কারাগারে মৃত্যু/৩৭ শতাংশ হাসপাতালে নেওয়ার পথে, অ্যাম্বুলেন্স পেয়েছেন মাত্র কয়েকজন
শাহরিয়ার ইসলাম শোভন

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার বন্দি গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃতদের দুজন বিচারাধীন মামলার আসামি ছিলেন। একজন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এবং অন্যজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হাসপাতালে পৌঁছানোর সুযোগ পাওয়া এই চার বন্দি এক অর্থে ভাগ্যবান ছিলেন। একদিনে চার বন্দির মৃত্যুর ঘটনা দেশের কারাগারগুলোর দীর্ঘস্থায়ী সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। চিকিৎসক সংকট, অপ্রতুল জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা এবং সময়মতো হাসপাতালে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় দেশের কারা স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকছে।
কারা উপ-তত্ত্বাবধায়ক রহিম মণ্ডল জানান, ‘সেবার পরিধি বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি। বারবার লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এসব উদ্যোগ আটকে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিকিৎসকসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করলে ভালো হতো। দুর্ভাগ্যবশত তাদের কাছ থেকেও কোনো সাহায্য মেলেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অসুস্থ বন্দিদের বাইরের হাসপাতালে পাঠানোর জন্য প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রয়োজন। এই অনুমোদনে অনেক সময় নষ্ট হয়। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে কিছু বন্দি পথেই মারা যান।’
৭৫ কারাগারে স্থায়ী চিকিৎসক মাত্র ২
দেশের মাত্র দুটি কারাগারে চব্বিশ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের জন্য একজন করে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি ৭৩ কারাগারে জরুরি চিকিৎসার জন্য নিয়মিত পেশাদার চিকিৎসক নেই।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১ হাজার ৭৩৬ জন বন্দি মারা গেছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৮১ জন পুরুষ এবং ৫৫ জন নারী ছিলেন। এই পাঁচ বছরে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা গেছেন ৬৪৬ জন বন্দি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচ বছরে গড়ে ৩৭ শতাংশ বন্দি হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালে নেওয়ার সময় বন্দিদের বেশিরভাগই কোনো অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা পাননি।
অ্যাম্বুলেন্স সংকট ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব
কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ আখতার হোসেন দেওয়ান জানান, কারাগারগুলোতে অ্যাম্বুলেন্সের তীব্র সংকট রয়েছে। দেশজুড়ে ৭৫টি কারাগারের মধ্যে মাত্র ২৩টিতে বর্তমানে ১৮ থেকে ২০টি সচল অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে।
অনেক অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বাধ্য হয়ে সাধারণ ভ্যান ব্যবহার করতে হয়। প্রতিবন্ধী বন্দিদের জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। কারাগারগুলোতে কোনো গাইনি বা অন্য কোনো বিশেষ রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার জান্নাতুন তায়েবা জানান, ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। সহকারী সার্জনরা খণ্ডকালীন হিসেবে কাজ করেন। ডিপ্লোমা নার্স ও ফার্মাসিস্টরা চব্বিশ ঘণ্টা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৭৫টি কারাগারের মধ্যে মানিকগঞ্জ জেলা কারাগার ও রাজশাহী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক ডাক্তার কর্মরত আছেন। বাকি ৭৩টি কারাগারে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসকরা খণ্ডকালীন চিকিৎসা দেন। কোনো পূর্ণকালীন ডাক্তার সেখানে নেই।
কারা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান, গত চার বছরে কারা বিভাগে নতুন অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয়নি।
মোস্তফা কামাল বলেন, ‘রাজস্ব বাজেট থেকে অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছিল। চলতি বছরে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। বন্দিদের হাসপাতালে পাঠাতে কারাগারগুলো হিমশিম খাচ্ছে এবং কিছু বন্দি পথেই মারা যাচ্ছেন।’
চলতি বছরের এপ্রিলে সাবেক কারা মহাপরিদর্শক সৈয়দ মো. মোতাহার হোসেন বলেছিলেন, ‘বন্দি মৃত্যুর সংখ্যাকে আমি আশঙ্কাজনক বলব না। কারাগারের বাইরের মৃত্যুর তুলনায় ভেতরের মৃত্যুর হার কম। তবে আমরা হেফাজতে কোনো মৃত্যুই চাই না।’
মোতাহার হোসেন দাবি করেন, প্রতিটি মৃত্যুর তদন্ত হয়। দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মোতাহার হোসেন আরও জানান, সারা দেশের কারাগারগুলোতে অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত স্থানান্তরের জন্য অন্তত ৯৭টি অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। বর্তমানে মাত্র ১৫টি কারাগারে ১৮ থেকে ২০টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে।
ডিআইজি দেওয়ান জানান, ‘কারাগারগুলোতে ১৫১ চিকিৎসকের পদ অনুমোদিত আছে। বর্তমানে মাত্র দুজন সার্বক্ষণিক কাজ করছেন এবং বাকিরা অস্থায়ী। রাতে কোনো ডাক্তার থাকেন না। জরুরি মুহূর্তে এই পরিস্থিতি বড় সংকট তৈরি করে।’
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার ফারুক আহমেদ জানান, বন্দিদের নিজেদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনাও ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ দুটি ব্যবস্থা নেয়। কোনো ঝামেলা হলে প্রথমে একবার বাঁশি বাজানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে তিনবার বাঁশি বাজিয়ে ‘পাগলা ঘণ্টা’ বাজানো হয়। পাগলা ঘণ্টা বাজলে সবাই সতর্ক হয়ে যায়। মারামারির ঘটনায় কোনো বন্দি মারা যাওয়ার তথ্য তাদের রেকর্ডে নেই বলে জানান এই কর্মকর্তা।
আইনি সুরক্ষার ফাঁকা বুলি
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার বিশ্লেষক ব্যারিস্টার ফারান মো. আরাফ জানান, মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী গণ্য না করার এবং সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
ব্যারিস্টার আরাফ বলেন, ‘হেফাজতে মৃত্যু বন্ধ করতে হলে সংবিধানে লেখা অধিকার এবং কারাগারের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যকার ফারাক দূর করতে হবে। নিরাপত্তার পুরোনো মানসিকতা থেকে বের হয়ে বন্দিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বকে মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখতে হবে।’
বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক ‘ম্যান্ডেলা রুলস’ বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করেছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে বহু মানুষকে কারাগারে পাঠিয়েছিল। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা যথাযথ চিকিৎসার অভাবে কারাগারে মারা গেছেন।
জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা রুলসের ২ নম্বর নিয়ম অনুযায়ী বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাধারণ মানুষের সমান স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার বন্দিদেরও রয়েছে। ম্যান্ডেলা রুলসের ২৭ নম্বর নিয়ম অনুযায়ী জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জেল কোড অনুযায়ী প্রতিটি কারাগারে মেডিকেল অফিসার, সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ও কম্পাউন্ডার থাকা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই।
সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে সব ধরনের নির্যাতন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের জীবন, ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের সমান আশ্রয় এবং অমানবিক নির্যাতন থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে এই মৌলিক অধিকারগুলো লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রতিনিয়ত উঠছে।
.png)
-028855-256x144.webp)





