আরিফ রহমান

ভাষা প্রবহমান নদীর মতো; সময়ের আবর্তে শব্দের আভিধানিক অর্থ বদলে যাওয়া ভাষার চিরায়ত বাস্তবতা। আমরা প্রতিদিন হাজারও শব্দ ব্যবহার করি, যার কোনোটি আমাদের দক্ষতাকে প্রকাশ করে, কোনোটি লজ্জাকে আবার কোনোটি আমাদের শারীরিক অসুস্থতাকে। কিন্তু আমরা কজন জানি, এই নিতান্ত সাধারণ শব্দগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের পুরোনো বহু অলৌকিক আখ্যান?
বাংলা ভাষায় প্রতিদিনের ব্যবহৃত শব্দগুলোর পেছনে আছে নানা গল্প। আজ ভাষা দিবসে তেমন কিছু শব্দের পেছনের গল্প জানা যাক।
দক্ষ: নিছকই পটুতা নাকি এক করুণ ট্র্যাজেডি
‘দক্ষ’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি, যিনি তাঁর কাজে অত্যন্ত পটু, নিপুণ এবং অভিজ্ঞ। আমরা বলি ‘দক্ষ কারিগর’, ‘দক্ষ প্রশাসক’ কিংবা ‘দক্ষ যোদ্ধা’। আধুনিক বাংলায় ‘দক্ষ’ মানেই হলো পজিটিভ কিছু, যোগ্যতার মাপকাঠি। কিন্তু হিন্দু পুরাণের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই ‘দক্ষ’ শব্দটি এসেছে এক প্রবল প্রতাপশালী কিন্তু অহংকারী চরিত্রের নাম থেকে, যার পরিণতি ছিল ভয়াবহ।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দক্ষ হলেন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার পুত্র, অর্থাৎ ব্রহ্মার মানসপুত্র। সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মার ১০ জন মানসপুত্রের জন্ম হয়, যাদের মধ্যে দক্ষ ছিলেন অন্যতম। তাঁকে বলা হয় ‘দক্ষ প্রজাপতি’। পুরাণ বলছে, ব্রহ্মা তাঁর ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল থেকে দক্ষকে সৃষ্টি করেছিলেন। এই দক্ষ ছিলেন সৃষ্টির দেবতা, কিন্তু তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অহমিকা।

দক্ষের গল্পটি মূলত শিব এবং সতীর সঙ্গে সম্পর্কিত। দক্ষের কন্যা সতী বাবার অমতে মহাদেব শিবকে বিবাহ করেছিলেন। এই ঘটনা দক্ষ মেনে নিতে পারেননি। তিনি শিবকে কখনোই জামাতা হিসেবে সম্মান দেননি, বরং উদাসীন, শ্মশানবাসী শিবকে তিনি ঘৃণা করতেন। প্রতিশোধের স্পৃহায় দক্ষ একবার এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেন, যা ইতিহাসে ‘দক্ষযজ্ঞ’ নামে পরিচিত। সেই যজ্ঞে তিনি ত্রিভুবনের সবাইকে আমন্ত্রণ জানালেও নিজের মেয়ে সতী এবং জামাতা শিবকে আমন্ত্রণ জানাননি।
বাবার বাড়িতে যজ্ঞ হচ্ছে শুনে সতী বিনা নিমন্ত্রণেই সেখানে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর স্বামীর জন্য কোনো আসন রাখা হয়নি, বরং দক্ষ সবার সামনে শিবের চরম অপমান করছেন। স্বামীর এই অপমান সহ্য করতে না পেরে সতী যজ্ঞস্থলেই দেহত্যাগ করেন। এই সংবাদ শুনে শিবের ক্রোধে সৃষ্টি হয় এক প্রলয়ঙ্করী পরিস্থিতির। শিবের অনুচরেরা এবং বীরভদ্র এসে দক্ষের যজ্ঞ লণ্ডভণ্ড করে দেন এবং দক্ষের শিরশ্ছেদ করেন।
পরে শিবের ক্রোধ প্রশমিত হলে, দক্ষকে পুনরায় জীবনদান করা হয়, কিন্তু তাঁর কাটা মুণ্ডু আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই একটি ছাগ বা মেষের মাথা তাঁর স্কন্ধে জুড়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রাচীন চিত্রকলায় দক্ষকে তাই স্থূলকায়, ভুঁড়িযুক্ত এবং মেষের মাথাওয়ালা এক অবয়বে দেখা যায়।
ভাবলে অবাক লাগে, আজ আমরা যে শব্দটিকে ‘নিপুণতা’ বা ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ বোঝাতে ব্যবহার করি, তার উৎসে রয়েছে এক প্রবল অহংকারী রাজা, যিনি নিজের অহমিকার কারণে নিজের বিনাশ ডেকে এনেছিলেন।
‘দক্ষযজ্ঞ’ বাগধারাটি আজও বাংলায় ‘বিশাল হট্টগোল’ বা ‘লণ্ডভণ্ড পরিস্থিতি’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যা সেই পৌরাণিক ধ্বংসলীলারই স্মৃতি বহন করে। অথচ ব্যক্তি ‘দক্ষ’ শব্দটিতে লেগে আছে পারদর্শিতার তকমা।
যে দক্ষ এককালে শিবের অবমাননা করে নিজের সর্বনাশ করেছিলেন, আজ সেই দক্ষের নামই হয়ে উঠেছে কাজের নিপুণতার প্রতীক।
জ্বর: মহাদেবের ঘাম থেকে জন্ম নেওয়া এক অসুর
এবার আসা যাক ‘জ্বর’ শব্দটিতে। ঋতু পরিবর্তনের সময় কিংবা ভাইরাসের প্রকোপে আমাদের শরীর গরম হয়ে ওঠে, আমরা বলি ‘জ্বর এসেছে’। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি পাইরেক্সিয়া বা ফিভার। কিন্তু বাংলা লোকবিশ্বাস আর পুরাণের গল্পে ‘জ্বর’ কোনো সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, ‘জ্বর’ স্বয়ং এক জীবন্ত সত্তা, এক লৌকিক দেবতা, বা বলা ভালো— এক অসুর।
‘জ্বর’-এর জন্মবৃত্তান্ত বেশ রোমাঞ্চকর। তারানাথ তান্ত্রিক সমগ্র এবং বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যান অনুসারে, জ্বরের জন্ম স্বয়ং মহাদেব বা শিবের শরীর থেকে। একবার মহাদেব গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। সেই সময় কোনো এক কারণে (ভিন্ন মতে দক্ষযজ্ঞের বিনাশের সময় ক্রোধে) তাঁর কপাল থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ে। সেই ঘামবিন্দু থেকেই জন্ম হয় এক ভয়ঙ্কর দর্শন অসুরের, যার নাম হয় ‘জ্বরাসুর’।

জ্বরাসুর ছিল প্রবল শক্তিশালী। তার প্রভাবে মানুষের শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠত, কম্পন শুরু হতো। পুরাণে বর্ণিত আছে, একবার ভগবান বিষ্ণুর হয়গ্রীব অবতার এই জ্বরের কোপে পড়েছিলেন। জ্বরাসুরের তাপে দেবতারাও অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তখন বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে জ্বরাসুরকে আক্রমণ করেন। চক্রের আঘাতে জ্বরাসুর তিন টুকরো হয়ে নিহত হয়।
কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয়। মৃত্যুর পর ব্রহ্মার বরে জ্বরাসুর পুনরায় জীবিত হয়ে ওঠে। ব্রহ্মা তাকে বর দেন যে, সে পৃথিবীতে রোগ হিসেবে টিকে থাকবে। সেই থেকেই পৃথিবীতে জ্বরের উৎপত্তি। গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে সুন্দরবন এলাকায় আজও ‘জ্বরাসুর’-এর পূজা হয়। সেখানে তাঁকে ওলাবিবি বা শীতলা দেবীর মতো এক লৌকিক দেবতা হিসেবে গণ্য করা হয়, যিনি রুষ্ট হলে মহামারী দেখা দেয়, আর তুষ্ট থাকলে গ্রাম থাকে রোগমুক্ত।
মূর্তিকল্পে জ্বরাসুরকে দেখা যায় তিন মাথা, তিন পা, ছয় হাত এবং নয় চোখ বিশিষ্ট এক ভয়ঙ্কর সত্তা হিসেবে। এই তিন মাথা জ্বরের তিনটি অবস্থাকে নির্দেশ করে—বাত, পিত্ত এবং কফ। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও জ্বরের এই তিন দোষের কথা বলা হয়েছে।
আজ যখন আমরা থার্মোমিটার বগলে দিয়ে বলি ‘১০২ ডিগ্রি জ্বর’, তখন আমরা কি একবারও ভাবি যে, আমরা অজান্তেই পৌরাণিক এক চরিত্রের নাম উচ্চারণ করছি? আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে জ্বর নিছকই একটি উপসর্গ, কিন্তু বাংলা শব্দের গভীর ইতিহাসে এটি এক পরাক্রমশালী অসুর, যাকে স্বয়ং বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
আবহাওয়া: ফারসি বাতাসের বাংলা দাপট
আজকের দিনে আমরা যখন বলি ‘আজকের আবহাওয়াটা বেশ গুমোট’ বা ‘আবহাওয়া অফিস ঝড়ের সংকেত দিয়েছে’, তখন আমরা মূলত পরিবেশের বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থাকেই বোঝাই। কিন্তু এই ‘আবহাওয়া’ শব্দটির গঠন বিশ্লেষণ করলে এক চমৎকার ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়।
শব্দটি আসলে দুটি আলাদা শব্দের সন্ধি। ফারসি ভাষা থেকে এই শব্দটির আগমন। ফারসিতে ‘আব’ (آب) শব্দের অর্থ হলো পানি বা জল। আর ‘হাওয়া’ (هوا) শব্দের অর্থ হলো বাতাস। অর্থাৎ, আক্ষরিক অর্থে ‘আবহাওয়া’ মানে হলো ‘পানি ও বাতাস’।
এখন প্রশ্ন হলো, জলবায়ু বা পরিবেশ বোঝাতে পানি আর বাতাসকে কেন বেছে নেওয়া হলো?
প্রাচীনকালে মানুষ লক্ষ করেছিল যে পরিবেশের পরিবর্তন মূলত বাতাস এবং পানির সংমিশ্রণ বা আর্দ্রতার ওপরই নির্ভরশীল। বাতাসের গতিবেগ, দিক এবং তাতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ—এগুলোই ঠিক করে দেয় দিনটি কেমন যাবে। বৃষ্টি হবে নাকি রোদ উঠবে, শীত করবে নাকি গরম—সবই এই ‘আব’ আর ‘হাওয়া’র খেলা।
বাংলা ভাষায় ফারসি শব্দের প্রভাব সুগভীর। মুঘল ও সুলতানি আমলে রাজকার্য এবং আদালতের ভাষা ফারসি হওয়ার কারণে প্রচুর ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়ে এবং নিজস্ব হয়ে যায়। ‘আবহাওয়া’ তেমনই একটি শব্দ। এটি এত চমৎকারভাবে আমাদের ভাষায় মিশে গেছে যে একে এখন আর বিদেশি শব্দ বলে মনেই হয় না। অথচ এর শিকড় গাঁথা আছে মধ্যপ্রাচ্যের ভাষার মাটিতে। পরিবেশের পরিবর্তনশীল অবস্থা বোঝাতে বাঙালিরা সংস্কৃত ‘জলবায়ু’ শব্দের পাশাপাশি এই ফারসি শব্দটিকেও আপন করে নিয়েছে।
তাই পরের বার যখন ‘আবহাওয়া’ শব্দটি উচ্চারণ করবেন, মনে রাখবেন আপনি আসলে পানি (আব) এবং বাতাস (হাওয়া)—প্রকৃতির এই দুই আদি উপাদানের নাম একদমে নিচ্ছেন।
দূষণ: পরিবেশের শত্রু নাকি রাবণের সেনাপতি
আধুনিক বাংলায় ‘দূষণ’ একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং ভীতিকর শব্দ। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ–এই শব্দগুলো শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে কালো ধোঁয়া, বিষাক্ত জল আর আবর্জনার স্তূপ। ‘দূষণ’ মানেই যা কিছু অপবিত্র, নোংরা ও ক্ষতিকর।
কিন্তু রামায়ণের যুগে ফিরে গেলে দেখা যায়, ‘দূষণ’ কোনো আবর্জনা বা ধোঁয়া ছিল না। ‘দূষণ’ ছিলেন লঙ্কার রাজা রাবণের এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি এবং রাবণের বৈমাত্রেয় ভাই। রাবণের রাজ্য কেবল লঙ্কায় সীমাবদ্ধ ছিল না, ভারতের মূল ভূখণ্ডের গোদাবরী নদীর তীরবর্তী দণ্ডকারণ্যেও তার আধিপত্য ছিল। এই দণ্ডকারণ্য রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন রাবণের দুই ভাই খর ও দূষণ।
রামায়ণে বর্ণিত আছে, বনবাসের সময় রাম ও লক্ষ্মণ যখন দণ্ডকারণ্যে প্রবেশ করেন, তখন শূর্পণখার নাক কাটার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাক্ষসদের সঙ্গে রামের বিরোধ বাধে। বোন শূর্পণখার অপমানের প্রতিশোধ নিতে খর এবং দূষণ বিশাল রাক্ষস বাহিনী নিয়ে রামকে আক্রমণ করেন। সেই যুদ্ধে রামের তিরের আঘাতে সেনাপতি দূষণ নিহত হন।
এখন প্রশ্ন হলো, একজন রাক্ষস সেনাপতির নাম কেন ‘দূষণ’ হলো? সংস্কৃতে ‘দূষণ’ শব্দের অর্থ হলো যা দোষযুক্ত করে, যা কলুষিত করে বা যা পাপের জন্ম দেয়। রাক্ষস দূষণ সম্ভবত সেই কাজই করতেন—ঋষিদের যজ্ঞ পণ্ড করা, বন কলুষিত করা এবং পবিত্রতা নষ্ট করাই ছিল তাঁর কাজ।
আজ হাজার বছর পর সেই রাক্ষস মরে গেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর নাম বেঁচে আছে এক বিমূর্ত ধারণা হিসেবে। আজ যা কিছু আমাদের পৃথিবী বা প্রকৃতিকে ‘কলুষিত’ করে, তাকেই আমরা ‘দূষণ’ বলি। রামায়ণের দূষণকে রাম মেরে ফেলেছিলেন, কিন্তু আধুনিক যুগের প্লাস্টিক আর কার্বনের ‘দূষণ’ রাক্ষসকে মারা অতটা সহজ হচ্ছে না। শব্দের এই রূপান্তর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যা কিছু ক্ষতিকর, তা-ই ‘দূষণ’—সে রাক্ষস হোক বা কালো ধোঁয়া।
লজ্জা: সংকোচ নয়, উর্বরতার দেবী
আজকের সমাজে ‘লজ্জা’ শব্দটিকে প্রায়ই সংকোচ, শরম বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার অর্থে ব্যবহার করা হয়। বলা হয়, ‘মেয়েদের লজ্জা পেতে হয়’। কিন্তু এই ধারণাটি শব্দের আধুনিক এবং কিছুটা ভিক্টোরিয়ান বা রক্ষণশীল ব্যাখ্যা। প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলা এবং লোকবিশ্বাসে ‘লজ্জা’ বা ‘লজ্জা গৌরী’ এক অত্যন্ত শক্তিশালী দেবী।
প্রজাপতি দক্ষের কন্যা এবং পদ্ম-মস্তকযুক্ত হিন্দু দেবী হলেন লজ্জা গৌরী। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং মূর্তিকল্পে তাঁকে যেভাবে দেখানো হয়, তা আধুনিক ‘লজ্জা’র ধারণার পুরো বিপরীত। লজ্জা গৌরীর মূর্তিতে দেবীর কোনো মানবীয় মাথা থাকে না, তাঁর মস্তকের বদলে থাকে একটি প্রস্ফুটিত পদ্মফুল। তাঁকে প্রায়শই সন্তান প্রসবের ভঙ্গিতে বা পা ছড়িয়ে বসা অবস্থায় দেখানো হয়, যা উর্বরতা, যৌনতা এবং সৃষ্টির প্রাচুর্যের প্রতীক।

এই মূর্তিকল্পে ‘লজ্জা’ মানে নিজেকে লুকিয়ে রাখা নয়, বরং সৃষ্টির আদি সত্যকে নির্দ্বিধায় ধারণ করা। গ্রামীণ সমাজে শস্যের প্রাচুর্য এবং সুসন্তান লাভের আশায় লজ্জা গৌরীর পূজা করা হতো। তিনি ছিলেন মাটির উর্বরতা শক্তির প্রতীক। যিনি নতুন জীবন দেন, তাঁর আবার সংকোচ কীসের? তাঁর নাম ‘লজ্জা’ হওয়ার একটি কারণ হতে পারে তার বিনম্রতা, কিন্তু সেই বিনম্রতা দুর্বলতা নয়।
অথচ আজ আমরা ‘লজ্জা’ শব্দটিকে নারীর জন্য একটি শেকল বানিয়ে ফেলেছি। প্রাচীন ভারত যেখানে নারীর প্রজনন ক্ষমতা এবং সৃষ্টিশীলতাকে ‘লজ্জা গৌরী’রূপে পূজা করত, সেখানে আজ আমরা লজ্জা বলতে বুঝি জড়সড় হয়ে থাকা। শব্দের এই অর্থবদল প্রমাণ করে, সমাজ যত ‘আধুনিক’ হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আমাদের মনন ততটাই সংকুচিত হয়েছে। ‘লজ্জা’ আসলে জীবনেরই জয়গান, কোনো আড়াল করার বিষয় নয়।
*এই লেখাটি শব্দের পেছনের গল্প নিয়ে এক খেয়ালি ভ্রমণ। পৌরাণিক আখ্যানগুলো বিভিন্ন উৎসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হতে পারে, তাই এগুলোকে আক্ষরিকভাবে না নেওয়ার অনুরোধ রইল। বরং শব্দের এই যাত্রাপথকে উপভোগ করাই হোক আমাদের উদ্দেশ্য।

ভাষা প্রবহমান নদীর মতো; সময়ের আবর্তে শব্দের আভিধানিক অর্থ বদলে যাওয়া ভাষার চিরায়ত বাস্তবতা। আমরা প্রতিদিন হাজারও শব্দ ব্যবহার করি, যার কোনোটি আমাদের দক্ষতাকে প্রকাশ করে, কোনোটি লজ্জাকে আবার কোনোটি আমাদের শারীরিক অসুস্থতাকে। কিন্তু আমরা কজন জানি, এই নিতান্ত সাধারণ শব্দগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের পুরোনো বহু অলৌকিক আখ্যান?
বাংলা ভাষায় প্রতিদিনের ব্যবহৃত শব্দগুলোর পেছনে আছে নানা গল্প। আজ ভাষা দিবসে তেমন কিছু শব্দের পেছনের গল্প জানা যাক।
দক্ষ: নিছকই পটুতা নাকি এক করুণ ট্র্যাজেডি
‘দক্ষ’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি, যিনি তাঁর কাজে অত্যন্ত পটু, নিপুণ এবং অভিজ্ঞ। আমরা বলি ‘দক্ষ কারিগর’, ‘দক্ষ প্রশাসক’ কিংবা ‘দক্ষ যোদ্ধা’। আধুনিক বাংলায় ‘দক্ষ’ মানেই হলো পজিটিভ কিছু, যোগ্যতার মাপকাঠি। কিন্তু হিন্দু পুরাণের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই ‘দক্ষ’ শব্দটি এসেছে এক প্রবল প্রতাপশালী কিন্তু অহংকারী চরিত্রের নাম থেকে, যার পরিণতি ছিল ভয়াবহ।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দক্ষ হলেন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার পুত্র, অর্থাৎ ব্রহ্মার মানসপুত্র। সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মার ১০ জন মানসপুত্রের জন্ম হয়, যাদের মধ্যে দক্ষ ছিলেন অন্যতম। তাঁকে বলা হয় ‘দক্ষ প্রজাপতি’। পুরাণ বলছে, ব্রহ্মা তাঁর ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল থেকে দক্ষকে সৃষ্টি করেছিলেন। এই দক্ষ ছিলেন সৃষ্টির দেবতা, কিন্তু তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অহমিকা।

দক্ষের গল্পটি মূলত শিব এবং সতীর সঙ্গে সম্পর্কিত। দক্ষের কন্যা সতী বাবার অমতে মহাদেব শিবকে বিবাহ করেছিলেন। এই ঘটনা দক্ষ মেনে নিতে পারেননি। তিনি শিবকে কখনোই জামাতা হিসেবে সম্মান দেননি, বরং উদাসীন, শ্মশানবাসী শিবকে তিনি ঘৃণা করতেন। প্রতিশোধের স্পৃহায় দক্ষ একবার এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেন, যা ইতিহাসে ‘দক্ষযজ্ঞ’ নামে পরিচিত। সেই যজ্ঞে তিনি ত্রিভুবনের সবাইকে আমন্ত্রণ জানালেও নিজের মেয়ে সতী এবং জামাতা শিবকে আমন্ত্রণ জানাননি।
বাবার বাড়িতে যজ্ঞ হচ্ছে শুনে সতী বিনা নিমন্ত্রণেই সেখানে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর স্বামীর জন্য কোনো আসন রাখা হয়নি, বরং দক্ষ সবার সামনে শিবের চরম অপমান করছেন। স্বামীর এই অপমান সহ্য করতে না পেরে সতী যজ্ঞস্থলেই দেহত্যাগ করেন। এই সংবাদ শুনে শিবের ক্রোধে সৃষ্টি হয় এক প্রলয়ঙ্করী পরিস্থিতির। শিবের অনুচরেরা এবং বীরভদ্র এসে দক্ষের যজ্ঞ লণ্ডভণ্ড করে দেন এবং দক্ষের শিরশ্ছেদ করেন।
পরে শিবের ক্রোধ প্রশমিত হলে, দক্ষকে পুনরায় জীবনদান করা হয়, কিন্তু তাঁর কাটা মুণ্ডু আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই একটি ছাগ বা মেষের মাথা তাঁর স্কন্ধে জুড়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রাচীন চিত্রকলায় দক্ষকে তাই স্থূলকায়, ভুঁড়িযুক্ত এবং মেষের মাথাওয়ালা এক অবয়বে দেখা যায়।
ভাবলে অবাক লাগে, আজ আমরা যে শব্দটিকে ‘নিপুণতা’ বা ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ বোঝাতে ব্যবহার করি, তার উৎসে রয়েছে এক প্রবল অহংকারী রাজা, যিনি নিজের অহমিকার কারণে নিজের বিনাশ ডেকে এনেছিলেন।
‘দক্ষযজ্ঞ’ বাগধারাটি আজও বাংলায় ‘বিশাল হট্টগোল’ বা ‘লণ্ডভণ্ড পরিস্থিতি’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যা সেই পৌরাণিক ধ্বংসলীলারই স্মৃতি বহন করে। অথচ ব্যক্তি ‘দক্ষ’ শব্দটিতে লেগে আছে পারদর্শিতার তকমা।
যে দক্ষ এককালে শিবের অবমাননা করে নিজের সর্বনাশ করেছিলেন, আজ সেই দক্ষের নামই হয়ে উঠেছে কাজের নিপুণতার প্রতীক।
জ্বর: মহাদেবের ঘাম থেকে জন্ম নেওয়া এক অসুর
এবার আসা যাক ‘জ্বর’ শব্দটিতে। ঋতু পরিবর্তনের সময় কিংবা ভাইরাসের প্রকোপে আমাদের শরীর গরম হয়ে ওঠে, আমরা বলি ‘জ্বর এসেছে’। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি পাইরেক্সিয়া বা ফিভার। কিন্তু বাংলা লোকবিশ্বাস আর পুরাণের গল্পে ‘জ্বর’ কোনো সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, ‘জ্বর’ স্বয়ং এক জীবন্ত সত্তা, এক লৌকিক দেবতা, বা বলা ভালো— এক অসুর।
‘জ্বর’-এর জন্মবৃত্তান্ত বেশ রোমাঞ্চকর। তারানাথ তান্ত্রিক সমগ্র এবং বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যান অনুসারে, জ্বরের জন্ম স্বয়ং মহাদেব বা শিবের শরীর থেকে। একবার মহাদেব গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। সেই সময় কোনো এক কারণে (ভিন্ন মতে দক্ষযজ্ঞের বিনাশের সময় ক্রোধে) তাঁর কপাল থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ে। সেই ঘামবিন্দু থেকেই জন্ম হয় এক ভয়ঙ্কর দর্শন অসুরের, যার নাম হয় ‘জ্বরাসুর’।

জ্বরাসুর ছিল প্রবল শক্তিশালী। তার প্রভাবে মানুষের শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠত, কম্পন শুরু হতো। পুরাণে বর্ণিত আছে, একবার ভগবান বিষ্ণুর হয়গ্রীব অবতার এই জ্বরের কোপে পড়েছিলেন। জ্বরাসুরের তাপে দেবতারাও অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তখন বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে জ্বরাসুরকে আক্রমণ করেন। চক্রের আঘাতে জ্বরাসুর তিন টুকরো হয়ে নিহত হয়।
কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয়। মৃত্যুর পর ব্রহ্মার বরে জ্বরাসুর পুনরায় জীবিত হয়ে ওঠে। ব্রহ্মা তাকে বর দেন যে, সে পৃথিবীতে রোগ হিসেবে টিকে থাকবে। সেই থেকেই পৃথিবীতে জ্বরের উৎপত্তি। গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে সুন্দরবন এলাকায় আজও ‘জ্বরাসুর’-এর পূজা হয়। সেখানে তাঁকে ওলাবিবি বা শীতলা দেবীর মতো এক লৌকিক দেবতা হিসেবে গণ্য করা হয়, যিনি রুষ্ট হলে মহামারী দেখা দেয়, আর তুষ্ট থাকলে গ্রাম থাকে রোগমুক্ত।
মূর্তিকল্পে জ্বরাসুরকে দেখা যায় তিন মাথা, তিন পা, ছয় হাত এবং নয় চোখ বিশিষ্ট এক ভয়ঙ্কর সত্তা হিসেবে। এই তিন মাথা জ্বরের তিনটি অবস্থাকে নির্দেশ করে—বাত, পিত্ত এবং কফ। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও জ্বরের এই তিন দোষের কথা বলা হয়েছে।
আজ যখন আমরা থার্মোমিটার বগলে দিয়ে বলি ‘১০২ ডিগ্রি জ্বর’, তখন আমরা কি একবারও ভাবি যে, আমরা অজান্তেই পৌরাণিক এক চরিত্রের নাম উচ্চারণ করছি? আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে জ্বর নিছকই একটি উপসর্গ, কিন্তু বাংলা শব্দের গভীর ইতিহাসে এটি এক পরাক্রমশালী অসুর, যাকে স্বয়ং বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
আবহাওয়া: ফারসি বাতাসের বাংলা দাপট
আজকের দিনে আমরা যখন বলি ‘আজকের আবহাওয়াটা বেশ গুমোট’ বা ‘আবহাওয়া অফিস ঝড়ের সংকেত দিয়েছে’, তখন আমরা মূলত পরিবেশের বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থাকেই বোঝাই। কিন্তু এই ‘আবহাওয়া’ শব্দটির গঠন বিশ্লেষণ করলে এক চমৎকার ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়।
শব্দটি আসলে দুটি আলাদা শব্দের সন্ধি। ফারসি ভাষা থেকে এই শব্দটির আগমন। ফারসিতে ‘আব’ (آب) শব্দের অর্থ হলো পানি বা জল। আর ‘হাওয়া’ (هوا) শব্দের অর্থ হলো বাতাস। অর্থাৎ, আক্ষরিক অর্থে ‘আবহাওয়া’ মানে হলো ‘পানি ও বাতাস’।
এখন প্রশ্ন হলো, জলবায়ু বা পরিবেশ বোঝাতে পানি আর বাতাসকে কেন বেছে নেওয়া হলো?
প্রাচীনকালে মানুষ লক্ষ করেছিল যে পরিবেশের পরিবর্তন মূলত বাতাস এবং পানির সংমিশ্রণ বা আর্দ্রতার ওপরই নির্ভরশীল। বাতাসের গতিবেগ, দিক এবং তাতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ—এগুলোই ঠিক করে দেয় দিনটি কেমন যাবে। বৃষ্টি হবে নাকি রোদ উঠবে, শীত করবে নাকি গরম—সবই এই ‘আব’ আর ‘হাওয়া’র খেলা।
বাংলা ভাষায় ফারসি শব্দের প্রভাব সুগভীর। মুঘল ও সুলতানি আমলে রাজকার্য এবং আদালতের ভাষা ফারসি হওয়ার কারণে প্রচুর ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়ে এবং নিজস্ব হয়ে যায়। ‘আবহাওয়া’ তেমনই একটি শব্দ। এটি এত চমৎকারভাবে আমাদের ভাষায় মিশে গেছে যে একে এখন আর বিদেশি শব্দ বলে মনেই হয় না। অথচ এর শিকড় গাঁথা আছে মধ্যপ্রাচ্যের ভাষার মাটিতে। পরিবেশের পরিবর্তনশীল অবস্থা বোঝাতে বাঙালিরা সংস্কৃত ‘জলবায়ু’ শব্দের পাশাপাশি এই ফারসি শব্দটিকেও আপন করে নিয়েছে।
তাই পরের বার যখন ‘আবহাওয়া’ শব্দটি উচ্চারণ করবেন, মনে রাখবেন আপনি আসলে পানি (আব) এবং বাতাস (হাওয়া)—প্রকৃতির এই দুই আদি উপাদানের নাম একদমে নিচ্ছেন।
দূষণ: পরিবেশের শত্রু নাকি রাবণের সেনাপতি
আধুনিক বাংলায় ‘দূষণ’ একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং ভীতিকর শব্দ। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ–এই শব্দগুলো শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে কালো ধোঁয়া, বিষাক্ত জল আর আবর্জনার স্তূপ। ‘দূষণ’ মানেই যা কিছু অপবিত্র, নোংরা ও ক্ষতিকর।
কিন্তু রামায়ণের যুগে ফিরে গেলে দেখা যায়, ‘দূষণ’ কোনো আবর্জনা বা ধোঁয়া ছিল না। ‘দূষণ’ ছিলেন লঙ্কার রাজা রাবণের এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি এবং রাবণের বৈমাত্রেয় ভাই। রাবণের রাজ্য কেবল লঙ্কায় সীমাবদ্ধ ছিল না, ভারতের মূল ভূখণ্ডের গোদাবরী নদীর তীরবর্তী দণ্ডকারণ্যেও তার আধিপত্য ছিল। এই দণ্ডকারণ্য রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন রাবণের দুই ভাই খর ও দূষণ।
রামায়ণে বর্ণিত আছে, বনবাসের সময় রাম ও লক্ষ্মণ যখন দণ্ডকারণ্যে প্রবেশ করেন, তখন শূর্পণখার নাক কাটার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাক্ষসদের সঙ্গে রামের বিরোধ বাধে। বোন শূর্পণখার অপমানের প্রতিশোধ নিতে খর এবং দূষণ বিশাল রাক্ষস বাহিনী নিয়ে রামকে আক্রমণ করেন। সেই যুদ্ধে রামের তিরের আঘাতে সেনাপতি দূষণ নিহত হন।
এখন প্রশ্ন হলো, একজন রাক্ষস সেনাপতির নাম কেন ‘দূষণ’ হলো? সংস্কৃতে ‘দূষণ’ শব্দের অর্থ হলো যা দোষযুক্ত করে, যা কলুষিত করে বা যা পাপের জন্ম দেয়। রাক্ষস দূষণ সম্ভবত সেই কাজই করতেন—ঋষিদের যজ্ঞ পণ্ড করা, বন কলুষিত করা এবং পবিত্রতা নষ্ট করাই ছিল তাঁর কাজ।
আজ হাজার বছর পর সেই রাক্ষস মরে গেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর নাম বেঁচে আছে এক বিমূর্ত ধারণা হিসেবে। আজ যা কিছু আমাদের পৃথিবী বা প্রকৃতিকে ‘কলুষিত’ করে, তাকেই আমরা ‘দূষণ’ বলি। রামায়ণের দূষণকে রাম মেরে ফেলেছিলেন, কিন্তু আধুনিক যুগের প্লাস্টিক আর কার্বনের ‘দূষণ’ রাক্ষসকে মারা অতটা সহজ হচ্ছে না। শব্দের এই রূপান্তর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যা কিছু ক্ষতিকর, তা-ই ‘দূষণ’—সে রাক্ষস হোক বা কালো ধোঁয়া।
লজ্জা: সংকোচ নয়, উর্বরতার দেবী
আজকের সমাজে ‘লজ্জা’ শব্দটিকে প্রায়ই সংকোচ, শরম বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার অর্থে ব্যবহার করা হয়। বলা হয়, ‘মেয়েদের লজ্জা পেতে হয়’। কিন্তু এই ধারণাটি শব্দের আধুনিক এবং কিছুটা ভিক্টোরিয়ান বা রক্ষণশীল ব্যাখ্যা। প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলা এবং লোকবিশ্বাসে ‘লজ্জা’ বা ‘লজ্জা গৌরী’ এক অত্যন্ত শক্তিশালী দেবী।
প্রজাপতি দক্ষের কন্যা এবং পদ্ম-মস্তকযুক্ত হিন্দু দেবী হলেন লজ্জা গৌরী। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং মূর্তিকল্পে তাঁকে যেভাবে দেখানো হয়, তা আধুনিক ‘লজ্জা’র ধারণার পুরো বিপরীত। লজ্জা গৌরীর মূর্তিতে দেবীর কোনো মানবীয় মাথা থাকে না, তাঁর মস্তকের বদলে থাকে একটি প্রস্ফুটিত পদ্মফুল। তাঁকে প্রায়শই সন্তান প্রসবের ভঙ্গিতে বা পা ছড়িয়ে বসা অবস্থায় দেখানো হয়, যা উর্বরতা, যৌনতা এবং সৃষ্টির প্রাচুর্যের প্রতীক।

এই মূর্তিকল্পে ‘লজ্জা’ মানে নিজেকে লুকিয়ে রাখা নয়, বরং সৃষ্টির আদি সত্যকে নির্দ্বিধায় ধারণ করা। গ্রামীণ সমাজে শস্যের প্রাচুর্য এবং সুসন্তান লাভের আশায় লজ্জা গৌরীর পূজা করা হতো। তিনি ছিলেন মাটির উর্বরতা শক্তির প্রতীক। যিনি নতুন জীবন দেন, তাঁর আবার সংকোচ কীসের? তাঁর নাম ‘লজ্জা’ হওয়ার একটি কারণ হতে পারে তার বিনম্রতা, কিন্তু সেই বিনম্রতা দুর্বলতা নয়।
অথচ আজ আমরা ‘লজ্জা’ শব্দটিকে নারীর জন্য একটি শেকল বানিয়ে ফেলেছি। প্রাচীন ভারত যেখানে নারীর প্রজনন ক্ষমতা এবং সৃষ্টিশীলতাকে ‘লজ্জা গৌরী’রূপে পূজা করত, সেখানে আজ আমরা লজ্জা বলতে বুঝি জড়সড় হয়ে থাকা। শব্দের এই অর্থবদল প্রমাণ করে, সমাজ যত ‘আধুনিক’ হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আমাদের মনন ততটাই সংকুচিত হয়েছে। ‘লজ্জা’ আসলে জীবনেরই জয়গান, কোনো আড়াল করার বিষয় নয়।
*এই লেখাটি শব্দের পেছনের গল্প নিয়ে এক খেয়ালি ভ্রমণ। পৌরাণিক আখ্যানগুলো বিভিন্ন উৎসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হতে পারে, তাই এগুলোকে আক্ষরিকভাবে না নেওয়ার অনুরোধ রইল। বরং শব্দের এই যাত্রাপথকে উপভোগ করাই হোক আমাদের উদ্দেশ্য।

ভাষা শুধু মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, ভাষা একটি জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনবোধ ও আত্মপরিচয়ের ধারক। ভাষার ভেতর লুকিয়ে থাকে একটি জনগোষ্ঠীর শতাব্দী-প্রাচীন স্মৃতি, বিশ্বাস, লোকজ জ্ঞান, জীবনবোধ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন।
৩ ঘণ্টা আগে
এ লেখাটি লেখার আগে সচেতনভাবে কখনো খেয়ালই করিনি, এখন আমরা কথা বলার আগে একটু থেমে যাই। এটা এতটাই স্বাভাবিক যে, আমরা আর প্রশ্নই করি না, এই ‘থামা’ কবে থেকে আমাদের স্বভাব হয়ে গেল
৩ ঘণ্টা আগে
ভাষাবিজ্ঞানের চিরায়ত ধারণায় বলা হতো, কোনো ভাষা একবার তার শেষ স্থানীয় বক্তা বা নেটিভ স্পিকাকে হারালে, অর্থাৎ মৃত বা বিলুপ্ত হলে, তা আর কখনোই স্বাভাবিক কথ্যরপে ফিরে আসতে পারে না। কিন্তু গত শতকে ইউরোপের একটি প্রান্তিক ভাষা এই অসম্ভবকে সম্ভব করে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।
৪ ঘণ্টা আগে
চর্যাপদের সেই প্রাচীন পঙ্ক্তি থেকে শুরু করে আজকের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চ্যাটবক্স—বাংলা ভাষার এই দীর্ঘ পরিক্রমা শুধু সময়ের বিবর্তন নয়, এক মহাকাব্যিক রূপান্তর।
৫ ঘণ্টা আগে