ad

মৃত্যুবার্ষিকী/অতুলপ্রসাদ সেন: ধ্রুপদি নাগরিক বাউল

সংগীতই ছিল অতুলপ্রসাদের প্রাণের আরাম। নিজের রচিত গানে নিজেই সুর যোজনা করতেন। বাংলার বাউল ও কীর্তনের সুরের সঙ্গে হিন্দুস্থানি সংগীতের সুর ও ঢং মিশিয়ে তিনি নিজস্ব সংগীতরীতির প্রবর্তন করেছিলেন। অতুলপ্রসাদী সংগীতরীতি তাই এত সুপরিচিত।

অর্থী দাস
অর্থী দাস

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ২০
অতুলপ্রসাদ সেন। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
অতুলপ্রসাদ সেন। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

বিচিত্ররূপী বাংলা সাহিত্যকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে সুফি, বাউল ও কীর্তনের গীতল স্রোতের অববাহিকা। পরবর্তী সময়ে এ অধ্যাত্মবাদী ধারাগুলোকে তত্ত্বায়নের ভিত্তিতে একসূত্রে ব্যাখ্যা করেছে ‘অচিন্ত্য দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’। সেই সূত্রে জীব-পরমের দ্বৈত এবং অদ্বৈত রূপকে একই সময়ে কাব্য ও গীতির আশ্রয়ে বোঝার সুযোগ হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, একই ভাবাবেগ থেকে জন্ম নেওয়া গান ও কবিতার মাঝে আদতে কি কোনো বিরোধ আছে? কোনো দ্বন্দ্ব কি পরিলক্ষিত হয়? হয় না। শিল্পমাধ্যম ভিন্ন হলেও দার্শনিক ব্যাখ্যার পাটাতনে এরা অদ্বৈত হয়ে ওঠে। বর্ণাশ্রিত শব্দাবলি সুরাশ্রিত হয়ে ভিন্ন সত্তারূপে প্রকাশিত হয়, এই হলো দুইয়ের মধ্যে মূল পার্থক্য। বস্তুত, কবির মনোজগতে সৃজনশীলতার সুর, তাল ও লয়ের সম্মিলিত কাব্যরূপটি প্রকাশিত হয় সংগীতরূপে। দ্বৈত থেকে তখন তা অদ্বৈত রূপ লাভ করে।

দ্বৈতাদ্বৈতের এই লীলায় পাঠক কিংবা শ্রোতাও লীন হয়ে যান অনায়াসে। কেবল প্রিয়ের বাণী নয়, প্রাণের মধ্যে সুর ও শব্দের পরশেও আন্দোলিত হয় মানবহৃদয়। কবিতা ও গান তাই লালনের ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে’র মতো অদ্বৈত মোহিনী রূপে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়।

কবিতা ও সুরের এই দ্বৈত সত্তাকেই অদ্বৈতে মিলিত করেছেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য কয়েকজন সাহিত্যিক। ইতিহাসে তাঁরা ‘পঞ্চকবি’ নামে আদৃত ও স্বীকৃত। তাঁদের মধ্যে ১৮৬১ থেকে ১৮৭১ সাল পর্যন্ত সময়কালে জন্মেছিলেন প্রথম চারজন সুরসাধক—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১), দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩–১৯১৩), রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫–১৯১০) এবং অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭১–১৯৩৪)। আর এই চতুষ্টয়ের প্রায় তিন দশক পরে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬)।

আজ থেকে ৯২ বছর আগে এক বৃষ্টিস্নাত মৌসুমে তিনি চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেদিন ছিল ২৬ আগস্ট। নশ্বর জীবনের পর তিনি এসব বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় এখনো ফেরার অপেক্ষায় থাকেন কি না, কে জানে। কিন্তু বাংলা জননীর কোলে তাঁর ঠিকানা আজও অবিনশ্বর, কোনো দিন তা নশ্বর হবে না।

সর্বাগ্রে জন্ম যেমন, তেমন প্রভাবেও অনিবার্যভাবেই অদ্বিতীয় ছিলেন মহামহিম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘মাঝে মাঝে প্রাণে পরশ চেয়ে’ তিনি অধিকাংশ গানের সুরেই ধ্রুপদাশ্রয়ী হয়েছেন। গানের বাণীতে সৃষ্টি করেছেন কাব্যের দ্যোতনা। আবার বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন এবং মৃত্তিকাসংলগ্ন অন্যান্য সুরকেও করেছেন আলিঙ্গন। আশি বছরের জীবনে এমন বিবিধ সুর ও দার্শনিক কথামালায় আচ্ছন্ন করে রবিকবি লিখেছেন প্রায় দুই হাজার গান।

পঞ্চাশ বছরের জীবনে পাঁচশটির মতো গান লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, যেগুলোর অধিকাংশই নাটকে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর গানে খেয়াল ও টপ্পার উপস্থিতি লক্ষণীয়। অন্যদিকে, পঁয়তাল্লিশ বছরের নাতিদীর্ঘ আয়ুষ্কালে রজনীকান্ত সেনের মোটামুটি ২৯০টি গানের হিসাব পাওয়া যায়। আর বাংলার বাইরে ব্যস্ত কর্মজীবনের ফাঁকে তেষট্টি বছরের পার্থিব জীবনে অতুলপ্রসাদ সেন লিখেছেন সাকুল্যে ২০৮টি গান।

সবাইকে ছাপিয়ে অবশ্য সর্বকনিষ্ঠ কাজী নজরুল ইসলামের গানের সংখ্যাই সর্বাধিক—তিন সহস্রাধিক। সৃজনশীল জীবনে প্রায় (কিংবা মাত্র) পঁচিশ বছরের সীমায় নজরুলের প্রতিভার চরম স্বাক্ষর পাওয়া যায় তাঁর গীতিকবিতায়। অবশ্য নজরুলের কবিতা ও গানকে একই চাঁদের এপিঠ-ওপিঠে ঝলকানো সমান আলো ভাবতে বেশ ভালো লাগে সাধারণের। এর কারণ সম্ভবত ছন্দ ও মাত্রা নিয়ে বোদ্ধা নজরুলের ‘মস্তানি’ করার বিপুল ক্ষমতা। কিন্তু তাতে নজরুল-প্রতিভার প্রতি সুবিচার করা হয় না। নজরুল প্রথাগত গীতিকার নন, মূলত অনতিক্রম্য এক গীতিকবি ও সংগীতসাধক। অথচ অতিরঞ্জনের দোষে নজরুলের এই কৃতিত্ব অনালোচিত থেকে যায়।

রবীন্দ্রনাথের অতুল-স্মরণ। সংগৃহীত ছবি
রবীন্দ্রনাথের অতুল-স্মরণ। সংগৃহীত ছবি

পঞ্চকবির মধ্যে চারজন কবিরূপে যেমন বিখ্যাত, তেমনি গীতিকার হিসেবেও সর্বজনস্বীকৃত। ব্যতিক্রম শুধু অতুলপ্রসাদ সেন। গীতিকার হিসেবে তিনি যতটা খ্যাত, কবিরূপে ততটা নন। যদিও কাব্যক্ষেত্রে তাঁর অবদান মোটেই অকিঞ্চিৎকর নয়। আর অন্যদের তুলনায় নিতান্ত কম হলেও বাংলা সংগীতজগৎকে অতুলপ্রসাদ নতুন সুরধারার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে সক্ষম হন।

সংগীতই ছিল অতুলপ্রসাদের প্রাণের আরাম। নিজের রচিত গানে নিজেই সুর যোজনা করতেন। বাংলার বাউল ও কীর্তনের সুরের সঙ্গে হিন্দুস্থানি সংগীতের সুর ও ঢং মিশিয়ে তিনি নিজস্ব সংগীতরীতির প্রবর্তন করেছিলেন। অতুলপ্রসাদী সংগীতরীতি তাই এত সুপরিচিত। এই ধারাগুলো মিলেই বাংলা গানের ‘রাগাশ্রয়ী’ ধারার বিকাশ ঘটে। রাগাশ্রয়ী গানের মধ্যে ‘বঁধু, ধর ধর মালা পর গলে’, ‘তবু তোমায় ডাকি বারে বারে’ এগুলো পাই। ধ্রুপদ ও কীর্তনের অপূর্ব সংমিশ্রণে ‘জানি জানি হে রঙ্গরাণী’ গানটিও উল্লেখযোগ্য। অতুলপ্রসাদের নিজের কণ্ঠে গানটি গাওয়া হয়েছে।

অতুলপ্রসাদ দীর্ঘদিন ছিলেন লক্ষ্ণৌতে। স্বভাবতই উত্তর প্রদেশের সাংগীতিক ধারার দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন। ভাবপ্রধান, শৃঙ্গার রসাত্মক, চপলতাবর্জিত, ক্ষুদ্র আকারের এক ধরনের গায়নশৈলী হলো ‘ঠুংরিগান’ বা ‘ঠুমরি’। নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের সৃষ্ট ‘ঠুংরি’ ধারাকে বাংলা সংগীতে প্রথম প্রবর্তন করেন অতুলপ্রসাদ। বাণী ও সুরের মিলনে লক্ষ্ণৌ বা বারাণসীর ঠুংরি ধারা থেকে বাংলা গানের ‘রাগাশ্রয়ী’ ধারার বিকাশ ঘটে। নানা রাগের সংমিশ্রণে স্থায়ী ও অন্তরার সংক্ষিপ্ত শব্দের মধ্যে অতুলনীয় মাধুর্যের সন্ধান পাওয়া যায়। ‘কদরপিয়া’, ‘লালনপিয়া’ ছদ্মনামে ওস্তাদদের মধ্যে ঠুংরি রচনার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ‘আখতারপিয়া’ ছদ্মনামে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ রচিত ঠুংরি থেকেই অতুলপ্রসাদ মুখ্য প্রেরণা লাভ করেন।

‘পরের শিকল ভাঙিস পরে,/ নিজের নিগড় ভাঙ রে ভাই/ সার ত্যজিয়ে খোসার বড়াই!/ তাই মন্দির মসজিদে লড়াই।/ প্রবেশ করে দেখ রে দু’ভাই/ অন্দরে যে একজনাই।’

অতুলপ্রসাদের সবচেয়ে প্রিয় রাগ ছিল খাম্বাজ ও ভৈরবী। বিচিত্র মাত্রায় তিনি রাগ দুটি ব্যবহার করেছেন। বাংলায় গজল রচনাতেও অতুলপ্রসাদ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে এই সুরধারায় অনেকেই গান রচনা করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের গজলসহ নানা গানেও অতুলপ্রসাদী সুরের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। গজল গানের নিবিড় রসাস্বাদনে সমর্থ হয়েছিলেন অতুলপ্রসাদ। বাংলায় গজল রচনা করে তিনি খুলে দিয়েছিলেন বিশাল এক সংগীত-বাতাবরণ।

কবির হৃদয় নিঃসৃত কাব্যিক শব্দমালার গাঁথুনি এবং সুরের বাঁধন—এই দ্বৈত সত্তাই মূলত অদ্বৈত ধারা সৃষ্টি করে। অতুলপ্রসাদ সেন ব্যক্তিজীবনের বেদনাকে কথা ও সুরের সংমিশ্রণে বাংলা গানের জগতে উপহার দেন স্বতন্ত্র একটি ধারা। প্রিয়-বিরহের পথ ধরে তাঁর জীবনে গান এসেছিল প্রবলভাবে। বস্তুত গান হয়ে উঠেছিল তাঁর নিত্য সহচর। অন্তর-মথিত করা অব্যক্ত এক বেদনা রূপান্তরিত হয়ে সৃজিত হতো তাঁর গানের আধার। বিচ্ছেদ-বেদনাবিদ্ধ অবস্থায় অতুল মহাজগতের কাছে নিজেকে সমর্পনের গান শোনান। তাই তিনি বলতে পারেন: ‘আমারে রাখতে যদি আপন ঘরে/ বিশ্ব ঘরে পেতাম না ঠাঁই/ দুজন যদি হত আপন, /হত না মোর আপন সবাই।'

অতুলপ্রসাদের গানকে কয়েকটি ধারাশ্রয়ে ভাগ করা যায়। প্রকৃতির গান, স্বদেশচেতনার গান, ঈশ্বর-নিবেদিত সংগীত, প্রেমগীতি এবং বিবিধ—এভাবেই স্বাচ্ছন্দ্যে তাঁর গানের বিষয় বিভাজন করা যায়। খাঁটি বাউল-কীর্তনকে আধুনিক রিফাইনমেন্টের মাধ্যমে হৃদয়স্পর্শীভাবে প্রকাশ করার প্রয়াস তিনি চালিয়েছিলেন। আরেকটি দিক হলো বাংলা গানের মধ্যে হিন্দুস্থানি সুরের ঢংকে অভিনবভাবে মূর্ত করে তোলা। এভাবেই মাত্র ২০৮টি গানের সম্পদ দিয়ে শান্ত, নিরহংকার মানুষটি বাংলা গানের ভুবনকে দিয়ে গেছেন অপার ঐশ্বর্য।

অতুলপ্রসাদের গানের কথায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থাকলেও সুরের ক্ষেত্রে তিনি একেবারেই অনন্য। গানের ব্যাপারে গোছানো মানুষ ছিলেন না বলে লাজুক গীতিকবির জন্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই এগিয়ে আসেন। তাঁর নির্দেশেই ১৯২৫ সালে প্রথম গ্রন্থিত হয় অতুলের ‘কয়েকটি গান’। এরপর ১৯৩১ সালে ‘গীতিগুঞ্জ’, আরও পরে স্বরলিপিসমৃদ্ধ ‘কাকলি’। বাংলা কথাচিত্রে গজলের মধুর-করুণ রসের স্বাদ বাঙালি এর আগে পায়নি। বাউল ও ভক্তিগীতির এ ধারায় উল্লেখযোগ্য গান হলো: ‘ভাঙা দেউলে মোর কে আইলে আলো হাতে?/ ব’লে দিল কে পথ এ কালো রাতে?/ এ যে কাঁটার বন, হেথা কী প্রলোভন,/ ঘর ছেড়ে এলে কী আশাতে?’

লক্ষ্ণৌতে অতুলপ্রসাদ। সংগৃহীত ছবি
লক্ষ্ণৌতে অতুলপ্রসাদ। সংগৃহীত ছবি

এ ছাড়া আছে ‘কে তুমি ঘুম ভাঙায়ে, কেন মোরে, ডাকিলে গো এ আঁধারে?’; ‘তব অন্তর এত মন্থর’, ‘ক্রন্দসী পথচারিণী’; ‘মন রে আমার শুধু তুই বেয়ে যা দাঁড়’, ‘আর কতকাল থাকব বসে’, ‘মেঘেরা দল বেঁধে যায় কোন দেশে’, ‘প্রকৃতির ঘোমটাখানি খোল’ প্রভৃতি গান। এ ধারায় ‘মোদের গরব, মোদের আশা’ গানটি তাঁর দেশভক্তিমূলক গানের অনন্য উদাহরণ। ঠুংরি ঘরানার গানের মধ্যে ‘শ্রাবণ-ঝুলাতে বাদল রাতে আয় কে গো ঝুলিবি আয়’ উল্লেখযোগ্য। কাফি-খাম্বাজের মিশ্রণে ঠুংরি চালের ‘বাদল ঝুম ঝুম বোলে’ বা ‘বঁধু ধরো ধরো মালা পরো গলে’র মতো আসরজমানো গানেরও স্রষ্টা ছিলেন অতুলপ্রসাদ সেন।

পিতা রামপ্রসাদ সেন এবং মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তের জীবনাচরণ অতুলপ্রসাদের মধ্যে অধ্যাত্মচিন্তার বীজ বপন করে। পরবর্তী সময়ে সংসারজীবনের নানা প্রতিকূলতায় শান্তির খোঁজে ধীরে ধীরে ঈশ্বরের কাছে সমর্পিত হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর গানের মাঝেই তাই সমর্পণের পরম আকুতি পরিলক্ষিত হয়।

বাঙালির ঘরে ঘরে অতুলপ্রসাদের গান আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা নিয়ে পৌঁছে যায়। পরমের প্রতি আত্মনিবেদন বাঙালির প্রাণকে আন্দোলিত করে। এ প্রসঙ্গে The High Court of Calcutta-র ১২৫ বর্ষীয় স্মারক সংখ্যায় (১৮৬২-১৯৮৭) মুদ্রিত অক্ষরে দেখা যায়, “The Ecstatic resonance of Atul Prasad Sen’s (1896) lyrics is heard in every Bengali home. Again, the poet of ‘The song of the ocean’ (Sagara Sangeet) in his Vaishnavite melody surrendered completely to the Almighty.”

জীবিকার জন্য লক্ষ্ণৌতে থাকাকালীন অতুলপ্রসাদ সকলের মধ্যমণি ছিলেন। তাঁর এই জনপ্রিয়তা কেবল নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং রাজা থেকে প্রান্তিক মানুষ, শিক্ষিত থেকে অক্ষরজ্ঞানহীন, ধনী থেকে দরিদ্র, মডারেট থেকে এক্সট্রিমিস্ট—সকলের কাছেই সমভাবে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন তিনি। এখানে ধর্মেরও কোনো ভেদ ছিল না। সকল ধর্ম, শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে তাঁর অদ্ভুত প্রভাব লক্ষণীয়। তিনি কারও কাছে ‘এ.পি. সেন’, তো কারও ‘ভাই সাহেব’, কারও ‘ভাই দাদা’ তো কারও ‘অতুলদা’, আবার কারওবা ‘সেন সাহেব’।

এমন জীবনযাপনের দরুণ পার্থিবযাত্রার শেষ দিন পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করতে পেরেছিলেন অতুলপ্রসাদ সেন। তাঁর চেতনায় অসাম্প্রদায়িকতার চারাগাছটিও বোনা হয় শৈশবে। নাগরিক জীবন আলিঙ্গন করে বড় হওয়া অতুল ঢাকায় একাধারে মহররমের তাজিয়া, জন্মাষ্টমীর মিছিল, হোলির গানে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বড় হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। তাই হয়তো তিনি লিখেছেন: ‘দেখ মা, এবার দুয়ার খুলে।/ গলে গলে এলু মা, তোর/ হিন্দু-মুসলমান দু-ছেলে।’

এই চর্চারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লক্ষ্ণৌর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময়ে। জুজুধান দুই পক্ষের দাঙ্গা থামাতে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। উদার মানবতাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে করে তিনি দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় ঘুরেছেন। দাঙ্গা নিরসনের জন্য উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে বুঝিয়েছেন। আর বাইরে সবাইকে শান্ত করে ঘরে ফিরে এসে লিখেছেন:

‘পরের শিকল ভাঙিস পরে,/ নিজের নিগড় ভাঙ রে ভাই/ সার ত্যজিয়ে খোসার বড়াই!/ তাই মন্দির মসজিদে লড়াই।/ প্রবেশ করে দেখ রে দু’ভাই/ অন্দরে যে একজনাই।’

মাতামহের কল্যাণে আশৈশব তিনি রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন। ছিলেন সংঘাতবিরোধী। ফলে, তিনি নিজেও হয়ে উঠেছিলেন নিপীড়নবিরোধী ‘অ্যাক্টিভিস্ট’। রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে অবশ্য ভূমিকা ছিল রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনমোহন ঘোষ, আনন্দমোহন বসু প্রমুখ রাজনীতিবিদের বিভিন্ন সময়ের বক্তৃতার। সে ধারাবাহিকতায় পরবর্তী জীবনে এই আকর্ষণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু, এইচ.সি. পোলক প্রমুখের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক ছিল অতুলপ্রসাদের, তেমনি গোপালকৃষ্ণ গোখলে, অ্যানি বেসান্ত, মদনমোহন মালব্য, শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার, তেজবাহাদুর সপ্রু, সি. ওয়াই. চিন্তামণি, লর্ড সিন্হা, লালা লাজপত রায় প্রমুখের সঙ্গেও ছিল গভীর অন্তরঙ্গতা।

এত এত বড় নামের সঙ্গে সখ্য থাকার পরও সব ধরনের রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ও পার্টি-পলিটিক্সের ঊর্ধ্বে গিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির উদারতার কারণে ভিন্ন মতাদর্শের অনেকের সঙ্গে তিনি সহজ সম্পর্ক স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এই রাজনীতি-সচেতনতা অতুলপ্রসাদের চিত্তলোকে উপ্ত করেছে স্বদেশপ্রেমের বীজ। স্বদেশের প্রতি প্রবল ভালোবাসা তাঁর রাজনৈতিক বোঝাপড়ার উল্লেখযোগ্য গুণ। ব্রিটিশ শাসনের পরাধীনতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির বাসনায় অতুলপ্রসাদ তাই লেখেন স্বদেশপ্রেমমূলক সংগীত:

‘দুটি ঘরে জ্ঞানের আলো, কোটি ঘরে আঁধার কালো;/ এ আঁধার ঘুচাতে হবে – নইলে এ দেশ এমনি রবে।/ এদানেই এ জ্ঞান দ্বিগুণ হবে – এরাও তোমার মায়ের ছেলে।/ এ আঁধার ঘুচাতে হবে যতনে, অতি যতনে।’

একদিকে ছিল তাঁর রাজনৈতিক বোধ, যেখানে ঔপনিবেশিক ক্লেদ ও ক্লেশকে তিনি চর্মচক্ষুতে অবলোকন করেছেন। অন্যদিকে ছিল নাগরিক জীবনের ব্যক্তিগত বেদনাবোধ, যাকে এড়িয়ে না গিয়ে বন্ধুর মতো আলিঙ্গন করেছেন। সেই অথৈ সমুদ্র মন্থনান্তে গানে বর্ষণ করেছেন অমৃতধারা। বাউল, ঠুংরি কিংবা গজলের ফল্গুধারায় তুলে এনেছেন জীবনের পরমার্থ-অমৃত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহাস্পদ অতুলপ্রসাদ জীবনের নেতিবাচকতাকে ইতিবাচক জীবনবোধের দিকে পরিচালিত করে ধ্রুপদি সুর, কাব্য ও সংগীতের সাধনা করে গেছেন। তাই হয়তো তাঁর সমাধিলিপিও এমন ইতিবাচকতার অর্থদ্যোতনা তৈরি করে। বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের কাওরাইদে, সুতিয়া নদীর কাছে চিরশায়িত এই মহান সংগীতসাধকের সমাধিলিপিতে লেখা আছে: ‘শেষে, ফিরব যখন সন্ধ্যাবেলা, সাঙ্গ করে ভবের খেলা,/ জননী হয়ে আমায় কোল বাড়ায়ে ল'বে।/ আমার যে শূন্য ডালা, তুমি ভরিও!/ আর, তুমি যে শিব তাহা বুঝিতে দিও।’

আজ থেকে ৯২ বছর আগে এক বৃষ্টিস্নাত মৌসুমে তিনি চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেদিন ছিল ২৬ আগস্ট। নশ্বর জীবনের পর তিনি এসব বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় এখনো ফেরার অপেক্ষায় থাকেন কি না, কে জানে। কিন্তু বাংলা জননীর কোলে তাঁর ঠিকানা আজও অবিনশ্বর, কোনো দিন তা নশ্বর হবে না।

ধ্রুপদি এই নাগরিক বাউলের প্রতি অপার শ্রদ্ধা জানাই!

অর্থী দাস: শিক্ষণ সহকারী, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত