন্ত কোর্টরুমের সাথে। লেখক এই কোর্টরুমের বিচারক। নানা তত্ত্ব ও কেতাবাদি হলো তার ‘সাক্ষী’, বিচারকের যেমন সাক্ষী লাগে।
উঁচু মানের জার্নাল-আর্টিকেল লেখক খালি সাক্ষীদের পরিচয় করিয়ে দেন না; তাঁর কাজ হলো, সাক্ষীদের প্রত্যেককে জেরা করা, তাদের বক্তব্যের সততা ও দুর্বলতা খতিয়ে দেখা, এক সাক্ষীকে আরেক সাক্ষীর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে সংলাপ তৈরি করা, এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত সাক্ষ্য-সাবুদ ও যুক্তি-তর্কের ভিত্তিতে নিজস্ব একটা রায় বা উপসংহার হাজির করা। মিউজিয়ামের যে কিউরেটর, সে কখনও রায় দেয় না, কেবল জিনিসপত্র সংরক্ষণ আর প্রদর্শন করে। কিন্তু আদালতের বিচারক রায় দেন। তো, একটা ভালো আর্টিকেলের অথার হচ্ছেন ওই আদালতের বিচারকের মতোন। মানে, ভালো আর্টিকেল মিউজিয়াম বা তথ্যের গুদামঘর না, একটা ইন্টেলেকচুয়াল সালিশি আর কি! আদালতের বিচারকের মতো তার কাজ৷
এই পর্ব শেষ করতে পারি সেখানে, যেখানে শুরু হয়েছিল, অর্থাৎ এরিস্টটলের কাছে ফিরে। যে দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে লেখা হচ্ছে, তার ভূমিকায়, উপসংহারে ও মূল অংশে সেই যুক্তি ও দাবিকে পুনরাবৃত্তি করতে হয়। যুক্তিক্রমের প্রবাহ বজায় রাখার জন্যে এই রিপিটিশন জরুরি; একই সঙ্গে প্রাচীন রেটরিক অনুসারে পাঠক-শ্রোতাকে বোঝাতে ও লেখার সঙ্গে সংলগ্ন রাখতে এই পুনরাবৃত্তি কাজে দেয়। এরিস্টটল বক্তৃতার কার্যকারিতার জন্যে Ethos, Pathos ও Logos-এর কথা বলেছিলেন। একাডেমিক লেখায় পাঠককে লেখকের খনন ও উন্মোচন প্রক্রিয়ায় সঙ্গী করতে পুনরাবৃত্তি ও স্মরণ-করানো একটা গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইস, ঠিক যেমন এরিস্টটল নিজেই তাঁর যুক্তি বারবার ফিরিয়ে এনে পাঠককে সাথে করে আগান, তাঁর ‘পোয়েটিক্স’ গ্রন্থে।
এই লেখায় মূলত সংক্ষেপে একাডেমিক লেখার ভিত্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করেছি আমরা। অর্থাৎ কোথা থেকে এই রীতিনীতিগুলো এল, কোন দার্শনিক পরম্পরা তাদেরকে গঠন করেছে—তা। কিন্তু এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়, যেগুলো নিয়ে সিরিজের পরের পর্বগুলোতে আলাপ করার ইচ্ছা আছে। যেমন, একাডেমিক লেখা আসলে কোন অর্থে ‘সত্য’ দাবি করে, আর সত্য-দাবি ও যুক্তি-দাবির ভেতরের পার্থক্যটা কোথায়। ক্রিটিক বলতে ঠিক কী বোঝায়—দোষ ধরা, নাকি অন্তর্নিহিত অনুমানকে উন্মোচন করা। রেফারেন্স বা সাইটেশন কেন শুধুই ফরম্যালিটি না, বরং একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক দায়বদ্ধতা। আর একাডেমিক লেখারও যে বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে—বর্ণনামূলক, পুনঃপাঠ ও সৃজনমূলক, জ্ঞানসৃষ্টিমূলক—সেই ভাগগুলো কীসের ভিত্তিতে দাঁড়ায়, সেগুলোও আলোচনার দরকার হবে। এরপর ধীরে ধীরে তত্ত্ব থেকে প্রয়োগের দিকে যাওয়া যাবে—থিসিস ও ক্লেইম কীভাবে লিখতে হয়, নলেজ গ্যাপ বা প্রব্লেমেটাইজেশন কী, লিটারেচার রিভিউ কীভাবে একটা আড্ডায় অংশ নেওয়ার মতো করে লেখা যায়, IMRaD-এর মতো কাঠামো বাস্তবে কীভাবে ব্যবহার করা হয়, এবং যুক্তি নির্মাণ ও রেটরিকের হাতিয়ারগুলো কী।
সবশেষে আমরা দুই-তিনটি উন্নত মানের আর্টিকেল নিয়ে আলোচনা করব, তাদের গড়ন-গঠন বুঝে নিতে চেষ্টা করব। আমাদের এই সিরিজের প্রচেষ্টা থাকবে ধাপে ধাপে, পর্বে পর্বে আগোনো।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক
.png)

কালজয়ী কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের জীবদ্দশার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি তাঁর সন্তানদের মানসপটে নেই। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর কারণে তাঁদের কারও স্মৃতিতেই বাবার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে বাবার রক্ত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে পথ চলছেন তাঁর সন্তানেরা।
১৯ আগস্ট ২০২৬
চলচ্চিত্রের জন্ম মুহূর্তে সে নির্বাক ছিল। ছবির পর ছবি তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যেত, কিন্তু ওরা কথা বলত না। কথা না বললেও বিভিন্ন অভিব্যক্তির মাধ্যমে নির্বাক ছবি সবাক হয়ে ধরা দিত দর্শকের মনে। তারপর ছবিতে ধ্বনি এলো, শব্দ এলো, সংলাপ এলো। ছায়াছবিতে সংলাপের সংযোজনের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্প তার বনে
