
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার রূপনগর গ্রামের সোনিয়া আক্তার তাঁর ১০ মাস বয়সী মেয়ে ফাতিমার মৃত্যুর বর্ণনা দিচ্ছিলেন। এতবার তাঁকে এই ঘটনার কথা বলতে হয়েছে যে, নতুন করে কাঁদার মতো আর কোনো জল তাঁর চোখে অবশিষ্ট নেই।
গত মার্চ মাসে ১০ মাস বয়সী ফাতিমা অসুস্থ হয়ে পড়লে সোনিয়া প্রথমে তাকে গ্রামের এক পল্লিচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া হয়।
শেষমেশ তিনি মেয়েকে নিয়ে ছোটেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসকেরা জানান, ফাতিমা হামে আক্রান্ত। তাকে দ্রুত পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ বা শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ভর্তি করা প্রয়োজন। কিন্তু সে সময় আইসিইউতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। নিবিড় পরিচর্যার অপেক্ষায় থাকা শিশুদের তালিকায় তাঁর মেয়ের অবস্থান ছিল ৪৪ নম্বরে। বাধ্য হয়েই তাঁদের অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়।
৩০ মার্চ মারা যায় ফাতিমা। এর তিন দিন পর হাসপাতাল থেকে এই শোকাহত মাকে ফোন করে জানানো হয়, আইসিইউতে একটি শয্যা খালি হয়েছে।
দেশজুড়ে মৃত্যুর খতিয়ান
বাংলাদেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত এবং এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আজ এক হাজার ছাড়িয়েছে। হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। রোগীর বিশাল চাপে স্বাস্থ্যকর্মীরা দিশাহারা, যাদের বেশির ভাগই আবার ছোট শিশু।
এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৮৬ হাজারেরও বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার আক্রান্ত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়। ২০ হাজার নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত।
এই পরিস্থিতি এমন একটি দেশে ঘটছে, মাত্র ছয় বছর আগেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যাকে টিকাদানে সাফল্যের রোলমডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ৯০ শতাংশের ওপর টিকাদানের হার নিয়ে চলতি বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে হাম নির্মূল হওয়ার কথা ছিল। তার বদলে টিকার সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশটি এখন অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশের ন্যাশনাল পোলিও, মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা ল্যাবরেটরি, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি), বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে স্বাধীনভাবে একই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে: এই প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ‘বি৩ জেনোটাইপ’। এটি হামের এমন একটি ধরন যা বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশেই রয়েছে, বিদেশ থেকে আসেনি।
সরবরাহ ব্যবস্থা ধসের নেপথ্যে
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি তাদের নিয়মিত টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। এজন্য বছরে প্রায় ৭ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করা হতো। শিশুদের ৯টি অতিপ্রয়োজনীয় টিকার দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংস্থাটির বৈশ্বিক ক্রয়ক্ষমতা ও লজিস্টিক নেটওয়ার্কের ওপরই নির্ভর করত দেশ।
সবদিক থেকেই এই ব্যবস্থা বেশ কার্যকর ছিল। এরপর ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বচ্ছতার কথা বলে বাজারভিত্তিক সংস্কারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উদ্যোগ নেয়।
এটি ছিল খরচ কমানোরও একটি চেষ্টা। ইউনিসেফের ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ সারচার্জ (১২ শতাংশ পরিবহন ফি এবং ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সার্ভিস ফি) এড়াতে সরকার সরাসরি উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি ব্যবহারের পথে হাঁটে।
এর অর্থ হলো, দেশের মোট টিকার চাহিদার প্রায় অর্ধেকের ক্ষেত্রে ইউনিসেফের সরাসরি সরবরাহ ব্যবস্থা বাতিল করা। দরপত্র প্রক্রিয়ার কারণে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে।
নতুন এই অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ৬০৯ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে আলোচনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি মাস পেরিয়ে যায়। অথচ সে সময় দেশের নিজস্ব রিজার্ভ কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলেও তা ব্যবহার করা হয়নি।
২০২৪ সালের আগস্টে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন রানা ফ্লাওয়ার্স। ২০২৬ সালের ২১ মে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সাল থেকেই আমরা সরকারকে সতর্ক করে আসছিলাম যে টিকার এই ঘাটতি বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ডেকে আনতে পারে। ২০২৪ থেকে ২০২৫ এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমরা চিঠি দিয়েছি, অন্তত ১০টি আলাদা বৈঠক করে জানিয়েছি যে এটি একটি বড় সমস্যা। তাই দ্রুত টিকার কার্যাদেশ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তারা তা করেনি।’
কোথায় ভুল ছিল, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তহবিল দেওয়া হয়েছিল... কিন্তু কীভাবে টিকা কেনা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েই বিলম্বটা হয়েছে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগে, ২০২৫ সালের আগস্টে ইউনিসেফের উপনির্বাহী পরিচালক টেড চাইবানও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সরাসরি একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন।
টানা ১৩ মাসের এই শূন্যতার ফলে টিকার সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। এর পাশাপাশি অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের হামে মৃত্যু ঠেকাতে অত্যন্ত জরুরি ‘ভিটামিন এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোও এর সঙ্গে থমকে যায়।
এর ফলে দেশজুড়ে বস্তি, শরণার্থীশিবির ও বিভিন্ন জেলায় এমন এক বিপুল ও অদৃশ্যমান ‘জিরো-ডোজ’ (এক ডোজ টিকাও পায়নি এমন) শিশুর সংখ্যা নীরবে বাড়তে থাকে। এই শিশুরা কোনো রকম সুরক্ষাই পায়নি।
সরবরাহ ব্যবস্থার এই ধস ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। নয় মাস বয়সে টিকাদানের আগে শিশুরা মাতৃগর্ভ ও বুকের দুধ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভর করে। নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে পাওয়া ‘হার্ড ইমিউনিটি’ (গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা) থেকে বঞ্চিত হয়ে এই অরক্ষিত শিশুরা সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান ২০২৬ সালের মে মাসে একটি লিখিত প্রতিবাদলিপি দেন। সেখানে তিনি যুক্তি দেন যে ইউনিসেফের চিঠিতে কখনোই ‘হামের প্রাদুর্ভাব’ কথাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। উল্টো বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালুর ক্ষেত্রে গ্যাভির মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের বিলম্বের দিকে আঙুল তোলেন তিনি।
তাঁর দাবি ছিল, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের পরিসংখ্যানে এমন কোনো আসন্ন জরুরি অবস্থার আভাস ছিল না।
সরকারের কাঁধে বেসামাল পরিস্থিতি
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি যখন সরকার গঠন করে, তখন দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
নতুন প্রশাসন কাগজপত্রে বেশ তৎপরতা দেখায়। ফাতিমা যেদিন মারা যায়, ঠিক সেই দিনই (৩০ মার্চ) দেশব্যাপী জরুরি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ৫ এপ্রিল ইউনিসেফের সহায়তায় একটি জরুরি গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আওতায় শেষ পর্যন্ত ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
তবে কাগজপত্রের এই তৎপরতা বাস্তবে খুব একটা কাজে আসেনি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ শংকর কে বিশ্বাস সংবাদমাধ্যম স্ট্রিম-এর কাছে তাঁদের কর্মীদের মরিয়া পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, আগে থেকেই রোগীতে ঠাসা পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে বাধ্য হয়ে অস্থায়ী শয্যা যুক্ত করতে হচ্ছিল। আইসোলেশনের জায়গার অভাবে চরম সংক্রামক হামের রোগীরা কীভাবে সাধারণ শিশু ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ছিল তা চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় ছিল না।
রামেক হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের ভেতরকার ঢিলেঢালা অবস্থার তদন্ত এই ব্যর্থতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ‘আইসোলেশন’ বা বিচ্ছিন্নকরণ কেবল দরজায় লেখা একটি শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এর কোনো বাস্তব প্রয়োগ ছিল না।
দর্শনার্থীরা মাস্ক বা প্রাথমিক জৈবনিরাপত্তার তোয়াক্কা না করেই অবাধে ওই ওয়ার্ডে যাতায়াত করতেন। তাঁদের শরীর বাহক হয়ে ভাইরাসটিকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর জন্য তৈরি করা একটি ওয়ার্ড রোগ বিস্তারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
এই সংকটের প্রশাসনিক দিক সামলাতে ঢাকাও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি।
২০২৬ সালের ১৯ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হান জনসমক্ষে এক অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতে বাধ্য হন। তিনি জানান, হাসপাতালগুলোর তথ্য সংরক্ষণে বড় ধরনের দ্বৈতনীতির (একই তথ্য বারবার আসা) কারণে রাতারাতি দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৮৪৬ থেকে কমিয়ে ৫৪ হাজার ৯১১ করতে হয়েছে।
চলমান এই মহামারির একটি পর্যায়ে লড়াইরত সরকার মুমূর্ষু বা মৃতদের সঠিক হিসাবটুকুও রাখতে পারেনি। আর সুনির্দিষ্টভাবে সম্পদ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি তো বহুদূর।
রাষ্ট্রের জবাবদিহির অভাব সৃষ্ট এই শূন্যতায় শিকড় গেড়েছে ভিন্ন ধরনের এক ক্ষতি। আর তা হচ্ছে সামাজিক বিভাজন।
আমলাতান্ত্রিক অবহেলার পাশাপাশি ফাতিমার মতো শোকাহত পরিবারগুলোকে একধরনের সামাজিক নির্বাসনেরও শিকার হতে হয়েছে।
রাজশাহীর অনেক বাসিন্দা এই প্রাদুর্ভাবকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে আসা ‘বহিরাগতদের’ বয়ে আনা অভিশাপ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এই মনগড়া গল্প টিকা সংগ্রহের ব্যর্থতা আর হাসপাতালে লম্বা লাইনের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে গিয়ে এমন পরিবারগুলোর কাঁধে দায় চাপাচ্ছে, যারা সরাসরি এই অকার্যকর ব্যবস্থারই শিকার।
ফাতিমা কোনো অভিশাপের কারণে মারা যায়নি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরের কোনো অপ্রতিরোধ্য বা নতুন মহামারিতেও তার মৃত্যু হয়নি। তার মৃত্যুর পেছনে ছিল কিছু সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট, শনাক্তযোগ্য এবং পুরোপুরি মানবসৃষ্ট। উন্নয়ন ঋণে বিলম্ব করা হয়েছে। সার্ভিস ফি বাঁচানোর চেষ্টা আর জাতিসংঘের একটি সংস্থাকে বকেয়া বিল পরিশোধ না করা এতে ইন্ধন জুগিয়েছে। আর সেই সংস্থারই বিল পরিশোধে বিলম্ব করা হলো, যেটি দেড় বছর ধরে বারবার সতর্ক করার পরও কেউ কানে তোলেনি।
.png)
-028855-256x144.webp)





