জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রামেক হাসপাতাল

জাপানি বলে দিল চীনের লিফট, তদন্তে ফাঁস গোমর

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩: ০৪
রামেকে লিফট স্থাপন নিয়ে বড় দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংগৃহীত ছবি

জাপানের তৈরি লিফট স্থাপনে ঠিকাদারকে চাহিদা দেয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পণ্য পেলেও সেটি চীনের। অবশ্য লিফটি জাপানের প্রমাণে মরিয়া ছিলেন ঠিকাদার। এ জন্য তিনি জাপানি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ই-মেইল খুলে চিঠি চালাচালি করেন। তদন্তে জালিয়াতি ধরা পড়ার পরও গণপূর্ত বিভাগের বিরুদ্ধে ঠিকাদারের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, রামেকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) চালুর জন্য ২০২১ সালে দরপত্র আহ্বান করে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২। ১০ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার টাকার কাজটি পায় রাজশাহীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশন’। লিফট ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় কিছু কাজ ছিল।

আইসিইউ ভবনে ২০২৪ সালে লিফট বসানো হয়। দরপত্রের শর্তে ‘এ’ গ্রেড থাকলেও ঠিকাদার সরবরাহ করে ‘সি’ গ্রেডের লিফট। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানালে তদন্তে গণপূর্ণ অধিদপ্তর অনিয়ম পায়। ২০২৪ সালের ৬ মে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে বলা হয়, দরপত্রের শর্ত না মেনে সাধারণ মানের কম দামি লিফট দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান লিফটি সরিয়ে নেয় এবং গত বছরের মে মাসের মধ্যে দরপত্র অনুযায়ী নতুন লিফট বসানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজটি না করাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি দেয়। অবশেষে সেই লিফট আসে গত বছরের ১ অক্টোবর। কিন্তু এবার আরও ভয়াবহ জালিয়াতি করেছেন ঠিকাদার।

নতুন করে নতুন জালিয়াতি

লিফটটির বাংলাদেশি আমদানিকারক ‘সেল করপোরেশন বিডি’। দ্বিতীয় দফায় লিফট আনার পর বন্দরে ইন্সপেকশনের কথা থাকলেও করেনি গণপূর্ণ বিভাগ। সন্দেহ হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) দুই অধ্যাপককে রেখে তদন্ত কমিটি করে। তাদের তদন্তে ধরা পড়ে নতুন জালিয়াতি।

গত বছরের ৪ অক্টোবর তদন্ত কমিটি গঠনের পর তারা ওই মাসের ১৪ এবং পরের মাসের ৪ ও ১১ তারিখে তিন দফায় লিফট-সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে। পরে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদন পাঠান।

এতে বলা হয়, লিফট খুলে নিয়ে যাওয়ার পর রামেক হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিউল আজমের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন। নির্বাহী প্রকৌশলী আশ্বস্ত করেন–লিফট আমদানি ও স্থাপন-সংক্রান্ত সব বিষয়ে হাসপাতাল মনোনীত প্রতিনিধি বা কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। এরপর নির্বাহী প্রকৌশলী ঠিকাদারকে দিয়ে লিফটের এলসি, ফ্যাক্টরি উৎপাদন, পিএসআই ও শিপমেন্ট করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর লিফটটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। সেদিনই একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে লিফটের পোর্ট ইন্সপেকশনের জন্য কমিটি করা হয়।

কমিটিতে রামেক হাসপাতালের প্রতিনিধি হিসেবে ডা. শংকর কুমার বিশ্বাসকে রাখা হয়। কিন্তু একাধিকবার পোর্ট ইন্সপেকশনের তারিখ পরিবর্তন করে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিউল আজম চিঠি পাঠিয়ে ডা. শংকর বিশ্বাসকে জানান, ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরে উপস্থিত থাকতে হবে। এ জন্য ডা. শংকর বিশ্বাসকে বিমানের টিকিট পর্যন্ত দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে ১ অক্টোবর রাতে ডা. শংকর বিশ্বাসকে জানানো হয়, লিফটের সব মালামাল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বের করে রাজশাহীর পথে রওনা হয়েছে। পরে ডা. শংকর বিশ্বাস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানান– লিফটের পোর্ট ইন্সপেকশন বানোয়াট।

তদন্তে নানা অসঙ্গতির প্রমাণ

হাসপাতালে লিফট আসার পর তদন্তে পাওয়া অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, লিফটের এলসি ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বলা হলেও, প্রকৃতপক্ষে করা ২০২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। এলসির মাধ্যমে লিফটের জন্য ১৪ হাজার ডলার এবং পরে ব্যাংকের মাধ্যমে ৮ হাজার ডলার পরিশোধিত করা হয়। লিফটের দাম এত কম নয়। এলসি করা ময়মনসিংহের নাঈমা এন্টারপ্রাইজ ফুজিটেকের বাংলাদেশের আমদানিকারক নয়। এলসি গ্রহণকারী সেল করপোরেশন লিমিটেডও আমদানিকারক নয়। সুযোগ না থাকলেও আমদানির সময় লিফটের সঙ্গে অতিরিক্ত পণ্য এসেছে। লিফটের মূল আইটেম ট্রাকশন মোটর ও কন্ট্রোল বক্স মূল প্যাকিং লিস্টে পাওয়া যায়নি।

লিফটের অর্ডার-সংক্রান্ত ডকুমেন্টের প্রমাণ হিসেবে ফুজিটেকের ই-মেইল আইডি [email protected] দেখানো হয়েছে। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, fujitec-jp.com ডোমেইনটি ঢাকার মো. জহিরুল ইসলামের [email protected] এর নামে নিবন্ধিত। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সেল করপোরেশন বিডি লিফটিকে জাপান থেকে আনা বোঝাতে এই ভুয়া ডোমেইনে ই-মেইল চালাচালি করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অরিজিন সার্টিফিকেটেও জাপানের ফুজিটেক কোম্পানির নাম নেই। ‘এ’ শ্রেণির লিফট আমদানি করতে হলে সেল করপোরেশনকে ফুজিটেকের পরিবেশক (ডিলার) হতে হবে, তা তারা নয়। প্যাকেজিং লিস্টের প্রথম ও শেষ পাতায় সই থাকলেও মাঝের পাতাগুলোতে নেই, যেটি সন্দেহের। মালপত্রের বারকোড স্ক্যান করেও ফুজিটেক পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে মতামত ও সুপারিশ হিসেবে লেখা, লিফটের প্রিশিপমেন্টের সঙ্গে জড়িত সব কার্যক্রম বানোয়াট। লিফট অর্ডার করা ই-মেইলগুলো ভুয়া। সরকারি কাজে এসব শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রকৃতপক্ষে লিফটি জাপান থেকে আমদানি করা হয়নি। কিন্তু জাপানের দেখাতে বিভিন্ন প্যাকেজ একত্রিত করে হাসপাতালে আনা হয়েছে।

গণপূর্তের ভিন্ন সুর

হাসপাতালের তদন্তে লিফট নিয়ে জালিয়াতি উঠে এলেও গণপূর্তের ভিন্ন সুর। তদন্তের বরাত দিয়ে তারা সব ঠিকঠাক রয়েছে দাবি করেছে। যদিও গণপূর্তের ওই কারিগরি কমিটিতে হাসপাতালের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না।

লিফট আসার পর গত বছরের ৩০ নভেম্বর গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী (পিপিসি) কারিগরি কমিটি করেন। এর আহ্বায়ক করা হয় গণপূর্ত বিভাগের ডিজাইন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুমকে। সদস্যসচিব হিসেবে ছিলেন গণপূর্তের ডিজাইন বিভাগ-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন। কমিটির সদস্য ছিলেন রাজশাহীর ই/এম পিএন্ডডি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমার দাশ।

মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম গত ২৮ জানুয়ারি নির্বাহী প্রকৌশলীকে (পিপিস) চিঠি দেন। এতে তিনি লেখেন, সরবরাহ করা লিফটের সবকিছুই দরপত্রের স্পেশিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এসেছে। লিফট স্থাপন, কমিশনিং ও পরবর্তী কার্যক্রমে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই।

জাপানের বদলে চীনের লিফট আমদানির ব্যাখ্যায় লেখা হয়েছে, দরপত্রের শর্তে ছিল যে ফুজিটেক (জাপান) ছাড়াও এডিবির সদস্য দেশগুলো থেকে লিফট আমদানি করা যাবে।

এ ব্যাপারে ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশনের স্বত্ত্বাধিকারী জাকির হোসেন হাসপাতালের তদন্তকে গুরুত্ব না দিয়ে গণপূর্তের প্রতিবেদনে জোর দিয়েছেন। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার কাজ গণপূর্তের সঙ্গে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কী করেছে, তাতে কিছু যায় আসে না। গণপূর্ত বিভাগ বলেছে লিফটের সবকিছু ঠিক আছে। স্থাপন করতে সমস্যা নেই।’

ভুয়া ডোমেইনের ই-মেইল ব্যবহারের বিষয়ে জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা সরাসরি লিফট আনি না। থার্ড পার্টির মাধ্যমে এনেছি। তারা কীভাবে এনেছে, তা বলতে পারব না। দরপত্রে লিফট ইন্সপেকশনের শর্ত ছিল না। তারপরও আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু পূজার ছুটিতে গণপূর্তের কর্মকর্তারা সময় দিতে পারেননি।’

লিফট নেবে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

অনিয়মে ভরা লিফট স্থাপন করবেন না বলে জানিয়েছেন রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, এই লিফট নিয়ে শুরু থেকেই নানা অসঙ্গতি পেয়েছি। এজন্য আমরা ইন্সপেকশন করে লিফট আনব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু সে কার্যক্রম না করে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী লিফট এনেছেন। এখন তদন্তে জালিয়াতি ধরা পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে জানিয়েছি। দায় গণপূর্ত বিভাগ নেবে নাকি ঠিকাদার, সেটি তাদের বিষয়। আমরা লিফট নেব না।

শুরু থেকে লিফট আমদানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিউল আজম। সম্প্রতি তিনি ঢাকায় বদলি হয়েছেন। এ ব্যাপারে শাকিউল আজমকে কল দিলে সেমিনারে আছেন জানিয়ে পরে কথা বলতে চান। কিন্তু এরপর আর তিনি কল ধরেননি।

রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২ এর বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানকে একাধিকবারর কল দিলেও রিসিভ হয়নি।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত