
ভাষাবিজ্ঞানের চিরায়ত ধারণায় বলা হতো, কোনো ভাষা একবার তার শেষ স্থানীয় বক্তা বা নেটিভ স্পিকাকে হারালে, অর্থাৎ মৃত বা বিলুপ্ত হলে, তা আর কখনোই স্বাভাবিক কথ্যরপে ফিরে আসতে পারে না। কিন্তু গত শতকে ইউরোপের একটি প্রান্তিক ভাষা এই অসম্ভবকে সম্ভব করে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে। সেই ভাষাটি হলো যুক্তরাজ্যের কর্নওয়াল অঞ্চলের কেল্টিক ভাষা ‘কর্নিশ’। ১৭৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষিত হওয়ার প্রায় দেড়শ বছর পর, গবেষক ও ভাষাপ্রেমীদের নিরলস প্রচেষ্টায় কর্নিশ আজ পুনরায় জীবিত।
কর্নিশ ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের কেল্টিক শাখার ব্রাইথনিক উপদলের অন্তর্গত। এটি ওয়েলশ এবং ব্রেটন ভাষার নিকটাত্মীয়। মধ্যযুগে কর্নওয়ালজুড়ে এই ভাষাটিই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু ১৫৪৯ সালের ‘প্রেয়ার বুক রিবেলিয়ন’-এর পর থেকে ইংরেজি ভাষার আগ্রাসনে কর্নিশ কোণঠাসা হতে শুরু করে। গির্জা ও রাজদরবারে ইংরেজি ভাষার বাধ্যতামূলক প্রচলন কর্নিশকে কেবল দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভাষায় পরিণত করে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই ভাষার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়। ১৭৭৭ সালে কর্নওয়ালের মাউসহোল গ্রামের বাসিন্দা ডলি পেনট্রেথের মৃত্যুকে ইতিহাসের পাতায় কর্নিশ ভাষার ‘মৃত্যু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ডলিকে ঐতিহ্যগতভাবে কর্নিশ ভাষার ‘সর্বশেষ একভাষী বক্তা’ হিসেবে গণ্য করা হতো, যিনি ইংরেজি জানতেন না বা ব্যবহার করতেন না। তবে আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, ডলির মৃত্যুর পরও স্বল্প পরিসরে ভাষাটি টিকে ছিল। ১৮৯১ সালে জন ডেভি নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয়, যাকে কর্নিশ ভাষার আংশিক দক্ষ সর্বশেষ ঐতিহ্যবাহী বক্তা মনে করা হয়। জন ডেভির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কর্নিশ ভাষাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মৃত’ বা ‘বিলুপ্ত’ ঘোষণা করা হয়।
এই ভাষাটি যখন ইতিহাসের আর্কাইভে ধুলো জমছিল, তখন বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এক অভূতপূর্ব বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সূচনা হয়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কর্মচারী এবং ভাষাতাত্ত্বিক হেনরি জেনার বিশ্বাস করতেন, কর্নিশ ভাষা কর্নওয়ালের জাতীয় সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, নাটক এবং মৌখিক ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ জোড়া লাগিয়ে ভাষাটিকে পুনরুদ্ধারের ব্রত নেন।
১৯০৪ সালে জেনার প্রকাশ করেন তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘অ্যা হ্যান্ডবুক অব দ্য কর্নিশ ল্যাঙ্গুয়েজ’। এই বইটিকে কর্নিশ ভাষা পুনর্জাগরণের ‘ম্যাগনা কার্টা’ বলা যেতে পারে। জেনারের বিখ্যাত উক্তি, 'হোয়াই শুড কর্নিশ প্রিজার্ভ? বিকজ ইট ইজ দ্য সৌল অব কর্নওয়াল'—ভাষা আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়। জেনারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রবার্টর মটন ন্যান্স ১৯২৯ সালে ‘ইউনিফায়েড কর্নিশ’ নামে ভাষাটির একটি প্রমিত রূপ দাঁড় করান, যা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষা শিক্ষার পথ সুগম করে।
একটি মৃত ভাষাকে দৈনন্দিন জীবনে ফিরিয়ে আনা ছিল অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে কর্নিশ ভাষার বানানরীতি ও উচ্চারণ নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয় (যেমন—Kemmyn, Unified, Modern)। তবে ২০০৮ সালে সকল পক্ষ মিলে একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড রিটেন ফর্ম’ (এসআরএফ) গ্রহণ করে, যা সরকারি ও শিক্ষাগত কাজে ব্যবহারের উপযোগী হয়।
ধীরে ধীরে কর্নওয়ালের স্কুলগুলোতে কর্নিশ ভাষা শিক্ষা ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে চালু হয়। রাস্তাঘাটের সাইনবোর্ড দ্বিভাষিক (ইংরেজি ও কর্নিশ) করা হয় এবং সংগীত, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে ভাষাটির ব্যবহার বাড়তে থাকে। বর্তমানে কর্নওয়ালের স্থানীয় সরকার দাপ্তরিক কাজেও সীমিত পরিসরে কর্নিশ ভাষা ব্যবহার করছে।
কর্নিশ ভাষার পুনর্জাগরণের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে ২০১০ সালে (ঘোষণা ২০০৯)। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেসকো) তাদের ‘অ্যাটলাস অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ডেঞ্জার’-এ কর্নিশ ভাষার মর্যাদা ‘বিলুপ্ত’ থেকে পরিবর্তন করে ‘চরমভাবে বিপন্ন’তে উন্নীত করে। এটি ছিল ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা, যেখানে একটি মৃত ঘোষিত ভাষা পুনরায় জীবিত ভাষার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৩,০০০ মানুষ কর্নিশ ভাষায় সাধারণ কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ থেকে ১,০০০ জন মানুষ এই ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ এবং তারা তাদের সন্তানদের মাতৃভাষা হিসেবে কর্নিশ শেখাচ্ছেন। এই নতুন প্রজন্মের বক্তারা ভাষাটিকে আর ‘মৃত’ নয়, বরং একটি ‘জীবন্ত ও বিকাশমান’ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
কর্নিশ ভাষার এই পুনরুত্থান প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগনের সাংস্কৃতিক সচেতনতা থাকলে কোনো ভাষাই চিরতরে হারিয়ে যায় না। ১৭৭৭ সালে ডলি পেনট্রেথের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছিল, একবিংশ শতাব্দীতে হাজারো নতুন বক্তার কণ্ঠে তা আবার নতুন করে রচিত হচ্ছে। কর্নিশ ভাষার এই সাফল্য আজ বিশ্বের হাজারো বিপন্ন ভাষার জন্য এক আলোকবর্তিকা। এটি আমাদের শেখায়, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ডিএনএ—যাকে চাইলেই পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
.png)

পুরান ঢাকার অলি-গলি ধরে চলতে গিয়ে কখনও কি মনে হয়েছে ‘হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হাঁটছেন’? বাতাসে ‘প্রাচীন প্রাচীন’ গন্ধ, পলেস্তারা উঠে যাওয়া দালানে মিশে আছে ফেলে আসা অতীতের স্মৃতি, মানুষগুলোও যেন পুরোনো সময়ের সাক্ষী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এলাকাজুড়ে। পুরোনো এসব এলাকার নামের পেছনেও আছে অতীতের ইতিহাস। অ
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘মি. ওসমানী, আপনি কি জানেন আপনার উচ্চতা কম?’ কিংস কলেজের ভাইভা বোর্ডে প্রশ্নটা শুনে তরুণ আতাউল গণি ওসমানী মোটেই বিচলিত হলেন না। শান্তভাবে বললেন, ‘জি, জানি।’
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বঙ্গভবন। ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা দিলকুশার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবন অনেক কিছুর সাক্ষী। গল্পটা শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। তখন এই জায়গায় ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের একটি বাগানবাড়ি। পরে সরকার সেটি কিনে নেয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর এর নাম হয় ‘গভর্নমেন্ট হাউস’। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে, ভবনটির নাম পাল্টে রাখা
২৩ আগস্ট ২০২৬
মশা ছোট। এতটাই ছোট যে হাতের এক চাপে তার অস্তিত্ব মুছে যায়। কিন্তু ইতিহাসের ওপর তার ছাপ মুছে ফেলা এত সহজ নয়। এই ক্ষুদ্র প্রাণী কখনো সেনাবাহিনী দুর্বল করেছে, কখনো যুদ্ধের ফলাফল বদলে দিয়েছে, আবার কখনো জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। উপনিবেশ বিস্তার থেকে শুরু করে মানবসভ্যতার নানা গুরুত্বপূর্ণ বাঁকেও মশাবাহিত
২০ আগস্ট ২০২৬