এ লেখাটি লেখার আগে সচেতনভাবে কখনো খেয়ালই করিনি, এখন আমরা কথা বলার আগে একটু থেমে যাই। এটা এতটাই স্বাভাবিক যে, আমরা আর প্রশ্নই করি না, এই ‘থামা’ কবে থেকে আমাদের স্বভাব হয়ে গেল।
যেকোনো আড্ডায়, আলাপচারিতায় যখনই কেউ কিছু বলতে শুরু করে, নিজে থেকেই হঠাৎ গলার স্বর নামিয়ে আনে। কথাটা শেষ করে না। ঝুলিয়ে রাখে। এদিকে-ওদিকে সন্তর্পণে তাকায়। তখন আমরাই কেউ না কেউ তাকে হয়তো বলি, ‘আস্তে বল’, বা বলি, ‘থাক, এসব কথা এখন থাক’। যদিও এই কথাটা বলি খুব নরম করে, প্রায় স্নেহের ভঙ্গিতে। কিন্তু এই ‘আস্তে বল’ বা ‘থাক’-এর ভেতরে যতটা না স্নেহ থাকে তারচেয়ে বেশি একটা অদৃশ্য সীমারেখা টানা থাকে। ওই রেখার ওপারে কথা বলা নিরাপদ নয়, এই অনুভব আমরা প্রায় সবাই উপলব্ধি করতে পারি।
বাংলাদেশের রাজনীতি বোঝার জন্য এখন আর মিছিলের দিকে তাকানো তত জরুরি নয়। বরং এই ‘থামা’র দিকে তাকানো ভালো। কথার মাঝখানে এই থামা, দম আটকে রাখা কিংবা সাবধান হয়ে যাওয়ার মধ্যেই আমরা রাজনীতির প্রভাব টের পেয়ে যাব। দৃশ্যত, পরিস্থিতির এমন এক স্তরে এসে পৌঁছেছি, যেখানে আমরা প্রতিটি কথা বলছি হিসেবে কষে, বাস্তবতার নিরিখে। এ লেখার উদ্দেশ্যও তাই—মূলত সেই স্তরটিকে বোঝার চেষ্টা করা, যেখানে ভাষা আর শুধু কথা বলার মাধ্যম থাকে না, ভাষা হয়ে ওঠে শাসনের কৌশল। এই স্তরে কাউকে চুপ করাতে আর লাঠি লাগে না, আইন লাগে না। কেবল কিছু শব্দ, কিছু অভ্যাস, আর থেমে যাওয়ার সেই ভঙ্গিটি লাগে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতা সবচেয়ে গভীরভাবে কাজ করে ভাষার এই স্তরেই, যেখানে মানুষ কী বলবে আর কী বলবে না, সেটাই তার নাগরিক পরিচয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হয়ে উঠেছে।
১
নব্বইয়ের দশকের রাজনীতির কথাও যদি বলি, তখন রাজনীতি মানে ছিল দল, পতাকা, মিছিল। একুশ শতকের শুরু থেকেই সেই রাজনীতি বদলে যেতে যেতে রাজনীতি মানে এখন হয়ে উঠেছে শব্দচয়ন। কোন শব্দ বললে সম্মতি উৎপাদন হবে, আর কোন শব্দ বললেই হঠাৎ অস্বস্তি নেমে আসবে—এই বোধটাই এখন রাজনৈতিক বোধ। যেমন ধরা যাক, কেউ বলল, ‘সবকিছু ঠিক নেই’। কথাটা খুব সাধারণ তো বটেই, নিরীহও। কিন্তু এই নিরীহ প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন আসে, ‘কেন, কী কী ঠিক নেই?’ এই প্রশ্নটা কিন্তু তথ্য জানার জন্য নয়। এই প্রশ্ন একটা সতর্কতা। এর মানে দাঁড়ায়, ‘সবকিছু ঠিক নেই’ বলার পরিণতি ভেবে দেখেছ তো?
যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, অফিসে, চায়ের টেবিলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে বা বাসে ফেরার পথে কেউ কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। কথাটা বলতে অন্য কেউ এসে বাধা দেয় না, সে নিজেই থেমে যায়। চারপাশে তাকায়—কেউ শুনছে কিনা দেখে। তারপর বলবার কথাটি উহ্য রেখে হালকা হাসি দিয়ে বলে, ‘যাই হোক’। এই ‘যাই হোক’ আসলে কোনো উপসংহার নয়। এটাকে বলা যায়, একটা নিরাপদ প্রস্থান। কথাটা শেষ না করেই কথার জায়গা থেকে সরে যাওয়ার প্রকৌশল।
কেন আমরা সরে যাওয়ার কৌশল খুঁজি! কেউ তো সামনে এসে আমাদের মুখ চেপে ধরছে না। তবু আমাদের চোখ কাউকে খোঁজে, যে আমার কথাটি শুনে ফেললে আমার বিপদ হবে। এই ভয়টা আসলে অনেক আগেই ভাষার ভেতরে ঢুকে গেছে। ভয়টা আমরা রপ্ত করেছি পরিবার থেকে, সমাজ থেকে। উত্তরাধিকার হিসেবে আমরা এই ভয় বহন করে চলেছি। নিজেরাই নিজেদের মুখে লাগাম পরিয়ে দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ করছি। এটাই হয়তো আধুনিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় কার্যকারিতা।
নিঃসন্দেহে একটা অস্বস্তিকর বৈপরীত্য এই, যে দেশ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, সেই দেশেই আমরা ভাষা নিয়ে অতি সতর্ক হয়ে গেছি। এখনও ভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করি, আমাদের শৈশবের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানে প্রভাতফেরি আর হয় না ঠিকই, তবু আমরা এখনও ভাষা বিষয়ক কবিতা পড়ি, সালাম, জব্বার, বরকতের গান গাই, বক্তৃতা দিই। তবু কেন দৈনন্দিন জীবনে এসে ভাষা এমন আচমকা সংকুচিত হয়ে যায়! কারণ তখন ভাষা আর প্রতিবাদের থাকে না। ভাষা হয়ে ওঠে টিকে থাকার কৌশল।
ভাষা ফিরিয়ে আনা মানে বড় বক্তৃতা দেওয়া নয়। মাইক্রোফোনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করা নয়। ভাষা ফিরিয়ে আনা মানে—ভদ্রতার নামে চুপ থাকা বন্ধ করা। অপমানের ভাষা ব্যবহার না করা। লেবেলের ভয়ে প্রশ্ন ছাড় না দেওয়া। ভাষা ফিরিয়ে আনা মানে নিজের কথাকে আবার গুরুত্ব দেওয়া। নিজের অভিজ্ঞতাকে আবার বিশ্বাস করা।
যেমন, কেউ যদি খুব সাধারণভাবে নির্বাচন নিয়ে, নিরাপত্তা নিয়ে, গুম নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে, প্রশ্নটা তখন আর নিরপেক্ষ থাকে না। প্রশ্নকারীকেও আমরা সন্দেহ করি যে, সে আসলে কার লোক? সে কেন একথা বলছে? তাকে এই কথা সাহস দিচ্ছে কে? প্রশ্নের চেয়ে প্রশ্নকারীর পরিচয় ও উৎস বড় হয়ে ওঠে। ভাষা তখন আর অভিজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম থাকে না; ভাষা হয়ে ওঠে পরিচয় যাচাইয়ের যন্ত্র। বাংলাদেশে রাজনৈতিক-সংস্কৃতিতে একটা কথা প্রায়ই বলা হয়,—‘ভদ্রভাবে কথা বলো’। এই উপদেশটা সাধারণত তখন আসে, যখন কেউ একটু বেশি স্পষ্টভাবে সত্য কথাগুলো বলতে শুরু করে। তাই ‘ভদ্রভাবে’-র ভদ্রতা এখানে আচরণগত গুণ নয়। ভদ্রতা এখানে সীমারেখা। তুমি কতটুকু বলবে, কীভাবে বলবে, কোথায় থামবে—এসবকিছুর মানচিত্র ভদ্রতার নামে এভাবে দাগিয়ে দেওয়া হয়। ভদ্র মানে তীব্র না হওয়া, দায় নির্দিষ্ট না করা। ভদ্র মানে এমনভাবে বলা, যাতে কেউ অস্বস্তিতে না পড়ে, বিশেষ করে ক্ষমতাবান কেউ। ফলে ভদ্রতার চাপে ভাষা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। শব্দগুলো নিরাপদ হয় বটে, কিন্তু তা প্রকৃতপ্রস্তাবে অর্থহীন হয়ে যায়। মানুষ হয়তো কথা বলে, কিন্তু আসলে কিছুই বলে না। এভাবে ভদ্রতা রাজনীতির নরম অস্ত্র হয়ে ওঠে।
২
মিছিলে বা সংসদে নয়, রাজনৈতিক ভাষা সবচেয়ে ভালোভাবে আমরা প্রথম উপলব্ধি করি আমাদের নিজেদের ঘরে। খাবার টেবিলে যখনই কেউ কোনো খবরের প্রসঙ্গ তোলে, একটা শিরোনাম বা একটা ছবি নিয়ে কোনো একটা প্রশ্ন উত্থাপন করে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কেউ না কেউ বলে উঠি—‘এইসব নিয়ে এখন মাথা ঘামাস না তো!’ কথাটা শুনতে খুব স্নেহ-বিজড়িত লাগে। যেন এটাই বলি, এসব নিয়ে না ভেবে বরং নিজের দিকে খেয়াল রাখো। কিন্তু এই বাক্যের মানে খুব স্পষ্ট যে, এই আলোচনা কোনো নিরাপদ ব্যাপার নয়। অর্থাৎ এই নিষেধাজ্ঞা উচ্চস্বরে আসা কোনো নির্দেশ নয়। পরামর্শের মোড়কে নীরব-নির্দেশ বরং আরও বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।
আগেই বলেছি, এখন আড্ডাতে বা ব্যক্তিগত আলাপে কেউ একটু বেশি আগ্রহ দেখালে আমরা তাকে বলতে শুরু করেছি, ‘তুই বেশি বুঝিস’। এই ‘বুঝিস’ শব্দটা প্রশংসার জন্য বলি না। সতর্কতার জন্য বলি। কারণ বুঝতে চাওয়া এখানে ঝুঁকি। বুঝতে চাওয়া মানে নিজেকে আলোচনার ভেতরে টেনে আনা। আর আলোচনার ভেতরে এলেই একটা অবস্থান নিতে হয়। এভাবে পরিবার, বন্ধু, সহকর্মীরা আমাদেরকে ধীরে ধীরে শেখায়, কোথায় থামতে হয়। এই থামা প্রথমে কৌশল, তারপর অভ্যাস, শেষে আমাদের স্বভাব হয়ে ওঠে। একসময় আমরা আর নিজের মতামত লুকোই না, নিজেদের যে একটা মতামত ছিল, এটাই ভুলে যাই।
আমাদের মিডিয়াগুলোর খবরের ভাষাও খুব গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করতে হবে। কারণ খবর কেবল তথ্য দেয় না, খবর এটাও শেখায় যে, কোন বিষয় নিয়ে কথা বলা উচিত। তবে এই শেখানোটা আপনা-আপনি হয় না। এর পেছনে নিশ্চয়ই সিদ্ধান্ত থাকে যে, কোন খবর চলবে, কতক্ষণ চলবে, কোনধরনের শব্দ ব্যবহার হবে। শিরোনামের ভেতর দিয়ে, ছবির বাছাই দিয়ে, কোন ঘটনার পেছনে ‘ব্রেকিং নিউজ’ বসবে আর কোনটা ‘সংক্ষিপ্ত সংবাদ’ হয়ে যাবে—এসবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় খবরের ভাষা। ফলে কিছু বাস্তবতা নিয়মিত দৃশ্যমান থাকে, আর কিছু বাস্তবতা নিয়মিত অদৃশ্য হতে হতে একসময় অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। এরমধ্যে কিছু ঘটনা বড় শিরোনাম হয়। কিছু ঘটনা ছোট কলামে ঢুকে যায়। আর কিছু ঘটনা ব্ল্যাক-আউট হয়ে দৃশ্যপট থেকেই হারিয়ে যায়। এই হারিয়ে যাওয়াটাও ভাষা এবং নিঃসন্দেহে খুব কার্যকর ভাষা। যখন কোনো বিষয় নিয়মিত বাদ পড়ে, আমরা ধীরে ধীরে শিখে যাই—এই বিষয়ে প্রশ্ন করা অপ্রয়োজনীয়। এই নিয়ে কথা বাড়ানো ঠিক নয়। এভাবে ধীরে নীরবতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। অথচ এখানে আপাতভাবে হয়তো কেউ কাউকে এসে সরাসরি বলে না, এই প্রশ্ন কোরো না। প্রকাশ্যে কোনো তালিকা বানানো হয় না বা কোনো নিষেধাজ্ঞাও সেভাবে জারি হয় না। কিন্তু প্রশ্নটা নিজে থেকেই হারিয়ে যায়।
প্রকৃতঅর্থে, বাংলাদেশে আমরা এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি অতিক্রম করে চলেছি, কখনো কখনো কিছু ঘটনা ঘটার আগেই তার ভাষ্য তৈরি থাকে। ঘটনা হয়তো পরে একটা ঘটে। যেমন ক্রসফায়ারের গল্পে আমরা অস্ত্র উদ্ধারের কাহিনি শুনে থাকি। আমরা সবই বুঝি, কিন্তু কোনো ঘটনাকে আর নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করতে ভয় পাই। তখনই আমাদের ভাষায় নিরাপদ শব্দ প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। নিরাপদ শব্দ মানে, যে শব্দ বললে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলে না। কারণ আমরা ক্রমাগত ঝামেলা এড়িয়ে যেতে চাই। কিন্তু, এভাবে ঝামেলা এড়িয়ে যেতে যেতে আমরা মূলত আমাদের নিজেদের কণ্ঠকেই একসময় হারিয়ে ফেলি।
এই অস্বস্তিকর বাস্তবতায় আমরা বাস করছি বাংলাদেশে, রাজনীতি এখন আমাদের ভাষার ভেতরে বসে আছে। কীভাবে কথা বলব, কোথায় থামব, কোন শব্দ এড়িয়ে চলব—এই বোধটাই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা।
৩
কিছু শব্দ আছে, যেমন, ‘উন্নয়ন’, ‘নিরাপত্তা’, ‘শৃঙ্খলা’। এই শব্দগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন। কারণ এগুলো এমনভাবে সাজানো, যেন এগুলো মানেই মঙ্গল। আর যে মঙ্গলের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাকে সহজে সন্দেহ করা যায়। এই প্রশ্নগুলো শব্দগুলোর শক্তি, যেমন, কে উন্নয়নের বিরুদ্ধে? কে নিরাপত্তা চায় না? কে বিশৃঙ্খলা পছন্দ করে? প্রশ্নগুলো শুনতে নিরীহ বটে, কিন্তু বিষয়টি নিরীহ নয়। কারণ এগুলো প্রশ্নকে আগেই পরাজিত করে দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষ্যে এই শব্দগুলো সত্যি বলতে এখন আর নির্দিষ্ট কোনো অর্থ বহন করে না। কারণ এগুলোকে আমরা দিনের পর দিন একেকটা ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখেছি। ঢালের আড়ালে অনেককিছু লুকানো থাকে—প্রশ্ন, সমূহ ক্ষতি এবং অপরাধ। বাংলাদেশে আমরা প্রায় সব শাসনামলে একটা আপ্তবাক্য সবচেয়ে বেশি শুনি, ‘উন্নয়ন হয়েছে’। এই কথাটা বলা হয় খুব স্বাভাবিকভাবে, প্রায় বিজয়ের ভঙ্গিতে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এটা কোনো বিবরণ নয়। এটা একধরনের রায়।
চুপ থাকা শিখে গেলে বা তাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আমরা ‘ভয় পাচ্ছি’ আর বলি না। বরং বলি, ‘থাক, এসব নিয়ে কথা বলে কী হবে’। হয়তো এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে রাজনৈতিক উপলব্ধি। বস্তুত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভাষা এখন আর কেবল মতপ্রকাশের মাধ্যম নয়। ভাষা হয়ে উঠেছে সীমারেখা।
‘উন্নয়ন হয়েছে’—মানে কী? তাতে কি আমাদের জীবন সহজ হয়েছে? নাকি শুধু দৃশ্য পাল্টেছে? এই প্রশ্নগুলো তোলার জায়গা খুব সংকীর্ণ। কারণ ‘উন্নয়ন হয়েছে’ বলার পর কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, ‘কিন্তু কার জন্য উন্নয়ন হয়েছে?—তখন প্রশ্নটা আর প্রশ্ন থাকে না। তখন তা হয়ে যায় আমাদের একটি রাজনৈতিক অবস্থান। আমাদেরকে বলা হয়, তুমি নেগেটিভ মাইন্ডেড। তুমি ভালো কোনোকিছুই দেখতে চাও না। সবসময় সমস্যা খুঁজে বেড়াও। শব্দটা এভাবেই কাজ করে। কারণ উন্নয়ন শব্দটা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে না; বরং বাস্তবতার ওপর নৈতিক কর্তৃত্ব বসায়। আর নৈতিক কর্তৃত্ব একবার বসে গেলে প্রশ্নকে তখন আর যুক্তি দিয়ে ঠেকাতে হয় না, প্রশ্নকে সন্দেহ করলেই হয়। ফলে আমরা ধীরে ধীরে শিখে যাই, উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন করা মানে নিজের অবস্থান দুর্বল করে ফেলা।
এসব নিয়ে কথা বলার সময়, লক্ষ করলে দেখব, কিছু কথা প্রায়ই শোনা যায়, আবার কিছু কথা শোনাই যায় না বা হারিয়ে যায়। এই না শুনতে পাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটাই শাসনের ভঙ্গি। আমরা প্রায়ই শুনতে পাই, রাস্তা হয়েছে, সেতু হয়েছে, ভবন উঠেছে। কিন্তু কার জমি গেল, কার ঘর ভাঙল, কার জীবন এলোমেলো হয়ে গেল এই কথাগুলো একেবারেই শুনতে পাই না।
এই শুনতে না-পাওয়া কথাগুলো কিন্তু কেউ জোর করে মুছে দেয় না। এগুলো নিজেরাই হারিয়ে যায়। কারণ এগুলো বললে পরিবেশ ভারী হয়ে যায়। কথাবার্তা অস্বস্তিকর হয়। আমরাই তখন ভাবি, কী লাভ এইসব কথা বলে? এই ‘কী লাভ’ কথাটাই উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর সঙ্গী। কারণ মানুষ যখন লাভ গণনা করতে শিখে যায়, সে তখন ন্যায়ের ভাষা ভুলে যায়। তার অভিজ্ঞতা তখন আর গল্প হয় না, ঝামেলা হয়। এভাবে উন্নয়নের ভাষা মানুষের অভিজ্ঞতার একটা অংশকে এমনকি অপ্রয়োজনীয় বানিয়ে ফেলে।
নিরাপত্তা শব্দটা সম্ভবত আরও সূক্ষ্ম। এটা সরাসরি কিছু নিষেধ করে না। এটা কেবল সাধারণভাবে সতর্ক করে এবং সতর্কতার ভেতর দিয়ে ভয়কে ভদ্র বানিয়ে তোলে। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে যখনই কোনো কঠোর সিদ্ধান্তের কথা আসে, নিরাপত্তা শব্দটা সামনে চলে আসে। বলা হয়, পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। বলা হয়, স্থিতিশীলতা রক্ষা করা জরুরি।
এই ভাষা আপাতভাবে খুব ঠান্ডা। কোনো আবেগ নেই। কোনো উত্তেজনা নেই। কিন্তু এই ঠান্ডা ভাষার ভেতরেই ভয় সবচেয়ে বেশি কাজ করে। কারণ নিরাপত্তার নামে সবকিছু তখন যুক্তিযুক্ত হয়ে ওঠে। তখন প্রশ্ন থেমে যায়। কারণ প্রশ্ন করলে বলা হয়, এই মুহূর্তে নিরাপত্তার কথা আগে ভাবো। এই কথাটা শুনতে যুক্তিসঙ্গতই লাগে কিন্তু এর ফল হয় ভয়ংকর। কারণ এতে নাগরিকদেরকে একটা নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় আটকে রাখা যায়, সতর্ক, সন্দিহান আর নীরব করে দিয়ে।
শব্দ হিসেবে শৃঙ্খলাও খুব নির্মম কিছু নয়। কিন্তু বাস্তবে এই শব্দটা খুব বাছাই করা জায়গায় প্রয়োগ হয়। শৃঙ্খলার কথা বলা হয় তখনই, যখন কেউ সীমা পেরোয়। কিন্তু সেই সীমা কে ঠিক করেছে—এই প্রশ্নটা তোলেই হয় না। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক কথাবার্তায় শৃঙ্খলা মানে অনেক সময় চুপ থাকা। শান্ত থাকা। লাইন না ভাঙা। কিন্তু এই শৃঙ্খলার ভেতরে ন্যায় আছে কি না, সেটা ভাষা আর পরীক্ষা করে না। ভাষা শুধু বলে, শৃঙ্খলা জরুরি। এভাবে শৃঙ্খলা শব্দটা একসময় নৈতিকতার জায়গা দখল করে নেয়। এভাবে এই তিনটি শব্দ—‘উন্নয়ন, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা’ মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ভাষা খুব ভদ্র হয়ে ওঠে। এই শব্দগুলো এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যেন এগুলো কোনো নীতিগত অবস্থান নয়, স্বাভাবিক সত্য। যেমন, আলো জ্বাললে অন্ধকার থাকে না। উন্নয়ন হলে প্রশ্ন থাকবে না। নিরাপত্তা চাইলে আপত্তি থাকবে না। শৃঙ্খলা মানলে দ্বিধা থাকবে না। ফলে, এই শব্দগুলো ধীরে ধীরে যুক্তির জায়গা দখল করে নেয়। যুক্তি দিয়ে এগুলো প্রমাণ করতে হয় না। কারণ এগুলো বিশ্বাস হিসেবে কাজ করে। আর রাষ্ট্রকে কখনো রাগতে দেখা যায় না। রাষ্ট্র শান্তভাবে ব্যাখ্যা দেয়। এই ভদ্রতার বিপরীতে বরং নাগরিকের ভাষাই ধীরে ধীরে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তখন নাগরিক প্রশ্ন করলে তাকে বলা হয়, ‘উত্তেজিত’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’। নাগরিক অভিযোগ করলে তাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলা হয়। এই অসমতা খুব ধীরে তৈরি হয়। কেউ টের পায় না কখন নাগরিকের ভাষা অশোভন হয়ে গেল।
খবর পড়লে বা বিজ্ঞপ্তি শুনলে প্রায়ই একই বাক্য চোখে পড়ে—‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক।’ ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে’। ‘যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে’। এই বাক্যগুলো আমাদের খুব চেনা। বারবার শুনে শুনে এর ভেতরে লুকোনো বাস্তবতা আমরা আর দেখতে পাই না। আমরা ভাবি, সব ঠিকই আছে। আর যদি নিজের চোখে কিছু আলাদা দেখেও ফেলি, তখন আমরাই নিজেদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাই। ভাবি, আমি মনে হয় ঠিকঠাক বুঝতে পারিনি। এখানেই ভাষার ক্ষমতা সবচেয়ে গভীরভাবে কাজ করে। ভাষা মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতাকেও অবিশ্বাস করতে শেখায়।
আর তখনই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা ঘটে—আমরা আসলে ক্লান্ত হয়ে যাই। প্রতিটা প্রশ্নে যদি ব্যাখ্যা দিতে হয়, প্রতিটা সন্দেহে যদি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয়, প্রতিটা মন্তব্যে যদি নিজের দেশপ্রেম প্রমাণ করতে হয়, তখন একসময় চুপ করে যাওয়া ছাড়া আমাদের আরকিছু করার থাকে না। এই চুপ থাকা হয়তো বিদ্রোহ নয়। তবে চুপ থাকা পরাজয়ও নয়। এই চুপ থাকাকে বলা যায় একধরনের ক্লান্তি। আর এই ক্লান্তিই ভাষার মাধ্যমে তৈরি হওয়া সবচেয়ে কার্যকর শাসন।
কারণ উন্নয়ন, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলার মতো শব্দগুলো এত পরিচিত হয়ে যায় যে, আমরা আর এগুলো নিয়ে ভাবি না। শব্দ যখন প্রশ্নহীন হয়ে যায়, তখনই শব্দ ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। শব্দগুলো আমাদের শেখায়—কোন চিন্তাটা স্বাভাবিক, কোন চিন্তাটা বাড়াবাড়ি। এই শেখানোটা খুব নীরবে ও ধীরে হয়। কিন্তু একবার হয়ে গেলে, সেটা আর ভাঙা যায় না বা ভাঙা সহজ নয়।
মিছিলে বা সংসদে নয়, রাজনৈতিক ভাষা সবচেয়ে ভালোভাবে আমরা প্রথম উপলব্ধি করি আমাদের নিজেদের ঘরে। খাবার টেবিলে যখনই কেউ কোনো খবরের প্রসঙ্গ তোলে, একটা শিরোনাম বা একটা ছবি নিয়ে কোনো একটা প্রশ্ন উত্থাপন করে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কেউ না কেউ বলে উঠি—‘এইসব নিয়ে এখন মাথা ঘামাস না তো!’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক টকশোগুলোর কথা বলতে পারি। এগুলো দেখলে প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ে, সেটা আলোচনা নয়, সংঘর্ষ। একজন কিছু বলতে শুরু করলে, সে শেষ করার আগেই আরেকজন তার কথার ভেতরে ঢুকে পড়ে। হঠাৎ গলার স্বর চড়ে যায়। কথা আর শোনার মতো থাকে না। একজন আরেকজনকে বলে, ‘আপনি তো ওই দলের দালাল, আপনার কথার কোনো গুরুত্ব নাই’। এই কথাটি অবশ্যই কোনো যুক্তি নয়। একে বলা যায়, একধরনের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। কারণ এখানে বক্তব্য খণ্ডন না করে বক্তাকেই অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। টকশোর এই ভাষা আমাদেরকে একটা খুব পরিষ্কার শিক্ষা দেয় যে, রাজনীতিতে যুক্তি দিয়ে জেতা যায় না। জেতা যায় গলা দিয়ে। যে বেশি চেঁচায়, সে বেশি দৃশ্যমান। যে বেশি অপমান করে, সে বেশি শক্ত। এই দৃশ্যমানতাই এখনকার রাজনৈতিক পুঁজি।
অথচ একসময় রাজনৈতিক অপমান ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। এখন অপমানই প্রত্যাশিত। কেউ যদি ভদ্রভাবে কথা বলে, তাকে দুর্বল মনে করা হয়। তাকে বলা হয়, সে ঠিকভাবে লড়তে পারছে না। এই বদলের ভেতরটা খুব গভীর। কারণ এখানে ভাষা শুধু আঘাত করে না; ভাষা মানুষকে শেখায় যে, আঘাত করাই রাজনীতির অংশ। এই শিক্ষা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। টকশো থেকে ফেসবুকে। ফেসবুক থেকে আড্ডায়। আড্ডা থেকে ঘরের ভেতরে। মানুষ একে অপরের সঙ্গে কথা বলার সময়ও সেই ভাষাভঙ্গি অনুকরণ করে। এভাবে রাজনৈতিক আগ্রাসন আমাদের সামাজিক আচরণ হয়ে ওঠে।
৪
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষ্যে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো একবার উচ্চারিত হলে আর কিছু বলার থাকে না। যেমন, ‘দেশদ্রোহী’, ‘দালাল’, ‘জঙ্গির মদদদাতা’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’। কারণ এই শব্দগুলো কোনো ব্যাখ্যা চায় না। এই শব্দগুলো কোনো যুক্তিও নয়। এগুলো মূলত রায়। এই শব্দগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এগুলো দিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায়। কেউ যদি কঠিন কোনো প্রশ্ন তোলে, এগুলো দিয়ে তার প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া যায়। শব্দটা ছুড়ে দিলেই হয়। এই লেবেলগুলো খুব নির্দিষ্টভাবে কাজ করে। এগুলো মানুষকে আলোচনার ভেতর থেকে বের করে দেয়। কথাবার্তার অধিকার কেড়ে নেয়। মানুষ তখন আর নাগরিক থাকে না। মানুষ হয়ে যায় ঝুঁকি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই আগ্রাসী ভাষা আরও উন্মুক্ত। এখানে কেউ কাউকে চেনে না। চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। ফলে ভাষার ওপর সামাজিক লাগামও থাকে না। একটা পোস্ট। কয়েকটা লাইন। তারপর কমেন্টে নেমে আসে ঘোষণা, ‘তুমি একটা দালাল।’ ‘তুমি বিক্রি হয়ে গেছ।’ ‘তোদের জায়গা এই দেশে নাই।’ ‘তুই দেশ ছেড়ে চলে যা।’
এই বাক্যগুলো নিশ্চিতভাবে যুক্তির অংশ নয়, সিদ্ধান্ত। এভাবে ভাষা সবচেয়ে নির্মম হয়ে ওঠে। কারণ এখানে ভাষা শুধু মত প্রকাশ করে না, ভাষা জায়গা দাবি করে। কে থাকবে, কে থাকবে না—এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। এই আগ্রাসী ভাষার ভেতরে একটা খুব স্পষ্ট রাজনীতি কাজ করে, যোগ্যতার রাজনীতি। যে প্রশ্ন তোলে, সেই সন্দেহজনক। যে ভিন্নমত দেয়, সেই বিপজ্জনক। যে দ্বিধা প্রকাশ করে, সে দুর্বল। এভাবে রাজনীতির ভাষা নাগরিককে ধাপে ধাপে শ্রেণিবদ্ধ করে। কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ সহনীয়। কেউ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এই শ্রেণিবিভাগ কোনো আইনে লেখা নেই। কিন্তু সবাই জানে।
কিন্তু আগ্রাসন কেন এত আকর্ষণীয় বা এই ভাষা কেন এত জনপ্রিয়? কারণ আগ্রাসী ভাষা খুব সহজ। এতে ভাবতে হয় না, জটিলতা নেই। স্পষ্ট কথা— আমরা ভালো। ওরা খারাপ। বিবৃতির এই সরলতা আমাদেরকে স্বস্তি দেয়। বিভ্রান্তি কমায়। দ্বিধা দূর করে। কিন্তু এই স্বস্তির দাম আমরা ভয়ংকরভাবে মেটাই। কারণ এই সরলতার ভেতরে বাস্তবতার জটিলতা মুছে যায়। আমরা আর প্রশ্ন করা শিখতে পারি না।
তবে ভদ্রতা ও আগ্রাসন মূলত একই মুদ্রার দুই পিঠ। ভদ্র রাষ্ট্রীয় ভাষা আর আগ্রাসী জনপ্রিয় ভাষাকে একে অপরের বিরোধী মনে হলেও আসলে তা নয়। বরং এরা একে অপরকে পরিপূরকতা দেয়। ভদ্র ভাষা বলে, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক’। আগ্রাসী ভাষা বলে, যে প্রশ্ন করছে, সেই সমস্যাজনক। একটা ভাষা শান্ত করে, আরেকটা ভাষা আক্রমণ করে। দুটোরই ফল এক—নাগরিক চুপ করে যায়।
ভাষা এভাবে আক্রমণ করে, অপমান করে, লেবেল দেয়। আর ভয়ংকর বিষয় হলো, সমাজ ধীরে ধীরে এটাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। এই মেনে নেওয়াটাই হয়তো সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এখানে ভাষা আর কেবল কথাবার্তার বিষয় থাকে না। ভাষা হয়ে ওঠে সামাজিক অনুমতি। একটা সময় আসে, যখন মানুষ আর কথা বলেই না।
কিছু শব্দ আছে, যেমন, ‘উন্নয়ন’, ‘নিরাপত্তা’, ‘শৃঙ্খলা’। এই শব্দগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন। কারণ এগুলো এমনভাবে সাজানো, যেন এগুলো মানেই মঙ্গল। আর যে মঙ্গলের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাকে সহজে সন্দেহ করা যায়। এই প্রশ্নগুলো শব্দগুলোর শক্তি, যেমন, কে উন্নয়নের বিরুদ্ধে? কে নিরাপত্তা চায় না? কে বিশৃঙ্খলা পছন্দ করে? প্রশ্নগুলো শুনতে নিরীহ বটে, কিন্তু বিষয়টি নিরীহ নয়। কারণ এগুলো প্রশ্নকে আগেই পরাজিত করে দেয়।
এই চুপ থাকাটা অবশ্য হঠাৎ করে আসে না। এটা কোনো একদিনের সিদ্ধান্ত নয়। ধীরে ধীরে আমরা চুপ থাকা শিখে যাই। শিশুরা যেমন শেখে—কোন প্রশ্ন করলে মা বিরক্ত হন, কোন প্রশ্ন করলে বাবা বলেন, থাক, পরে। এই শেখাটা বড় হতে হতে বদলে যায়। তখন এটা পারিবারিকতার গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে রাজনীতির সবচেয়ে পরিণত রূপই এই নীরবতা। কেউ চেঁচায় না। কেউ হুমকি দেয় না। তবু সবাই জানি—কে কথা বলতে পারে, আর কে পারে না।
প্রমিত ভাষার ব্যাপারে একটু বলি। বাংলাদেশে প্রমিত ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম না, প্রমিত ভাষা একটা সিগন্যাল। এই ভাষায় কথা বলতে পারা মানে, আপনি শিক্ষিত, ভদ্র, গ্রহণযোগ্য। ফলে টেলিভিশনের স্টুডিওতে, আদালতের কাঠগড়ায়, প্রশাসনিক সভায়—এই ভাষার বাইরে যাওয়ার জায়গা খুব সীমিত। এই ভাষার উচ্চারণ মাপা। বাক্যগুলো ভারসাম্যপূর্ণ। শব্দগুলো সাবধানে বসানো। এই ভাষা শুনলে মনে হয়—সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণটাই আসলে ক্ষমতার ভাষা। যে এই ভাষায় কথা বলতে পারে না, তার বক্তব্য আগেই দুর্বল হয়ে যায়। সে কী বলছে, সেটা আর মুখ্য থাকে না। মুখ্য হয়ে ওঠে—সে কীভাবে বলছে। এখানেই ভাষা শ্রেণিবিভাজন তৈরি করে।
আঞ্চলিক ভাষা, শ্রমজীবী মানুষের ভাষা, গ্রামের ভাষা— এই ভাষাগুলোর রাজনীতিতে অবস্থান খুব অদ্ভুত। ভোটের সময় এই ভাষা দরকার হয়। এই ভাষায় কথা বললে মানুষ আপন মনে করে। এই ভাষায় হাসলে হাততালি আসে। কিন্তু সিদ্ধান্তের টেবিলে এসে এই ভাষা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। সংসদে কেউ আঞ্চলিক টানে কথা বললে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সঙ্গে সঙ্গে ঠাট্টা শুরু হয়। উচ্চারণ নিয়ে মিম হয়। বাক্যের গঠন নিয়ে হাসাহাসি হয়। এই হাসিটা নিরীহ না। এই হাসি একটা বার্তা দেয়, এই ভাষায় কথা বললে আপনি সিরিয়াস নন। এভাবে ভাষা আমাদের নিজের কথা লুকিয়ে ফেলতে শেখায় । আর তখন একটা অদৃশ্য ক্ষত তৈরি হয়—ভাষার লজ্জা।
আমরা ভাবতে শুরু করি—আমি ঠিকভাবে বলতে পারি না। আমার ভাষা ঠিক না। আমার কথার কোনো দাম নেই। এই লজ্জা ভয়ংকর। কারণ তখন আর কাউকে দমন করতে হয় না। আমরা নিজেরাই নিজেকে সরিয়ে নিই। মিটিংয়ে চুপ করে থাকি, ক্লাসে কোনো প্রশ্ন করি না। ফেসবুকে স্টেটাস লিখে ডিলিট করে দিই বা অনলি মি করে রাখি। এই আত্মসংযম কোনো ভদ্রতা নয়। এটা ভয়।
ভাষার এই সমস্যাটা কেবল এটা নয় যে, এটা ‘ওরা’ ব্যবহার করে। সমস্যাটা এই যে, ক্লান্তিতে, রাগে, হতাশায়—আমরাও কখনো কখনো এই ভাষা ব্যবহার করি কাউকে তর্কে হারানোর জন্য, নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য, বা শুধু নিজের ক্ষোভ নামানোর জন্য। তখন আমরা ভাবি—এটা সাময়িক। কিন্তু এই সাময়িক ব্যবহার ভাষার এই রূপকে স্থায়ী করে তোলে। আগ্রাসী ভাষা এভাবে নিজের পুনরুৎপাদন নিশ্চিত করে।
৫
ফলে, একদিক থেকে দেখতে গেলে, বাংলাদেশে নীরবতা এখন সবচেয়ে নিরাপদ ভাষা। কিছু না বলা মানে ঝুঁকি না নেওয়া। কিছু না লেখা মানে ঝামেলা ডেকে না আনা। এই নীরবতা আবার প্রশংসাও পায়। বলা হয়, সে শান্ত মানুষ। সে দায়িত্বশীল। সে ঝামেলা করে না। এই প্রশংসার ভেতরে লুকিয়ে থাকে শর্ত—তুমি কথা বলবে না। এইভাবে নীরবতা একটা সামাজিক চুক্তিতে পরিণত হয়। কেউ প্রকাশ্যে বলে না। কিন্তু সবাই মেনে চলে।
অবশ্য নীরবতাও সবার জন্য সমান নয়। কিছু মানুষ চুপ থাকতে পারে না। কারণ তাদের জীবনটাই প্রশ্ন। যার ঘর ভাঙে, সে নীরব থাকতে পারে না। যার জমি যায়, সে নীরব থাকতে পারে না। যার সন্তান নিখোঁজ হয়, সে নীরব থাকতে পারে না। কিন্তু যার সিদ্ধান্তে এসব হয়, তার নীরবতা সহজ। এই পার্থক্যটাই সবচেয়ে রাজনৈতিক। কারণ তখনই বোঝা যায়—নীরবতা নিরপেক্ষ নয়। নীরবতা শ্রেণিভিত্তিক।
নব্বইয়ের দশকের রাজনীতির কথাও যদি বলি, তখন রাজনীতি মানে ছিল দল, পতাকা, মিছিল। একুশ শতকের শুরু থেকেই সেই রাজনীতি বদলে যেতে যেতে রাজনীতি মানে এখন হয়ে উঠেছে শব্দচয়ন। কোন শব্দ বললে সম্মতি উৎপাদন হবে, আর কোন শব্দ বললেই হঠাৎ অস্বস্তি নেমে আসবে—এই বোধটাই এখন রাজনৈতিক বোধ।
তবে নীরবতারও ভাষা আছে। চোখ এড়িয়ে চলা। বিষয় পাল্টে ফেলা। হালকা হাসি দিয়ে কথাটা উড়িয়ে দেওয়া। এই ছোট ছোট আচরণগুলোই ভাষার শেষ স্তর। এখানে আর শব্দের দরকার হয় না। মানুষ বুঝে যায়, এই জায়গায় থামো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নীরবতার ভাষাই সবচেয়ে শক্তিশালী। কারণ নীরবতার ভাষা দৃশ্যমান নয়, নৈমিত্তিক অভ্যাস। কেউ এসে ‘চুপ থাকো’ না বললেও আমরা নিজেরাই জানি কখন চুপ থাকতে হয়।
৬
চুপ থাকা শিখে গেলে বা তাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আমরা ‘ভয় পাচ্ছি’ আর বলি না। বরং বলি, ‘থাক, এসব নিয়ে কথা বলে কী হবে’। হয়তো এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে রাজনৈতিক উপলব্ধি। বস্তুত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভাষা এখন আর কেবল মতপ্রকাশের মাধ্যম নয়। ভাষা হয়ে উঠেছে সীমারেখা। এই সীমারেখা কেউ চক দিয়ে টেনে দেয় না। সীমারেখা তৈরি হয় অভ্যাসে—কোন শব্দ বলা নিরাপদ, কোন প্রশ্ন অস্বস্তিকর, কোন নীরবতা বুদ্ধিমানের। এই অভ্যাসই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ একসময় আমরা শুধু প্রশ্ন করা বন্ধ করি তাই নয়, প্রশ্ন ভাবাই বন্ধ করে দিই। ভাষা তখন শুধু বাইরের জিনিস থাকে না, ভাষা হয়ে ওঠে আমাদের মানসিক কাঠামো। তখন আমরা নিজের অভিজ্ঞতাকেই সন্দেহ করি, নিজের চোখে যা দেখি, নিজের কানে যা শুনি—সেগুলো প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পাই না। রাজনীতির কারণে আমরা ভাষা হারিয়ে ফেলি। ভাষা হারানো মানে শুধু কথা বলতে না পারা নয়। ভাষা হারানো মানে নিজের কষ্টের নাম খুঁজে না পাওয়া। নিজের রাগকে অপরাধ মনে করা। নিজের প্রশ্নকে অযৌক্তিক ভাবা। ভাষা হারানো মানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সে আর নাগরিক থাকে না। সে হয়ে যায় দর্শক। রাজনীতি তখন তার জীবনের ওপর দিয়ে যায়, কিন্তু সে রাজনীতির ভেতরে থাকে না। ক্ষমতার জন্য নাগরিকদের এই দর্শক হয়ে যাওয়াটাই হয়তো সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিস্থিতি।
কিন্তু ভাষা কি আসলেই পুরোপুরি হারিয়ে গেছে? না। ভাষা পুরোপুরি হারায়নি। ভাষা এখনো আছে—অস্বস্তিতে, ফিসফিসে কথায়, অর্ধেক বাক্যে, হঠাৎ থেমে যাওয়া না বলা বাক্যের শেষে। ভাষা আছে সেই মানুষটির ভেতরে, যে লিখে আবার মুছে ফেলে। ভাষা আছে সেই প্রশ্নের মধ্যে, যেটা বলা হয় না, কিন্তু ঘুরে ফিরে মাথার ভেতর বাজে। ভাষা মরেনি। বলা যায়, ভাষা চাপা পড়েছে। আর আমরা জানি, চাপা পড়া জিনিস কখনো কখনো বিস্ফোরণ ঘটায়। কিন্তু বিস্ফোরণই একমাত্র পথ নয়। ভাষা ফিরতে পারে ধীরে। নীরবে। কিন্তু দৃঢ়ভাবে।
এখানে এসে প্রশ্নটা আর শুধু রাষ্ট্র বা ক্ষমতার থাকে না। প্রশ্নটা কিছুটা ব্যক্তিগতও। আমি কোথায় চুপ থেকেছি? কোন বাক্যটা আমি শেষ করিনি? কোন প্রশ্নটা আমি মনে মনে ঠিক করে আবার গিলে ফেলেছি? কোন শব্দটা আমি নিরাপদ ভেবে ব্যবহার করেছি, যদিও জানতাম সেটা পুরো সত্য না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব অস্বস্তিকর। কিন্তু এই অস্বস্তিই ভাষা ফিরে পাওয়ার প্রথম লক্ষণ। ভাষা ফিরিয়ে আনা মানে বড় বক্তৃতা দেওয়া নয়। মাইক্রোফোনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করা নয়। ভাষা ফিরিয়ে আনা মানে—ভদ্রতার নামে চুপ থাকা বন্ধ করা। অপমানের ভাষা ব্যবহার না করা। লেবেলের ভয়ে প্রশ্ন ছাড় না দেওয়া। ভাষা ফিরিয়ে আনা মানে নিজের কথাকে আবার গুরুত্ব দেওয়া। নিজের অভিজ্ঞতাকে আবার বিশ্বাস করা। এই বিশ্বাস খুব বড় জায়গা থেকে শুরু হয় না। শুরু হয় ছোট জায়গা থেকে—পরিবারে, আড্ডায়, লেখায়, ক্লাসে। এটা কোনো বিপ্লবী রোমান্টিসিজম না। এটা কষ্টসাধ্য কাজ বটে কিন্তু খুব ধীরলয়ের কাজ। কারণ ভাষা ফিরিয়ে আনা মানে ঝুঁকি নেওয়া। অস্বস্তি নেওয়া। কখনো একা হয়ে যাওয়া। কিন্তু ভাষা ছাড়া নাগরিকত্ব থাকে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের গভীরে গেলে দেখা যায়, এটা শুধু প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন বা আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়। এটা ভাষার সংকট। যে সমাজ নিজের ভাষাকে ভয় পেতে শেখে, সে সমাজ একসময় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে পারে না। এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়। এই লেখার উদ্দেশ্য একটাই—ভাষার দিকে আবার ফিরে তাকানো। ফিরে তাকারো দরকার শব্দের দিকে। থেমে যাওয়া বাক্যের দিকে। যে কথাগুলো বলা হয়নি, সেগুলোর দিকে। কারণ রাজনীতি বদলানোর আগে ভাষা বদলায়। আর ভাষা বদলানোর আগে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়, সে চুপ থাকবে, না কথা বলবে। এই সিদ্ধান্তটা কোনো রাষ্ট্র নেয় না। এই সিদ্ধান্তটা নেয় মানুষ নিজে।
এখানেই সব শেষ নয়। এখান থেকেই আসলে শুরু।