আমাদের জনস্বাস্থ্যের এক অদৃশ্য শত্রু ‘ফরএভার কেমিক্যালস’

লেখা:
লেখা:
আহসানুর রহমান

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১১: ০৪
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সম্প্রতি দেশে প্রসাধনসামগ্রী, তেল বা দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করলে এই আলোচনা খুবই জরুরি। আমাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক ঠিক কী কী ক্ষতি করছে, তা বিস্তারিত জানতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গবেষকেরা কাজ করে যাচ্ছেন। ঠিক একইভাবে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মিশে থাকা আরও একধরনের ভয়ংকর রাসায়নিক সম্পর্কে পাঠকদের জানাতে ও সচেতন করতেই আমার এই লেখা।

ব্যক্তিগতভাবে গবেষণার সূত্রে গত দুই বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও স্বনামধন্য এন্ডোক্রাইন কনফারেন্সে আমি আমন্ত্রিত হয়েছি। সেখানে আমাদের ল্যাবের গবেষণার ফলাফল তুলে ধরার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পাশাপাশি ‘আমেরিকান ফিজিওলজি সামিট কনফারেন্স’-এও আমি গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেছি।

এসব সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা তাঁদের গবেষণার প্রাথমিক তথ্য তুলে ধরেন। সেগুলো দেখে আমি একটি বিষয় খেয়াল করেছি। তা হলো, উন্নত দেশগুলোর বর্তমান সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো ক্যানসার এবং এন্ডোক্রাইন ও মেটাবলিক (বিপাকীয়) সমস্যা। গবেষকদের এসব প্রাথমিক ডেটা বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের চেয়েও আরও ভয়ানক, অদৃশ্য ও শক্তিশালী এক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছি আমরা। যার কারণে এন্ডোক্রাইন, বিপাকীয় সমস্যা ও ক্যানসারের মতো মারাত্মক সব অসুখ বেড়ে যাচ্ছে। আর এই ঝুঁকির মূল কারণটি লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভেতরেই।

সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে চলুন জেনে নিই, কী সেই কেমিক্যাল বা রাসায়নিক। বিজ্ঞানীদের ভাষায় একে বলা হয় ‘পার-অ্যান্ড পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল সাবস্ট্যান্স’। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘ফরএভার কেমিক্যালস’ বা ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ নামেই বেশি পরিচিত। এই রাসায়নিকগুলো আমাদের শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বা এন্ডোক্রাইন সিস্টেমকে নষ্ট করে দেয়। তাই এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা হরমোন বিশেষজ্ঞরা একে ‘এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টিং কেমিক্যাল’ (ইডিসি) বলে থাকেন।

এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন, কেন একে ‘ফরএভার কেমিক্যালস’ বলা হচ্ছে? এই নামকরণের মূল কারণ হলো এদের অণুর বিশেষ রাসায়নিক গঠন এবং মানবশরীরে এদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওইসিডি-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, পিএফএএস যৌগের কার্বন শেকলে অন্তত একটি সম্পূর্ণ ফ্লোরিনেটেড মিথাইল বা মিথিলিন কার্বন পরমাণু থাকে। সহজ কথায়, এই যৌগের কার্বনের সঙ্গে হাইড্রোজেন বা অন্য কোনো হ্যালোজেন নয়, বরং কেবল ফ্লোরিন যুক্ত থাকে।

জৈব রসায়নে কার্বন ও ফ্লোরিনের এই বন্ধনটি হলো সবচেয়ে শক্তিশালী একক সমযোজী বন্ধন। প্রাকৃতিক পরিবেশে কিংবা আমাদের শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় এই বন্ধন কিছুতেই ভাঙে না। এমনকি আমাদের শরীরও সহজে এগুলোকে ভাঙতে পারে না।

এর ফলে পিএফএএস একবার শরীরে প্রবেশ করলে, শরীর তা বের করে দেওয়ার আগেই এগুলো দ্রুতগতিতে জমতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের রক্তে এদের ‘অর্ধায়ু’ বা ‘হাফ-লাইফ’ কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, যেকোনো রাসায়নিকের অর্ধায়ু বলতে একটি নির্দিষ্ট সময়কে বোঝায়। একটি রাসায়নিকের প্রাথমিক পরিমাণের ঠিক অর্ধেক (৫০ শতাংশ) ক্ষয় বা নষ্ট হতে যে সময় লাগে, সেটিই হলো তার অর্ধায়ু।

প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে এই সব ভয়ংকর রাসায়নিক চলে আসল? এই ইতিহাস জানার জন্য আমাদের একটু পেছনে ফিরতে হবে। ১৯৫০-এর দশকে বহুজাতিক রাসায়নিক কোম্পানিগুলো নন-স্টিক বাসনের আস্তরণ (যেমন- টেফলন), ফায়ারফাইটিং ফোম, ভবন নির্মাণের উপকরণ এবং পানি ও দাগ-প্রতিরোধী কাপড়ে ব্যবহারের জন্য পিএফএএস বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো- ১৯৬১ সাল থেকেই কোম্পানিগুলোর নিজস্ব গবেষণাগারে প্রাণী-গবেষণায় ধরা পড়েছিল যে পিএফএএস লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি করে।

বিখ্যাত কেমিকেল কোম্পানি ডুপন্টের নিজস্ব বিষতত্ত্ববিদেরা তখনই টেফলন-উপাদানে ইঁদুর ও খরগোশের লিভারে এর প্রতিক্রিয়া যেমন লিভার বড় হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পেয়ে সতর্ক করেছিলেন। ২০২৩ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘অ্যানালস অব গ্লোবাল হেলথ’-এ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ফ্রান্সিসকো (ইউসিএসএফ)-এর গবেষকদের প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী নথি-বিশ্লেষণ থেকে জানা যাচ্ছে, ডুপন্ট ও থ্রিএম-এর মতো কোম্পানিগুলো সাধারণ মানুষের রক্তে এবং সেসব ইন্ড্রাস্ট্রিতে কর্মরত শ্রমিকদের সন্তানদের নাড়ির রক্তে এই রাসায়নিকের উপস্থিতি খুঁজে পেলেও তা কয়েক দশক ধরে জনসাধারণ এবং সরকারি তদারকি সংস্থার কাছে গোপন রেখেছিল।

পরবর্তীতে জনস্বাস্থ্যের আশঙ্কাজনক চিত্রে বাধ্য হয়ে সরকার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ প্রধান দুই পিএফএএস যৌগ-পারফ্লুরোঅক্টানয়িক অ্যাসিড এবং পারফ্লুরোঅক্টেন সালফোনেট-এর উৎপাদন পর্যায়ক্রমে বন্ধ বা ফেজ-আউট করে। কিন্তু ঘটনার শেষ এখানেই নয়। রাসায়নিক প্রস্তুতকারকেরা এদের জায়গায় বাজারে নিয়ে এসেছে আরও হাজার হাজার নতুন বা বিকল্প পিএফএএস, যেগুলোর অধিকাংশেরই কোনো স্বতন্ত্র স্বাস্থ্যঝুঁকি গবেষনাগারে মূল্যায়িত হয়নি এবং অহরহ নতুন যৌগ বাজারে যুক্ত হয়েই চলেছে।

চার দশক পরেও যথাযথ রেগুলেশনের অভাবে এসব চিরস্থায়ী রাসায়নিক উৎপাদন, ব্যবহার বা বর্জ্য ফেলার মাধ্যমে আমাদের খাবার পানি, মাটি এবং বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। খাবার বা পানির সাথে গিলে ফেলা, গৃহস্থালির ধুলা ও দূষিত বাতাস শ্বাসের সাথে নেওয়া, কিংবা কিছু ক্ষেত্রে ত্বক দিয়ে শোষণের মাধ্যমে পিএফএএস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

যদিও গবেষণা জানাচ্ছে এসব রাসায়নিক মূলত খাদ্য ও খাবার পানি দিয়েই শরীরে ঢুকে পড়ছে। ফলে মানুষের রক্ত, প্রস্রাব, মায়ের বুকের দুধ, শুক্রাণু এবং নাড়ির রক্তে অবলীলায় এর উপস্থিতি মিলছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরীক্ষা সমীক্ষার তথ্য মতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯৮–৯৯ শতাংশ মানুষের রক্তেই পিএফএএস উপস্থিতি আছে। বিশেষ করে অগ্নিনির্বাপক কর্মী, পিএফএএস কারখানার শ্রমিক এবং বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি কিংবা শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি বা ভাটিতে বসবাসকারী মানুষের শরীরে এর এক্সপোজার সবচেয়ে বেশি।

এবার আসি কেন এদেরকে বলা হয় হরমোনের শত্রু বা এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর। এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর বলার কারণ হচ্ছে অত্যন্ত নগণ্য ঘনমাত্রাতেও এরা আমাদের হরমোনের সিগনালিং কে ব্যাহত করতে পারে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। সাধারণত ২০টি অলিম্পিক সাইজের সুইমিং পুলের পানিতে মাত্র এক ফোঁটা কোন রাসায়নিক মিশিয়ে দিলে যে ঘনত্ব তৈরি হয় সেটিকে বিজ্ঞানীরা বলেন ১ পার্টস পার ট্রিলিয়ন (১ পিপিটি)। সেই হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) খাবার পানিতে পিএফওএ ও পিএফওএস-এর সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা বেঁধে দিয়েছে মাত্র চার (0৪) পিপিটি-এ। তবে স্বাস্থ্য-ভিত্তিক ‘লক্ষ্যমাত্রা’ (এমসিএলজি) নির্ধারণ করেছে ‘শূন্য’। তাহলে বুঝতেই পারছেন কত ক্ষুদ্র পরিমাণ থাকলেই এই পিএফএএস গুলো আমাদের শরীরের ক্ষতি করতে পারে।

স্বভাবতই প্রশ্ন আসে এত অল্প পরিমাণে থেকেও কিভাবে এরা আমাদের এত বড় রকমের ক্ষতি করতে সক্ষম হয়? যেহেতু পিএফএএস-এর ক্ষতির প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহে পরিলক্ষিত হয়না বরং এক্সপোজার বা শরীরে ঢোকার বহু বছর পর সেটির প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সে হিসেবে বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তবে প্রাথমিক ভাবে ধারনা করা হচ্ছে এই পিএফএএস এর ক্ষতিকারক দিকটির পেছনে আছে যৌগটির আণবিক গঠন। এই মলিকিউলদের গঠন মানবদেহের ফ্যাটি অ্যাসিডের মতোই এক প্রান্তে লম্বা কার্বন টেইল, অন্য প্রান্তে অ্যাসিডিক অণু থাকে। এই সাদৃশ্যের কারণে এরা রক্তের অ্যালবুমিন ও লিভারের ফ্যাটি অ্যাসিড-বাইন্ডিং প্রোটিনের সঙ্গে মিশে যেতে পারে এবং কোষের ভেতরে থাকা নিউক্লিয়ার রিসেপ্টর যেমন PPAR-α (Peroxisome Proliferator-Activated Receptor Alpha)—কে সক্রিয় করে ফেলে এবং সরাসরি আমাদের জিন এক্সপ্রেশন বদলে দেয়। এর ফলে আমাদের খাদ্য পরিপাকতন্ত্রে ব্যাঘাত এবং লিভার এনজাইম বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ মানুষের গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে পাওয়া গেছে।

এছাড়াও মানুষের রক্তে পিএফএএস-এর মাত্রা বেশি হলে কোলেস্টেরলও বেড়ে যায়। কিছু গবেষণা বলছে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ডায়াবেটিসের সঙ্গেও পিএফএএস-এর সম্পর্ক আছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, মায়ের শরীর থেকে প্লাসেন্টা পেরিয়ে ভ্রূণে এবং পরে বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে এই রাসায়নিক পৌঁছে যায় অর্থাৎ জন্মের আগেই এক্সপোজার শুরু হয়। একাধিক প্রজন্ম ধরে (নাতি-নাতনি পর্যন্ত) জৈবিক ক্ষতি বহনের প্রমাণ এখন পর্যন্ত মূলত প্রাণী-গবেষণা থেকে আমরা জানতে পেরেছি। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এগুলো একাধিক প্রজন্মতে ট্রান্সফার বা পরিবাহিত হয় কি না তা জানতে গবেষনা চলছে।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত এবং সেমিনার বা কনফারেন্সে উপস্থাপিত তথ্য থেকে এটা পরিষ্কার যে সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে আমাদের শিশুরা। বিশেষ করে বাড়ন্ত শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরীদের ওপর পিএফএএস-এর প্রভাব নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। বয়ঃসন্ধি বা পিউবার্টি হলো মানুষের জীবনের এমন একটি সংবেদনশীল সময়, যখন হাইপোথ্যালামাস-পিটুইটারি-গনাডাল (এইচপিজি) অক্ষের সূক্ষ্ম হরমোনাল সিগন্যালের ওপর ভিত্তি করে প্রজনন ও দৈহিক বিকাশ ঘটে। নরওয়ের ‘বার্গেন গ্রোথ স্টাডি ২’-এর যে বিশ্লেষণটি ২০২৪ সালে ‘এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-জার্নালে প্রকাশিত হয়, তাতে দেখা যায় ৯ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরদের রক্তে চারটি প্রধান পিএফএএস-এর সম্মিলিত মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকায় তাদের বয়ঃসন্ধির শুরু গড়ে প্রায় ১১ মাস পিছিয়ে যায় (১২.১৪ বছর বনাম ১১.২৬ বছর)।

একইভাবে বার্গেন গ্রোথ স্টাডির মেয়েদের ওপর করা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রক্তে উচ্চ মাত্রার পিএফএএস থাকা মেয়েদেরও প্রথম ঋতুস্রাব বা মেনার্কে দেরিতে শুরু হয়েছে। গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর সম্ভাব্য কারণ বয়ঃসন্ধির মূল হরমোন যেমন লুটেইনাইজিং হরমোন (এলএইচ), ফলিকল-স্টিমুলেটিং হরমোন (এফএসএইচ) ও ইস্ট্রোজেনের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং এই কমে যাবার পেছনে পিএফএএস এর সম্পর্ক আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটি ও সান ফ্রান্সিসকো শহরের মেয়েদের ওপর করা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাও (এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পার্সপেক্টিভস-এ ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে) দেখিয়েছে যে পিএফএএস-এর উচ্চ মাত্রার সঙ্গে বয়ঃসন্ধির সূচনা কয়েক মাস দেরিতে হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। বাড়ন্ত বয়সের হাড়ের গঠনেও পিএফএএস প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোম স্টাডির শিশুদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে উচ্চ মাত্রার পিএফওএ থাকা কিশোর-কিশোরীদের হাড়ের খনিজ ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেছে। কৈশোরেই মানুষের সারা জীবনের সর্বোচ্চ হাড়-ভর তৈরি হয়; তাই এই সময়ে ঘনত্ব সামান্য কমে যাওয়াও পরবর্তী জীবনে হাড় ভেঙে যাওয়া ও অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

এছাড়া মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই মানব ভ্রূণের লিভারের মেটাবলিক প্রোফাইলিং করে দেখা গেছে, পিএফএএস জমা হয়ে বাইল অ্যাসিড ও লিপিড মেটাবলিজমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। গর্ভাবস্থার এক্সপোজারের সঙ্গে কৈশোরে স্থূলতা ও দেহ-গঠনের পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রোজেক্ট ভিভা’ কোহর্টে, আর থাইরয়েড হরমোন পরিবাহী প্রোটিন ‘ট্রান্সথাইরেটিন’ (টিটিআর)-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করার প্রমাণও একাধিক কিশোর-জনগোষ্ঠীতে মিলেছে।

২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) পিএফওএ-কে ‘গ্রুপ ১: মানুষের জন্য ক্যানসার-সৃষ্টিকারী’ এবং পিএফওএস-কে ‘গ্রুপ ২বি: সম্ভাব্য ক্যানসার-সৃষ্টিকারী’ হিসেবে ক্লাসিফাই করেছে। মানুষের ক্ষেত্রে কিডনি ও অণ্ডকোষের ক্যানসারের সাথে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিছু কিছু গবেষনা জানাচ্ছে এই পিএফএএস আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব এমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশন-এ প্রকাশিত ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের শিশুদের নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে পিএফওএস-এর মাত্রা দ্বিগুণ হলে ৫ থেকে ৭ বছর বয়সে ডিপথেরিয়া ও টিটেনাস টিকার বিপরীতে তৈরি অ্যান্টিবডির পরিমাণ প্রায় ৪৯% কমে যায়। এখানে জানিয়ে রাখি যে এগুলো সব পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা তাই এরা এসোসিয়েশন বা সম্পর্ক দেখায় কিন্তু সরাসরি কার্যকরন বা কজাল সম্পর্ক প্রমাণ করেনা। আগেই যেমনটা বলেছি যে বিস্তারিত জানতে আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন জনগোষ্ঠীতে একই রকমের ফলাফল পাওয়াটাই উদ্বেগের মূল কারণ।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ফরএভার কেমিকেলের হাত থেকে আমাদের সন্তান ও নিজেদের কীভাবে রক্ষা করব?

মাইক্রোপ্লাস্টিকের মত এখানেও ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে কিছু সচেতনতা এক্সপোজার কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন- রান্নাবান্নায় স্ক্র্যাচ পড়া পুরনো নন-স্টিক পাত্রের বদলে স্টেইনলেস স্টিল বা কাস্ট আয়রনের পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। খাবার কেনার সময় যেসব খাবার যেমন ফাস্ট ফুড বা পিজ্জা যা তেল রোধী প্যাকেট বা কাগজের মোড়কে দেয়া হয় সেসমস্ত খাবার যথা সম্ভব এড়িয়ে চলা ও ওয়াটারপ্রুফ কেমিক্যালযুক্ত জিনিস কেনা থেকে বিরত থাকা। খাবার পানি শোধন করার জন্য পিএফএএস ছাঁকতে সক্ষম উচ্চমানের রিভার্স অসমোসিস (আরও) বা গ্র্যানুলার অ্যাক্টিভেটেড কার্বন (জিএসি) ফিল্টার ব্যবহার করা যায়। সাধারণ কার্বন ফিল্টার লং চেইনে পিএফএএস ভালোভাবে ফিল্টার করতে পারে তবে ফিল্টার নিয়মিত বদলানো জরুরি।

তবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে পরিবেশ ও আমাদের শরীরে ছড়িয়ে পড়া পিএফএএস-এর মহাসমুদ্রে আমাদের আচরণ পরিবর্তন বা ব্যবহার কমিয়ে আনা অতি সামান্য প্রতিরোধ মাত্র। বিশ্বজুড়ে পিএফএএস উৎপাদন, ব্যবহার ও অপসারণের ওপর কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণই এর একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। তাই সরকার কেই এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। রাসায়নিক কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং নিরাপদ বিকল্প উপাদান উদ্ভাবনে বাধ্য করা সরকারের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।

এতক্ষণ যেসব গবেষণার কথা বললাম, তার প্রায় সবই যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে বা ইউরোপের। স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে বাংলাদেশে এর অবস্থা কী? দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তরটি হলো, আমরা জানি না। আর একজন গবেষক হিসেবে আমার কাছে এই না-জানাটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে মানুষের রক্তে পিএফএএস-এর মাত্রা পরিমাপের কোনো সার্ভিল্যান্স কর্মসূচি নেই; যুক্তরাষ্ট্রে ন্যশনাল হেলদ এন্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভে-এর মতো জরিপ থেকে যেভাবে জানা গেছে সেখানকার ৯৮–৯৯ শতাংশ মানুষের রক্তে এই রাসায়নিক আছে, আমাদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো তথ্যই নেই। খাবার পানিতে পিএফএএস-এর সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা নির্ধারিত হয়নি যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা যেখানে এই সীমা মাত্র ৪ ppt-এ বেঁধে দিয়েছে, বাংলাদেশে সেই মানদণ্ডটিই এখনো তৈরি হয়নি। আর শিল্পবর্জ্যে পিএফএএস পরিমাপের কোনো নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থাও নেই। এই শূন্যতাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ আমাদের দেশ পিএফএএস-এর কেবল ভোক্তা নয়, উৎপাদন-প্রক্রিয়ার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পানি ও দাগ-প্রতিরোধী ফিনিশিং আমাদের কারখানাতেই হয়; ফলে সেই রাসায়নিকের এক্সপোজার বহন করেন আমাদের শ্রমিকেরা, আর তার বর্জ্য গিয়ে মেশে আমাদের নদীতে। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে জানা দরকার প্রচলিত ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) পিএফএএস অপসারণে কার্যত অক্ষম। কারণ ইটিপি নকশা করা হয়েছে জৈব-অবক্ষয়যোগ্য দূষণ, রং ও ভারী ধাতুর জন্য; কিন্তু কার্বন-ফ্লোরিন বন্ধন জৈবিক প্রক্রিয়ায় ভাঙে না।

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ায় এক্সপোজার বেশি হওয়ারই কথা। স্টকহোম কনভেনশনের পক্ষভুক্ত দেশ হিসেবে পিএফওএস, পিএফওএ ও পিএফএইচএসএস নিয়ন্ত্রণে আমাদের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমাদের দেশে খাবার পানি, শিল্পবর্জ্য ও মানুষের রক্তে পিএফএএস পরিমাপের একটি জাতীয় কর্মসূচি এখনই শুরু করা জরুরী, না হলে এই সমস্যার সমাধানও আমরা করতে পারব না। সময় থাকতেই আমাদের এখনই এই রাসায়নিকের বিরুদ্ধে আগাম আইনি ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার জন্যই আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্য ।

  • লেখক: পোস্টডক্টরাল ফেলো ও ফ্লেয়ার ফেলো, এন্ডোক্রাইন সোসাইটি, ইউএসএ; হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিন ওয়াশিংটন, ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র।
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত