সৌদিকে রক্ষা নাকি ইরানের মিত্রতা, মক্কা চুক্তির ফাঁদে পাকিস্তান
স্ট্রিম ডেস্ক

হুতি ও সৌদি আরবের সংঘাত নাটকীয় মোড় নেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ করেছেন। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়, ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ করেছে দেশটির সরকার।
এর আগে মঙ্গলবার সৌদি আরবের চার শহরে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭৩ জন আহত হন। একাধিক তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায়। ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা বৃহস্পতিবার ভোরে ইয়েমেনের উপকূলীয় শহর মোখা দখল করে। নিকটবর্তী দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণও তারা নিজেদের হাতে নেয়। শুক্রবার সকালের মধ্যে পুরো লোহিত সাগর উপকূল হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সরকারি বাহিনী সরে যাওয়ার পর বাব এল-মান্দেব প্রণালির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মায়্যুন দ্বীপে হুতি যোদ্ধারা পৌঁছেছে বলে ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে হুতি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সৌদি আরবের প্রধান দুটি তেল রপ্তানি পথ হরমুজ প্রণালি ও বাব এল-মান্দেব একই সময়ে অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হরমুজে রয়েছে সরাসরি ইরানের চাপ। বাব এল-মান্দেবে সক্রিয় রয়েছে দেশটির মিত্র হুতিরা।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, সৌদি ভূখণ্ডে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর করা হবে। কিন্তু সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে আরাগচির ফোনালাপের পর বিশ্লেষকরা মনে করছেন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চেয়ে কূটনীতিকেই বেছে নিয়েছে পাকিস্তান।
নীরব কূটনীতির কৌশল
সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, সৌদির হুঁশিয়ারির মুখে পাকিস্তান নিজেদের মিত্র ইরানকে অনুরোধ করেছে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান এই খবরকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেন।
অন্যদিকে ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থানে পাকিস্তানকে হামলা চালানোর অনুরোধ জানিয়েছে সৌদি—এমন দাবিও তিনি নাকচ করেন। ইরানের মাধ্যমে হুতিদের সঙ্গে পাকিস্তান যোগাযোগের চেষ্টা করছে কি না, এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব বা অস্বীকার কোনোটাই করেননি তিনি।
সাজ্জাদ হায়দার খান বলেন, ‘এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য পাকিস্তান সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা ও কূটনীতির পথেই এগিয়ে যাবে।’
ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজের সভাপতি এবং পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জওহর সালিম আল জাজিরাকে বলেন, ‘কূটনীতিতে মুখে কী বলা হলো তার চেয়ে কী চেপে যাওয়া হলো, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদের ভাষা সামরিক সংঘাতের চেয়ে উত্তেজনা হ্রাস (ডি-এসকেলেশন) এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করছে।’
ইরানের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ
গত এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির চারবার ইরান সফর করেছেন। কূটনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত এক ইরানি সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে টেলিফোনে যোগাযোগ অনেক বেড়েছে।
ওই সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান ও ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে তিন থেকে চারবার টেলিফোনে কথা হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে মাত্র দুটি আলোচনার খবর প্রকাশ করা হয়েছিল। বাকি আলোচনাগুলো গোপন রাখা হয়েছে।
পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার সৌদি ও তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছেন।
জওহর সালিম জানান, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পাকিস্তানের জন্য নতুন কিছু নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেশি। রিয়াদের প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির কারণে এই মধ্যস্থতায় জড়িয়ে পড়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
অতীতে নিরপেক্ষ থাকার অভিজ্ঞতা
পাকিস্তান আগেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। ২০১৫ সালের এপ্রিলে হুতিদের বিরুদ্ধে সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান পাঠানোর সৌদি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল পাকিস্তানের পার্লামেন্ট। সংকট নিরসনে কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকা পালনের জন্য ইয়েমেন যুদ্ধে পাকিস্তানের নিরপেক্ষ থাকা উচিত বলে ওই সময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
এক দশক আগের সেই কঠিন পরীক্ষার মুখেই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি আবারও পড়েছে বলে মন্তব্য করেন জওহর সালিম।
ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ইরানি হামলার পর সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাভেদ হেইরান-নিয়া আল জাজিরাকে বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বা মক্কা চুক্তির আওতায় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো এক দেশ আক্রান্ত হলেই অপর দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
পাকিস্তানের ভূমিকা
বৃহস্পতিবার রাতে মুনির ও আরাগচির মধ্যে ঠিক কী কথা হয়েছিল, তা পরিষ্কার নয়। বিশ্লেষক জাভেদ হেইরান-নিয়া বলেন, ‘পাকিস্তান সম্প্রতি সৌদি আরবের সতর্কবার্তা ইরানে পৌঁছে দিয়েছে এবং হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করতে তেহরানকে অনুরোধ জানিয়েছে। দুই বৈরী পক্ষের মধ্যে পাকিস্তান কার্যকর যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হুতিদের ওপর ইরানের গভীর প্রভাব রয়েছে, যদিও এই প্রভাব সীমাহীন নয়। কিছু ক্ষেত্রে হুতিরা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিলেও তাদের কৌশলগত স্বার্থ তেহরানের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।’
হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইরানি নেতারা তাদের আনন্দ গোপন রাখেননি। ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ সামাজিক মাধ্যমে ইয়েমেনিদের বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার হুতিদের ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর অংশ হিসেবে উল্লেখ করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মোখবার লেখেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শক্তি এবং ইয়েমেনিদের লড়াই আমেরিকা ও তার মিত্রদের বড় ধরনের সামরিক সংকটে ফেলেছে।’
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথ
ইরানে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি জানান, মক্কা চুক্তির মূল বিষয় হলো বিপদের মাত্রা পরিমাপ করা। কোনো অংশীদার দেশ আক্রান্ত হয়ে সরাসরি অনুরোধ জানালেই কেবল অন্য দেশ সাড়া দেয়। হুমকি মোকাবিলায় সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা পাকিস্তানের রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত জওহর সালিম জানান, এই মুহূর্তে সম্মুখ লড়াইয়ের জন্য পাকিস্তানের কোনো প্রয়োজন সৌদি আরবের নেই। তবে পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে সৌদি।
রিয়াদের কিং ফয়সাল সেন্টারের গবেষক উমর করিম বলেন, ‘কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। সৌদি ও তুরস্কের সঙ্গে হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে একপর্যায়ে পাকিস্তানকে কোনো না কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতেই হবে।’
.png)









