
একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠলেন, অন্য সব দিনের মতো হয়তো চা খেলেন, পরিবারের সঙ্গে কথা বললেন, কাজে গেলেন। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না তিনি মনের ভেতর থেকে কতটা ভেঙে পড়েছেন। এরপর কাউকে কিছু না বলে দিন শেষে তিনি পাড়ি দিলেন না ফেরার দেশে। এমন অসংখ্য আত্মহত্যার গল্প বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিয়মিত ঘটনা হয়ে গেছে।
কেউ হারাচ্ছে তার পরিবারের স্বজন, কেউ হারাচ্ছে বন্ধু। কেউ বা তার প্রিয়জনকে। তবে আত্মহত্যার বৈশ্বিক চিত্র বলছে, আত্মহত্যা শুধু ব্যক্তিগত সংকটের গল্প নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমাজ, অর্থনীতি, মানসিক স্বাস্থ্য, সহিংসতা, বৈষম্য এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ হিসাবে, বছরে ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯৭০ জন; প্রতি ঘণ্টায় যা প্রায় ৮২ জন। ২০২১ সালে আনুমানিক ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যায় মারা গেছেন। বিশ্বে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও আত্মহত্যা।
কোন দেশে আত্মহত্যার হার বেশি
আত্মহত্যায় ঘটা মৃত্যুর প্রায় ৭৩ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে। আত্মহত্যা শুধু ধনী দেশগুলোর সমস্যা নয়, বরং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও সহজে সহায়তা না পাওয়ার বাস্তবতা অনেক দেশের ঝুঁকি বাড়ায়।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের (আইএইচএমই) গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের হিসাব অনুযায়ী, বয়স-সমন্বিত আত্মহত্যার হারে শীর্ষে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড—প্রতি লাখে প্রায় ৭৪ জন। এরপর রয়েছে সুরিনাম—২৭ দশমিক ১ জন, গায়ানায় ২৫ দশমিক ২ জন এবং লেসোথো ২৩ দশমিক ৬ জন। দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়াতেও এই হার প্রতি লাখে ১৯ দশমিক ৬ জন।
অন্যদিকে মোট সংখ্যার হিসাবে বড় জনসংখ্যার দেশগুলো স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে। ২০২৩ সালে ভারতে আনুমানিক ২ লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান, চীনে প্রায় ৯৬ হাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫১ হাজার।
যুদ্ধ-সংঘাত-অস্থিরতা কি আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়ায়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক দেশের মানুষ অকল্পনীয় মৃত্যু, ধ্বংস ও আতঙ্কের মধ্যে বাস করলেও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধ চলাকালে আত্মহত্যার হার বরং কমেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৪৪–৪৫ সালে) সেনাদের আত্মহত্যার হার ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন ছিল। তখন সেনাদের আত্মহত্যার হার প্রতি লাখে প্রায় ৫ জনে নেমে এসেছিল।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যুদ্ধের মতো জাতীয় সংকটে মানুষ অনেক সময় বৃহত্তর একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে বেশি সংযুক্ত হয়ে পড়ে। পরিবার, সহযোদ্ধা, প্রতিবেশী ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সেই সংযোগ ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি কমাতে পারে। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের চিত্র দেখায়। ২০২০ সালে পাবলিক লাইব্রেরি অব সায়েন্সে (পিএলওএস) প্রকাশিত তাকাশি আইডার এক গবেষণায় দেখা যায়, যুদ্ধের সময়ে শ্রীলঙ্কার সংঘাতপূর্ণ জেলাগুলোতে আত্মহত্যার হার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৩ থেকে ৫২ শতাংশ কমে গিয়েছিল। গবেষকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে এসব এলাকায় প্রতি লাখে গড়ে ২৭ দশমিক ৫ জন আত্মহত্যা করতেন, যুদ্ধের সময়ে সেই হার ১১ দশমিক ৮ থেকে ১৪ দশমিক ৪ জনে নেমে আসে।
তবে যুদ্ধ শেষ হলেই ঝুঁকি শেষ হয় না। জাপানের ইতিহাসে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আত্মহত্যার হার ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। সুইসাইড ইন জাপান: সোসিওইকোনমিক ইফেক্টস অন ইটস স্যেকুলার অ্যান্ড সিজনাল ট্রেন্ডস গবেষণায় যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে এই প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল।
৯/১১ এর পর কী হয়েছিল
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ারের সন্ত্রাসী হামলা ইতিহাসে নাইন/ইলেভেন বলে পরিচিত। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যা দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে বদলেছিল, তা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। তবে নেদারল্যান্ডসে পরিচালিত দ্য ইফেক্ট অব দ্য সেপ্টেম্বর ইলেভেন টেররিস্ট অ্যাটাকস অন সুইসাইড অ্যান্ড ডিলিবারেট সেল্ফ-হার্ম: আ টাইম ট্রেন্ড স্টাডি গবেষণায় ৯/১১ এর পরের প্রথম কয়েক সপ্তাহে আত্মহত্যা ও আত্মক্ষতির হার বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষকেরা এর সঙ্গে গণমাধ্যমে সহিংসতার ব্যাপক প্রচার ও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কের কথা বলেছেন।
৯/১১-এর প্রভাব সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ীভাবে দেখা গেছে হামলায় প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কিছু মানুষের মধ্যে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ রেজিস্ট্রির একটি গবেষণায় উদ্ধার ও পুনরুদ্ধারের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পরবর্তী বছরগুলোতে আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে আশঙ্কার কথা উঠে এসেছিল।
করোনা কি আত্মহত্যার ঢেউ তৈরি করেছিল
২০২০ সালে যখন পৃথিবী থেমে গেল, তখন আশঙ্কা ছিল লকডাউন, চাকরি হারানো, ব্যবসা বন্ধ, বিচ্ছিন্নতা ও ভয় আত্মহত্যার হার বাড়িয়ে দেবে।
কিন্তু বৈশ্বিক গবেষণার ফল কিছুটা ভিন্ন। ৩৩টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য ল্যাংসেটের একটি গবেষণায় দেখা যায়, মহামারির প্রথম ৯-১৫ মাসে সামগ্রিকভাবে আশঙ্কার চেয়ে আত্মহত্যার হার কম ছিল।
আত্মহত্যা কম হলেও যে করোনায় মানসিক সংকট ছিল না তা বলা যাবে না। কিছু দেশ ও জনগোষ্ঠীতে আত্মহত্যা বা আত্মক্ষতির প্রবণতা বেড়েছিল। বিশেষ করে জাপানে ২০২০ সালের মাঝামাঝি থেকে কিছু সময়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়। তরুণদের আত্মঘাতী আচরণ নিয়েও বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগজনক প্রবণতা পাওয়া গেছে।
করোনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে বৈশ্বিক সংকট মানেই সব দেশে একইভাবে আত্মহত্যা বাড়বে, এমন নয়। মানুষের সামাজিক বন্ধন, সরকারি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও মানসিক সহায়তার সুযোগের ওপরও ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে।
মানুষ কেন আত্মহত্যা করতে চায়
আত্মহত্যার একাধিক কারণ রয়েছে। তবে ডব্লিউএইচও বলছে, আত্মহত্যা সাধারণত সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জৈবিক, মানসিক ও পরিবেশগত নানা কারণের সম্মিলিত ফল। পাশাপাশি বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, ঋণের বোঝা, সম্পর্কের ভাঙন, সহিংসতা, নির্যাতন, বৈষম্য, একাকিত্ব এবং বড় ধরনের ক্ষতি আত্মহত্যার দিকে মানুষকে ধাবিত করে। অনেক সময় নেশা ও অ্যালকোহল মিশ্রিত ঔষধও মানুষকে আত্মহত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
আত্মহত্যাকে শুধু ব্যর্থতার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। অনেক সময় এটি এমন এক মুহূর্তের ফলাফল যখন একজন মানুষ নিজের কষ্ট থেকে বের হওয়ার অন্য কোনো পথ খুঁজে পান না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, সংকটের সময়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার উপায়গুলো সহজ করলে মানুষ আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরে আসতে পারে। তবে এর জন্য শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবার, বন্ধু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্র সবাইকে এই প্রতিরোধব্যবস্থার অংশ নিতে হবে।
.png)
-028855-256x144.webp)







