ad

মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ/বিশ শতকের বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় ও নজরুল

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ০৫
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

আজ যে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে, তিনি বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ, বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক। আমরা তাঁকে পাঠ করি কবি, সংগীতস্রষ্টা কিংবা সাম্যবাদ ও মানবমুক্তির কণ্ঠস্বর হিসেবে। তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তার এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে।

শতবর্ষ আগে বাংলার আলো-হাওয়ায় যে নজরুল বেড়ে উঠছিলেন, তিনি ছিলেন একজন রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ। সৃজিত সাহিত্যের মতো তাঁর জীবনও ছিল বহুবর্ণিল। তিনি চিঠি লিখতেন, আড্ডা দিতেন এবং সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তেন পথে। তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে এগোলে বিশ শতকের অবিভক্ত বাংলার কিছু ভৌগোলিক রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে নজরুলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বেশ কিছু ছোটো-বড় বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়।

বিশ শতকের প্রথমার্ধের বাংলা ছিল দ্রুত বদলে যাওয়া এক সমাজ। চলমান ঔপনিবেশিক শাসন, জাতীয়তাবাদের জন্ম, সাম্প্রদায়িকতার উত্থান, সমাজসংস্কারের প্রয়াস, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রাম, নারী-স্বাধীনতার প্রশ্ন, শিল্প-সাহিত্যের নতুন ভাষা—সব মিলিয়ে তৎকালীন বাঙালি সমাজে নানা ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা একযোগে পাশাপাশি চলছিল। সেকালে গ্রন্থ, পত্রিকা, সাহিত্যসভা, রাজনৈতিক সমাবেশ, ব্যক্তিগত আড্ডা ও চিঠিপত্র ছিল প্রচলিত সংযোগ-মাধ্যম। নজরুল ব্যক্তিগত জীবনে এসব তৎপরতায় কম-বেশি যুক্ত ছিলেন। তাঁর বন্ধুবৎসল ও আড্ডাপ্রিয় স্বভাবের কথা সর্বজনবিদিত। তবে মানুষটি যেহেতু নজরুল তাই তাঁর ব্যক্তিগত আলাপচারিতা নিছক দৈনন্দিন কথোপকথনে থেমে থাকেনি। বিভিন্ন ক্ষেত্রের অংশীজনের সঙ্গে তিনি যখন মিশেছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের মধ্যে চলেছে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান। এর মাধ্যমে নজরুলের মানসগঠন যেমন হয়েছে, তেমনি তাঁর ভিতরগত চিন্তাদর্শও ছড়িয়ে পড়েছে বহির্জগতে। এই সংযোগের সবচেয়ে বড় প্রামাণিক দলিল তাঁর পত্রসাহিত্য।

সব যুগেই পত্রসাহিত্য বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ সাধনে ভূমিকা রেখেছে। ইউরোপীয় রেনেসাঁর যুগে (চৌদ্দ শতক থেকে সতেরো শতক) চিঠিপত্র ব্যক্তিগত যোগাযোগের গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞানবিজ্ঞান ও নতুন চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেওয়ার বৈপ্লবিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ফলে ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও মানবতাবাদীদের মধ্যে চিঠির মাধ্যমে একটি অদৃশ্য আন্তঃদেশীয় বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় গড়ে ওঠে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে নজরুলের লেখা চিঠিগুলোর মধ্যেও একই কাঠামো নজরে আসে। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট সম্পাদিত নজরুলের পত্রাবলি-র সর্বশেষ সংস্করণে (২০২১) ১৯১৭ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত লেখা নজরুলের ৮৪টি চিঠি সংকলিত করেছে। এ সব চিঠির সিংহভাগই ব্যক্তিগত। অল্প কয়েকটি লেখা হয়েছে পত্রিকায় প্রকাশ কিংবা কোনো বিশেষ সম্মেলনে পাঠের উদ্দেশ্যে। প্রাপকের তালিকায় আছেন সমকালের প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক, নারী সাহিত্যিক, উদীয়মান লেখক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, গ্রন্থ প্রকাশক, পত্রিকার সম্পাদক, সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, গীতিকার, চলচ্চিত্র ডিস্ট্রিবিউটর, যোগী সাধক, সম্মেলনের আয়োজক, মাদ্রাসার মৌলভী এবং নজরুলের আত্মীয়, বন্ধু ও শিক্ষক। সরাসরি প্রাপক নন কিন্তু চিঠির ভিতরে নাম পাওয়া যাচ্ছে এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের তালিকাও দীর্ঘ। কথা প্রসঙ্গে এসেছে বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা, সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের নাম। এই চিঠিগুলোর আলোকে বিশ শতকের প্রথমার্ধের বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলের পারস্পরিক আদান-প্রদানের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা পাওয়া সম্ভব, যার একেবারে কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন নজরুল।

কল্লোল যুগের পত্তন হয়েছিল যাঁর কলমে সেই শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০১-১৯৭৬) ছিলেন নজরুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু। ‘প্রিয় শৈলজা’কে লেখা এ পর্যন্ত প্রাপ্ত একটিমাত্র চিঠিতে নজরুল জানাচ্ছেন রাজনৈতিক কনফারেন্সের হিড়িকে এতদিন কালিকলম পত্রিকায় লেখা দিতে পারেননি,

কনফারেন্সের আর মাত্র একমাস বাকি। হেমন্তদা আর আমি সব করছি এ যজ্ঞের। কাজেই লেখাটা শেষ করতে পারিনি এতদিন। রেগো না লক্ষ্মীটি। আমি তোমাদের লেখা দিতে না পেরে বড় লজ্জিত আছি।

তবে বন্ধুর মানভঙ্গ করতে এবারে চিঠির সঙ্গে পাঠাচ্ছেন ‘মাধবী-প্রলাপ’ কবিতাটি। চিঠিতে শ্রীহট্ট যুবক সম্মিলনী ও কলকাতার দাঙ্গার খবরও আছে। আর আছে প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮) ও মুরলীধর বসুর (১৮৯৭-১৯৬০) উল্লেখ। এখানে স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শ্রম স্বরাজ পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হেমন্তকুমার সরকার (১৮৯৭-১৯৫২) এবং সাহিত্যিক শৈলজানন্দের মধ্যে যোগসূত্রের কাজ করছেন নজরুল। আবার হেমন্তকুমার ছিলেন বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র বসুর (১৮৯৭-১৯৪৫) একান্ত সহযোগী। এতে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গেও নজরুলের যোগাযোগের পথ তৈরি হয়েছে।

কালিকলম পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মুরলীধর বসুকে লেখা পাঁচটি চিঠিতে ঘুরে ফিরে এসেছে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নলিনীকান্ত সরকার (১৮৮৯-১৯৮৪), নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (১৯০৫-১৯৬৩) প্রমুখের নাম। সাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার, প্রেমেন্দ্র, শৈলজানন্দের সঙ্গে যে নজরুলের গানের গায়ক নলিনীকান্ত ও গীতিকার-চিত্রপরিচালক নৃপেন্দ্রকৃষ্ণের ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল তা এই চিঠিগুলো থেকে স্পষ্ট। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণের উল্লেখ আবারও পাওয়া যায় প্রখ্যাত নাট্যকার মন্মথ রায়কে (১৮৯৯-১৯৮৮) লেখা নজরুলের চিঠিতে। মন্মথের সৃষ্টির প্রশংসা করে নজরুল লিখেছেন,

পবিত্রের মারফত আপনার প্রথম লেখা পড়ি-'মুক্তির ডাক'। পড়ে আমার কেমন লাগে পবিত্র লিখতে বলেছিল। ইচ্ছে করেই লিখিনি। সূর্যকে অভিবাদন করতে পারি কিন্তু তাকে উজ্জ্বলতর করে দেখানোর মতো আলো ও অভিমান আমার নেই। আজো আপনার শক্তিকে অন্তর দিয়ে নমস্কার জানাচ্ছি মাত্র, তাকে প্রশংসা করিনি। আপনাকে প্রশংসা করার শক্তি আমার নেই।

মন্মথ রায়ের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এই পবিত্র হলেন অনুবাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৯৩-১৯৭৪)। তিনি ছিলেন ন্যুট হামসুন (১৮৫৯-১৯৫২), ম্যাক্সিম গোর্কির (১৮৬৮-১৯৩৬) অনুবাদক। ফলে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সূত্রে নজরুল যে বিশ্বসাহিত্যের সংস্পর্শেও এসেছিলেন তা সহজেই অনুমান করা যায়।

সমকালীন নারী লেখকদের কারও কারও সঙ্গেও নজরুলের সম্পর্কের সূত্র পাওয়া যায় তাঁর চিঠিতে। বাংলার নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ (১৯০৮-১৯৬৪) ছিলেন নজরুলের স্নেহধন্য। কিশোরী নাহারকে লেখা চিঠিতে কথা প্রসঙ্গে নজরুল জানিয়েছেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের (১৮৮০-১৯৩২) কথা,

তোমায় যে আজ কাঁদতে হয় বসে বসে কলেজে পড়তে যাবার জন্য, এও হয়তো সেই কারণেই। মিসেস আর এস হোসেনের মতো অভিভাবিকা পাওয়া অতি বড় ভাগ্যের কথা। তাঁকেও যখন তাঁরা স্বীকার করে নিতে পারলেন না, তখন তোমার কী হবে পড়ার, তা আমি ভাবতে পারি নে!

সব বাধা বিপত্তি পেরিয়ে ১৯২৬ সালে শামসুন্নাহার স্নাতক পাশ করলে রোকেয়া এ উপলক্ষে সংবর্ধনার আয়োজন করেন। চিঠিতে নজরুলের থেকে নাহার আরও জেনেছেন বিপ্লবী হেমন্তকুমার সরকার ও কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) কথা। পরবর্তী কালে শামসুন্নাহার ও তাঁর ভাই মুহম্মদ হাবীবুল্লাহ বাহারের (১৯০৬-১৯৬৬) সঙ্গে নজরুলের পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থ নজরুল তাদের ভাই-বোনের নামে উৎসর্গ করেন। মুসলিম নারী কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার (১৯০৬-১৯৭৭) সঙ্গেও নজরুলের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। নজরুলের কলকাতার বাড়িতে কবির যাতায়াতের তথ্যও একটি চিঠি থেকে জানা যায়।

প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সংগঠন মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার অনেক আগে থেকেই এর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নজরুলের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। ১৯২৫ সালে আনোয়ার হোসেনকে লেখা চিঠিতে নজরুল একজন বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিক হিসেবে নিজের সাহিত্য-দর্শন প্রকাশ করেছেন। পরের বছরই আনোয়ার হোসেনদের হাত ধরে ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠিত হয়। সে বছর আরেকটি চিঠিতে আনোয়ার হোসেনকে নজরুল তাঁর রাজনৈতিক সমাবেশে অংশগ্রহণের খবর জানাচ্ছেন,

এই শরীর নিয়েই আবার বেরুব ৬ই মার্চ দিনাজপুরে। সেখানে ডিস্ট্রিক্ট কনফারেন্স, সেখান থেকে মাদারিপুর Fishermen's Conference-এ attend করতে যাব। ওখান থেকে খুব সম্ভব ঢাকা যাব। যদি যাই দেখা হবে।

এভাবে নজরুলের মাধ্যমে ঢাকায় বসেই আনোয়ার হোসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত কনফারেন্স সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। ১৯২৭ ও ১৯২৮ সালে নজরুল দুবার ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেন। ১৯২৭ সালের সম্মেলন উপলক্ষে কবির আগমনী সংগীত রচনার তথ্য জানা যায় শিখা গোষ্ঠীর অন্যতম কর্ণধার আবুল হুসেনকে (১৮৯৬-১৯৩৮) লেখা চিঠিতে।

১৯২৮ সালে শুধু এক বছরেই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা কাজী মোতাহার হোসেনকে (১৮৯৭-১৯৮১) নজরুল আটটি চিঠি লিখেছেন। এ চিঠিগুলোয় তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনদর্শন, সাহিত্য-ভাবনা ও বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কিত ধারণা প্রকাশ করেন। নানা প্রসঙ্গে এসেছে রবার্ট ব্রাউনিং (১৮১২-১৮৮৯), পার্সি বিশি শেলি (১৭৯২-১৮২২), জন কিটস (১৭৯৫-১৮২১) প্রমুখ বিদেশি সাহিত্যিকের কথা। বাংলা সাহিত্য সম্পর্কিত আলাপে পাওয়া যাচ্ছে কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), নলিনীকান্ত সরকার, বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) ও আবুল হুসেনের প্রসঙ্গ। আবার গ্রামোফোনে গান রেকর্ড করার খবরও মোতাহার হোসেনকে নজরুল পত্র মারফত জানিয়েছেন,

আমার গ্রামোফোনে গান ১৪ই এবং ১৫ই এপ্রিল। চারখানা গান এবং দুটা আবৃত্তি দেবো। দিলীপ, সাহানা, কে. মল্লিক প্রভৃতি আরো পাঁচ-সাতজন গাইয়ে আমার গান দেবেন এই সাথে।

এই সূত্রে নজরুলের মাধ্যমে কাজী মোতাহার হোসেনের যোগাযোগ তৈরি হয়েছে কলকাতার বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায় (১৮৯৭-১৯৮০), কণ্ঠশিল্পী মুনশী মুহম্মদ কাশেম ওরফে কে. মল্লিক (১৮৮৮-১৯৫৯) ও গায়িকা সাহানা দেবীর (১৮৯৭-১৯৯০) সঙ্গে। এভাবে নজরুল বিশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকা ও কলকাতার শিল্প-সংস্কৃতি জগতে খোলা জানালার ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে দুই বাংলার আদান-প্রদান যেমন বেড়েছে তেমনি নজরুল নিজেও ঋদ্ধ হয়েছেন।

নজরুলের সঙ্গে কেবল সমকালের প্রতিষ্ঠিত লেখক নন, উদীয়মান নবীন সাহিত্যিকদেরও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। নজরুলের ভাবনা তাঁদের লেখার অনুপ্রেরণা, দিকনির্দেশনা ও রসদ জুগিয়েছে। হুগলির তরুণ কবি শচীন করকে লেখা চিঠিতে নজরুলের কাব্য-ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে,

পড়া ছাড়িসনে তুই, তাহলে তোকে লেখায় ছাড়বে। অবশ্য পণ্ডিত হতে আমি বলছিনে, কিন্তু আমার আনন্দকে প্রকাশের পুঁজি তো আমার থাকা চাই। পণ্ডিত জমায়, সে কৃপণ; কবি বিলোয়, সে দাতা। কবি নেয়, কিন্তু সে দান করে,–নদীর মতো সে চলে গাইতে গাইতে, দান করে করে, দু’পাশে ফুল ফুটিয়ে।

একই চিঠিতে পাওয়া যাচ্ছে হুগলির আরেক সম্ভাবনাময় কবি প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যচর্চার খবর। প্রাণতোষ পরবর্তী জীবনে কাজী নজরুল শিরোনামে তিন খণ্ডে নজরুলের জীবনী রচনা করেন। নজরুলের চিঠি থেকে শচীন-প্রাণতোষদের উদ্যোগে হুগলির ‘মুশায়েরা’ শীর্ষক সাহিত্যিক বৈঠকের তথ্যও জানা যায়। আজিজুল হাকিম (১৯০৮-১৯৬২) নজরুলের স্নেহধন্য আরেক তরুণ কবি। তাকে লেখা একটি চিঠি থেকে বোঝা যাচ্ছে সওগাতমাসিক মোহাম্মদীর মতো পত্রিকায় হাকিমের কবিতা পাঠিয়ে নজরুল তাদের মধ্যে সেতুবন্ধের কাজ করেছেন। তিনি হাকিমের কবিতার সমালোচকের ভূমিকাও পালন করেছেন,

ছন্দ ও ভাষা দুই ঘোড়াকেই তুমি বেশ আয়ত্ত করেছ। ভাবের নীহারিকা লোক তোমার উজ্জ্বল গ্রহ হয়ে দেখা দেয়নি বলে অধৈর্য হয়ো না ও দানা বাঁধতে একটু সময় লাগবে হয়তো।

কবি জসীমউদ্‌দীন (১৯০৩-১৯৭৬) ও ছান্দসিক-প্রাবন্ধিক আবদুল কাদিরের (১৯০৬-১৯৮৪) সঙ্গে নজরুলের আন্তরিক সম্পর্কের প্রসঙ্গও এ চিঠিতে আছে। ফলে চিঠির মাধ্যমে জসীমউদ্‌দীন ও কাদিরের সঙ্গে হাকিম এক সূত্রে বাঁধা পড়েছেন।

বিশ শতকের প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাময়িকপত্রের স্বর্ণযুগ। পত্রিকাগুলো সমকালীন পাঠক-সাহিত্যিকদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির রুচি নির্মাণে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে। স্বাভাবিকভাবেই সাময়িকপত্রগুলোর সঙ্গে নজরুলের আন্তসম্পর্ক ছিল। নজরুলের পত্রাবলির অন্যতম প্রাপক ছিলেন এসব পত্রিকার প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ। বিভিন্ন সময় মোসলেম ভারত পত্রিকার সম্পাদক আফজাল-উল-হক (১৯০৬-১৯৮২), শক্তি পত্রিকার সম্পাদক বলাই দেবশর্মা, সবুজপত্র পত্রিকার সম্পাদনা সহযোগী পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, কালিকলম পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মুরলীধর বসু ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, আত্মশক্তি পত্রিকার সম্পাদক গোপাললাল সান্যাল, সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন (১৮৮৮-১৯৯৪), জয়তীমাহে-নও পত্রিকার সম্পাদক আবদুল কাদির, মাসিক বুলবুল পত্রিকার সম্পাদক মুহম্মদ হাবীবুল্লাহ বাহারকে নজরুল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিঠি লিখেছেন।

এছাড়াও বিভিন্ন চিঠিতে কথাপ্রসঙ্গে এসেছে প্রবাসী, নারায়ণ, বিজলী, ধূমকেতু, লাঙল, গণবাণী, Forward, কল্লোল, নওরোজ, বঙ্গবাণী, প্রগতি, নবশক্তি, মাসিক মোহাম্মদী, নাগরিক, নবযুগ প্রভৃতি সাময়িকপত্রের কথা। বিশ শতকের বাংলায়, বিশেষ করে ঢাকা ও কলকাতায়, এই সাময়িকপত্রগুলোকে ঘিরে বিভিন্ন সাহিত্যিক গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল। চিঠিপত্রের মাধ্যমে এ সব গোষ্ঠীর সঙ্গে নজরুলের বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের আক্ষরিক প্রমাণ পাওয়া যায়।

অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত নজরুল অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিচিত্র কর্মযজ্ঞে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। তাঁর চিঠিগুলোও তাই নানা সময়ে নানা স্থানে বসে লেখা। প্রাপকদের স্থানের তালিকাও বিচিত্র। প্রথমদিকে কৃষ্ণনগর ও পরবর্তী কালে কলকাতায় বসে নজরুল সিংহভাগ চিঠি লিখেছেন। কিছু চিঠি লেখা হয়েছে করাচি, দেওঘর, কুমিল্লা, হুগলি, পদ্মা নদী, রাঁচি থেকে। এসব চিঠি খামবন্দি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে কলকাতা, রংপুর, বর্ধমান, ঢাকা, ময়মনসিংহ, হুগলি, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ সহ বাংলার নানা প্রান্তে। বিশ শতকের বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়কে বোঝার জন্য নজরুলের পত্রাবলির প্রেরণ ও গ্রহণের স্থানসমূহ তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে তৎকালীন বুদ্ধিজীবী সমাজের প্রগতিশীল আদান-প্রদানের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক রেখাসমূহ চিহ্নিত করা যায়।

নজরুল বিশ শতকের কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন প্রতিভা ছিলেন না। তিনি ছিলেন তৎকালীন বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর লেখা চিঠিগুলোকে সামনে রাখলে বিশ শতকে তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা ছোটো-বড় অনেকগুলো প্রগতিশীল বলয় বা গোষ্ঠী চিহ্নিত করা যায়। ঢাকা ও কলকাতার বলয়গুলোর মধ্যে নজরুল ব্যতীত আরো কয়েকজন ব্যক্তির সন্ধান মেলে যাঁরা অনেক গোষ্ঠীর সাধারণ সদস্য। ফলে এই গোষ্ঠীগুলো পুরোপুরি নজরুলকেন্দ্রিক নয়। কিন্তু হুগলি, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর কিংবা বর্ধমানের মতো প্রান্তিক বলয়গুলোর ক্ষেত্রে নজরুলই প্রধান সংযোগ-মাধ্যমের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁকে বাদ দিলে অনেক ক্ষেত্রেই গোষ্ঠিগুলোর মধ্যে আন্তসম্পর্ক ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়। এসব ক্ষেত্রে নজরুলের মাধ্যমে কেন্দ্রের সঙ্গে প্রান্তের বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ সাধন হয়েছে। নজরুলের চিঠিপত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে নজরুলের মানসগঠনের একটি রূপরেখা যেমন পাওয়া যায় তেমনি তাঁর আইডিয়াগুলো কীভাবে সময়ের সাথে সাথে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়েছে সে রূপরেখাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে বিশ শতকের অবিভক্ত বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার প্রবাহ আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।

লেখক: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত