খাবার থেকে শিল্প, হিন্দুত্ববাদের পরের লক্ষ্য কি দুর্গাপূজা
স্ট্রিম ডেস্ক

ভারতীয় বাঙালির সবচেয়ে বড় ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব হলো দুর্গাপূজা। পূজার আর এক মাসের সামান্য বেশি বাকি থাকলেও উৎসবের চিরচেনা উদ্দীপনা কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার এবং বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিতর্কিত নানা নির্দেশে এবারের দুর্গাপূজা নজিরবিহীন মতাদর্শিক বিতর্কের মুখে পড়েছে।
উৎসবের আনন্দের জায়গা দখল করে নিয়েছে নানা বিভেদমূলক বিতর্ক। প্রতিমার সনাতনী রূপ বনাম আধুনিক থিম, আমিষ খাবার বর্জনের নির্দেশ এবং পূজায় মুসলিমদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে। এ ধরনের নির্দেশ বাংলার বহু পুরোনো ‘সর্বজনীন’ পূজার ধারণাকে সরাসরি আঘাত করছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে মণ্ডপ গড়ার ঐতিহ্য বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপূজাকে মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই পূজা কোনো গোঁড়ামির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সব সম্প্রদায়ের যৌথ শিল্পচর্চা ও খাওয়া-দাওয়ার এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে দুর্গাপূজা।
হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো অতীতে দুর্গাপূজার মূল সুর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ক্ষমতা পাওয়ার পর তারা একের পর এক বিতর্ক তৈরি করছে।
‘সর্বজনীন’ শব্দ ও মুসলিমদের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক
কয়েক দিন আগে প্রায় ৫০০ পূজা কমিটি ও ‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসব’-এর প্রতিনিধিদের সভায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) নেতা স্বামী নির্গুণানন্দ বলেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার—এমন ধারণা অবাস্তব। কোনো ধর্মই এমন বিষয় স্বীকার করে না। প্রত্যেকের নিজস্ব ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার রয়েছে। নিজস্ব ঐতিহ্যকে খাটো করা যাবে না।’
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির জনপ্রিয় স্লোগানকে কটাক্ষ করেই এই বক্তব্য দেওয়া হয়।
ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের চেয়ারম্যান পার্থ ঘোষ দ্য ওয়্যার-কে বলেন, ‘মণ্ডপের ভেতরে আমিষ বা নিরামিষ খাওয়ার বিতর্ক মূল বিষয় নয়। পূজা থেকে সর্বজনীন শব্দ বাদ দেওয়ার দাবিতে আমরা আঘাত পেয়েছি। অন্য ধর্মের মানুষদের পূজার সঙ্গে যুক্ত হতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা দুর্গাপূজাকে কখনো এই সংকীর্ণ চোখে দেখিনি। ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতেও সর্বজনীন চরিত্রের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ ছিল। আমাদের শতবর্ষের ঐতিহ্য আমরা কেন ভাঙব?’
পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপূজায় মুসলিমদের অংশগ্রহণ বহুদিনের ঐতিহ্য। মুসলিম কারিগরদের নকশা করা মণ্ডপ থেকে শুরু করে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করার সম্প্রীতি বাংলার অন্যতম পরিচয়। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সহকারী সাধারণ সম্পাদক স্বামী তত্ত্ববিদানন্দ দ্য ওয়্যার-কে জানান, শ্রী শ্রী সারদা দেবীর নির্দেশ মেনেই তাঁরা কাজ করেন।
স্বামী তত্ত্ববিদানন্দ বলেন, ‘শ্রীমা আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছেন আমরা তার বাইরে যাব না। পূজা সবার জন্য। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে দেবীকে নিরামিষের পাশাপাশি আমিষ ভোগও দেওয়া হয়। ভৌগোলিক পরিবেশ ও স্থানীয় রীতির ওপর ভিত্তি করেই খাদ্যাভ্যাস নির্ধারিত হয়।’
অধ্যাপক ও পুরোহিত রোহিণী ধর্মপাল একই মত প্রকাশ করেছেন। রোহিণী ধর্মপাল বলেন, ‘বাঙালির কাছে পূজা মানে ঘরের মেয়ে উমার বাড়ি ফেরা। উমা কৈলাস থেকে পাঁচ দিনের জন্য সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে আসেন। খাওয়া, আড্ডা, গান ও সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটে এখানে। দুর্গাপূজাকে উত্তর ভারতীয় নবরাত্রি উৎসবে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। জোর করে নিরামিষ চাপিয়ে দিয়ে হিন্দু ধর্মের মূল শাস্ত্রীয় দর্শনকেই ধ্বংস করা হচ্ছে। ঋগ্বেদেও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাংসের উল্লেখ আছে।’
‘শারদোৎসব’ শব্দ ও থিম প্রতিমায় নিষেধাজ্ঞা
১০ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পূজা কমিটিগুলোকে নতুন নির্দেশ দেন, কেউ যদি ‘দুর্গাপূজা’ না লিখে ‘শারদোৎসব’ লেখে, তবে মণ্ডপের বাইরে তাদের বইয়ের স্টল বসাতে দেওয়া হবে না। এই শব্দের ব্যবহারে পূজার ধর্মীয় গাম্ভীর্য নষ্ট হয় বলে দাবি শুভেন্দুর।
বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পল ও সজল ঘোষ পূজার নানা রীতি ও প্রতিমার শিল্পরূপ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন।
অগ্নিমিত্রা পল সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেবীকে কোনো সাধারণ মানুষের মতো দেখানো যাবে না। প্রতিমাকে দেবীর রূপেই গড়তে হবে।’
কলকাতার একটি বিখ্যাত পূজার দায়িত্বে থাকা সজল ঘোষ জানান, দেবীর মূর্তি নিয়ে কোনো ব্যঙ্গ বরদাশত করা হবে না। থিমের অজুহাতে ছোট হাত-পা কিংবা বড় মাথার প্রতিমা তৈরি তিনি সরাসরি প্রতিহত করবেন।
মণ্ডপ তৈরির শিল্পীরা এখন আতঙ্কে রয়েছেন। খ্যাত মণ্ডপশিল্পী অনির্বাণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘হিন্দু পরিষদ বলছে ধর্মীয় সংস্কৃতিতে আঘাত লাগে এমন কোনো নকশা করা যাবে না। তাদের এই অযৌক্তিক নিয়মের কারণে আমাদের সৃজনশীলতা কেন আটকে থাকবে?’
মাছ-মাংস ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে জটিলতা
মণ্ডপ চত্বরে আমিষ খাবার নিষিদ্ধ করার বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রস্তাব তীব্র বিরোধিতার জন্ম দিয়েছে। স্বঘোষিত ধর্মীয় গুরু ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী ওরফে বাগেশ্বর ধাম সরকার কলকাতার পূজামণ্ডপের পেছনে মাছ রান্না করা বাঙালিদের হাড়গোড় ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেন।
এর প্রতিবাদে অনেক বাঙালি বিক্ষোভ করেছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পাল্টা হুঁশিয়ারি দেন, কোথাও শাস্ত্রীর ছবি পোড়ালে বা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করার দাবি তুললে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মাথায় প্রদেশ কংগ্রেসের এক সাধারণ সম্পাদককে আটক করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে পূজা ঘিরে বসা খাবার বিক্রেতারা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। শঙ্কর হালদার নামের এক ফিশ-ফ্রাই বিক্রেতা প্রশ্ন তোলেন, ‘পূজার সময় মণ্ডপের পাশে আমিষ বিক্রি বন্ধের সরকারি কোনো নির্দেশ কি আসলেই জারি হয়েছে?’
চিকেন ও মাটন রোলের দোকানদার মন্টু সর্দার জানান, আমিষ বিক্রি বন্ধ হলে তাঁর রুটিরুজি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
হিন্দু পরিষদের রাজ্য নেতা স্বরূপ চট্টোপাধ্যায় দাবি করেন, মণ্ডপের বাইরে খাবার বিক্রিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। কেবল মূল মণ্ডপ চত্বরে নিরামিষ বজায় রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বাংলার শাক্ত ঐতিহ্যে দেবীকে মাছ ও মাংস নিবেদনের প্রাচীন প্রথা রয়েছে। শোভাবাজার রাজবাড়ির মতো ঐতিহাসিক পরিবারগুলো দেবীকে পোড়া মাছ বা শোল মাছের ভোগ দেয়। পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া রান্না করা খাসির মাংস নবমীর দিনে দেবীকে উৎসর্গ করার চল রয়েছে।
বিতর্ক ও হুমকির কারণে উত্তর কলকাতার দুটি বিখ্যাত পূজা এবার বন্ধ রাখার ঘোষণা হয়েছে। নর্থ কলকাতার 'ইয়ং মেনস স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশন' এবং '২০তম পল্লী সর্বজনীন' পূজা না করার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে নোটিশ টানিয়েছে।
অষ্টমীতে ‘ড্রাই ডে’ ও শুভেন্দুকে ঘিরে থিম পূজা
মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন পূজার অষ্টমীর দিন পুরো রাজ্যে সব মদের দোকান বন্ধ থাকবে (ড্রাই ডে)।
আগের সরকার পূজামণ্ডপে বিদ্যুৎ বিলে ৮০ শতাংশ ছাড় দিয়েছিল। শুভেন্দু অধিকারী পূজা কমিটিগুলোর জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা রেড রোডের বর্ণাঢ্য কার্নিভাল বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
বাংলার ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে একটি পূজার পুরো থিম তৈরি হচ্ছে। কলকাতার ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের কাছে ‘নন্দীগ্রাম থেকে নবান্ন, বুবাইয়ের জয়যাত্রা’ নামে এই বিশেষ মণ্ডপ তৈরি করছে অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা।
হিন্দু মহাসভার রাজ্য সভাপতি চন্দ্রচূড় গোস্বামী জানান, ছাত্র রাজনীতিতে ‘বুবাই’ নামে যাত্রা শুরু করা নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই এই আয়োজন।
মণ্ডপের ভেতরে ও বাইরে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক লড়াই ও সরকারের নানা জনকল্যাণমূলক কাজের খতিয়ান তুলে ধরা হবে। একটি ডালের দানার ওপর মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখার মতো মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ প্রতিকৃতি রাখা হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণ
.png)






