বাংলাদেশে সামুদ্রিক শুশুক কেমন আছে

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ১৮
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ভারতের বিখ্যাত লেখক অমিতাভ ঘোষের ‘দ্য হাংরি টাইড’ নামের একটি উপন্যাস আছে। এই উপন্যাসে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন নিয়ে যেমন লেখা আছে, তেমনি লেখা আছে ইরাবতী ডলফিন নিয়ে। উপন্যাসের একজন বিজ্ঞানী চরিত্রের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন ইরাবতী ডলফিন সংরক্ষণের গুরুত্ব কতখানি। এই ইরাবতী ডলফিন বাংলাদেশের সমুদ্রেও দেখা যায়।

গত সপ্তাহের খবর। পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের পূর্ব পাশে চর গঙ্গামতি এলাকায় জোয়ারের পানির সঙ্গে ভেসে এসেছে ৬ ফুট লম্বা মৃত বোতলনজ শুশুক। খবরে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘ সময় জলে থাকার কারণে শুশুকটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতচিহ্ন ছিল। একটি দড়ি বাঁধা ছিল। কুয়াকাটায় মিলল মৃত বোতলনোজ ডলফিন, কুয়াকাটার উপকূলে ৪ বছরে ৫৮টি মৃত ডলফিন উদ্ধার—এ ধরনের সংবাদ প্রায়ই পত্রিকায় পাওয়া যায়।

কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির তথ্যমতে, ২০২৩ সালে সেখানে ১৫টি শুশুক, ২০২৪ সালে ১০টি, ২০২৫ সালে ১৭টি এবং ২০২৬ সালে এখন অবধি ১৬টি মৃত শুশুক পাওয়া গেছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে এসব শুশুকের কোনো কোনোটি শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেছে, কোনোটি নৌযানের আঘাতে। এ ছাড়া প্লাস্টিক, তেল-রাসায়নিক দূষণসহ বিভিন্ন কারণে সামুদ্রিক শুশুক মরে থাকতে পারে।

বাংলাদেশের সমুদ্রে বিভিন্ন প্রজাতির শুশুক বা ডলফিন পাওয়া যায়। যেমন ইন্দো-প্যাসিফিক হ্যাম্পব্যাক ডলফিন, বোতলনাক ডলফিন, স্পিনার ডলফিন, স্পটেড ডলফিন।

২০২২ সালে প্রকাশিত মো. মোজাম্মেল হোসেনের লেখা অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকায় ইরাবতী ডলফিন, ইন্দোপ্যাসিফিক হাম্পব্যাক ডলফিন, বোতলনাক ডলফিন, স্পটেড ডলফিন, স্পিনার ডলফিন পাওয়া যায়।

স্মিথের গবেষণামতে, তার ১৬ হাজার ৭৭৯ বর্গকিলোমিটার গবেষণা এলাকায় ইরাবতী ডলফিন পাওয়া গিয়েছিল ৭৫টি। এর গ্রুপ সাইজ ছিল ২.২ আর ডলফিনের সীমা ছিল ১ থেকে ১০-এর মধ্যে। সমুদ্র উপকূল এলাকায় ইরাবতী বেশি পাওয়া যায়। এর নাম হয়েছে মিয়ানমারের ইরাবতী নদীর নাম অনুসারে। এটি সারা বিশ্বেই বিপদসংকুল। এটি দেখতে ধূসর-কালো। এদের পার্শ্বীয় পাখনা ছোট।

হাম্পব্যাক ডলফিনকে গোলাপি ডলফিনও বলা হয়। এটি ২৮০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বয়স ও এলাকাভেদে এর রং ভিন্ন হয়। এরা সাধারণত দল বেঁধে সাঁতার কাটে। আইইউসিএন এটিকে লাল তালিকাভুক্ত করেছে।

বোতলনাক ডলফিন ২৫০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর নাক আছে। পার্শ্বীয় পাখনা আছে। ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন সোসাইটি ১৭০০ থেকে ২২০০ বোতলনাক ডলফিন বাংলাদেশে পাওয়া গেছে বলে নথিভুক্ত করেছে। সংস্থাটি বোতলনাক ডলফিনের জন্য ২৮২ বর্গকিলোমিটার সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা ঘোষণার জন্য বিবেচনা করেছে। এই জায়গায় ৯০ ভাগ বোতলনাক ডলফিন দেখা গেছে।

স্পটেড ডলফিনকে চিত্রা শুশুক বলা হয়। এটি বঙ্গোপসাগরের সংরক্ষিত এলাকায় দেখা গেছে। প্রাপ্তবয়স্ক ডলফিনের দেহে ছোট ছোট চিহ্ন থাকে। পেটের দিকটা ধূসর। অধিকাংশ স্পটেড ডলফিন ২৬০ সেমি পর্যন্ত লম্বা। এই ডলফিনটি অপরিকল্পিত মৎস্যশিকারের কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে। সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ডে ৮৬ ভাগ স্পটেড ডলফিন পাওয়া গেছে। কারণ সেখানকার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বেশ ভালো।

স্পিনার ডলফিনকে ঘূর্ণি ডলফিন বলা হয়। এটি ২৪০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর পেট সাদা রঙের। দেহ ধূসর। এর অধিকাংশ সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকায় দেখা গেছে। ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন সোসাইটির মতে সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ডে ৫৫০টির মতো দেখা গেছে।

বাংলাদেশে শুশুককে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রাখা হয়েছে। একটি তথ্যমতে এই প্রজাতিটির সংখ্যা সারা বিশ্বে প্রায় ৩ হাজার। বাংলাদেশে পৃথিবীতে বাস করা মোট প্রজাতির এক-তৃতীয়াংশ বাস করে। অর্থাৎ সুন্দরবনে ২২৫টি, পদ্মা-যমুনায় ২০০টি, কর্ণফুলী, সাঙ্গু, সুরমা, হালদায় প্রায় ৫০০টির বাস। ডলফিনকে পানির ওপরে সাঁতরাতে ও লাফাতে বেশি দেখা যায়। এরা ৩/৪ মিনিট পরপর পানির ওপরে শ্বাস নেয় আর ছাড়ে। এই ডলফিনের কিছু মজার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এরা চোখে দেখতে পায় না। তীক্ষ্ম শব্দ ছোড়ার মাধ্যমে শিকার খোঁজে। এদের ওজন ১৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। দুই-তিন বছরে একবার বাচ্চা দেয়। এর গড় আয়ু ২০ থেকে ২২ বছর।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মিঠাপানির শুশুক দিবস পালন করে। ১২ সেপ্টেম্বর হলো বিশ্ব শুশুক দিবস। এই দিবসে মূলত সামুদ্রিক শুশুককেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের দেশে সামুদ্রিক শুশুকের বেশ কয়েকটি প্রজাতিই কিন্তু দেখা যায়। এদের সংখ্যা একেবারে কম নয়।

বাংলাদেশের সুন্দরবনে ডলফিন রক্ষায় ৬টি অভয়ারণ্য রয়েছে। ডলফিন রক্ষায় সরকারেরও অ্যাকশন প্ল্যান রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এর মৃত্যু কিন্তু থেমে নেই। অতিরিক্ত দূষণ, জালে জড়িয়ে পড়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামুদ্রিক শুশুক হুমকির মুখে পড়েছে। আইইউসিএনের বিপন্ন তালিকায় থাকা এই শুশুকটিকে রক্ষা করতে না পারলে একদিন এটি হয়তো হারিয়েই যাবে। এ জন্য ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র সকল জায়গা থেকে এখন থেকেই শুশুক রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

লেখক: পরিবেশবিষয়ক লেখক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত