জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

‎তারাবির নামাজে দাঁড়িয়ে একজন ইমামের উপলব্ধি

‎ওলিউর রহমান
‎ওলিউর রহমান

বায়তুল মোকাররমে তারাবির নামাজের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

প্রায় দেড়যুগ ধরে প্রতিবছর তারাবির নামাজ পড়াচ্ছি। এবছর দায়িত্ব নিয়েছি রাজধানীর উত্তরখান থানার বেপারিপাড়া মহল্লার নবনির্মিত বেলাল মসজিদে, সঙ্গে আছেন আরেকজন হাফেজ সাহেব।

‎আমার বাসা থেকে মসজিদের দূরত্ব দুই কিলোমিটার। এশার নামাজের প্রায় ২০ মিনিট আগে মসজিদের উদ্দেশে বের হই। পথে প্রায় প্রতিদিনই কয়েকজন ইমামের সঙ্গে দেখা হয়, যারা তারাবি পড়ান। নামাজের আগ মুহূর্তে প্রায় সবার চেহারার অভিব্যক্তি প্রায় একইরকম, ঠোঁটে মৃদু কম্পন। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারি—তারা আসন্ন তারাবির অংশটুকু মনে মনে তিলাওয়াত করছেন। ঠোঁটের সেই নীরব নড়াচড়ায় কোরআনের শব্দ ভাসতে থাকে।

‎রমজানে এশার নামাজের পর ২০ রাকাত তারাবি আদায় করা হয়। শহরের অধিকাংশ মসজিদে খতমে তারাবি হয়। দুই বা তিনজন হাফেজ পালাক্রমে প্রতিদিন সম্মিলিতভাবে এক পারা করে তেলাওয়াত করেন, যাতে পুরো মাসে কোরআন মাজিদ একবার খতম হয়।

‎৬১১ পৃষ্ঠার ৩০ পারার কোরআন মজিদ আদ্যোপান্ত অক্ষরে অক্ষরে মুখস্থ রাখা সহজ কাজ নয়। কিন্তু আল্লাহর অশেষ কৃপায় যুগে যুগে মানুষ কোরআন মুখস্থ করে আসছে। ১৪০০ বছর ধরে অবিরত ধারায় রমজানের রাতে তারাবির নামাজে দাঁড়িয়ে হাফেজরা কোরআন খতম করে যাচ্ছেন।

‎সারাদিন রোজা রেখে ইফতারের পর যখন শরীর একটু বিশ্রাম চায়, তখনই হাফেজদের ছুটতে হয় মসজিদে। গোটা মহল্লার নামাজ তাদের কাঁধে—এ এক কঠিন ও গৌরবময় দায়িত্ব।

‎হাদিসে এসেছে—‘ইমাম হলেন জামিনদার।’ (আবু দাউদ, তিরমিযী) তারাবির ইমামের ক্ষেত্রে সেই দায় যেন আরও গভীর। নির্ভুলভাবে সারা কোরআন তেলাওয়াত করতে হবে। আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর কিতাব পড়া—এখানে কোনো কারচুপি চলতে পারে না।

‎তাছাড়া পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ, কিশোর, শ্রমিক, ব্যবসায়ী—সবার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। তারা চোখ বন্ধ করে কোরআন শুনছে। তাদের সেই নির্ভরতা ইমামের কণ্ঠকে ভারী করে তোলে।

‎একজন তারাবির ইমাম সারাদিন নিজের নির্ধারিত অংশ বারবার পড়ে নেন। হাঁটতে-হাঁটতে, বসে-শুয়ে নীরবে তেলাওয়াত জারি থাকে। এরপর তারাবির কাতারে দাঁড়িয়ে যখন একের পর এক পৃষ্ঠা পড়তে থাকেন, তখন ধীরে ধীরে ভেতরের চাপ কমতে থাকে।

‎কখনো কোনো আয়াতে জিহ্বা সামান্য আটকে গেলে বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। মনে হয়—এই বুঝি ভুল হয়ে গেল! তারপর আয়াত ঠিকঠাক এগোলে মনে হয়, যেন বড় কোনো বিপদ থেকে বেঁচে গেলাম। সালাম ফেরানোর পর কয়েক সেকেন্ড মসজিদে এক ধরনের গভীর নীরবতা নেমে আসে। সেই নীরব মুহূর্তেই ইমাম সাহেব বুঝতে পারেন—আজকের মতো শেষ হলো।

‎কখনো কখনো মনে হয়, এই কাতারে আমি একা নই। আমার আগে অসংখ্য হাফেজ একইভাবে দাঁড়িয়েছেন—কোনো কাঁচা মাটির মসজিদে, কোনো সাম্রাজ্যের জৌলুসময় রাজধানীতে, কোনো যুদ্ধবিদ্ধস্ত জনপদে বিদ্যুৎহীন অন্ধকার রাতে। তাঁদের কণ্ঠের সঙ্গে আমার কণ্ঠের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন রয়েছে। কোরআনের আয়াতই আমাদের সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে।

‎এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারাবির ইমামরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন। কণ্ঠ বদলেছে, মসজিদ বদলেছে, সময় বদলেছে—কিন্তু কাতারের সামনে দাঁড়িয়ে কোরআর তেলাওয়াত করার সেই কম্পন আজও একই রয়ে গেছে।

  • মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা

সম্পর্কিত