বোরো সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার ১৬% বেশি, তবু কৃষকের প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

২৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকারিভাবে বোরো ধান সংগ্রহ হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন। ছবি: সংগৃহীত
২৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকারিভাবে বোরো ধান সংগ্রহ হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন। ছবি: সংগৃহীত

চলতি মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে বোরো ধান সংগ্রহ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নির্ধারিত সময়সীমায় সরকারিভাবে ৫ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বিপরীতে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন।

তবে এই সাফল্যের সুবিধা প্রকৃত কৃষক কতটা পেয়েছেন, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের তালিকায় অনিয়ম এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও মিলারদের অতিমাত্রায় লাভবান হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার মৌসুমের শুরুতে অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হাওরাঞ্চলের কৃষকদের অনেকেই সরকারি মূল্যের তুলনায় কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত ২২ এপ্রিল খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভায় প্রতি কেজি ৩৬ টাকা (প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা) দরে ৫ লাখ টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি ৪৯ টাকা কেজি দরে ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল, ৪৮ টাকা কেজি দরে ১ লাখ টন আতপ চাল এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে ৫০ হাজার টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত হিসাব অনুসারে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন ধানের পাশাপাশি সিদ্ধ চাল ১১ লাখ ৫৬ হাজার ১১০ টন, আতপ চাল ৯৭ হাজার ৫০ টন ও গম ৫২৩ টন সংগ্রহ হয়েছে।

হাওরে ক্ষতি, সরকারি দাম অধরা

দেশের বোরো উৎপাদনের বড় একটি অংশ আসে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর থেকে। আগাম জাতের হওয়ায় এপ্রিল থেকেই সেখানে ধান কাটা শুরু হয়। চলতি বছর এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরুতে টানা অতিবৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ বোরো জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত হাওরের সাত জেলায় প্রায় ৪৯ হাজার হেক্টর বোরো জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ক্ষতির মুখে পড়েন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা চাষি।

মৌসুমের শুরুতে হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেত থেকে সরাসরি বিক্রি করা ধান মণপ্রতি ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং কিছুটা শুকনো ধান ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় দুর্যোগের পর ভেজা ধানের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় নেমে আসে। অথচ সরকারের নির্ধারিত দর ছিল মনপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা অর্থাৎ দ্বিগুণের বেশি।

হাওরের পরিস্থিতি বিবেচনায় ছয় জেলায় নির্ধারিত সময়সূচির ১২ দিন আগে ৩ মে থেকে ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু করা হয়। তবে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধানের আর্দ্রতার নির্ধারিত মান। সরকারি গুদামে ধান দিতে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা থাকার নিয়ম। টানা বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষকের ধানে আর্দ্রতা ছিল ২০ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে গুদামে নিয়েও ধান ফেরত আনতে হয়েছে অনেক কৃষককে।

কৃষক নির্বাচনেও জটিলতা

সরকারি ধান সংগ্রহে সব উপজেলায় একই পদ্ধতিতে কৃষক নির্বাচন হয় না। ‘কৃষকের অ্যাপ’-এ নিবন্ধন, কৃষি বিভাগের তালিকা এবং উপজেলাভেদে ‘আগে এলে আগে’ কিংবা লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচনের ব্যবস্থা রয়েছে।

২০১৯ সালে স্বচ্ছতা বাড়াতে ‘কৃষকের অ্যাপ’ চালু হলেও নিবন্ধন, আবেদন, নির্বাচন এবং গুদামে ধানের মান যাচাইের প্রক্রিয়া অনেক প্রান্তিক কৃষকের জন্য এখনো জটিল।

এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান না কিনে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে গুদামে ধান সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। ফলে সরকারি নথিতে কৃষকের যে নাম রয়েছে, বাস্তবে তিনিই উৎপাদক কিনা এবং সরকারি দামের পুরো সুবিধা তিনি পাচ্ছেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংগ্রহের লক্ষ্য অর্জনই শেষ কথা নয়। কারণ সরকারি সংগ্রহের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। সেক্ষেত্রে কতজন প্রকৃত কৃষক সরকারি দামে ধান বিক্রি করেছেন, কোন অঞ্চল থেকে কত কৃষক সুবিধা পেয়েছেন এবং তাদের কাছ থেকে বাস্তবে কী পরিমাণ ধান কেনা হয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সরকারি সংগ্রহের মূল্য ফসল কাটার আগেই ঘোষণা করা হলে কৃষক বাজারে যাওয়ার আগে দামের ধারণা পান। এতে দর কষাকষির সক্ষমতা বাড়ে। সরকারি পর্যায়ে চালের তুলনায় ধান সংগ্রহ বাড়ানো এবং সাধারণ কৃষক যেন জটিলতা ছাড়াই সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, সাধারণত বছরের এই সময়ে চালের দাম বাড়লেও এবার স্থিতিশীল রয়েছে। হাওরের উৎপাদনে ক্ষতির পরও বাজার স্থিতিশীল থাকার পেছনে সরকারি সংগ্রহ, আমদানি ও মজুত ব্যবস্থাপনার ভূমিকা রয়েছে। তবে কোনো ব্যবসায়ী চক্র যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে না পারে, সে জন্য বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মু. জসীম উদ্দিন খান জানান, সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং কৃষকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রয়েছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত