দেশে ব্র্যান্ডের ৭৭% টুথপেস্টেই ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

মোট ১৯ ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে ইএসডিও। ছবি: সংগৃহীত

দেশের বাজারে পরিচিত ব্র্যান্ডের টুথপেস্টের চারটির মধ্যে তিনটিতেই ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মোট ১৯ ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২৬টি প্রায় ৭৭ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণার উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। এমনকি শিশুদের জন্য বাজারে থাকা ছয় টুথপেস্টের চারটিতে ক্ষতিকর এই উপাদান রয়েছে।

পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার (ইএসডিও) গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় সংস্থার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন টুথপেস্ট’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) উপপরিচালক (রসায়ন) মনজুরুল করিম বলেন, টুথপেস্টের জাতীয় মানে বর্তমানে ৪০টি অনুমোদিত উপাদান ও কণার সীমা নির্ধারণ করা রয়েছে। তবে উৎপাদকরা কম খরচে ওজন বাড়ানোর জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করছেন, যা খুবই বাজে চর্চা।

তিনি বলেন, ২০১৯ সাল থেকেই প্রসাধনী পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষয় বিএসটিআই নজর রাখছে। ইতোমধ্যে ফেসওয়াশ ও ফেসপ্যাকের মান সংশোধন করা হয়েছে। এখন টুথপেস্টের মানেও একই ধরনের সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

শিশুদের জন্য বাজারে থাকা ছয় টুথপেস্টের মধ্যে চারটি বা প্রায় ৬৭ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এসব নমুনায় প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে স্থানীয় এবং আমদানি করা ১৯ ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করে ইএসডিও। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই) ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। একই সময়ে সারা দেশে ২ হাজার ৭৬০ জনের ওপর ভোক্তা জরিপ চালায় সংগঠনটি।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫ নমুনার মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এছাড়া ভিয়েতনাম থেকে আনা দুটি নমুনার দুটিতেই, থাইল্যান্ডের দুটির একটিতে এবং ভারতের পাঁচটি নমুনার একটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

পরীক্ষায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে সর্বনিম্ন ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ ৩২০ কণা শনাক্ত হয়েছে মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেলে। ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেনথল ফ্রেশে ১৬০টি করে, কোদোমো আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলায় ১৪০, সিগন্যাল গ্রিন টিতে ১২০, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট ও হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ারে ১০০টি করে এবং সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টে ৮০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে জেনফ্রেশ, প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাংগো), কোদোমো অরেঞ্জ এবং ক্লোজ-আপ রেড-হট জিঙ্ক ফ্রেশ টেকনোলজিসহ মোট আট নমুনায় কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় বলা হয়, শিশুদের জন্য বাজারে থাকা ছয় টুথপেস্টের মধ্যে চারটি বা প্রায় ৬৭ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এসব নমুনায় প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কোদোমো আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলায় সর্বোচ্চ ১৪০, মেরিল বেবি স্ট্রবেরিতে ৬০, মেরিল বেবি অরেঞ্জে ৪০ এবং পেপসোডেন্ট কিডজ অরেঞ্জে ২০টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন টুথপেস্ট’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে ইএসডিও। ছবি: সংগৃহীত
‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন টুথপেস্ট’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে ইএসডিও। ছবি: সংগৃহীত

ইএসডিও জানায়, পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ব্যবহৃত সিনথেটিক পলিমারের তথ্য উল্লেখ নেই। ফলে ভোক্তারা সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বাজার তদারকিও কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ইএসডিওর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেন জানান, গবেষণার সব নমুনা সরাসরি সুপারশপ ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে নকল বা ভেজাল পণ্য গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না।

ইএসডিওর ভোক্তা জরিপে বলা হয়েছে, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে জনসচেতনতা এখনো সীমিত। অংশগ্রহণকারীদের ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ আগে কখনো শোনেননি। ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ শুনলেও বিস্তারিত জানেন না। মাত্র ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা এই বিষয়ে সচেতন বলে জানিয়েছেন।

গবেষণায় বলা হয়, ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা নিয়মিত টুথপেস্ট ব্যবহার করেন এবং ৯০ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়মিত টুথব্রাশ ব্যবহার করেন। ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ দিনে একবার এবং ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ দিনে দুবার দাঁত ব্রাশ করেন। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত টুথপেস্ট ব্র্যান্ড মেডিপ্লাস, যা ব্যবহার করেন ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা। এরপর রয়েছে ক্লোজআপ ও পেপসোডেন্ট (১৩ দশমিক ৮ শতাংশ) এবং কোলগেট (১১ দশমিক ৩ শতাংশ)।

বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫ নমুনার মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এছাড়া ভিয়েতনাম থেকে আনা দুটি নমুনার দুটিতেই, থাইল্যান্ডের দুটির একটিতে এবং ভারতের পাঁচটি নমুনার একটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

ইএসডিওর দাবি, বাংলাদেশে বাজারজাত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে তারাই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা করল। বর্তমানে দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো জাতীয় মানদণ্ড, অনুমোদিত সীমা, পরীক্ষা পদ্ধতি বা বাধ্যতামূলক লেবেলিং নীতি নেই। গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে লক্ষ্যবস্তু করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের জন্য একটি বৈজ্ঞানিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি।

সংস্থাটি বলেছে, টুথপেস্ট থেকে নির্গত মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শের সঙ্গে শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, হৃদরোগ, স্নায়ুতন্ত্র ও প্রজননস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

ইএসডিও পণ্যের লেবেলে ব্যবহৃত উপাদান বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করা, মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য জাতীয় মানদণ্ড প্রণয়ন, বাজার তদারকি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোক্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত