রাষ্ট্রের জন্ম মানচিত্রে, জাতির জন্ম ভাষায়। বাংলা ভাষার ইতিহাস কেবল ব্যাকরণ, ধ্বনি বা সাহিত্যিক বিবর্তনের ঘুমপাড়ানি গল্প নয়, এটি একটি জাতির চেতনা, প্রতিরোধ এবং সার্বভৌমত্বের স্থাপত্য নির্মাণের ইতিহাস। বাংলা ভাষা, চর্যাপদের গুপ্ত সাধনভাষা থেকে শুরু করে বায়ান্নর রক্ত, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং আজকের জেন-জি ও ডিজিটাল প্রজন্মের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধের সংগ্রাম। বাংলা ভাষা একটি মৌলিক ‘জাতীয় শক্তির উপাদান হিসাবে’ ক্রমাগত রূপান্তরিত হয়েছে।
ইতিহাস কখনো কখনো এমন মুহূর্ত সৃষ্টি করে, যা তখনকার মানুষ হয়তো বুঝতে পারেনি, কিন্তু ভবিষ্যৎ শতাব্দী, আগামীর প্রজন্ম সেই মুহূর্তগুলোকে জাতির জন্মলগ্ন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে, অনেক মনীষীর মতে, সেই মুহূর্তের নাম চর্যাপদ। বাইরের চোখে এটি হয়তো আধ্যাত্মিক সাধনার গান বা গুপ্ত বিদ্যার নিদর্শন, কিন্তু ইতিহাসের গভীর কিন্তু নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি ছিল বাংলা ভাষাভাষীর জাতিসত্তার নীরব বীজ রোপণ।
চর্যাপদকে প্রায় ৮ম থেকে ১০ম শতাব্দীতে রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম দলিল বলে গণ্য করা হয়। এ কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার গান নয়, বরং সেই সময়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আঞ্চলিক সংস্কৃতি, কৃষি, নদী এবং সামাজিক সম্পর্কের জীবন্ত প্রতিফলন। চর্যাপদে ব্যবহৃত ভাষা ছিল আদি বা মধ্যযুগীয় বাংলা, যা রাষ্ট্রের গঠনের আগে মানুষের অন্তর্গত অভিজ্ঞতা ও চেতনার ভাষা হিসেবে জন্ম নিয়েছিল। এই সাহিত্যকর্ম প্রমাণ করে যে, ভাষা তখনও মানুষের সংস্কৃতি, চিন্তা ও আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি ছিল, যা পরবর্তী শতাব্দীতে বাংলা জাতির সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চর্যাপদ রচনাকারীরা কোনো রাষ্ট্র গঠন বা ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য নিয়ে বসেছিলেন এমন কোনো তথ্য জানা যায় না। তারা কোনো পতাকা ওড়াননি, তবু তারা এমন ভাষায় কথা বলেছিলেন যা মানুষের ভেতরে এক অভিন্ন আবেগ তৈরি করে। এটাই বাংলা ভাষার ইতিহাসের প্রথম মহাসত্য: ‘রাষ্ট্র ভাষা তৈরি করে না; ভাষা রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত তৈরি করে।’
ভাষা রাষ্ট্রের আগে কেন
রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক কাঠামো; এর সীমানা বদলায়, শাসক পরিবর্তন হয়। কিন্তু ভাষা মানুষের মগজে মননে চেতনায় বাস করে। মানুষ যেভাবে স্বপ্ন দেখে, ঘুম থেকে উঠে চিন্তা করে, ভালোবাসে, দুঃখ পায়, সেই অভ্যন্তরীণ জগত নিজের মাতৃভাষায় তৈরি হয়।
চর্যাপদের সময় ‘বাংলা রাষ্ট্র’ বলতে কোনো একক রাজনৈতিক সত্তা ছিল না। ছিল বিচ্ছিন্ন জনপদ, নানা শাসক, বিচ্ছিন্ন সমাজ। কিন্তু চর্যাপদের শব্দভাণ্ডারে উঠে আসে—নদী, নৌকা, কৃষিজীবন, গ্রামীণ অভিজ্ঞতা। এ সকল শব্দচয়ন যা দেখায়, তা হলো, এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবনযাপনে অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল। ভাষা তাই হয়ে ওঠে মানুষের অভ্যন্তরীণ মিলের, ভাব আদান-প্রদানের বা প্রকাশের মাধ্যম। অর্থাৎ ভাষা মানুষের মধ্যে সামষ্টিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা একসময় কৃষ্টি-কালচারে রূপান্তরিত হয়ে পরবর্তীতে রাজনৈতিক রূপ পায়।
চর্যাপদ: গুপ্ত সাধনা ও প্রকাশ্য বাস্তবতা
অনেকে চর্যাপদকে সাধারণভাবে আধ্যাত্মিক ও রহস্যময় গান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। আবার অনেকের মতে, এর মধ্যে তন্ত্র, সহজিয়া দর্শন ও গভীর আধ্যাত্মিকতা আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আধ্যাত্মিক ভাষার ভেতরও উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্প। চর্যাপদে মানব জীবনের সহজ এই উপাদানগুলি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়—নদী ও নৌকা, কৃষিকাজ ও জমির চাষ, পাখি, বন, প্রকৃতি, গ্রামীণ উপমা ইত্যাদি।
এই উপাদানগুলো কেবল রূপক নয়; এগুলো হলো বাংলা ভাষাভাষী ভূখণ্ডের মানুষের সুখ দুঃখের জীবন্ত চিত্র, যা কাল্পনিক বা সাহিত্যিক রূপক নয়, প্রত্যক্ষ বাস্তব। শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে চর্যাপদ প্রমাণ করেছে, আধ্যাত্মিক সাধনা ও দৈনন্দিন জীবন একই ভাষায় মিলিত হতে পারে। তাই চর্যা কোনো দরবারি, প্রাসাদীয় বা অভিজাত ভাষা নয়, হয়ে উঠেছিল ‘মাটি ও মানুষের ভাষা।’
ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের মানচিত্র
একটি প্রশ্ন দিয়ে জাতীয় পরিচয় শুরু হয়—‘আমরা কারা?’ সেই প্রশ্নের প্রথম উত্তর দেয় আমাদের ভাষা। কারণ আমাদের হাসি-কান্না-ভালোবাসার শব্দ কেমন হবে, কী হবে, কেন হবে, ভাষা তা আমাদের প্রকাশ করতে শেখায়।
চর্যাপদের ভাষায় যে শব্দভাণ্ডার ও বাক্যগঠন ব্যবহৃত হয়েছে, তা আধুনিক বাংলার প্রাচীনতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এই ভাষার শিকড় নিহিত ছিল প্রাচীন প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ধারায়, যার সঙ্গে সংস্কৃতের ধ্বনি, শব্দ ও ব্যাকরণগত প্রভাব গভীরভাবে মিশে ছিল। বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের আধ্যাত্মিক ভাবনা যে ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, তা ছিল আঞ্চলিক কথ্যরীতির সঙ্গে সংস্কৃত-উৎপন্ন শব্দভাণ্ডারের এক সৃজনশীল সমন্বয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বাংলার শব্দভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ হয় আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার সংস্পর্শে—বিশেষত প্রশাসন, দর্শন, আধ্যাত্মিকতা ও সাহিত্যক্ষেত্রে। মধ্যযুগীয় বাণিজ্য ও ঔপনিবেশিক যোগাযোগের সূত্রে পর্তুগিজ, পরে ইংরেজি ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাও বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। এভাবে চর্যাপদের প্রাথমিক ভাষা ছিল এক উন্মুক্ত ও গ্রহণক্ষম ভিত্তি, যা বহুভাষিক প্রভাবকে আত্মস্থ করে ক্রমে পরিণত ও প্রসারিত হয়েছে।
হাজার বছর আগে যে চিন্তাধারার সূচনা হয়েছিল, তা আজও আমাদের ভাষায় জীবন্ত—শুধু শব্দে নয়, মানসে। এটিকে আমরা একটি মানসিক মানচিত্র বলতে পারি, যেখানে অঞ্চল, প্রকৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকজ জীবনধারা এবং বহির্বিশ্বের প্রভাব একত্রে গাঁথা হয়েছে। এই সৃজিত ও সূচিত মানচিত্রের ওপরই পরবর্তী শতাব্দীতে গড়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক রীতি এবং শেষপর্যন্ত জাতীয় চেতনার সুদৃঢ় ভিত্তি। অর্থাৎ চর্যাপদ কেবল ভাষার প্রাচীন নিদর্শন নয়; এটি বহুস্রোত-সমন্বিত এক সাংস্কৃতিক যাত্রার সূচনা, যার ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশি জাতিসত্তা দাঁড়িয়ে আছে।
অরাষ্ট্রীয় ভাষা, তবু শক্তিশালী
চর্যার সময় ভাষা ছিল অপ্রাতিষ্ঠানিক। চর্যার কোনো একাডেমি ছিল না, কোনো ব্যাকরণ রচনার প্রকল্প ছিল না, বৈয়াকরণ ছিলেন না, ছিল না রাষ্ট্রের ভাষানীতি। তবু ভাষা ছিল জীবন্ত। কারণ ভাষার শক্তি আসে ব্যবহারে, অভিজ্ঞতায়, অনুভূতিতে। চর্যাপদ প্রমাণ করে যে, ভাষার শক্তি রাজনৈতিক স্বীকৃতি থেকে আসে না; তা মানুষের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন ও জীবনের প্রকাশ থেকে আসে। ইতিহাস সাক্ষী, তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক শক্তিও বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির কঠিন বিরোধিতা করেছিল। মানুষ তার গভীরতম ভাব প্রকাশ করতে যে ভাষা বেছে নেয়, সেই ভাষাই টিকে থাকে। চর্যাপদ সেই টিকে থাকার প্রাচীন সাক্ষী।
চর্যাপদ: ভবিষ্যৎ বাংলার সাংস্কৃতিক নকশা
চর্যাপদের ভাষায় যে উপাদানগুলো দেখা যায়, তা পরবর্তীতে উভয় বাংলার সংস্কৃতির ধারায় বারবার ফিরে এসেছে—নদীমাতৃক জীবন-কৃষিভিত্তিক সমাজ-আধ্যাত্মিকতা ও লোকজ বাস্তবতার মিশ্রণ- প্রতীকে কথা বলার ঐতিহ্য।
পরবর্তী সময়ে এগুলো বাংলা বদ্বীপের বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন ধারা উপধারা, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, লোকগান, পুঁথি, হামদ, নাথ, এমনকি বাউল দর্শনের ভিত্তি গড়ে দেয়। সুতরাং, চর্যাপদ কেবল সাহিত্যিক সূচনা নয়; এটি বাঙালি সভ্যতার, বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক রূপরেখা।
ভাষা: অদৃশ্য ঐক্যের শক্তি
চর্যাপদের যুগে মানুষ হয়তো নিজেদের ‘এক জাতি’ ভাবেনি। কিন্তু তারা একই রকম ভাষায় ভাবছিল, কথা বলছিল, গান গাইছিল, ভাব প্রকাশ করছিল। এই অভিন্ন ভাষা ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য ঐক্য তৈরি করে।
রাজনৈতিক ঐক্য জোর করে চাপানো যায়, কিন্তু ভাষাগত ঐক্য স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে। ফলে তা টেকসই হয়। পরবর্তী শতাব্দীতে যখনই বাইরের রাজনৈতিক চাপ এসেছে, ভাষাভিত্তিক ঐক্য বারবার জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে।
চর্যাপদ থেকে চেতনা: ধারাবাহিকতার সূচনা
চর্যাপদকে শুধু প্রাচীন কবিতা হিসেবে দেখলে এর প্রভাবকে খাটো করে দেখা হয়। এটি আসলে এক সুদীর্ঘ অভিযাত্রার সূচনা। যদি অতি সংক্ষেপে বলি, তবে এই অভিযাত্রাকে, ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা গঠনের বিবর্তনধারা চর্যাপদ → লোকভাষার বিকাশ → সাহিত্যিক ঐতিহ্য → সাংস্কৃতিক চেতনা → ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা বলা যেতে পারে। এই ধারাবাহিকতার প্রথম ধাপেই মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়। ভাষা মানুষের ভেতরে এক অভিন্ন আবেগী মানসিক জগৎ তৈরি করে।
ভাষা জাতির আত্মার স্থাপত্য
একটি বাড়ি নির্মাণের আগে নকশা তৈরি হয়। জাতির ক্ষেত্রেও তাই। রাজনৈতিক স্বাধীনতা, রাষ্ট্রগঠন, সাংস্কৃতিক জাগরণ, এসবের আগে মানুষের ভেতরে গড়ে ওঠে এক মানসিক কাঠামো। চর্যাপদের ভাষা সেই কাঠামোর প্রথম রূপ।
তাই চর্যাপদকে জাতির আত্মার স্থাপত্যের ভিত্তিপ্রস্তর বলা যেতে পারে। আদি ভাষা আমাদের শেখায় যে, একটা জাতির পরিচয় বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; তা ভেতর থেকে জন্ম নেয়। চর্যাপদের ভাষায় যে অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল, সেটিই পরবর্তী হাজার বছরের পরিক্রমায় আজকের বাংলাদেশের ভিত্তিসমূহের অন্যতম। এক কথায় বলা যায়, চর্যাপদ কেবল বাংলা সাহিত্য নয়; এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের ভাষা ইতিহাসের প্রারম্ভিক শক্তি। সুতরাং, বাংলাভাষাই আমাদের জাতির আত্মার প্রথম স্থাপত্য।
- সৈয়দ মিজবাহ উদ্দিন আহমদ: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)