জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রোজা কি মানসিক চাপ কমায়

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে রোজার একটি বড় দিক হলো ‘ডিলেড গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি থেকে দূরে থেকে একধরণের আত্মসংযমের ভেতর দিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ সারাদিন চোখের সামনে খাবার বা পানীয় থাকা সত্ত্বেও তা থেকে বিরত থাকতে যে মানসিক শক্তি প্রয়োজন হয়, এই শক্তি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ২১: ০৭
রোজা মানসিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, এমন ইঙ্গিত গবেষণায় আছে। এআই জেনারেটেড ছবি

রোজার শারীরিক উপকারিতা নিয়ে অনেক লেখা পাওয়া যায়। কিন্তু রোজা আমাদের মন বা মানসিক অবস্থায় কী প্রভাব ফেলে, সেটা নিয়ে তুলনামূলক কম আলোচনা হয়। অথচ রমজানের মূল শিক্ষাই হলো আত্মসংযম ও মানসিক শুদ্ধি, যা পুরোপুরি আমাদের মনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাহলে প্রশ্ন হলো, রোজা কি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে? এ বিষয়ে বিজ্ঞান কী বলছে?

রোজা হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখে

আমাদের মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ হলো শরীরে ‘কোর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় উপবাস বা রোজা রাখার ফলে আমাদের মস্তিষ্ক এক বিশেষ ধরনের অভিযোজন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এ সময় মস্তিষ্ক থেকে ‘ব্রেইন-ডিরাইভড নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর’ বা বিডিএনএফ নামক প্রোটিনের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। এই পার্থক্যের পেছনে ঘুমের সময় বদল, খাবারের সময়, কাজের চাপ, পানি বা ক্যাফেইন গ্রহণ—এসবও ভূমিকা রাখতে পারে।

রোজা মানসিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, এমন ইঙ্গিত গবেষণায় আছে। কিন্তু এটি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ঘুম-খাদ্য-পানি-ওষুধের সময়সূচি বদলে গেলে সমস্যা হতে পারে।

মস্তিষ্কে বিডিএনএফ-এর মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যাগুলো প্রাকৃতিকভাবেই কমে আসতে শুরু করে। এছাড়া রোজা রাখার কয়েক দিন পর শরীর এন্ডোরফিন নামক হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়, যা আমাদের মনে এক ধরনের প্রাকৃতিক আনন্দ বা প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করে।

মনোযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে রোজার একটি বড় দিক হলো ‘ডিলেড গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি থেকে দূরে থেকে একধরণের আত্মসংযমের ভেতর দিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ সারাদিন চোখের সামনে খাবার বা পানীয় থাকা সত্ত্বেও তা থেকে বিরত থাকতে যে মানসিক শক্তি প্রয়োজন হয়, এই শক্তি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

মনোবিদদের মতে, যারা নিজেদের ইচ্ছা বা আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাঁরা জীবনের বিভিন্ন মানসিক চাপ বা প্রতিকূল পরিস্থিতি সহজে মোকাবিলা করতে সক্ষম হন। এক মাস রোজা রাখার মাধ্যমে আমাদের ভেতরে যে নিয়মানুবর্তিতা তৈরি হয়, তা আমাদের মনকে বিক্ষিপ্ত অবস্থার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে এবং যেকোনো কাজে মনোযোগ বা ফোকাস ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে এটি ব্যক্তি, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার ওপর নির্ভরশীল।

গবেষণায় যা উঠে এসেছে

রোজা ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকরা কাজ করেছেন। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সাময়িকীতে প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, রমজান মাসে রোজা পালনকারীদের মধ্যে উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং বিষণ্ণতার মাত্রা বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে একই সঙ্গে গবেষণাগুলো এটাও বলছে যে এই ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। ঘুমের রুটিন, দৈনন্দিন চাপ, শারীরিক অবস্থা, খাবারের গুণগত মান—এসবের ওপরও ফল নির্ভর করে।

গবেষকরা এর পেছনে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং নিকোটিন বা ক্যাফেইনের মতো স্নায়ু উত্তেজক পদার্থের ব্যবহার দীর্ঘক্ষণ বন্ধ থাকাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ ছাড়া সংযম অনুশীলনের কারণে মানুষের মধ্যে রাগ, ক্ষোভ বা হতাশার মতো নেতিবাচক আবেগগুলোও এই সময়ে কম পেয়েছেন।

মনোবিজ্ঞানীরা মানসিক চাপ কমানোর জন্য রোজার আধ্যাত্মিক দিকটির ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়ে থাকেন। তাদের মতে, বর্তমান সময়ে মানসিক স্ট্রেস বা ডিপ্রেশনের অন্যতম বড় কারণ হলো একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা। রমজান মাসে পরিবারের সবার সঙ্গে সেহরি ও ইফতার করা কিংবা দলবদ্ধভাবে তারাবির নামাজ পড়ার মতো বিষয়গুলো মানুষের মধ্যে সামাজিক সংযোগ ও একাত্মতা বৃদ্ধি করে। এই একতাবদ্ধ থাকার অনুভূতি মানুষের ভেতরকার একাকিত্ব দূর করে এবং মানসিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে সাহায্য করে। মনোবিদরা মনে করেন, রোজার এই সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এক ধরনের ‘গ্রুপ থেরাপি’ হিসেবে কাজ করে।

রোজা মানসিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, এমন ইঙ্গিত গবেষণায় আছে। কিন্তু এটি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ঘুম-খাদ্য-পানি-ওষুধের সময়সূচি বদলে গেলে সমস্যা হতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত