leadT1ad

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রোদ্রিগেজ কে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ডেলসি রোদ্রিগেজ। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হওয়ার পর দেশটিতে অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায়।

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ৫৬ বছর বয়সী ডেলসি রোদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এই ঘোষণায় ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে স্পষ্টভাবে উপেক্ষা করা হয়।

মাচাদো ডানপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। নোবেল পাওয়ার পর তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

তবে ট্রাম্প বলেন, মাচাদোর কাছে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যথেষ্ট সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা নেই। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ডেলসি রোদ্রিগেজ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, রোদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ভেনেজুয়েলাকে ‘আবার মহান’ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

ট্রাম্প বলেন, রোদ্রিগেজ আচরণে সৌজন্য দেখিয়েছেন। আর ভেনেজুয়েলায় এমন কাউকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না, যিনি জনগণের মঙ্গল চান না।

তবে হামলা ও মাদুরো আটক হওয়ার পর রোদ্রিগেজের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে ‘নৃশংস আগ্রাসন’ বলে আখ্যা দেন। তিনি মাদুরোর অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেন।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ভেনেজুয়েলার একমাত্র প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। সেই সময় তার পাশে ছিলেন শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডাররা।

বিপ্লবী শেকড়

ডেলসি রোদ্রিগেজ কারাকাসে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৯ সালের ১৮ মে। তিনি বামপন্থী বিপ্লবী নেতা হোর্হে আন্তোনিও রোদ্রিগেজের কন্যা। তাঁর বাবা ১৯৭০-এর দশকে সোশ্যালিস্ট লিগ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৭৬ সালে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের সময় নিহত হন। এই ঘটনা সে সময়ের বহু কর্মীকে নাড়া দেয়। তাদের মধ্যে তরুণ নিকোলাস মাদুরোও ছিলেন।

ডেলসি রোদ্রিগেজের ভাই হোর্হে রোদ্রিগেজও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। তিনি বর্তমানে জাতীয় পরিষদের প্রধান।

ডেলসি পেশায় আইনজীবী। ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে স্নাতক হন। গত এক দশকে তার দ্রুত রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এই ধারার অনুসারীরা ‘চাভিস্তা’ নামে পরিচিত।

তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে তিনি সরকারপন্থী গণপরিষদের প্রধান হন। এই পরিষদ মাদুরোর ক্ষমতা আরও বাড়ায়।

অর্থনৈতিক ভূমিকা ও প্রভাব

ডেলসি রোদ্রিগেজকে অনেক সময় হুগো চাভেজের সঙ্গে অস্ত্রধারী সংগ্রামে যুক্ত অন্যান্য সামরিক নেতাদের তুলনায় কিছুটা সংযত বলে মনে করা হয়।

ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি অর্থমন্ত্রী ও তেলমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একই সঙ্গে পালন করার ফলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পরিচালনায় তিনি একটি কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন। এর মাধ্যমে দেশের দুর্বল হয়ে পড়া বেসরকারি খাতেও তার প্রভাব বেড়ে যায়। তিনি লাগামহীন মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে প্রচলিত অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োগ করেছেন।

২০২৪ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাদুরো তেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও রোদ্রিগেজের হাতে তুলে দেন। তখন তার ওপর দায়িত্ব পড়ে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান নিষেধাজ্ঞা সামলানোর।

কারাকাসভিত্তিক সাংবাদিক স্লেইথার ফের্নান্দেজ বলেন, সরকারের ভেতরে রোদ্রিগেজের এই উচ্চ অবস্থানই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

রোদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের তেল শিল্পে রিপাবলিকানদের সঙ্গে এবং ওয়াল স্ট্রিটের কিছু মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এই মহলগুলো ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকার পরিবর্তনের ধারণার বিরোধিতা করেছিল।

তার সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন ব্ল্যাকওয়াটার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্স। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের বিশেষ দূত রিচার্ড গ্রেনেলও তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। গ্রেনেল মাদুরোর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়াতে চেয়েছিলেন।

‘বাঘ’ রোদ্রিগেজ

প্রেসিডেন্ট মাদুরো রোদ্রিগেজকে ‘বাঘ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি তাকে সমাজতান্ত্রিক সরকারের অটল রক্ষক হিসেবে দেখেন। ২০১৮ সালের জুন মাসে রোদ্রিগেজকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করার সময় মাদুরো বলেন যে তিনি একজন সাহসী ও অভিজ্ঞ তরুণী, একজন শহীদের কন্যা, একজন বিপ্লবী ও অসংখ্য লড়াইয়ে পরীক্ষিত।

শনিবার মাদুরো আটক হওয়ার পর রোদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের জীবিত থাকার প্রমাণ দাবি করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভিটিভিতে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কারণ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা যে কোনো দেশের সঙ্গেই করা হতে পারে। তিনি বলেন, জনগণের ইচ্ছা ভাঙতে নৃশংস শক্তি প্রয়োগ যে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চালানো যেতে পারে।

পরে শনিবারই ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্টের সংবিধানিক বেঞ্চ রোদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়।

আদালত জানায়, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিক ফের্নান্দেজের মতে, এই সময়কালে কিছু সাংবিধানিক অধিকার সাময়িকভাবে সীমিত করা হতে পারে। এর অর্থ হলো, ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে রোদ্রিগেজের ক্ষমতাও কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত