সৌরভ দাস
-a0c892-720x405.webp)
২০০৯ সালে রোলান্ড এমিরিখের ‘২০১২’ সিনেমা যখন মুক্তি পেয়েছিল, তখন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো আমাদের কাছে নিছক কল্পনাই মনে হয়েছিল। মাটি ফেটে যাচ্ছে, শহর ধসে পড়ছে, সমুদ্র ছুটে আসছে মানুষের বসতির দিকে। কোথাও মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে, কোথাও কেউ প্রিয়জনকে খুঁজছে, আবার কেউ শেষবারের মতো সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরছে। পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর সেই বিপর্যয়ের মধ্যেই বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয় হিসেবে উঠে আসে হিমালয়।
সিনেমার গল্পে পৃথিবীর অভ্যন্তরে শুরু হওয়া পরিবর্তন থেকে একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসে। ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, সুনামি—সব মিলিয়ে মানবসভ্যতা ধ্বংসের মুখে পড়ে। পৃথিবীর শেষ আশ্রয় হিসেবে হিমালয়ের কাছে তৈরি করা হয় বিশাল ‘আর্ক’। অল্প কিছু মানুষ ও প্রাণীকে সেখানে আশ্রয় দিয়ে মানবসভ্যতার শেষ অংশটুকু বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়।
তখন আমরা সিনেমায় দেখছিলাম। আজ এত বছর পর, হিমালয়ের দিকে তাকালে সেই সিনেমাটিকে আর ‘পুরোপুরি সিনেমা’ বলে মনে হয় না।
অবশ্য ‘২০১২’ কোনো ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না। পৃথিবী সিনেমাটির মতো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, এমন কথাও বলা যায় না। কিন্তু সিনেমাটি একটি প্রশ্ন রেখে গিয়েছিল, যা আজও প্রাসঙ্গিক: প্রকৃতি যখন তার শক্তির সামান্য অংশও মানুষের সামনে প্রকাশ করে, তখন আমাদের প্রযুক্তি, পরিকল্পনা আর আত্মবিশ্বাস আসলে কতটা টেকে?
প্রথম উত্তর এসেছিল কেদারনাথ থেকে। ২০১৩ সালে ভারতের কেদারনাথ সেই প্রশ্নের ভয়াবহ বাস্তব উত্তর দেখেছিল। হাজার হাজার তীর্থযাত্রী আর মানুষের ভিড়ে থাকা এক পাহাড়ি জনপদ। চারদিকে বরফঢাকা পাহাড়, মাথার ওপরে হিমবাহ, নিচ দিয়ে বয়ে চলা নদী। বছরের পর বছর ধরে মানুষ সেই ভূ-দৃশ্যের সঙ্গে বসবাস করেছে। কেউ এসেছে প্রার্থনা করতে, কেউ জীবিকার জন্য, কেউ পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে। পাহাড় তখনও নীরব, নদী তখনও নিজের পথেই বয়ে চলেছে।
তারপর ২০১৩ সালের জুন মাসের অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি অঞ্চলের নানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রবল বৃষ্টিপাত, তুষার ও বরফ গলা পানি, পাহাড়ি জলাধার থেকে পানির প্রবাহ এবং ভূমিধস, সবকিছু মিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কেদারনাথ ও আশপাশের অঞ্চল পরিণত হয় ধ্বংসের উপত্যকায়। বিপুল পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে নেমে এসে বসতি, রাস্তা ও অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
কেদারনাথের সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়লে ‘২০১২’ সিনেমার কিছু দৃশ্যও মনে পড়ে যায়। সিনেমায় বিশাল জলরাশি মানুষের তৈরি সবকিছুকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়। কেদারনাথে অবশ্য কোনো সমুদ্র পাহাড়ের দিকে ছুটে আসেনি। কিন্তু পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতের সামনে মানুষও প্রায় একই অসহায়ত্ব দেখেছিল। সিনেমার সঙ্গে বাস্তবের মিল ধ্বংসের দৃশ্যে নয়, মানুষের অসহায়ত্বে।
কেদারনাথের ঘটনার পর কেটে গেছে ১৩ বছর। কিন্তু ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট আবারও হিমালয় উঠে এল খবরের শিরোনামে। এবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের উচ্চ হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ে। এর পর সৃষ্ট প্রবল স্রোত নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনে। রাস্তা, সেতু, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ জনে পৌঁছেছে এবং নিখোঁজ ১৫০০ জন।
তবে এই ঘটনাকে কেদারনাথের সঙ্গে হুবহু এক করে দেখা ঠিক হবে না। দুই ঘটনার ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া আলাদা। কিন্তু দুটির মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট, পাহাড়ি পরিবেশে সামান্য সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কেদারনাথ ও নেপাল যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘২০১২’ সিনেমার সঙ্গে বাস্তবের মিল ধ্বংসের দৃশ্যে নয়, মানুষের অসহায়ত্বে।
কেদারনাথের মানুষ পাহাড় চিনত। নেপালেও মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাহাড়ে বসবাস করে আসছে। হিমালয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হাজার বছরের। মানুষ এখানে বসবাস করে, তীর্থে যায়, কৃষিকাজ করে, পর্যটন গড়ে তোলে, রাস্তা ও সেতু বানায়। পাহাড়ের পথ, নদী ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও তাদের আছে। কিন্তু পাহাড়ের কয়েক হাজার মিটার ওপরে কোথায় বরফ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, কোথায় পানি জমছে, কোন ঢাল কখন ভেঙে পড়বে, এসবের সবকিছু মানুষ আগে থেকে জানতে পারে না।
মানুষ পাহাড়ের ওপর রাস্তা বানাতে পারে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পারে। স্যাটেলাইট দিয়ে পাহাড়ের ওপর নজর রাখতে পারে। কিন্তু পাহাড়ের ভেতরে জমে থাকা শক্তিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই জায়গাতেই প্রকৃতি মানুষকে তার সীমার কথা মনে করিয়ে দেয়।
এদিকে হিমালয়ের এই পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। হিমালয়ের অনেক অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। ফলে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের বিপর্যয়ে বিশেষজ্ঞরা বরফ ও তুষার গলার ভূমিকা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণ খতিয়ে দেখছেন।
তবে বৃহত্তর চিত্রটি উদ্বেগের। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহের পরিবর্তন ঘটছে। আর এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যা, হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে যাওয়া কিংবা ভূমিধসের মতো ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ হিমালয় শুধু হঠাৎ কোনো একদিন বিপদ ডেকে আনে না; দীর্ঘ সময় ধরে তার ভেতরেও পরিবর্তন ঘটে।
২০১২ সিনেমার পরিচালক জানতেন, পর্দায় কখন বিপর্যয় শুরু করতে হবে। দর্শকও জানত, কয়েক ঘণ্টা পর সিনেমা শেষ হবে। ভূমিকম্পের পর সুনামি আসবে, সুনামির পর আরেক বিপর্যয় আসবে, তারপর গল্প একসময় শেষ হয়ে যাবে। পর্দার আলো নিভবে, আমরা হল থেকে বেরিয়ে আবার আমাদের স্বাভাবিক পৃথিবীতে ফিরে যাব। বাস্তব পৃথিবীতে সেই নিশ্চয়তা নেই।

কেদারনাথের মানুষ জানত না কখন পানি আসবে। ২০২৬ সালের নেপাল-তিব্বত সীমান্তের মানুষও জানত না, পাহাড়ের ওপরে জমে থাকা বরফ ও পাথরের একটি ধস কয়েক মুহূর্ত পর তাদের জীবনকে কীভাবে বদলে দেবে। বাস্তবে এমন বিপর্যয়ের আগে কেউ ঘোষণা দিয়ে সতর্ক করে না।
তাই এত বছর পর ২০১২ সিনেমাটির দিকে তাকালে সেটিকে আর শুধু পৃথিবী ধ্বংসের গল্প মনে হয় না। বরং মনে হয়, সিনেমাটি হয়তো এমন একটি প্রশ্ন করেছিল, যার গুরুত্ব আমরা তখন বুঝিনি।
মানুষ পৃথিবীকে জয় করার স্বপ্ন দেখে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পতাকা পুঁতে দেয়, নদীর গতিপথ বদলায়, বরফের ওপর গবেষণাগার তৈরি করে, স্যাটেলাইট দিয়ে মহাকাশের খবর রাখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন নির্ভর করে খুব সাধারণ কিছু জিনিসের ওপর—পানি, মাটি, নদী, পাহাড়, বাতাস আর বরফের ওপর।
আমরা প্রকৃতিকে যতটা জয় করেছি বলে মনে করি, প্রকৃতির ওপর আমাদের নির্ভরতা তার চেয়ে অনেক বেশি। ২০১২ সিনেমা সেই অসহায়ত্বকে কল্পনার পর্দায় দেখিয়েছিল। কেদারনাথ দেখিয়েছে বাস্তবে তার কতটা ভয়াবহ রূপ হতে পারে। আর ২০২৬ সালের হিমালয়ের বিপর্যয় আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতিকে পুরোপরি নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
-a0c892-480x270.webp)
২০০৯ সালে রোলান্ড এমিরিখের ‘২০১২’ সিনেমা যখন মুক্তি পেয়েছিল, তখন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো আমাদের কাছে নিছক কল্পনাই মনে হয়েছিল। মাটি ফেটে যাচ্ছে, শহর ধসে পড়ছে, সমুদ্র ছুটে আসছে মানুষের বসতির দিকে। কোথাও মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে, কোথাও কেউ প্রিয়জনকে খুঁজছে, আবার কেউ শেষবারের মতো সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরছে। পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর সেই বিপর্যয়ের মধ্যেই বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয় হিসেবে উঠে আসে হিমালয়।
সিনেমার গল্পে পৃথিবীর অভ্যন্তরে শুরু হওয়া পরিবর্তন থেকে একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসে। ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, সুনামি—সব মিলিয়ে মানবসভ্যতা ধ্বংসের মুখে পড়ে। পৃথিবীর শেষ আশ্রয় হিসেবে হিমালয়ের কাছে তৈরি করা হয় বিশাল ‘আর্ক’। অল্প কিছু মানুষ ও প্রাণীকে সেখানে আশ্রয় দিয়ে মানবসভ্যতার শেষ অংশটুকু বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়।
তখন আমরা সিনেমায় দেখছিলাম। আজ এত বছর পর, হিমালয়ের দিকে তাকালে সেই সিনেমাটিকে আর ‘পুরোপুরি সিনেমা’ বলে মনে হয় না।
অবশ্য ‘২০১২’ কোনো ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না। পৃথিবী সিনেমাটির মতো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, এমন কথাও বলা যায় না। কিন্তু সিনেমাটি একটি প্রশ্ন রেখে গিয়েছিল, যা আজও প্রাসঙ্গিক: প্রকৃতি যখন তার শক্তির সামান্য অংশও মানুষের সামনে প্রকাশ করে, তখন আমাদের প্রযুক্তি, পরিকল্পনা আর আত্মবিশ্বাস আসলে কতটা টেকে?
প্রথম উত্তর এসেছিল কেদারনাথ থেকে। ২০১৩ সালে ভারতের কেদারনাথ সেই প্রশ্নের ভয়াবহ বাস্তব উত্তর দেখেছিল। হাজার হাজার তীর্থযাত্রী আর মানুষের ভিড়ে থাকা এক পাহাড়ি জনপদ। চারদিকে বরফঢাকা পাহাড়, মাথার ওপরে হিমবাহ, নিচ দিয়ে বয়ে চলা নদী। বছরের পর বছর ধরে মানুষ সেই ভূ-দৃশ্যের সঙ্গে বসবাস করেছে। কেউ এসেছে প্রার্থনা করতে, কেউ জীবিকার জন্য, কেউ পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে। পাহাড় তখনও নীরব, নদী তখনও নিজের পথেই বয়ে চলেছে।
তারপর ২০১৩ সালের জুন মাসের অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি অঞ্চলের নানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রবল বৃষ্টিপাত, তুষার ও বরফ গলা পানি, পাহাড়ি জলাধার থেকে পানির প্রবাহ এবং ভূমিধস, সবকিছু মিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কেদারনাথ ও আশপাশের অঞ্চল পরিণত হয় ধ্বংসের উপত্যকায়। বিপুল পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে নেমে এসে বসতি, রাস্তা ও অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
কেদারনাথের সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়লে ‘২০১২’ সিনেমার কিছু দৃশ্যও মনে পড়ে যায়। সিনেমায় বিশাল জলরাশি মানুষের তৈরি সবকিছুকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়। কেদারনাথে অবশ্য কোনো সমুদ্র পাহাড়ের দিকে ছুটে আসেনি। কিন্তু পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতের সামনে মানুষও প্রায় একই অসহায়ত্ব দেখেছিল। সিনেমার সঙ্গে বাস্তবের মিল ধ্বংসের দৃশ্যে নয়, মানুষের অসহায়ত্বে।
কেদারনাথের ঘটনার পর কেটে গেছে ১৩ বছর। কিন্তু ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট আবারও হিমালয় উঠে এল খবরের শিরোনামে। এবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের উচ্চ হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ে। এর পর সৃষ্ট প্রবল স্রোত নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনে। রাস্তা, সেতু, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ জনে পৌঁছেছে এবং নিখোঁজ ১৫০০ জন।
তবে এই ঘটনাকে কেদারনাথের সঙ্গে হুবহু এক করে দেখা ঠিক হবে না। দুই ঘটনার ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া আলাদা। কিন্তু দুটির মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট, পাহাড়ি পরিবেশে সামান্য সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কেদারনাথ ও নেপাল যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘২০১২’ সিনেমার সঙ্গে বাস্তবের মিল ধ্বংসের দৃশ্যে নয়, মানুষের অসহায়ত্বে।
কেদারনাথের মানুষ পাহাড় চিনত। নেপালেও মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাহাড়ে বসবাস করে আসছে। হিমালয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হাজার বছরের। মানুষ এখানে বসবাস করে, তীর্থে যায়, কৃষিকাজ করে, পর্যটন গড়ে তোলে, রাস্তা ও সেতু বানায়। পাহাড়ের পথ, নদী ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও তাদের আছে। কিন্তু পাহাড়ের কয়েক হাজার মিটার ওপরে কোথায় বরফ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, কোথায় পানি জমছে, কোন ঢাল কখন ভেঙে পড়বে, এসবের সবকিছু মানুষ আগে থেকে জানতে পারে না।
মানুষ পাহাড়ের ওপর রাস্তা বানাতে পারে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পারে। স্যাটেলাইট দিয়ে পাহাড়ের ওপর নজর রাখতে পারে। কিন্তু পাহাড়ের ভেতরে জমে থাকা শক্তিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই জায়গাতেই প্রকৃতি মানুষকে তার সীমার কথা মনে করিয়ে দেয়।
এদিকে হিমালয়ের এই পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। হিমালয়ের অনেক অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। ফলে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের বিপর্যয়ে বিশেষজ্ঞরা বরফ ও তুষার গলার ভূমিকা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণ খতিয়ে দেখছেন।
তবে বৃহত্তর চিত্রটি উদ্বেগের। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহের পরিবর্তন ঘটছে। আর এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যা, হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে যাওয়া কিংবা ভূমিধসের মতো ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ হিমালয় শুধু হঠাৎ কোনো একদিন বিপদ ডেকে আনে না; দীর্ঘ সময় ধরে তার ভেতরেও পরিবর্তন ঘটে।
২০১২ সিনেমার পরিচালক জানতেন, পর্দায় কখন বিপর্যয় শুরু করতে হবে। দর্শকও জানত, কয়েক ঘণ্টা পর সিনেমা শেষ হবে। ভূমিকম্পের পর সুনামি আসবে, সুনামির পর আরেক বিপর্যয় আসবে, তারপর গল্প একসময় শেষ হয়ে যাবে। পর্দার আলো নিভবে, আমরা হল থেকে বেরিয়ে আবার আমাদের স্বাভাবিক পৃথিবীতে ফিরে যাব। বাস্তব পৃথিবীতে সেই নিশ্চয়তা নেই।

কেদারনাথের মানুষ জানত না কখন পানি আসবে। ২০২৬ সালের নেপাল-তিব্বত সীমান্তের মানুষও জানত না, পাহাড়ের ওপরে জমে থাকা বরফ ও পাথরের একটি ধস কয়েক মুহূর্ত পর তাদের জীবনকে কীভাবে বদলে দেবে। বাস্তবে এমন বিপর্যয়ের আগে কেউ ঘোষণা দিয়ে সতর্ক করে না।
তাই এত বছর পর ২০১২ সিনেমাটির দিকে তাকালে সেটিকে আর শুধু পৃথিবী ধ্বংসের গল্প মনে হয় না। বরং মনে হয়, সিনেমাটি হয়তো এমন একটি প্রশ্ন করেছিল, যার গুরুত্ব আমরা তখন বুঝিনি।
মানুষ পৃথিবীকে জয় করার স্বপ্ন দেখে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পতাকা পুঁতে দেয়, নদীর গতিপথ বদলায়, বরফের ওপর গবেষণাগার তৈরি করে, স্যাটেলাইট দিয়ে মহাকাশের খবর রাখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন নির্ভর করে খুব সাধারণ কিছু জিনিসের ওপর—পানি, মাটি, নদী, পাহাড়, বাতাস আর বরফের ওপর।
আমরা প্রকৃতিকে যতটা জয় করেছি বলে মনে করি, প্রকৃতির ওপর আমাদের নির্ভরতা তার চেয়ে অনেক বেশি। ২০১২ সিনেমা সেই অসহায়ত্বকে কল্পনার পর্দায় দেখিয়েছিল। কেদারনাথ দেখিয়েছে বাস্তবে তার কতটা ভয়াবহ রূপ হতে পারে। আর ২০২৬ সালের হিমালয়ের বিপর্যয় আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতিকে পুরোপরি নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
.png)

‘আমি যদি মহৎ হই, তবে যেন আমাকে পুণ্যবানদের দলে গণ্য করা হয়; আর যদি খারাপ হই, তবে তাঁদের খাতিরে যেন আমাকে ক্ষমা করা হয়।’ কথাগুলো চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত সুফি সাধক নিজামুদ্দিন আউলিয়ার। তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন, কথোপকথন ও দর্শনের নানা দিক সংকলিত হয়েছে ‘ফাওয়াইদ উল ফুয়াদ’ বইয়ে। এতে উঠে এসেছে সেই সময়ের সু
২৩ আগস্ট ২০২৬
বুধবার সন্ধ্যা ৬টা। নীলক্ষেত বইয়ের বাজারে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটছেন রবিউল ইসলাম। অফিস ছুটির পর ভিড়-বাসে চেপে বই কিনতে এসেছেন সদ্য স্কুলে ভর্তি হওয়া সন্তান আহনাফের জন্য। প্রথমে একটি দোকানে ঢুকে শিশুদের বই দেখতে চাইলেন। দোকানি একগাদা রূপকথার বই সামনে এনে রাখলেন। বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে রবিউলের ন
২১ আগস্ট ২০২৬
দেশজুড়ে আড়ংয়ের বর্তমানে ৩৪টি আউটলেট রয়েছে। ২০২৩–২৪ সালে আড়ংয়ের মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১,৬৪১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ১,৫৩৫ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আড়ংয়ের হিসাবভুক্ত মোট সম্পদের পরিমাণও প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা। সারাদেশে রয়েছে ৮৩৫টির বেশি প্রোডাকশন ও সাব-সেন্টার।
১৯ আগস্ট ২০২৬
ময়মনসিংহ শহরের ভাটিকাশর কবরস্থান হাজারো মানুষের শেষ ঠিকানার গল্প বলে। আর সেই গল্পের নিত্যদিনের সাক্ষী মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল কাদের লিটন। প্রায় সাড়ে তিন একর জমির এই সরকারি কবরস্থানে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি ইমাম ও রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল, কবরস্থানের নীরবতার
১৪ আগস্ট ২০২৬