
জানে আলম নামের ১৫ বছরের এক রোহিঙ্গা কিশোরকে কক্সবাজার থেকে অপহরণ করে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে তুলে দেওয়ার খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে একাধিক নামকরা সংবাদমাধ্যম। এ বছরের জুলাই মাসে মিয়ানমার উপকূলে মানব পাচারকারীদের দুটি নৌকা ডুবে যাওয়ার পর যে ৫০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ ও মারা যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, জানে আলম তাদের একজন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্ব, নিরাপত্তাহীনতা এবং ‘উন্নত জীবনের খোঁজে’ সাগরপথের অনিশ্চিতযাত্রার কথা নতুন করে সামনে আসছে। এ প্রসঙ্গে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর শত শত রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলো থেকে স্বেচ্ছায় অথবা জোরপূর্বক কাঠের ট্রলারে সাগরপথে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের সংখ্যাও কম নয়। নিরাপত্তা এবং নতুন সুযোগের আশায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে পুরনো মাছ ধরার ট্রলারে চেপে বসছেন তারা। সীমিত খাবার এবং পানি নিয়ে তাদের বহনকারী ট্রলারগুলো বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের উত্তাল পথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করছে। লক্ষ্য- কোনোমতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া যাওয়া।
এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ এবং কক্সবাজার ক্যাম্পগুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যা পাচারকারীদের একটি লাভজনক ব্যবসার সুযোগ করে দিয়েছে। এমনকি বোটের কোটা পূরণ বা পাচারকারীদের নৌকা ভর্তি করতে স্থানীয় চক্রগুলো মানুষকে অপহরণ করা শুরু করেছে।
রোহিঙ্গা অধিকার বিষয়ক সংস্থা ‘আরাকান প্রজেক্ট’-এর পরিচালক ক্রিস লিউয়া জানান, কক্সবাজার শরণার্থী ক্যাম্পে অপহরণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অপহরণকারী চক্রগুলো ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করছে।
তিনি বলেন, সাগরপথে মানবপাচার বিস্তারের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রার জন্য যাত্রীর চাহিদা বেড়েছে। যা অনেককে মানবপাচারের শিকারে পরিণত করছে।

যেমনটি হয়েছিল কিশোর জানে আলমের বেলায়। স্কুল থেকে ঘরে ফেরার পথে আলমকে তুলে নিয়েছিল অপহরণকারীরা। এরপর তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল পাচারকারীদের কাছে।
এদিকে ছেলের কাছ থেকে শেষ ফোন কলটি পাওয়ার পর, আলমের বাবা আব্দুল নূর ক্যাম্পের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চাঁদা তুলে অপহরণকারীদের দাবি করা প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার ছেলে আর কখনো বাড়ি ফিরে আসেনি।
সম্ভবত একই পরিণতি হয়েছে ক্যাম্পের আরেক যুবক হামিদ উল্লাহর। ক্যাম্পের একটি স্কুলে পড়াতেন হামিদ। মে মাসে তাকেও তুলে নেওয়া হয়। হামিদকে ছাড়িয়ে নিতে অপহরণকারীদের প্রথম দফায় চাওয়া দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ তুলতে তার বাবা-মা মানুষের কাছে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করলেও, পরবর্তীতে দাবি করা আরও প্রায় ৪ লাখ টাকা জোগাড় করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব হয়নি।
হামিদের মা বিবি জান জানান, ছেলের সঙ্গে যখন তাঁর শেষবার কথা হয়, তখন হামিদ তাঁকে জানিয়েছিলেন তাকে জোর করে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
এরপর থেকে পরিবারের লোকজন হামিদের আর কোনো খোঁজ পায়নি। পরবর্তীতে নিখোঁজ হওয়া সেই ট্রলারগুলোর খবর শুনে পুরো পরিবারটি শোকে ভেঙে পড়ে। আলম, হামিদরা সম্ভবত উত্তাল সাগরপথেই হারিয়ে গেছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে অনেকেই চিরতরে হারিয়ে যান। এই পথে সুদূর সাগরে যাত্রা শুরু করা প্রতি সাতজনের মধ্যে অন্তত একজন সমুদ্রেই প্রাণ হারান অথবা নিখোঁজ হন।
কিন্তু এরপরেও এই রুটে যাত্রীদের ভিড় দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, গত বছর প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন রোহিঙ্গা এই সাগরপথ অতিক্রমের চেষ্টা করেছিলেন। যাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জন নিখোঁজ বা মারা গেছেন, যা বিশ্বজুড়ে শরণার্থী ও অভিবাসীদের ব্যবহৃত যেকোনো সামুদ্রিক পথের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার। এমনকি চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই প্রায় ৫ হাজার ৭০০ জন এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেছেন। যা গত বছরের মোট আশ্রয়প্রত্যাশী সংখ্যার সমান। এ বছর যাত্রা শুরু করাদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৮২০ জন নিখোঁজ বা মারা গেছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
.png)






