অভিনেত্রী বাঁধনকে লাঞ্ছনা/ভয়ের রাজনীতি আর হিংস্র গণপরিসর, মুক্তি মিলবে কি

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯: ৪৫
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইতালির রাজপথে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন চিত্রতারকা আজমেরী হক বাঁধন। তার কিছু দৃশ্য দেখার পর আমি এই লেখাটি লিখতে বাধ্য হচ্ছি। সেসব দৃশ্যের শুরুতেই দেখা যায়—একদল প্রবাসী বাংলাদেশি তাঁকে ঘিরে ধরে তীব্রভাবে ব্যতিব্যস্ত করছে, চারপাশ থেকে "জয় বাংলা" এবং "জয় বঙ্গবন্ধু" স্লোগান দিতে বাধ্য করছে। বাঁধন সেখানে কোনো তর্ক বা প্রতিবাদের সুযোগ না পেয়ে কেবল সেই উগ্র জনতা ঠেলে পার হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাঁকে নির্বিঘ্নে পার হতেও দেওয়া হয়নি; গালিগালাজ, কুরুচিপূর্ণ শব্দপ্রয়োগ এবং উগ্র আচরণ দিয়ে তাঁকে চরমভাবে উত্ত্যক্ত করা হতে থাকে।

যাঁরা এই ধরনের মানসিক নিপীড়ন ও অশালীন বাক্যালাপের শিকার হয়েছেন, তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন যে বিগত পনেরো বছরে এই ধরনের উগ্র আচরণ আর মানুষকে আক্রমণের সংস্কৃতি কীভাবে আমাদের সমাজের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

আজ যে শিল্পীরা কিংবা সাধারণ মানুষ বিদেশে বা দেশে আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। শুরুতে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিল, তখন হয়তো সবাই সেখানে যাননি, যদিও দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক ছিল। কিন্তু যখন রাজপথে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু হলো এবং একের পর এক তরুণ, কিশোর ও শিশুদের রক্তে রাজপথে মৃত্যু নেমে এলো—তখন দেশের সাধারণ মানুষের আর ঘরে বসে থাকার উপায় ছিল না। সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞ দেখে প্রতিটি বিবেকবান মানুষ, অভিভাবক ও শিল্পী রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বর্তমানে সমাজে যে উগ্রতা, দলবদ্ধ নিপীড়ন এবং অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, তার সমস্ত দায়ভার কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ধর্মীয় চরমপন্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু তা হবে মূল সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার শামিল।

কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বা বৈদেশিক চক্রান্তের কারণে নয়, বরং স্বৈরাচারের এই চরম নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে মানবিক ও নৈতিক তাড়না থেকেই কোটি মানুষ শিক্ষার্থীদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি এমন অনেক তরুণ, চিত্রশিল্পী ও রচয়িতা সেদিন রাজপথে ছিলেন, যারা অতীতে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর চিত্রাঙ্কন করেছেন, তাঁকে নিয়ে রেখাচিত্র বা চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন কিংবা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পনেরো বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া ছিল সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত।

পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার এল বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে রূপ নিল—তার অর্থ এই নয় যে সেদিন সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কোনো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আজ বাঁধনদের মতো মানুষদের ওপর এভাবে চড়াও হওয়ার কোনো অধিকার কারো নেই।

বর্তমানে সমাজে যে উগ্রতা, দলবদ্ধ নিপীড়ন এবং অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, তার সমস্ত দায়ভার কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ধর্মীয় চরমপন্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু তা হবে মূল সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার শামিল। ইতালির রাজপথে একজন শিল্পীকে ঘিরে ধরে গালাগালি করা ও মানসিক অত্যাচার চালানোর যে হিংস্র রূপ আমরা দেখেছি, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত পোষণকারীদের যেভাবে আক্রমণ করে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, তা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটি মূলত বিগত পনেরো বছরের শাসনব্যবস্থার এক পরিকল্পিত ও বিষাক্ত ফসল, যা আমাদের সমাজকে উগ্রতায় অভ্যস্ত করে তুলেছে।

একটি সমাজের আত্মায় কীভাবে নিষ্ঠুরতা প্রবেশ করে, তা বুঝতে হলে তার দৃশ্যমান ও সামাজিক পরিবেশের দখলের দিকে তাকাতে হবে। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশের গণপরিসরকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বোমাবর্ষণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এটি কেবল রাজনৈতিক আধিপত্যের বিষয় ছিল না; এটি ছিল পুরো দৃশ্যপট এবং চিন্তাজগতকে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ দিয়ে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলার প্রচেষ্টা।

আমাদের পকেটের প্রতিটি কাগজের মুদ্রায় একটি নির্দিষ্ট মুখচ্ছবি মুদ্রিত করা হয়েছিল। অথচ একসময় বাংলাদেশের মুদ্রা ছিল এই ভূখণ্ডেরই এক মনোরম প্রতিচ্ছবি: যেখানে শোভা পেত দেশীয় পাখি, শাপলা, ঐতিহাসিক স্থাপত্য এবং আমাদের নদীগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সেই বৈচিত্র্যময় নান্দনিকতাকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল এক বাধ্যতামূলক আধিপত্য দিয়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিকে সর্বত্র উপস্থিত করা হয়েছিল। রাস্তাঘাট, সেতু, প্রতিষ্ঠান, পাঠশালা এবং পাবলিক স্মৃতিস্তম্ভগুলোর নাম ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল। প্রতিটি প্রধান মোড়ে মোড়ে ভাস্কর্য ও ব্যানার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

এই সর্বব্যাপী উপস্থিতি কোনো সাধারণ শ্রদ্ধা ছিল না; এটি ছিল আনুগত্য আদায়ের একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। এমনকি আমরা যারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত হয়ে বড় হয়েছি, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি যাদের অপরিসীম শ্রদ্ধা রয়েছে, তাদের কাছেও এই রাজনৈতিক যন্ত্রটি আমাদের একটি পবিত্র ইতিহাসকে ক্লান্তি ও বিরক্তির হাতিয়ারে পরিণত করেছিল। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ধারাবাহিক, গ্রন্থ, প্রচারমাধ্যম এবং সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে এক নির্দিষ্ট ও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বিবরণী প্রতিনিয়ত আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে গভীরভাবে ধারণ করা মানুষদের মনেও ক্লান্তি এনে দিয়েছিল।

আমার শৈশবের অনেকটা সময় জুড়ে ছিলেন আমার নানা—যাকে আমি গভীরভাবে ভালোবাসতাম এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতাম। তিনি আমার জীবনের এক অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন। তাঁর কারণেই আমি ইতিহাস ও রাজনীতির উভয় দিক সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছি, যা আমাকে নিজের মতো করে চিন্তা করতে শিখিয়েছে। আমার এই অভিজ্ঞতার আলোকেই আমি বুঝেছিলাম যে প্রধান দুটি দলই মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ এবং তাদের রাজনৈতিক চর্চা সন্ত্রাস আর দখলের মানসিকতায় ভরা।

বিগত পনেরো বছরের যে বাহ্যিক স্থায়িত্ব আমরা দেখেছি, তা কেনা হয়েছিল আমাদের জাতীয় চরিত্রের বিনিময়ে। এটি এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে যাদের আগ্রাসনে অভ্যস্ত করা হয়েছে, কুরুচিপূর্ণ ভাষায় অভ্যস্ত করা হয়েছে এবং দলবদ্ধ সহিংসতায় উৎসাহিত করা হয়েছে। সেই মডেলে ফিরে যাওয়া কিংবা সেটিকে অন্য কোনো রূপের স্বৈরাচার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা—একটি আত্মঘাতী ফাঁদ।

সে কারণেই আমার রাজনৈতিক জীবনে একমাত্র যেবার ব্যালটে ‘না ভোট’ দেওয়ার সুযোগ এসেছিল, ঠিক তখনই আমি ব্যবস্থার এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আসল তাগিদ ও উৎসাহ অনুভব করেছিলাম। তাই রাষ্ট্র-অনুমোদিত কোনো কৃত্রিম মতাদর্শের কাছে নতি স্বীকার না করাটা ছিল কেবলই সরে দাঁড়ানোর একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। তা সত্ত্বেও কোনো কর্তৃপক্ষ যখন প্রতিটি মুদ্রায় তার প্রতীক বসায়, একটি জাতির সবচেয়ে গর্বের ইতিহাসকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানায় এবং প্রতিটি গণপরিসর দখল করে নেয়, তখন তা জাতীয় ইতিহাসের প্রতি সাধারণ শ্রদ্ধাবোধকেও এক অস্বস্তিকর ও ক্লান্তিকর বোঝায় পরিণত করে।

স্বৈরাচারী শক্তিশালী শাসকের ভুল ধারণা

ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা বা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুহূর্তে—যখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, যখন শাসনব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে, কিংবা যখন বিদেশি শক্তিগুলো অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করে—তখন সমাজে এক ধরনের বিপজ্জনক অতীত-মোহ কাজ করে। মানুষ যখন বর্তমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় দুর্বল দেখতে পায়, তখন পেছনের দিকে তাকানোর প্রবণতা তৈরি হয়। অনেকে প্রশ্ন তোলেন: শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থা কি অত্যন্ত নির্মম হলেও অন্তত নিজের অবস্থান শক্তভাবে ধরে রাখার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল? অন্যদের তুলনায় তাঁর কি আন্তর্জাতিক চাপ সামলানোর মতো সাহস ছিল?

এই ভুল ধারণাকে আমাদের অত্যন্ত স্পষ্টতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। সেই তথাকথিত শক্তি ছিল নিজের দেশের মানুষকে নির্যাতন ও দমন-পীড়নের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক অলীক মায়া। যে শাসক দেশের ভেতরে নাগরিক স্বাধীনতাকে পিষে ফেলে আন্তর্জাতিক দর কষাকষিতে সুবিধা আদায় করেন, তিনি শক্তিশালী নন, তিনি কেবল একজন স্বৈরাচারী মাত্র।

বিগত পনেরো বছরের যে বাহ্যিক স্থায়িত্ব আমরা দেখেছি, তা কেনা হয়েছিল আমাদের জাতীয় চরিত্রের বিনিময়ে। এটি এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে যাদের আগ্রাসনে অভ্যস্ত করা হয়েছে, কুরুচিপূর্ণ ভাষায় অভ্যস্ত করা হয়েছে এবং দলবদ্ধ সহিংসতায় উৎসাহিত করা হয়েছে। সেই মডেলে ফিরে যাওয়া কিংবা সেটিকে অন্য কোনো রূপের স্বৈরাচার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা—একটি আত্মঘাতী ফাঁদ।

ভয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ক্ষমতা কোনো দেশকে রক্ষা করে না; তা ভেতর থেকে তার নাগরিকদের নৈতিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়।

আচরণগত অবক্ষয় ও হিংস্র গণপরিসর

যখন আমরা বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনা দেখি—মাজার ভাঙচুর, প্রকাশ্য দিবালোকে গণপিটুনি কিংবা নৃশংসভাবে মরদেহ পোড়ানোর মতো ঘটনা—তখন আমাদের নাগরিক সমাজের প্রথম প্রবণতা থাকে এগুলোকে কেবল ধর্মীয় চরমপন্থী বা মাদ্রাসার ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি সহিংসতার প্রকৃত উৎসকে এড়িয়ে যায়।

সেই চরমপন্থীরা কোনো শূন্যতার মধ্য থেকে জন্ম নেয়নি। দীর্ঘ পনেরো বছরে শেখ হাসিনার সরকার একদিকে ৫৬৪টি মডেল মসজিদ নির্মাণ থেকে শুরু করে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দিয়ে নির্দিষ্ট ধর্মীয় শ্রেণিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে, অন্যদিকে তাদের নিজেদের ছাত্রসংগঠনের মাধ্যমে হিংস্রতার যে ধরন প্রতিটি হলে ও রাজপথে প্রতিষ্ঠা করেছিল—তা পুরো জাতিকে সংক্রামিত করেছে। কাউকে জোর করে অপমান করা, আইনি বিচার ছাড়া গায়ে হাত তোলা বা ভিন্নমতকে পিষে ফেলার এই আগ্রাসী চর্চা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিগত সরকারের তৈরি করা এক সার্বিক জাতীয় অবক্ষয়।

নিয়তির ফাঁদ, চরমপন্থার ভয়

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললে গভীর হতাশা অনুভব করা যায়। যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের মধ্যে নীরব ভয় কাজ করছে যে আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেন আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। মানুষ গোপনে একটি সমীকরণের কথা ভাবছে: যেহেতু বর্তমান শাসনব্যবস্থায় নানামুখী দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে, তাই হয় পুরোনো স্বৈরাচার কোনো বৈদেশিক শক্তির সহায়তায় রক্তক্ষয়ী উপায়ে ফিরে আসবে, নয়তো উগ্র চরমপন্থা সেই খালি স্থান দখল করে নেবে।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন করতে হবে: এই দুটি উগ্র পথই কি আমাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ? আমরা কি আমাদের কল্পনাশক্তিকে সেই পুরনো ব্যবস্থার কাছেই বন্দি করে রাখব? হতাশাবাদ হলো স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় বিজয়। যখন পনেরো বছর ধরে একটি সমাজকে শেখানো হয় যে শক্তিই শেষ কথা, তখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এর চেয়ে ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ইতিহাস কোনো গাণিতিক সমীকরণ নয়; একটি জাতি নিজের ভবিষ্যতের জন্য কী বেছে নেয়, তার ওপরই ইতিহাস গড়ে ওঠে।

আমাদের বাংলাদেশের রূপকল্পকে কেবল রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতার সংকীর্ণ সীমানার মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। সামনে এগোনোর পথ কোনো বড় রাজনৈতিক ভাষণ বা সরকারি আদেশের মাধ্যমে আসবে না; তা আসবে আমাদের দৈনিক জীবনের ছোট ছোট পরিবর্তন থেকে—একটি পরিবার, একটি রাস্তার মোড় এবং আমাদের নিজেদের আচরণগত জায়গাগুলো থেকে।

আমরা এমন এক ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যা ভীতি ও অন্ধ আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। যেকোনো শক্তি বা মতাদর্শ—তা শেখ হাসিনার তৈরি করা স্বৈরাচারী ব্যবস্থা হোক, কিংবা কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান—যা মানুষকে ভয়ের মাধ্যমে অনুগত করতে চায় এবং এক উগ্র ভ্রাতৃত্ববোধের জন্ম দেয়, তা মূলত মানুষকে দাসত্বের দিকেই ঠেলে দেয়। যে মতাদর্শ সমাজ বা প্রকৃতির মৌলিক বৈচিত্র্যকে সহ্য করতে পারে না, অন্যের ভিন্নতাকে মেনে নিতে পারে না, তা হয়তো সৃষ্টির আসল রূপটি দেখতেই পায় না। কারণ পরম করুণাময় বা আমাদের সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো জড়িয়ে আছে এই বৈচিত্র্যের ভেতরেই।

প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, আমাদের দেশীয় গাছপালা, নদী আর মাটি—কোনো বাধ্যবাধকতা বা একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে বাঁচে না। কোনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা যখন এই ভিন্নতাকে মুছে দিতে চায়, তখন তা মূলত জীবনের নান্দনিকতাকেই অস্বীকার করে।

আমরা যা ভাবি, যে আচরণ বেছে নিই, জীবন হয়তো সেভাবেই রূপ পেতে থাকে। একজন মা হিসেবে সন্তানের জন্ম দেওয়া, নতুন কিছুকে গড়ে তোলা বা সুন্দর কিছু সৃষ্টির পেছনের যে অপরিসীম শ্রম আর ব্যাকুলতা, তা আমি গভীরভাবে অনুভব করি। ভাঙন আর কষ্ট যেমন সত্য, তেমনি নতুন করে কিছুকে জন্ম দেওয়ার ক্ষমতাও রূপকের বাইরে এক বাস্তব সত্য। আমাদের নিজেদের জীবনকে যেভাবে আমরা কখনো সুন্দর, কখনো বিশৃঙ্খল করে তুলি, সমাজ বা দেশের ক্ষেত্রেও হয়তো একই সমীকরণ কাজ করে।

আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় কষ্টগুলো খুবই দৃশ্যমান। নিত্যদিনের অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ, ক্ষমতার খেলা আর চারপাশের জটিলতার মধ্যে কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমান বিএনপি সরকারও যে ভুলমুক্ত নয় বা তাদের স্খলন ও সীমাবদ্ধতা নেই, তা নয়। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কি পুরনো স্বৈরাচারে ফিরে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো উগ্র চরমপন্থাকে মেনে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা তৈরি হয়? যদি এই শাসনব্যবস্থাও ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তবে আবার সোচ্চার হওয়ার, আবার নতুন কিছুকে জন্ম দেওয়ার অধিকার আর সামর্থ্য তো মানুষের ভেতরেই থাকে।

বাঁধনের ওপর হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি এমন এক রাজনৈতিক-সামাজিক সংস্কৃতির লক্ষণ, যেখানে ভিন্নমতকে অপমান ও দমন করা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার পথ পুরনো স্বৈরাচারে প্রত্যাবর্তনও নয়, ধর্মীয় চরমপন্থার হাতে সমাজ তুলে দেওয়াও নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি তৃতীয় পথ—বহুত্ববাদ, সহনশীলতা ও নাগরিক স্বাধীনতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

সমস্যা হলো, আমরা যেন এক যৌথ হতাশার ভেতরে বন্দি হয়ে পড়েছি—সব সময় চরম বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছি, যেন ধ্বংস ছাড়া আমাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু ইতিহাস হয়তো কোনো স্থির ট্র্যাজেডি নয়। আমাদের নিজস্ব প্রকৃতি, আমাদের ঐতিহ্য আর প্রতিটি ভিন্ন মানুষকে সাথে নিয়ে পথ চলার ভেতরেই প্রকৃত বিশ্বাস লুকিয়ে থাকে। যেকোনো একচ্ছত্র আধিপত্যের বদলে জীবনের এই বিচিত্র রূপকে ধরে রাখতে পারলে হয়তো সেই পরিবর্তনগুলোও অসম্ভব থাকে না যা আজ আমরা কল্পনা করতে পারছি না।

  • আনুশেহ আনাদিল: লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সামাজিক উদ্যোক্তা
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত