জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

‘উগ্রবাদ’ঠেকাতে ভারত এখন ইসরায়েলের পরম বন্ধু

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩: ১২
প্রতীকী ছবি

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই জোটের মূল লক্ষ্য হবে ‘উগ্রবাদী’ শত্রুদের সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা। গতকাল রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন ইসরায়েল সফর উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু জানান, ভারত হবে এই জোটের অন্যতম প্রধান অংশীদার।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু এই জোট গঠনের মাধ্যমে ইরান ও তার মিত্রদের মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক মেরুকরণ তৈরির চেষ্টা করছেন।

২৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো ইসরায়েল সফরে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৭ সালে প্রথম সফরের পর থেকে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একসময়ের গোপন সম্পর্ক এখন নয়াদিল্লির অন্যতম প্রকাশ্য মৈত্রীতে পরিণত হয়েছে। গাজায় গণহত্যার অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও মোদি বারবার বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে তাঁর ‘প্রিয় বন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন।

গতকাল নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, মন্ত্রিপরিষদে আমার প্রিয় বন্ধু নরেন্দ্র মোদির সফরের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী বুধবার তিনি ইসরায়েলে আসছেন। উদ্ভাবন, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত লক্ষ্যের ক্ষেত্রে ইসরায়েল ও ভারত একে অপরের অংশীদার।

নেতানিয়াহু আরও বলেছেন, ইসরায়েল পশ্চিম এশিয়া এবং এর আশপাশে সমমনা দেশগুলোকে নিয়ে একটি জোট গঠন করতে চায়। এই জোটের নাম দেওয়া হয়েছে ‘হেক্সাগন অব অ্যালায়েন্সেস’। এই জোটের লক্ষ্য হবে ‘র‍্যাডিক্যাল’ বা উগ্রবাদী শত্রুদের সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা।

নেতানিয়াহুর মতে পশ্চিম এশিয়া এবং আশপাশের মোট ৬টি দেশ নিয়ে হবে এই জোট। এই জোটে ভারত ছাড়াও গ্রিস, সাইপ্রাস এবং দুটি আফ্রিকান ও এশীয় দেশ থাকতে পারে। নেতানিয়াহু এই জোটকে ইরান এবং ‘উগ্রবাদের পক্ষে থাকা’ আরব দেশগুলোর পাল্টা অবস্থান হিসেবে দেখছেন।

এদিকে, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম অবশ্য নেতানিয়াহুর এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, এই প্রস্তাব ফিলিস্তিনের কৌশলগত স্বার্থের জন্য সরাসরি হুমকি। হাজেম কাসেমের মতে, ইসরায়েল এই অঞ্চলকে এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে যা কেবল দখলদারদের স্বার্থ রক্ষা করবে। আমরা আরব রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানাই তারা যেন এই চক্রান্তের বিপদ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব বুঝতে পারে।

মোদির এই সফরকে ‘বাস্তববাদী মোড়’ হিসেবে দেখছেন ভারতীয় কূটনীতিকরা। তবে নয়াদিল্লির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘পলিসি পারসপেক্টিভস ফাউন্ডেশন’-এর সিনিয়র ফেলো আনোয়ার আলম বলেন, ‘ভারতের এই তথাকথিত বাস্তববাদী অবস্থান গ্লোবাল সাউথে দেশটির নৈতিক শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মোদির এই সফর মূলত ইসরায়েলের বর্ণবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই বৈধতা দিচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালে ভারত জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিভক্তির বিরোধিতা করেছিল ও ১৯৮৮ সালে প্রথম অনারব দেশ হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৯২ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে সেই সমীকরণ বদলাতে শুরু করে।

২০১৪ সালে মোদির ক্ষমতায় আসা এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ও ইসরায়েলের জায়নবাদী ভাবধারার মধ্যে বিশেষ মিল রয়েছে। উভয় পক্ষই ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’কে বড় হুমকি হিসেবে দেখে। বর্তমানে ভারত ইসরায়েলের বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা দেশ। ২০২৪ সালেও ইসরায়েল যখন গাজায় হামলা চালাচ্ছে, তখন ভারতীয় কোম্পানিগুলো সেখানে রকেট ও বিস্ফোরক সরবরাহ করেছে। এবারের সফরে ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সমঝোতা স্মারক সই করার কথা রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রজেক্ট ডিরেক্টর ম্যাক্স রডেনবেক বলেন, ‘মোদির এই সফর নেতানিয়াহুর জন্য ব্যক্তিগত অনুগ্রহের মতো। ইসরায়েল যখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় একাকী হয়ে পড়েছে, তখন মোদির মতো একজন বিশ্বনেতার সফর তাঁর ইমেজ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।’ অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের কবির তানেজা বলেন, ‘ইসরায়েলের বর্তমানে খুব বেশি বন্ধু নেই, ভারত সেই অভাব পূরণ করছে।’

সম্প্রতি জেফরি এপস্টেইন ফাইলের কারণে মোদির ২০১৭ সালের সফর আলোচনায় এসেছে। নথিতে দেখা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খুশি করতে যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের কাছে পরামর্শ চান মোদি। তাঁর পরামর্শেই ২০১৭ সালে মোদির ইসরায়েল সফর হয়েছিল। ই-মেইল তথ্যে উঠে এসেছে ইসরায়েল গিয়ে মোদির নাচ-গান করার কথাও। ভারত অবশ্য একে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

ট্রাম্পের চাপে ভারত ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছে এবং চাবাহার বন্দরের কাজও বর্তমানে স্তিমিত। ম্যাক্স রডেনবেক মনে করেন, ভারত ভবিষ্যতের এমন এক মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকিয়ে আছে যেখানে ইরান দুর্বল হয়ে পড়বে এবং ইসরায়েল এই অঞ্চলের মূল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। মোদি বিশ্বাস করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের গুডবুকে থাকা সহজ হবে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত