জাহিদ জগৎ
-06f111-720x405.webp)
পঞ্চ আত্মার যোগ সাধনে
ছিলো নবী অতি গোপনে
তার কুদরতের শানে
আমিনার কোল ধন্য করি
তপ্ত মরু হাসে’রে
মরুদ্যানে ফুইটাছে ফুল
কি আচানক বেশে’রে…
গতকাল ছিল ১২ই রবিউল আউয়াল। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর জন্মদিন। সারাজাহানের বহু বড় বড় কবি, সাধক, গাউস, কুতুব রাসুল্লাহ (সঃ) এর প্রেমে দেওয়ানা হয়েছেন, লিখেছেন স্তুতি। বাংলার মহতি সাধকগণ, কবি ও ভাবুকগণও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁদের মধ্যে মাতাল কবি আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ান অন্যতম। উপরের উল্লেখিত মোহাম্মদ (সঃ) এর আগমনের আনন্দ স্তবক লিখেছেন তিনি। আজ সেই মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ানের ৯৩তম জন্মদিন।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে চর ওয়াসপুর গ্রাম। এই গ্রামের বিত্তশালী মোকসেদ আলী ব্যাপারীর ২য় স্ত্রী সোনাবানুর গর্ভে ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন সাধক মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ান। তাঁর আগে সোনাবানুর ৭টি সন্তান জন্মের পরই মারা যান। সাত সন্তানের মৃত্যুর পর আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন অতি আদরের। মায়ের ভালোবাসা, পিতার আদর আর বিত্ত, বৈভব-সবই ছিলো। প্রথমে মক্তব। সেখানে আরবি ভাষা ও কুরআন শিক্ষা। পরে প্রাইমারি স্কুল থেকে ক্লাস ফাইভ।
ধরাবাঁধা কোনো পড়াশোনাই তাঁকে ধরে রাখতে পারেননি। মক্তবের মৌলানার সাথে তর্ক করে মক্তব ছাড়েন। স্কুল ছাড়েন মুখস্ত পড়ায় অনীহা থেকে। এরপর পিতার অকস্মাৎ মৃত্যুর পর অস্থির আব্দুর রাজ্জাক যেন দুনিয়ার সকল বন্ধন ছেঁড়া এক মুক্ত পাখি। যাত্রাপালা, জারি-সারি, পালাগানের আসরে ঘুরে বেড়ান। সংগীতের প্রতি প্রেম এখান থেকেই শুরু। আসর থেকে আসর হয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখা পান কেরানীগঞ্জের সুফি সাধক আব্দুল খালেক দেওয়ানের। গান ও জ্ঞানের প্রতি মুগ্ধ আব্দুর রাজ্জাক তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শুরু হয় সংগীত ও জ্ঞান সাধনা। গুরুর পরম্পরা থেকেই তার নাম হয় আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ান।
ইতিমধ্যে পিতার রেখে যাওয়া সম্পদের ভাগ বাটোয়ারা হলো। উদাসীন আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ানও অংশীদার হিসেবে চর ওয়াসপুরের ষোল বিঘা জমির অধিকারী হন। উদাসীন আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ান তখন আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন। সম্পদে উদাসীনতার কারণে কিছুকাল পরে এই জমির বেশিরভাগ হাতছাড়া হয়ে যায়। ততদিনে রাজ্জাক দেওয়ান মঞ্চে দণ্ডায়মান। শুরু থেকেই জ্ঞান ও সঙ্গীতে তার বিশেষ প্রতিভার কারণে দিকে দিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ছে। এই সময় তিনি লেখেন:
শুনে তোমার নামের বাঁশি, দীনহীন রাজ্জাক দেওয়ান
মোকসেদ তোমার জমিদারী রাজবাড়ী করলাম শ্মশান
কি যেন খাইয়াছি নেশা, হাড়-মাংশের পাই না দিশা
সোনা ভাবি দস্তা-শিশা, পাইতে তোমার মন
যেখানেই অসংগতি দেখেছেন, অন্যায় দেখেছেন, জুলুম অত্যাচার দেখেছেন, সেখানেই তাঁর কলম হয় উঠেছে প্রতিবাদী। তাঁর লেখার ভাষা, যুক্তি, উপস্থাপন দেশের সাধারণ মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে দেশ, ধর্ম, সংকট বোঝাপড়ার এক তাত্ত্বিক উপকরণ। অথচ তাঁকে আমরা ঠেলে দিয়েছি লৌকিকতার খোপে। ধর্মের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন, ‘সত্য কথার ধার ধারি না/ মিথ্যা কথার ছিগলি ছাড়ি/ ধর্মের গৌরব করি/বড় ধর্মের গৌরভ করি”।
সত্য কথা কি? সেইটা কি শুধুই আসমানী, অলিক কিংবা অসম্ভবে থাকে? নাকি তার দৃশ্যমান কল্যাণরুপও আছে? এইখানে মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান বলতেছেন, ‘আমাদের ইসলামীয়া দর্শন যাহা/ মূলে কেউ করি না তাহা/ মুখে মুখে সবাই আহা/ ইসলাম দাবী করি/ রাত্র ভরা ঘুম আসে না/ আমরা কুচিন্তাতে মরি/ সকালে উঠিয়া আমি/ দিবো ভাইয়ের মাথায় বাড়ি/ ধর্মের গৌরব করি'। অর্থাৎ, কেবল পোশাকি ধার্মিক সাজলেই হচ্ছে না। ইসলাম যদি মানতেই হয়, তো ভাইয়ের মাথায় বাড়ি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এইটা ধর্মের দৃশ্যমান কল্যাণরুপ। ভাইয়ের হ্বক আদায় করতে হবে, এইটাও ধর্মের ভিত্তি।
এই বয়ানের ভেতর দিয়ে তিনি শিক্ষা দিচ্ছেন। শিখতেছেন কারা? যারা আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের গরিমা মাথায় তুলে নেয় নাই। সেই সকল সাধারণ মানুষ তাঁর এই তত্ত্বকথার বুঝদার। খুব সহজ ভাষা। সুরে সুরে শুনতেছেন, গাইতেছেন, বুঝতেছেন। ঠিক একইভাবে, আমাদের যে আধুনিকতা কিংবা তা ছেপে আজকের উত্তরাধুনিকতার ধাক্কা। সেই ধাক্কা মাথায় নিয়ে বড় বড় সভা সেমিনারে, বড় বড় তাত্ত্বিকরা সমালোচনা করছেন আজকাল। আমরা মুগ্ধ হয়ে সেইসব বক্তৃতা শুনছি। বাহবা দিচ্ছি। এবং মনে করছি, আমরা এইসব চিন্তার ধারক ও বাহক। আমরা উদ্ধার করছি আমাদের মানব সমাজ। সমাজ কি ভাবছে, সেইদিকে আমাদের খেয়াল নেই। সমাজের চিন্তা প্রকাশের ভাব ভাষা আমাদের কাছে অচেনা, অচ্ছুৎ।
অথচ দেখেন, এইখানে মাতাল রাজ্জাক আমাদের সাবধান করেছেন। লিখছেন, ‘অন্তর বোঝাই লোভ লালসা/দয়ামায়া কিছু নাই/ ছলে বলে কল কৌশলে/পরের মাইয়া ঘরে পাই/ করি তার নারীত্ব হরণ/হইয়া পশুরই মতোন/ দিয়া পীরালী বচন/ ওলী আল্লার জাত মারি/কালের চাকার তালে তালে ফাল পারি’ । আধুনিকতার এই গোল সম্পর্কে, একজন তত্ত্ব সাধক তাঁর সাধারণ দর্শকদের যে যুক্তিতে বুঝ দিয়েছেন, তা ভাষাগত সহজতার কারনে, অর্থাৎ গ্রাম্য লোকজ ভাষার কারণে গুরুত্ব পায় নি আমাদের কাছে।
আজকের রাজনীতিতে যে দায় ও দরদের কথা উঠছে, সেই দায় সম্পর্কে মাতাল রাজ্জাক আগেই নির্দেশ করেছেন তাঁর গানে। কিন্তু আমরা তা শুনতে চাইনি। বরং পশ্চিমা তত্ত্ব কিংবা একাডেমিক তত্ত্বায়নের যে তুবড়ি ভারি কথনের প্যাঁচ খেলি, তারই বা মূল ভাব কি? সেইটা কি কেবলই ভাষা বা শব্দের ঘরে আবদ্ধ? নাকি তা দুনিয়ার মানুষের কল্যাণের দিকটাও ভাবে? সেই ভাবনাটা কি? খুবই সহজ। কালের চাকার তালে তালে ফাল না পারা। অর্থাৎ ট্রেন্ডে গা না ভাসানো।
আমরা একাডেমিক তাত্বিক হিসেবে বড় বড় বয়ান তৈরি করতে পারি, নিজেরে কুতুব প্রমাণ করতে পারি। আধুনিক পুঁজি বাজারে সেইসব কথার দামও হয়তো অনেক। কিন্তু তা আদতে মানুষ পর্যন্ত কি পৌঁছায়। অর্থাৎ যাদের কল্যাণের কথা ভেবে এত চিন্তা, সেই চিন্তাটাই মানুষের কাছে পৌঁছাইতে সক্ষম না আমরা। কল্যাণ তো দূর কি বাত। মজাটা এইখানেই, পুঁজি নিজেও চায় না যে এই তত্ত্বকথা সহজে ঐসকল মানুষের কাছে পৌঁছাক। তাদের পুঁজি বোকা বানিয়ে রাখতে চায়। নিত্য নতুন হাল ফ্যাশনের (চিন্তা) দাস বানিয়ে রাখতে চায়। ফলে ভাষাগত জায়গায় আমরা পুঁজির হয়ে নিজেরে বড় ভেবে, প্রকৃত চিন্তক অর্থাৎ পীরদের জাত মারতেছি।
তিনি লিখতেছেন, ‘কুলবিন মুনিনীন আরশে আল্লা/ এইতো আল্লার ঠিকানা/ মসজিদ ঘরে আল্লাহ্ থাকে না/ শোন মওলানা মসজিদ ঘরে আল্লা থাকে না'। অর্থাৎ আল্লাহ্ ইট পাথরের একটা ঘরে আবদ্ধ নয়। আজকের বাংলায় ইসলামের দরদ অপেক্ষা যে কট্টর আগ্রাসান দেখি, যেখানে মানুষের মূল্য নাই কিন্তু ইট পাথরের মসজিদ হয়ে উঠেছে পবিত্র, দামী। মানুষের বিপরীতে, জীব জীবনের বিপরীতে একটা ঘর’কে দাঁড় করিয়ে দেবার যে রাজনীতি, মাতাল রাজ্জাক তারে ছেড়ে যান নাই। মানুষের বিপরীতে জড় বস্তুকে মহিমান্বিত করা তো এক প্রকার পৌত্তলিকতাই। কাজী নজরুল ইসলাম এইখানে তার মানুষ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘খোদার ঘরে কে কপাট লাগায় কে দেয় সেখানে তালা সব দ্বার এর খোলা রবে চালা হাতুড়ি শাবল চালা’।
আমরা নজরুল’কে বুঝতে পারি, ধরতে পারি। আলোচনা করতে পারি। কিন্তু যখন মাতাল রাজ্জাক লিখতেছেন, ‘মসজিদ ঘরে আল্লা থাকে না’, তখন আর আমরা তাকে হজম করতে পারি না। কেন পারি না? কারণ, কাজী নজরুল ইসলাম শিক্ষিতের কবি। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। কিন্তু গ্রাম্য, চাষাভূষা ভাষায় কোথাকার কোন মাতাল লেখবে এই কথা? অসম্ভব। আমরা তাকে মাতালের অতিউচ্চারণ হিসেবে ঠেলে দেই আস্তাকুঁড়ে। অথচ, মাতাল রাজ্জাক তাঁর দায়িত্ব থেকে সরেন না। সাহস আর চিন্তাশক্তি’র উপর ভর করে তিনি কঠোর সমালোচনা করছেন মওলানাদের।
এই গানে তিনি আরো লিখেছেন, ‘আলেম গেছে জালেম হইয়া/কোরান পরে চন্ডালে/ সতি সাধুর ভাত জোটে না/ সোনার হার বেশ্যার গলে/ যদি চিনিতে কোরান/হইতো মানুষের কল্যাণ/মুখে মুখে সব মুসলমান/কাজের বেলা ঠনঠনা’। এমন নিগূঢ় সত্য সহজে বলতে পারাটা সহজ কথা না। আমরা আজকের সমাজ বাস্তবতা দেখতেছি। নানানভাবে সেইটার তত্ত্ব করার চেষ্টাও করছে আমাদের শিক্ষিত, একাডেমিক, বুদ্ধিজীবীরা।
কিন্তু আমরা কি পারতেছি এই সহজ কথাটারে সহজে বুঝতে? মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান পেরেছিলেন। মানে তিনি খুব সোজা বাংলায় সমস্ত মুসলমানদের কোরান’কে বুঝতে বলতেছেন মানুষের কল্যাণের জন্য। শুধু অন্ধের মতো মুখস্ত/মান্য করলেই ধর্ম পালন পূর্ণ হচ্ছে না। সেইটাকে মানব কল্যাণে রুপান্তর করতে বলতেছেন মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান।
সেই কল্যাণের রূপ কেমন? এই গানে তিনি বলছেন, ‘যদি মক্কা গেলে খোদা মিলতো/নবী মিলতো মদিনায়/দেশে ফিরে কেউ আইতো না/হজ করিতে যারা যায়/ কেউ যায় টাকার গুমানে/কেউ যায় দেশ ভ্রমনে/ধনী যায় ধনের টানে/আনিতে সোনা দানা’।
আপনারাও বুঝতে পারছেন নিশ্চয়, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান কি বলতে চেয়েছেন।
তাঁর গানে এই রকম অসংখ্য জায়গা আছে, যেখানে আমাদের জন্য- দিক দিশার নির্দেশ করেছেন। সমাজ, বাস্তবতা, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি নিয়ে তত্ত্ব কথার উপস্থাপন করেছেন সহজ ভাষায়। আমরা আমাদের সমাজ সংকটে যে সকল ভাবনা, চিন্তা ও পাঠের মধ্য দিয়ে যাইতে চাই, অনুসন্ধান করি, তার বহুকিছুর ভাণ্ডার আমাদের এই লোকজ সাধকদের গানের মধ্যে বিদ্যমান। এরমধ্যে লালন সাঁইজি অন্যতম। একই ঘরানার পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, খোদা বক্স শাহ, ছাত্তার ফকির আছেন।
এ ছাড়াও, ময়মনসিংহ অঞ্চলের ওস্তাদ রশিদ উদ্দিন খাঁ আছেন। তাঁর শিষ্য জালাল খাঁ আছেন। সালাম সরকার আছেন। সিলেট সুনামগঞ্জ জুড়ে আছেন হাসন রাজা, রাধা রমন, আব্দুল করিম, রমিজ উদ্দিন, ক্বারী আমির উদ্দিন সাহেব আছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছেন মনমোহন দত্ত। মানিকগঞ্জের ভবা পাগলা, আলফু দেওয়ান, রজ্জব দেওয়ান, খালেক দেওয়ান, রশিদ সরকার আক্কাস দেওয়ান আছেন। মোটাদাগে পরিচিতদের নামগুলোই উদাহরণ হিসেবে হাজির করলাম। আমি শুধু এইসব লোকজ চিন্তা, যুক্তি, প্রস্তাবনার মধ্যে সম্ভাবনার বিষয়টা সামনে আনতে চাইলাম। এইক্ষেত্রে প্রয়োজন একাডেমিক্যাল তত্ত্বায়ন আমাদের এইসকল ভাব, চিন্তা, তত্ত্বের উপযুক্ত তত্ত্বায়ন করা গেলে হয়তো আমরা আমাদের আত্ম পরিচয় আরো শক্তভাবে তৈয়ার করতে সক্ষম হবো। আর হেলা করলে চিরকাল আমাদের ঘুরপাক খাইতে হবে নানান উপনিবেশিক চিন্তার ঘূর্ণিপাকে।
এইবার আসি তাত্ত্বিক মাতাল রাজ্জাকের দেওয়ানের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে। ‘আমার ঘুম ভাঙ্গাইয়া গেলো’রে মরার কোকিলে’’, ‘সাকি পুরা বোতল দে আমারে/ নেশায় মজে রই’, ‘ভুল বুঝে চলে যাও/যতো খুশি ব্যাথা দাও/সব ব্যথা নীরবে সইবো বন্ধু’রে/তোমার লেখা গান আমি গাইবো’ —এই গানগুলো একটা সময় প্রতিটি গ্রামগঞ্জে, হাটে বাজারে মাইকে মাইকে বাজতো। মাতাল রাজ্জাকের গান শোনেনি এমন লোক বাংলাদেশে খুব কমই আছে। এক সময় মুখে মুখে ফিরেছে মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানের বিচ্ছেদ। জনপ্রিয় শিল্পী মমতাজসহ বহু শিল্পী একের পর এক অ্যালবাম করেছে মাতাল রাজ্জাকের গান নিয়ে। আজও আমাদের শিল্পীরা মাতাল রাজ্জাকের গান গেয়ে করে খাচ্ছে। আমরাও শুনি, মজা পাই, হাত তালি দেই। কিন্তু কোনোদিন বোঝার চেষ্টা করি নাই- গানের কথায় আসলে কী বলতে চাইছে। শিল্পীরাও জানেন না মাতাল রাজ্জাক কী বলছে গানে। মাতাল রাজ্জাক সম্পর্কে বলা তো দূরে থাক।
‘মদ খেয়েছি, মাতাল হয়েছি/ সরিয়ে দাঁড়া তোরা যতো মওলানা, ধন দৌলত সিন্দুকের চাবি/দুঃখীর হাতে থাকে না/কাউয়ায় কমলা খাইতে জানে না, ‘ঘাটে একবার আসি একবার যাই/ যাইয়া দেখি শ্যামও ঘাটে নাই”, ‘তুমি ডাল ছাড়িয়া উড়াল দিয়া/ ডালে গিয়া বইও কোকিলা’রে/ গাইলে মাতালের গান গাইও’ —মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা সাধক কবি রাজ্জাক দেওয়ান সম্পর্কে আজকের প্রজন্ম অনেকটাই উদাসীন। তাই তাকে আবার স্মরণ করিয়ে দেবার তাগাদা থেকে এই লেখা।
নিজেদের চিন্তা, ভাব, তত্ব, চর্চা থেকে সরে গেলে সেই শূন্য জায়গায় দখল করে উপনিবেশিক শক্তি। ফলে আমরা একাডেমিক্যালি যতো আধুনিকতার দিকে ঝুকছি, ততোই আমরা চিন্তায়, ভাবে উপনিবেশিক শক্তির কাছে নত হচ্ছি। এতে করে, না আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছি, আর না নিজের বলে কিছু অর্জন করতে পারছি। এই কথাগুলো বললাম কারণ, আমরা আমাদের চিন্তা পদ্ধতিগুলোকে আমরাই লোকজ কিংবা গ্রাম্যতা (ক্ষ্যাত) বলে পেছনে ঠেলে দিয়েছি।
একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার, বর্তমান থাকা আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্বদ্যালয়গুলো খুব বেশিদিন আগের নয়। তার আগে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি কেমন ছিল। আমাদের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা কেমন ছিলো। নাকি ছিলোই না? এই জিজ্ঞাসাগুলো খুবই সোজা। কিন্তু উত্তর অত সোজা নয়। বাংলায় চর্চার ইতিহাস অনেক পুরোনো। এমনকি বাংলা ভাষার উৎপত্তির মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষায় জ্ঞান চর্চার শুরু। এইসকল চর্চায় যেমন বৌদ্ধ ও বৌদ্ধ সহজিয়া দর্শনের প্রভাব রয়েছে। তেমনি সনাতন, শাক্ত, সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, জৈন, শিখ, চার্বাক দর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দর্শনের চর্চাও হয়েছে।
আধুনিককালে সবচে বেশি যে দর্শনের চর্চা হয়েছে, তা হলো ইসলাম ধর্মের দর্শনসমূহ। তৌহিদ, রিসালাত, আখেরাত, বস্তুবাদ, ইবাদত এর মতো গুরুত্বপূর্ণ দর্শনের চর্চা হয়েছে। এর মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো সুফিবাদ বা বাংলায় মরমীবাদ। অর্থাৎ কেউই বিনাবাক্য ব্যয়ে বাংলা ভাষায় রাজত্ব করতে পারেনি।
কেন পারে নি? কারণ, আজকে যাদের আমরা ‘লোকজ’ বলে আড়াল করতে চাই, তারাই মূলত আগতসকল ধর্ম ও দর্শন’কে গ্রহণ কিংবা বর্জন করেছে, নিজস্ব চিন্তার ছাঁকনিতে ছেঁকে। তাঁরা সেইসব চিন্তার প্রকাশ ঘটাইছেন কেমনে? আমাদের মতো বড় বড় তত্ত্বকথার বই লিখে? কলাম লিখে? না। তাদের বেশিরভাগই কাব্য, বাণী বা গানের ভেতর দিয়ে দার্শনিক বয়ানগুলো হাজির করেছেন জনমানুষের সামনে। আমরা যাকে গান বলি, সাধকদের বা বাংলার চিন্তকদের কাছে তা কেবলই গান নয়। এই কথাটা বুঝতে হলেও সাধকদের বা গুরুর সান্নিধ্য প্রয়োজন। যা আমাদের নাই।
কেন নাই? কারণ, আমরা তাদের একাডেমি হিসেবে মেনেই নিতে পারি নাই। পুঁজিতান্ত্রিক একাডেমি আমাদের স্বীকারই করতে দেয় না যে আমাদের স্কুল কলেজ ছিলো। আমাদের শ্রী চৈতন্য ছিলেন, আমাদের কানা রঘুনাথ ছিলেন, আমাদের শান্ত রক্ষিত ছিলেন, আমাদের অতিশ দীপংকর ছিলেন। আমাদের ছিলেন লালন, হাসন, মনোমোহন, ভবা পাগলা, বিজয় সরকার, রজ্জব দেওয়ান, মাতাল রাজ্জাক, রশিদ সরকার।
আমাদের বাংলা’কে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আমাদের শিখাচ্ছে, বস্তুবাদ, ভাববাদ, মরমীবাদ, ধর্মতত্ত্ব, ন্যায়, মানবতা। অথচ বাংলায় তত্ত্বচর্চার নিগূঢ় সত্য স্থিতি ছিলো দর্শনের এই সকল শাখায়। এই সকল তর্কের মধ্য দিয়ে বাংলা বরাবর যেই দেশে (অবস্থান) দাঁড়িয়েছিল, সেইটা হলো ভাবের সাথে বস্তুর সম্পর্ক স্থাপন। অর্থাৎ জ্ঞান’কে পরম মেনে ভক্তি করাই মূল চর্চা না। সেই পরম’কে মানব কল্যাণে বাস্তবরুপে হাজির করার পথ পদ্ধতি তৈয়ার করা ছিলো বাংলার দর্শন চর্চার মূল ভিত্তি। এইখানে যেমন পরম লোক বা অচিন দেশের সন্ধান করা হইছে, তেমনি সেই অচিনদেশের ভাবকে বাস্তবের যুক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টাও করা হইছে।
আর এইসব তত্ত্বচর্চার ধারা ছিলো গুরুবাদী শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে। যার শেষদিকের কর্তা হলেন রশীদ উদ্দিন খাঁ, জালাল খাঁ, আবুল সরকার, রশিদ সরকার, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান, বাউল আব্দুল করিম, ক্বারী আমির উদ্দিন, সালাম সরকার, আক্কাস দেওয়ান’রা। আমরা তাদের এই প্রাচীন স্কুল থেকে নিজেদের আলাদা করে ফেলেছি। আমরা আধুনিক হয়েছি। আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ফলে আমরা আর ফিরে তাকাতে চাইনি আমাদের প্রাচীন স্কুলের দিকে।
এসবের কারণে যে সমস্যার মধ্যে আমরা পড়েছি, তা হলো আমাদের সমাজটাকে বুঝতে না পারা। এই না বোঝার কারণে, আমাদের এইখানে রাজনৈতিক ফয়সালা দুরূহ হয়ে পরেছে। আমাদের জাতি গঠন ভেঙে পরেছে। আমরা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে পড়েছি। কখনো আমরা মুসলমান, কখনো বাঙালি, কখনো বাংলাদেশি টাইপের নানান ক্যাঁচালে আমরা দিশেহারা। এই অবস্থায় তো আমরা একদিনে পরি নাই। যত আমরা আমাদের ঐতিহাসিক চর্চা থেকে সরে এসেছি, তত আমরা নতুন নতুন সংকটে নিমজ্জিত হয়েছি। যে কারণে, আমি নতুন করে আমাদের পুরোনো স্কুলগুলোর চর্চা’কে পুনর্মূল্যায়নের কথা বলছি। পেছনে যাওয়া যেহেতু সম্ভব নয়, তাই বর্তমান অবস্থার মধ্যে, অতীতের চর্চা, তত্ত্ব, জ্ঞান পুনর্পাঠ করা দরকার। এই কারণে, আমি নিকট তাত্ত্বিক মাতাল রাজ্জাকের ভাবনা চিন্তা’কে নতুন করে পাঠ করা যায় কি না তার প্রস্তাবে এই লেখা লিখছি।
ব্যক্তি মাতাল রাজ্জাক সম্পর্কেও দুইটা কথা বলতে হচ্ছে। মাতাল এবং কবি শব্দ দুইটাকে আলাদা করতে হবে যদি আমরা রাজ্জাক দেওয়ান’কে ধরতে চাই। রাজ্জাক দেওয়ান সাহেব তাঁর অসংখ্য বানীর মধ্যে নিজেকে মাতাল রাজ্জাক বলে পরিচয় দিয়েছেন। এইটা স্রেফ ভণিতার দায় নয়। তিনি মাতাল শব্দের ব্যাখ্যা দিতেন:
ম- তে মোহাম্মদ জ্ঞান জগতের গুরু
ত- তে তাপসীগণের বাঞ্ছাকল্পতরু
ল- তে লা শরীক আল্লাহ্ জপি চিরকাল
এই তিন অক্ষর যোগে, লোকে আমায় ভালোবেসে নাম দিয়েছে মাতাল।
বাংলা অঞ্চলের ভাবুকগণ, অধিকাংশ সময়ে নিজেকে আশেক বা প্রেমিক হিসেবে ভাব বা তত্ত্বচর্চা করেছেন। কখনোই তাত্ত্বিক হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা বা দার্শনিক হিসেবে নিজেরে চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ছিলো না এই অঞ্চলে। যে কারণে তত্ত্ব করা কিংবা জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা বা প্রচার এই অঞ্চলের চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক। এইখানেই বাংলা’র প্রেম সাধনার গূঢ় মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে। প্রেমিক হিসেবে নিজেকে হীন করে দেখা। অর্থাৎ পরমের কাছে দাস্যতা স্বীকার করে ব্যক্তি অর্থাৎ জীবের সীমাবদ্ধতা, অপারগতা, কমতি বা হীন হিসেবে হাজির করার জায়গা থেকে বাংলার ভাবুক, চিন্তক, সাধকরা নিজের পরিচয় প্রকাশে আনেন। লালন ফকির নিজেরে পামর, হীন, ভেড়ো, অধীন বলে পরিচয় দিয়েছেন। সাধক মনোমোহন দত্ত, জালাল উদ্দিন খাঁ, ভবা পাগলা, বিজয় সরকারের ক্ষেত্রেও আমরা তাই দেখি।
একইভাবে রাজ্জাক দেওয়ান সাহেব নিজেরে মাতাল বলে পরিচয় করিয়ে দেন মানুষের সামনে। ফলে অক্ষরবাদী চিন্তা ধারার বিরাট ডামাডোলের মধ্যে আমাদের বর্তমান সময় এমনভাবে বিষয়গুলোকে ফ্রেমিং করেছে যে, মাতাল মানে কেবলই মদখোর। অর্থাৎ মদখোর রাজ্জাক দেওয়ানের গান? ও আর এমনকি? বা অক্ষরবাদী ধার্মিকেরাও মদখোর মানে মাতাল রাজ্জাক উল্ল্যেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য কিংবা ইসলাম বিদ্বেষী ‘খেট্যাব’ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলে তাদের এইসকল উচ্চবাচ্যের বিরুদ্ধে মাতাল সম্পর্কে অর্থাৎ বাংলার ভাবে মাতাল’কে পরিষ্কার করতে হইলো।
অপরদিকে কবি আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ান। কবি হিসেবে রাজ্জাক দেওয়ান তাইলে কেমন? তাঁর কাব্যভাবনা, কবিতা, নন্দন, রসের সন্ধান করা দরকার। এইখানে আমার কবিতা সম্পর্কে বোঝাপড়া কম থাকায় খুব বেশি দূর যাইতে পারবো না। নির্ভর করতে হবে পাঠকের মনন ও আন্তরিকতার উপর। আমরা তাঁর দুইটা গানের কথা পূর্ণাঙ্গভাবে পাঠ করে দেখতে পারি।
১.
কৈলাসে ভোলা কাঁদে একেলা
ছিঁড়ে গেছে গাঁথা মালা মায়ারই বাঁধন
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
ছেড়ে গেছে নবমী এসেছে দশমী
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
বানাইয়া চালি চাঙ্গে তুলি
রঙ তুলিতে তারে করিয়া বর্ণন
শত ঢাক বাড়ি, নাড়ু চিড়া মুড়ি
আহা মরি মরি করি পূজার আয়োজন
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
সপ্তমী সাদরে পূজার মন্দিরে
করেছিলে যারে তুমি চরণে চুম্বন
তারে ফেলে যমুনায় কাদিলে কি হায়
ছেড়ে গেছে মা আমার কৈলাশ ভুবন
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
গেল নাচানাচি শত আতসবাজি
ঢাকির ঢাকবাজি, আজ বিদায়ী লগন
নাই নাই বেলা, ভেঙ্গে গেছে খেলা
কাঁদে অবলা মাতাল রাজ্জাকের মন
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
২.
আমি যাই যাই বলিতেছি
হাতে বেশি সময় নাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই
কাল বিষে আমায় ধরেছে
মরণ আমার অতি কাছে
বিষ উঠেছে উপর নিচে
কোন জায়গা বাঁকি নাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই
আমার দিন গিয়াছে দিয়া ফাঁকি
তোমার দিকেই চাইয়া থাকি
এখন সব লোকে কয় পোড়ামুখী
মরলে যায় আপদ বালাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই
মন যে আমার অমূল্য ধন
মন যে আমার হীরা কাঞ্চন
তোমার মনের কাছে রাখিতে মন
তাই সামান্য জায়গা চাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই
ও মন লতা শোন গো তোরা
যদি আমার কথা জিগায় ওরা
বলিস মাতাল রাজ্জাক গেছে মারা
আছে শুধু পোড়া ছাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই…
প্রথমটা দেবী দূর্গার বিসর্জন ঘিরে বিচ্ছেদ পর্বের একটা গান (আমরা কবিতা আকারে পড়ছি)। আর দ্বিতীয়টা নিখাদ বিচ্ছেদ। যদি আপনি সুরে না শুনে এই দুইটা লেখা পড়তে বসতেন, তবে আপনার কি মনে হতো? এইটা গান? না। আমার কাছে এইগুলা প্রিন্টে পড়লে অসাধারণ কবিতা হিসেবেই ধরা দিত। লোকজ স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা। যার শব্দ বন্ধনের অন্তর্গত সুর স্পষ্ট। ফলে শুদ্ধ স্বরবৃত্ত কিংবা শুদ্ধ মাত্রাবৃত্ত ছন্দে না থাকলেও-কবিতার অন্তর্গত ভাব, ছন্দের ঘাটতি পূরণ করে দিয়েছে। আবার কবিতার বিষয়বস্তু উপস্থাপনের ভাষা এবং উপমা, কোথাও কোনো খামতি নেই। ফলে কবিতা হিসেবেও মাতাল রাজ্জাকের লেখা কোনোভাবেই আমাদের শহুরে শিক্ষিতদের কাব্য ভাবনা থেকে কোনো অংশেই কম যায় না। বরং চিন্তা, দর্শন, এবং উপমার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও বহুগুণে আমাদের স্টাবলিশড কবিদের ছাড়িয়ে গেছেন।
মজার ব্যাপার হলো, কবি মাতাল রাজ্জাক’কে পড়বার পথপদ্ধতি আমাদের জানা নেই। আগ্রহও নেই। কারণ, মাতাল রাজ্জাকরা যদি আমাদের মুখোমুখি দাঁড়ায় তো আমরা তাদের সামনে নুয়ে পরবো। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভাব ভাষার যে গড়িমা, সেইখানে মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ান কি উৎরাইতে পারছিলেন? তখন আমরা চুপ। অথচ এমন জিজ্ঞাসা জরুরি ছিল। কেননা, আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা যে বিশেষ ভাষারীতি, রুচি এবং তার প্রকাশভঙ্গির আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে থাকি, সেইখানে কবি হিসেবে আমাদের নিজস্ব স্কুলের চিন্তক, ভাবুক, কবি’কে ঢুকতে দিতে চাই না। বিষয়টা এমন যে, চারপাশে নিরাপত্তা প্রাচীর দিয়ে ঢেকে রাখি আমাদের কথিত মার্জিত রুচি (আদতে উপনিবেশিক আধুনিকতা) রক্ষার দরকারে। যাকে মান ধরে আমাদের রাষ্ট্র চালনা হয়, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে এই রুচিকেই বলা হয় ‘মেইনস্ট্রিম’
কিন্তু যখন আরো বড় পরিসরে আমাদের সংরক্ষিত রুচির ভাব হাজির হলে টের পাওয়া যায়, কত খেলো আর মিথ্যে গড়িমায় ঢেকে আছে আমাদের শিক্ষিত রুচির মুখ। আপনি যদি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর দিকে তাকান, বিষয়টা সহজেই ধরতে পারবেন। মধ্যবৃত্তিয় রুচির প্রকাশ ভাষায় রচিত গানগুলো দেখেন। এদের খুব বেশিদিন বাঁচানো যায় না। বাজার মূল্যও তুলনামূলক কম। সেই তুলনায় আমাদের এইসব ‘লোকজ’ কবিদের অবস্থান দেখেন। যাদের লেখা, সুর করা, গাওয়া গানগুলো দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা সফল। সেটা কি এমনি এমনি? না। এইখানে শিক্ষা, চিন্তা, দর্শন, তত্ত্ব অন্যতম বিষয়, যা আমাদের আলগা লোক দেখানো পড়াশোনার মধ্যে নাই।
আমরা অক্ষরবাদী। শব্দের উপর ভর করে আমাদের জ্ঞানচর্চার টেম্পু ছুটে চলে। বিপরীতে, যাদের আমরা ‘লোকজ’ বলে আড়ালে রাখতে চাই, তাদের কবি হিসেবে স্বীকার করতে চাই না। তাত্ত্বিক বা দার্শনিক হিসেবেও তাদের মানতে আমাদের আপত্তি। কথিত মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় তাদের অশিক্ষিত বলে তাচ্ছিল্য করে। অথচ তারাই দিনের পর দিন আমাদের ভাবনা, সাহিত্য, কাব্য, সুর ও গানে মননের যে অভাব, তা পূরণ করে আসছেন।
মাতাল রাজ্জাক এইখানেও অনন্য এক শক্তি। তিনি শুধু বাউল নন, ফকির নন। তিনি কবি। কার কাছে কবি? দেশের আপামর জন সাধারণের কাছে কবি। তিনি ‘ঢাকা’র মানুষ। শিক্ষিত। রুচিশীল। তবু তিনি তত্ত্বচর্চার এমন এক পথ পদ্ধতি অনুসরণ করলেন, যে পথে তিনি সাধারণ মানুষের চিন্তার খোরাক হইতে পারেন। তিনি পাণ্ডুলিপিতে আবদ্ধ থাকতে চান নাই বলেই নিজের কাব্য কথা সুরে বেঁধে পৌঁছে দিয়েছেন প্রান্তিক ঘাসের ডগা পর্যন্ত।
তাত্ত্বিক মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানের দিকে একটু খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, তাঁরা কেবল আর্টটা করতে চান নাই। আর্টের সাথে তারা পরম ও জীবের সম্পর্কের রহস্য সন্ধান করেছেন। সেইটা কেমন? দেখেন, তিনি শুধু কি গান বেঁধেছেন? না, স্টেজেও রাতের পর রাত কাব্য করছেন, তর্ক করেছেন, বেঁধেছেন গান। তাত্ত্বিক হিসেবে তিনি বহুবিধ তত্ত্বের মোকাবিলা করেন তাঁর রচনায়। জীব তত্ত্ব, পরম তত্ত্ব, গুরু তত্ত্ব, দেহ তত্ত্ব, সংসার তত্ত্বে দেখিয়েছেন নিজের পান্ডিত্য।
তাঁর গানের বিরাট অংশজুড়ে আছে দেশপ্রেম। দেশাত্মবোধক গানে তাঁকে আমরা আলাদা এক কবি’কে খুঁজে পাই। সেখানে আমাদের শহুরে শিক্ষিত শ্রেণির রচনার মান ধরে ‘লোকজ’ কবির দেশ ধারণার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। এইক্ষেত্রে বাংলার অন্যান্য বাউল ফকিরের চেয়ে আলাদা। তিনি ধর্মতত্বের দিক থেকেও নিজেরে প্রমাণ করেছেন, নবী, রাসুল, পীর, পয়গম্বর, হাশর মেরাজ, শরিয়ত, মারেফত বিষয়ের রচনাগুলো’তে। এছাড়া প্রকৃতি রূপ, নারী প্রশ্ন, শিষ্যের করন সম্পর্কেও লিখেছেন অনেক গান।
তবে সবচে বেশি তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন বিচ্ছেদ পর্বে। এখনো তাঁর বিচ্ছেদের সুর, স্বর, শব্দ যেকোনো দরদীর হৃদয়ে তীরের মতো এসে বেঁধে। বাংলা গান, বিশেষ করে লোকজ ধারার গান যারা শোনেন তারা মাতাল রাজ্জাকের বিচ্ছেদ শোনেন নাই এমনটা প্রায় অসম্ভব। ঢাকাইয়া ইন্ডাস্ট্রি একচেটিয়া ব্যবসা করেছে মাতাল রাজ্জাকের বিচ্ছেদ গান বিক্রি করে। এখনো করছে। এখনো তাঁর গানে বুঁদ হয়ে থাকে নতুন এই প্রজন্মের শ্রোতারা। কিন্তু তাঁরা মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানকে চিনতে চান না। যারা তাঁর গান করছেন মঞ্চে, রেডিও, টেলিভিশনে, সেইসব শিল্পীরাও তাঁর পরিচয় দিতে চান না।
অবশ্য সেই সব মধ্যবিত্তীয় রুচির শিক্ষিত শিল্পীরা নিজেরাও খুব ভালো করে জানেন না যে, কে এই মাতাল রাজ্জাক। প্রায়শই দেখা যায় তাঁর গান আংশিক কিংবা বিকৃত করে গাইছেন। এমনকি ইন্ডাস্ট্রিগুলোও তাঁকে আর পরিচয় করিয়ে দিতে চান না। আর আমাদের একাডেমিগুলো তো আছেই দূরে ঠেলে দেবার জন্য। ফলে মাতাল রাজ্জাক যুগের পর যুগ আমাদের সঙ্গে থাকলেও তিনি থেকে যান আমাদের অন্তরালে। আমরা তাঁকে আবিষ্কার করতে পারি না। আমরা তাঁকে স্বীকার করতে পারি না বাংলার অন্যতম কবি হিসেবে। আমরা বলতে পারি না যে বাংলার ভাবুক, চিন্তক মাতাল রাজ্জাক আমাদের সম্পদ।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক
-06f111-480x270.webp)
পঞ্চ আত্মার যোগ সাধনে
ছিলো নবী অতি গোপনে
তার কুদরতের শানে
আমিনার কোল ধন্য করি
তপ্ত মরু হাসে’রে
মরুদ্যানে ফুইটাছে ফুল
কি আচানক বেশে’রে…
গতকাল ছিল ১২ই রবিউল আউয়াল। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর জন্মদিন। সারাজাহানের বহু বড় বড় কবি, সাধক, গাউস, কুতুব রাসুল্লাহ (সঃ) এর প্রেমে দেওয়ানা হয়েছেন, লিখেছেন স্তুতি। বাংলার মহতি সাধকগণ, কবি ও ভাবুকগণও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁদের মধ্যে মাতাল কবি আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ান অন্যতম। উপরের উল্লেখিত মোহাম্মদ (সঃ) এর আগমনের আনন্দ স্তবক লিখেছেন তিনি। আজ সেই মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ানের ৯৩তম জন্মদিন।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে চর ওয়াসপুর গ্রাম। এই গ্রামের বিত্তশালী মোকসেদ আলী ব্যাপারীর ২য় স্ত্রী সোনাবানুর গর্ভে ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন সাধক মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ান। তাঁর আগে সোনাবানুর ৭টি সন্তান জন্মের পরই মারা যান। সাত সন্তানের মৃত্যুর পর আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন অতি আদরের। মায়ের ভালোবাসা, পিতার আদর আর বিত্ত, বৈভব-সবই ছিলো। প্রথমে মক্তব। সেখানে আরবি ভাষা ও কুরআন শিক্ষা। পরে প্রাইমারি স্কুল থেকে ক্লাস ফাইভ।
ধরাবাঁধা কোনো পড়াশোনাই তাঁকে ধরে রাখতে পারেননি। মক্তবের মৌলানার সাথে তর্ক করে মক্তব ছাড়েন। স্কুল ছাড়েন মুখস্ত পড়ায় অনীহা থেকে। এরপর পিতার অকস্মাৎ মৃত্যুর পর অস্থির আব্দুর রাজ্জাক যেন দুনিয়ার সকল বন্ধন ছেঁড়া এক মুক্ত পাখি। যাত্রাপালা, জারি-সারি, পালাগানের আসরে ঘুরে বেড়ান। সংগীতের প্রতি প্রেম এখান থেকেই শুরু। আসর থেকে আসর হয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখা পান কেরানীগঞ্জের সুফি সাধক আব্দুল খালেক দেওয়ানের। গান ও জ্ঞানের প্রতি মুগ্ধ আব্দুর রাজ্জাক তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শুরু হয় সংগীত ও জ্ঞান সাধনা। গুরুর পরম্পরা থেকেই তার নাম হয় আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ান।
ইতিমধ্যে পিতার রেখে যাওয়া সম্পদের ভাগ বাটোয়ারা হলো। উদাসীন আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ানও অংশীদার হিসেবে চর ওয়াসপুরের ষোল বিঘা জমির অধিকারী হন। উদাসীন আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ান তখন আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন। সম্পদে উদাসীনতার কারণে কিছুকাল পরে এই জমির বেশিরভাগ হাতছাড়া হয়ে যায়। ততদিনে রাজ্জাক দেওয়ান মঞ্চে দণ্ডায়মান। শুরু থেকেই জ্ঞান ও সঙ্গীতে তার বিশেষ প্রতিভার কারণে দিকে দিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ছে। এই সময় তিনি লেখেন:
শুনে তোমার নামের বাঁশি, দীনহীন রাজ্জাক দেওয়ান
মোকসেদ তোমার জমিদারী রাজবাড়ী করলাম শ্মশান
কি যেন খাইয়াছি নেশা, হাড়-মাংশের পাই না দিশা
সোনা ভাবি দস্তা-শিশা, পাইতে তোমার মন
যেখানেই অসংগতি দেখেছেন, অন্যায় দেখেছেন, জুলুম অত্যাচার দেখেছেন, সেখানেই তাঁর কলম হয় উঠেছে প্রতিবাদী। তাঁর লেখার ভাষা, যুক্তি, উপস্থাপন দেশের সাধারণ মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে দেশ, ধর্ম, সংকট বোঝাপড়ার এক তাত্ত্বিক উপকরণ। অথচ তাঁকে আমরা ঠেলে দিয়েছি লৌকিকতার খোপে। ধর্মের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন, ‘সত্য কথার ধার ধারি না/ মিথ্যা কথার ছিগলি ছাড়ি/ ধর্মের গৌরব করি/বড় ধর্মের গৌরভ করি”।
সত্য কথা কি? সেইটা কি শুধুই আসমানী, অলিক কিংবা অসম্ভবে থাকে? নাকি তার দৃশ্যমান কল্যাণরুপও আছে? এইখানে মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান বলতেছেন, ‘আমাদের ইসলামীয়া দর্শন যাহা/ মূলে কেউ করি না তাহা/ মুখে মুখে সবাই আহা/ ইসলাম দাবী করি/ রাত্র ভরা ঘুম আসে না/ আমরা কুচিন্তাতে মরি/ সকালে উঠিয়া আমি/ দিবো ভাইয়ের মাথায় বাড়ি/ ধর্মের গৌরব করি'। অর্থাৎ, কেবল পোশাকি ধার্মিক সাজলেই হচ্ছে না। ইসলাম যদি মানতেই হয়, তো ভাইয়ের মাথায় বাড়ি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এইটা ধর্মের দৃশ্যমান কল্যাণরুপ। ভাইয়ের হ্বক আদায় করতে হবে, এইটাও ধর্মের ভিত্তি।
এই বয়ানের ভেতর দিয়ে তিনি শিক্ষা দিচ্ছেন। শিখতেছেন কারা? যারা আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের গরিমা মাথায় তুলে নেয় নাই। সেই সকল সাধারণ মানুষ তাঁর এই তত্ত্বকথার বুঝদার। খুব সহজ ভাষা। সুরে সুরে শুনতেছেন, গাইতেছেন, বুঝতেছেন। ঠিক একইভাবে, আমাদের যে আধুনিকতা কিংবা তা ছেপে আজকের উত্তরাধুনিকতার ধাক্কা। সেই ধাক্কা মাথায় নিয়ে বড় বড় সভা সেমিনারে, বড় বড় তাত্ত্বিকরা সমালোচনা করছেন আজকাল। আমরা মুগ্ধ হয়ে সেইসব বক্তৃতা শুনছি। বাহবা দিচ্ছি। এবং মনে করছি, আমরা এইসব চিন্তার ধারক ও বাহক। আমরা উদ্ধার করছি আমাদের মানব সমাজ। সমাজ কি ভাবছে, সেইদিকে আমাদের খেয়াল নেই। সমাজের চিন্তা প্রকাশের ভাব ভাষা আমাদের কাছে অচেনা, অচ্ছুৎ।
অথচ দেখেন, এইখানে মাতাল রাজ্জাক আমাদের সাবধান করেছেন। লিখছেন, ‘অন্তর বোঝাই লোভ লালসা/দয়ামায়া কিছু নাই/ ছলে বলে কল কৌশলে/পরের মাইয়া ঘরে পাই/ করি তার নারীত্ব হরণ/হইয়া পশুরই মতোন/ দিয়া পীরালী বচন/ ওলী আল্লার জাত মারি/কালের চাকার তালে তালে ফাল পারি’ । আধুনিকতার এই গোল সম্পর্কে, একজন তত্ত্ব সাধক তাঁর সাধারণ দর্শকদের যে যুক্তিতে বুঝ দিয়েছেন, তা ভাষাগত সহজতার কারনে, অর্থাৎ গ্রাম্য লোকজ ভাষার কারণে গুরুত্ব পায় নি আমাদের কাছে।
আজকের রাজনীতিতে যে দায় ও দরদের কথা উঠছে, সেই দায় সম্পর্কে মাতাল রাজ্জাক আগেই নির্দেশ করেছেন তাঁর গানে। কিন্তু আমরা তা শুনতে চাইনি। বরং পশ্চিমা তত্ত্ব কিংবা একাডেমিক তত্ত্বায়নের যে তুবড়ি ভারি কথনের প্যাঁচ খেলি, তারই বা মূল ভাব কি? সেইটা কি কেবলই ভাষা বা শব্দের ঘরে আবদ্ধ? নাকি তা দুনিয়ার মানুষের কল্যাণের দিকটাও ভাবে? সেই ভাবনাটা কি? খুবই সহজ। কালের চাকার তালে তালে ফাল না পারা। অর্থাৎ ট্রেন্ডে গা না ভাসানো।
আমরা একাডেমিক তাত্বিক হিসেবে বড় বড় বয়ান তৈরি করতে পারি, নিজেরে কুতুব প্রমাণ করতে পারি। আধুনিক পুঁজি বাজারে সেইসব কথার দামও হয়তো অনেক। কিন্তু তা আদতে মানুষ পর্যন্ত কি পৌঁছায়। অর্থাৎ যাদের কল্যাণের কথা ভেবে এত চিন্তা, সেই চিন্তাটাই মানুষের কাছে পৌঁছাইতে সক্ষম না আমরা। কল্যাণ তো দূর কি বাত। মজাটা এইখানেই, পুঁজি নিজেও চায় না যে এই তত্ত্বকথা সহজে ঐসকল মানুষের কাছে পৌঁছাক। তাদের পুঁজি বোকা বানিয়ে রাখতে চায়। নিত্য নতুন হাল ফ্যাশনের (চিন্তা) দাস বানিয়ে রাখতে চায়। ফলে ভাষাগত জায়গায় আমরা পুঁজির হয়ে নিজেরে বড় ভেবে, প্রকৃত চিন্তক অর্থাৎ পীরদের জাত মারতেছি।
তিনি লিখতেছেন, ‘কুলবিন মুনিনীন আরশে আল্লা/ এইতো আল্লার ঠিকানা/ মসজিদ ঘরে আল্লাহ্ থাকে না/ শোন মওলানা মসজিদ ঘরে আল্লা থাকে না'। অর্থাৎ আল্লাহ্ ইট পাথরের একটা ঘরে আবদ্ধ নয়। আজকের বাংলায় ইসলামের দরদ অপেক্ষা যে কট্টর আগ্রাসান দেখি, যেখানে মানুষের মূল্য নাই কিন্তু ইট পাথরের মসজিদ হয়ে উঠেছে পবিত্র, দামী। মানুষের বিপরীতে, জীব জীবনের বিপরীতে একটা ঘর’কে দাঁড় করিয়ে দেবার যে রাজনীতি, মাতাল রাজ্জাক তারে ছেড়ে যান নাই। মানুষের বিপরীতে জড় বস্তুকে মহিমান্বিত করা তো এক প্রকার পৌত্তলিকতাই। কাজী নজরুল ইসলাম এইখানে তার মানুষ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘খোদার ঘরে কে কপাট লাগায় কে দেয় সেখানে তালা সব দ্বার এর খোলা রবে চালা হাতুড়ি শাবল চালা’।
আমরা নজরুল’কে বুঝতে পারি, ধরতে পারি। আলোচনা করতে পারি। কিন্তু যখন মাতাল রাজ্জাক লিখতেছেন, ‘মসজিদ ঘরে আল্লা থাকে না’, তখন আর আমরা তাকে হজম করতে পারি না। কেন পারি না? কারণ, কাজী নজরুল ইসলাম শিক্ষিতের কবি। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। কিন্তু গ্রাম্য, চাষাভূষা ভাষায় কোথাকার কোন মাতাল লেখবে এই কথা? অসম্ভব। আমরা তাকে মাতালের অতিউচ্চারণ হিসেবে ঠেলে দেই আস্তাকুঁড়ে। অথচ, মাতাল রাজ্জাক তাঁর দায়িত্ব থেকে সরেন না। সাহস আর চিন্তাশক্তি’র উপর ভর করে তিনি কঠোর সমালোচনা করছেন মওলানাদের।
এই গানে তিনি আরো লিখেছেন, ‘আলেম গেছে জালেম হইয়া/কোরান পরে চন্ডালে/ সতি সাধুর ভাত জোটে না/ সোনার হার বেশ্যার গলে/ যদি চিনিতে কোরান/হইতো মানুষের কল্যাণ/মুখে মুখে সব মুসলমান/কাজের বেলা ঠনঠনা’। এমন নিগূঢ় সত্য সহজে বলতে পারাটা সহজ কথা না। আমরা আজকের সমাজ বাস্তবতা দেখতেছি। নানানভাবে সেইটার তত্ত্ব করার চেষ্টাও করছে আমাদের শিক্ষিত, একাডেমিক, বুদ্ধিজীবীরা।
কিন্তু আমরা কি পারতেছি এই সহজ কথাটারে সহজে বুঝতে? মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান পেরেছিলেন। মানে তিনি খুব সোজা বাংলায় সমস্ত মুসলমানদের কোরান’কে বুঝতে বলতেছেন মানুষের কল্যাণের জন্য। শুধু অন্ধের মতো মুখস্ত/মান্য করলেই ধর্ম পালন পূর্ণ হচ্ছে না। সেইটাকে মানব কল্যাণে রুপান্তর করতে বলতেছেন মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান।
সেই কল্যাণের রূপ কেমন? এই গানে তিনি বলছেন, ‘যদি মক্কা গেলে খোদা মিলতো/নবী মিলতো মদিনায়/দেশে ফিরে কেউ আইতো না/হজ করিতে যারা যায়/ কেউ যায় টাকার গুমানে/কেউ যায় দেশ ভ্রমনে/ধনী যায় ধনের টানে/আনিতে সোনা দানা’।
আপনারাও বুঝতে পারছেন নিশ্চয়, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান কি বলতে চেয়েছেন।
তাঁর গানে এই রকম অসংখ্য জায়গা আছে, যেখানে আমাদের জন্য- দিক দিশার নির্দেশ করেছেন। সমাজ, বাস্তবতা, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি নিয়ে তত্ত্ব কথার উপস্থাপন করেছেন সহজ ভাষায়। আমরা আমাদের সমাজ সংকটে যে সকল ভাবনা, চিন্তা ও পাঠের মধ্য দিয়ে যাইতে চাই, অনুসন্ধান করি, তার বহুকিছুর ভাণ্ডার আমাদের এই লোকজ সাধকদের গানের মধ্যে বিদ্যমান। এরমধ্যে লালন সাঁইজি অন্যতম। একই ঘরানার পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, খোদা বক্স শাহ, ছাত্তার ফকির আছেন।
এ ছাড়াও, ময়মনসিংহ অঞ্চলের ওস্তাদ রশিদ উদ্দিন খাঁ আছেন। তাঁর শিষ্য জালাল খাঁ আছেন। সালাম সরকার আছেন। সিলেট সুনামগঞ্জ জুড়ে আছেন হাসন রাজা, রাধা রমন, আব্দুল করিম, রমিজ উদ্দিন, ক্বারী আমির উদ্দিন সাহেব আছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছেন মনমোহন দত্ত। মানিকগঞ্জের ভবা পাগলা, আলফু দেওয়ান, রজ্জব দেওয়ান, খালেক দেওয়ান, রশিদ সরকার আক্কাস দেওয়ান আছেন। মোটাদাগে পরিচিতদের নামগুলোই উদাহরণ হিসেবে হাজির করলাম। আমি শুধু এইসব লোকজ চিন্তা, যুক্তি, প্রস্তাবনার মধ্যে সম্ভাবনার বিষয়টা সামনে আনতে চাইলাম। এইক্ষেত্রে প্রয়োজন একাডেমিক্যাল তত্ত্বায়ন আমাদের এইসকল ভাব, চিন্তা, তত্ত্বের উপযুক্ত তত্ত্বায়ন করা গেলে হয়তো আমরা আমাদের আত্ম পরিচয় আরো শক্তভাবে তৈয়ার করতে সক্ষম হবো। আর হেলা করলে চিরকাল আমাদের ঘুরপাক খাইতে হবে নানান উপনিবেশিক চিন্তার ঘূর্ণিপাকে।
এইবার আসি তাত্ত্বিক মাতাল রাজ্জাকের দেওয়ানের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে। ‘আমার ঘুম ভাঙ্গাইয়া গেলো’রে মরার কোকিলে’’, ‘সাকি পুরা বোতল দে আমারে/ নেশায় মজে রই’, ‘ভুল বুঝে চলে যাও/যতো খুশি ব্যাথা দাও/সব ব্যথা নীরবে সইবো বন্ধু’রে/তোমার লেখা গান আমি গাইবো’ —এই গানগুলো একটা সময় প্রতিটি গ্রামগঞ্জে, হাটে বাজারে মাইকে মাইকে বাজতো। মাতাল রাজ্জাকের গান শোনেনি এমন লোক বাংলাদেশে খুব কমই আছে। এক সময় মুখে মুখে ফিরেছে মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানের বিচ্ছেদ। জনপ্রিয় শিল্পী মমতাজসহ বহু শিল্পী একের পর এক অ্যালবাম করেছে মাতাল রাজ্জাকের গান নিয়ে। আজও আমাদের শিল্পীরা মাতাল রাজ্জাকের গান গেয়ে করে খাচ্ছে। আমরাও শুনি, মজা পাই, হাত তালি দেই। কিন্তু কোনোদিন বোঝার চেষ্টা করি নাই- গানের কথায় আসলে কী বলতে চাইছে। শিল্পীরাও জানেন না মাতাল রাজ্জাক কী বলছে গানে। মাতাল রাজ্জাক সম্পর্কে বলা তো দূরে থাক।
‘মদ খেয়েছি, মাতাল হয়েছি/ সরিয়ে দাঁড়া তোরা যতো মওলানা, ধন দৌলত সিন্দুকের চাবি/দুঃখীর হাতে থাকে না/কাউয়ায় কমলা খাইতে জানে না, ‘ঘাটে একবার আসি একবার যাই/ যাইয়া দেখি শ্যামও ঘাটে নাই”, ‘তুমি ডাল ছাড়িয়া উড়াল দিয়া/ ডালে গিয়া বইও কোকিলা’রে/ গাইলে মাতালের গান গাইও’ —মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা সাধক কবি রাজ্জাক দেওয়ান সম্পর্কে আজকের প্রজন্ম অনেকটাই উদাসীন। তাই তাকে আবার স্মরণ করিয়ে দেবার তাগাদা থেকে এই লেখা।
নিজেদের চিন্তা, ভাব, তত্ব, চর্চা থেকে সরে গেলে সেই শূন্য জায়গায় দখল করে উপনিবেশিক শক্তি। ফলে আমরা একাডেমিক্যালি যতো আধুনিকতার দিকে ঝুকছি, ততোই আমরা চিন্তায়, ভাবে উপনিবেশিক শক্তির কাছে নত হচ্ছি। এতে করে, না আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছি, আর না নিজের বলে কিছু অর্জন করতে পারছি। এই কথাগুলো বললাম কারণ, আমরা আমাদের চিন্তা পদ্ধতিগুলোকে আমরাই লোকজ কিংবা গ্রাম্যতা (ক্ষ্যাত) বলে পেছনে ঠেলে দিয়েছি।
একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার, বর্তমান থাকা আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্বদ্যালয়গুলো খুব বেশিদিন আগের নয়। তার আগে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি কেমন ছিল। আমাদের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা কেমন ছিলো। নাকি ছিলোই না? এই জিজ্ঞাসাগুলো খুবই সোজা। কিন্তু উত্তর অত সোজা নয়। বাংলায় চর্চার ইতিহাস অনেক পুরোনো। এমনকি বাংলা ভাষার উৎপত্তির মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষায় জ্ঞান চর্চার শুরু। এইসকল চর্চায় যেমন বৌদ্ধ ও বৌদ্ধ সহজিয়া দর্শনের প্রভাব রয়েছে। তেমনি সনাতন, শাক্ত, সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, জৈন, শিখ, চার্বাক দর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দর্শনের চর্চাও হয়েছে।
আধুনিককালে সবচে বেশি যে দর্শনের চর্চা হয়েছে, তা হলো ইসলাম ধর্মের দর্শনসমূহ। তৌহিদ, রিসালাত, আখেরাত, বস্তুবাদ, ইবাদত এর মতো গুরুত্বপূর্ণ দর্শনের চর্চা হয়েছে। এর মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো সুফিবাদ বা বাংলায় মরমীবাদ। অর্থাৎ কেউই বিনাবাক্য ব্যয়ে বাংলা ভাষায় রাজত্ব করতে পারেনি।
কেন পারে নি? কারণ, আজকে যাদের আমরা ‘লোকজ’ বলে আড়াল করতে চাই, তারাই মূলত আগতসকল ধর্ম ও দর্শন’কে গ্রহণ কিংবা বর্জন করেছে, নিজস্ব চিন্তার ছাঁকনিতে ছেঁকে। তাঁরা সেইসব চিন্তার প্রকাশ ঘটাইছেন কেমনে? আমাদের মতো বড় বড় তত্ত্বকথার বই লিখে? কলাম লিখে? না। তাদের বেশিরভাগই কাব্য, বাণী বা গানের ভেতর দিয়ে দার্শনিক বয়ানগুলো হাজির করেছেন জনমানুষের সামনে। আমরা যাকে গান বলি, সাধকদের বা বাংলার চিন্তকদের কাছে তা কেবলই গান নয়। এই কথাটা বুঝতে হলেও সাধকদের বা গুরুর সান্নিধ্য প্রয়োজন। যা আমাদের নাই।
কেন নাই? কারণ, আমরা তাদের একাডেমি হিসেবে মেনেই নিতে পারি নাই। পুঁজিতান্ত্রিক একাডেমি আমাদের স্বীকারই করতে দেয় না যে আমাদের স্কুল কলেজ ছিলো। আমাদের শ্রী চৈতন্য ছিলেন, আমাদের কানা রঘুনাথ ছিলেন, আমাদের শান্ত রক্ষিত ছিলেন, আমাদের অতিশ দীপংকর ছিলেন। আমাদের ছিলেন লালন, হাসন, মনোমোহন, ভবা পাগলা, বিজয় সরকার, রজ্জব দেওয়ান, মাতাল রাজ্জাক, রশিদ সরকার।
আমাদের বাংলা’কে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আমাদের শিখাচ্ছে, বস্তুবাদ, ভাববাদ, মরমীবাদ, ধর্মতত্ত্ব, ন্যায়, মানবতা। অথচ বাংলায় তত্ত্বচর্চার নিগূঢ় সত্য স্থিতি ছিলো দর্শনের এই সকল শাখায়। এই সকল তর্কের মধ্য দিয়ে বাংলা বরাবর যেই দেশে (অবস্থান) দাঁড়িয়েছিল, সেইটা হলো ভাবের সাথে বস্তুর সম্পর্ক স্থাপন। অর্থাৎ জ্ঞান’কে পরম মেনে ভক্তি করাই মূল চর্চা না। সেই পরম’কে মানব কল্যাণে বাস্তবরুপে হাজির করার পথ পদ্ধতি তৈয়ার করা ছিলো বাংলার দর্শন চর্চার মূল ভিত্তি। এইখানে যেমন পরম লোক বা অচিন দেশের সন্ধান করা হইছে, তেমনি সেই অচিনদেশের ভাবকে বাস্তবের যুক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টাও করা হইছে।
আর এইসব তত্ত্বচর্চার ধারা ছিলো গুরুবাদী শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে। যার শেষদিকের কর্তা হলেন রশীদ উদ্দিন খাঁ, জালাল খাঁ, আবুল সরকার, রশিদ সরকার, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান, বাউল আব্দুল করিম, ক্বারী আমির উদ্দিন, সালাম সরকার, আক্কাস দেওয়ান’রা। আমরা তাদের এই প্রাচীন স্কুল থেকে নিজেদের আলাদা করে ফেলেছি। আমরা আধুনিক হয়েছি। আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ফলে আমরা আর ফিরে তাকাতে চাইনি আমাদের প্রাচীন স্কুলের দিকে।
এসবের কারণে যে সমস্যার মধ্যে আমরা পড়েছি, তা হলো আমাদের সমাজটাকে বুঝতে না পারা। এই না বোঝার কারণে, আমাদের এইখানে রাজনৈতিক ফয়সালা দুরূহ হয়ে পরেছে। আমাদের জাতি গঠন ভেঙে পরেছে। আমরা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে পড়েছি। কখনো আমরা মুসলমান, কখনো বাঙালি, কখনো বাংলাদেশি টাইপের নানান ক্যাঁচালে আমরা দিশেহারা। এই অবস্থায় তো আমরা একদিনে পরি নাই। যত আমরা আমাদের ঐতিহাসিক চর্চা থেকে সরে এসেছি, তত আমরা নতুন নতুন সংকটে নিমজ্জিত হয়েছি। যে কারণে, আমি নতুন করে আমাদের পুরোনো স্কুলগুলোর চর্চা’কে পুনর্মূল্যায়নের কথা বলছি। পেছনে যাওয়া যেহেতু সম্ভব নয়, তাই বর্তমান অবস্থার মধ্যে, অতীতের চর্চা, তত্ত্ব, জ্ঞান পুনর্পাঠ করা দরকার। এই কারণে, আমি নিকট তাত্ত্বিক মাতাল রাজ্জাকের ভাবনা চিন্তা’কে নতুন করে পাঠ করা যায় কি না তার প্রস্তাবে এই লেখা লিখছি।
ব্যক্তি মাতাল রাজ্জাক সম্পর্কেও দুইটা কথা বলতে হচ্ছে। মাতাল এবং কবি শব্দ দুইটাকে আলাদা করতে হবে যদি আমরা রাজ্জাক দেওয়ান’কে ধরতে চাই। রাজ্জাক দেওয়ান সাহেব তাঁর অসংখ্য বানীর মধ্যে নিজেকে মাতাল রাজ্জাক বলে পরিচয় দিয়েছেন। এইটা স্রেফ ভণিতার দায় নয়। তিনি মাতাল শব্দের ব্যাখ্যা দিতেন:
ম- তে মোহাম্মদ জ্ঞান জগতের গুরু
ত- তে তাপসীগণের বাঞ্ছাকল্পতরু
ল- তে লা শরীক আল্লাহ্ জপি চিরকাল
এই তিন অক্ষর যোগে, লোকে আমায় ভালোবেসে নাম দিয়েছে মাতাল।
বাংলা অঞ্চলের ভাবুকগণ, অধিকাংশ সময়ে নিজেকে আশেক বা প্রেমিক হিসেবে ভাব বা তত্ত্বচর্চা করেছেন। কখনোই তাত্ত্বিক হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা বা দার্শনিক হিসেবে নিজেরে চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ছিলো না এই অঞ্চলে। যে কারণে তত্ত্ব করা কিংবা জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা বা প্রচার এই অঞ্চলের চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক। এইখানেই বাংলা’র প্রেম সাধনার গূঢ় মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে। প্রেমিক হিসেবে নিজেকে হীন করে দেখা। অর্থাৎ পরমের কাছে দাস্যতা স্বীকার করে ব্যক্তি অর্থাৎ জীবের সীমাবদ্ধতা, অপারগতা, কমতি বা হীন হিসেবে হাজির করার জায়গা থেকে বাংলার ভাবুক, চিন্তক, সাধকরা নিজের পরিচয় প্রকাশে আনেন। লালন ফকির নিজেরে পামর, হীন, ভেড়ো, অধীন বলে পরিচয় দিয়েছেন। সাধক মনোমোহন দত্ত, জালাল উদ্দিন খাঁ, ভবা পাগলা, বিজয় সরকারের ক্ষেত্রেও আমরা তাই দেখি।
একইভাবে রাজ্জাক দেওয়ান সাহেব নিজেরে মাতাল বলে পরিচয় করিয়ে দেন মানুষের সামনে। ফলে অক্ষরবাদী চিন্তা ধারার বিরাট ডামাডোলের মধ্যে আমাদের বর্তমান সময় এমনভাবে বিষয়গুলোকে ফ্রেমিং করেছে যে, মাতাল মানে কেবলই মদখোর। অর্থাৎ মদখোর রাজ্জাক দেওয়ানের গান? ও আর এমনকি? বা অক্ষরবাদী ধার্মিকেরাও মদখোর মানে মাতাল রাজ্জাক উল্ল্যেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য কিংবা ইসলাম বিদ্বেষী ‘খেট্যাব’ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলে তাদের এইসকল উচ্চবাচ্যের বিরুদ্ধে মাতাল সম্পর্কে অর্থাৎ বাংলার ভাবে মাতাল’কে পরিষ্কার করতে হইলো।
অপরদিকে কবি আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ান। কবি হিসেবে রাজ্জাক দেওয়ান তাইলে কেমন? তাঁর কাব্যভাবনা, কবিতা, নন্দন, রসের সন্ধান করা দরকার। এইখানে আমার কবিতা সম্পর্কে বোঝাপড়া কম থাকায় খুব বেশি দূর যাইতে পারবো না। নির্ভর করতে হবে পাঠকের মনন ও আন্তরিকতার উপর। আমরা তাঁর দুইটা গানের কথা পূর্ণাঙ্গভাবে পাঠ করে দেখতে পারি।
১.
কৈলাসে ভোলা কাঁদে একেলা
ছিঁড়ে গেছে গাঁথা মালা মায়ারই বাঁধন
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
ছেড়ে গেছে নবমী এসেছে দশমী
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
বানাইয়া চালি চাঙ্গে তুলি
রঙ তুলিতে তারে করিয়া বর্ণন
শত ঢাক বাড়ি, নাড়ু চিড়া মুড়ি
আহা মরি মরি করি পূজার আয়োজন
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
সপ্তমী সাদরে পূজার মন্দিরে
করেছিলে যারে তুমি চরণে চুম্বন
তারে ফেলে যমুনায় কাদিলে কি হায়
ছেড়ে গেছে মা আমার কৈলাশ ভুবন
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
গেল নাচানাচি শত আতসবাজি
ঢাকির ঢাকবাজি, আজ বিদায়ী লগন
নাই নাই বেলা, ভেঙ্গে গেছে খেলা
কাঁদে অবলা মাতাল রাজ্জাকের মন
হবে প্রতিমা বিসর্জন...
২.
আমি যাই যাই বলিতেছি
হাতে বেশি সময় নাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই
কাল বিষে আমায় ধরেছে
মরণ আমার অতি কাছে
বিষ উঠেছে উপর নিচে
কোন জায়গা বাঁকি নাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই
আমার দিন গিয়াছে দিয়া ফাঁকি
তোমার দিকেই চাইয়া থাকি
এখন সব লোকে কয় পোড়ামুখী
মরলে যায় আপদ বালাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই
মন যে আমার অমূল্য ধন
মন যে আমার হীরা কাঞ্চন
তোমার মনের কাছে রাখিতে মন
তাই সামান্য জায়গা চাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই
ও মন লতা শোন গো তোরা
যদি আমার কথা জিগায় ওরা
বলিস মাতাল রাজ্জাক গেছে মারা
আছে শুধু পোড়া ছাই
তুমি সামনে দাঁড়াও
একবার দেখে যাই…
প্রথমটা দেবী দূর্গার বিসর্জন ঘিরে বিচ্ছেদ পর্বের একটা গান (আমরা কবিতা আকারে পড়ছি)। আর দ্বিতীয়টা নিখাদ বিচ্ছেদ। যদি আপনি সুরে না শুনে এই দুইটা লেখা পড়তে বসতেন, তবে আপনার কি মনে হতো? এইটা গান? না। আমার কাছে এইগুলা প্রিন্টে পড়লে অসাধারণ কবিতা হিসেবেই ধরা দিত। লোকজ স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা। যার শব্দ বন্ধনের অন্তর্গত সুর স্পষ্ট। ফলে শুদ্ধ স্বরবৃত্ত কিংবা শুদ্ধ মাত্রাবৃত্ত ছন্দে না থাকলেও-কবিতার অন্তর্গত ভাব, ছন্দের ঘাটতি পূরণ করে দিয়েছে। আবার কবিতার বিষয়বস্তু উপস্থাপনের ভাষা এবং উপমা, কোথাও কোনো খামতি নেই। ফলে কবিতা হিসেবেও মাতাল রাজ্জাকের লেখা কোনোভাবেই আমাদের শহুরে শিক্ষিতদের কাব্য ভাবনা থেকে কোনো অংশেই কম যায় না। বরং চিন্তা, দর্শন, এবং উপমার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও বহুগুণে আমাদের স্টাবলিশড কবিদের ছাড়িয়ে গেছেন।
মজার ব্যাপার হলো, কবি মাতাল রাজ্জাক’কে পড়বার পথপদ্ধতি আমাদের জানা নেই। আগ্রহও নেই। কারণ, মাতাল রাজ্জাকরা যদি আমাদের মুখোমুখি দাঁড়ায় তো আমরা তাদের সামনে নুয়ে পরবো। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভাব ভাষার যে গড়িমা, সেইখানে মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ান কি উৎরাইতে পারছিলেন? তখন আমরা চুপ। অথচ এমন জিজ্ঞাসা জরুরি ছিল। কেননা, আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা যে বিশেষ ভাষারীতি, রুচি এবং তার প্রকাশভঙ্গির আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে থাকি, সেইখানে কবি হিসেবে আমাদের নিজস্ব স্কুলের চিন্তক, ভাবুক, কবি’কে ঢুকতে দিতে চাই না। বিষয়টা এমন যে, চারপাশে নিরাপত্তা প্রাচীর দিয়ে ঢেকে রাখি আমাদের কথিত মার্জিত রুচি (আদতে উপনিবেশিক আধুনিকতা) রক্ষার দরকারে। যাকে মান ধরে আমাদের রাষ্ট্র চালনা হয়, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে এই রুচিকেই বলা হয় ‘মেইনস্ট্রিম’
কিন্তু যখন আরো বড় পরিসরে আমাদের সংরক্ষিত রুচির ভাব হাজির হলে টের পাওয়া যায়, কত খেলো আর মিথ্যে গড়িমায় ঢেকে আছে আমাদের শিক্ষিত রুচির মুখ। আপনি যদি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর দিকে তাকান, বিষয়টা সহজেই ধরতে পারবেন। মধ্যবৃত্তিয় রুচির প্রকাশ ভাষায় রচিত গানগুলো দেখেন। এদের খুব বেশিদিন বাঁচানো যায় না। বাজার মূল্যও তুলনামূলক কম। সেই তুলনায় আমাদের এইসব ‘লোকজ’ কবিদের অবস্থান দেখেন। যাদের লেখা, সুর করা, গাওয়া গানগুলো দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা সফল। সেটা কি এমনি এমনি? না। এইখানে শিক্ষা, চিন্তা, দর্শন, তত্ত্ব অন্যতম বিষয়, যা আমাদের আলগা লোক দেখানো পড়াশোনার মধ্যে নাই।
আমরা অক্ষরবাদী। শব্দের উপর ভর করে আমাদের জ্ঞানচর্চার টেম্পু ছুটে চলে। বিপরীতে, যাদের আমরা ‘লোকজ’ বলে আড়ালে রাখতে চাই, তাদের কবি হিসেবে স্বীকার করতে চাই না। তাত্ত্বিক বা দার্শনিক হিসেবেও তাদের মানতে আমাদের আপত্তি। কথিত মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় তাদের অশিক্ষিত বলে তাচ্ছিল্য করে। অথচ তারাই দিনের পর দিন আমাদের ভাবনা, সাহিত্য, কাব্য, সুর ও গানে মননের যে অভাব, তা পূরণ করে আসছেন।
মাতাল রাজ্জাক এইখানেও অনন্য এক শক্তি। তিনি শুধু বাউল নন, ফকির নন। তিনি কবি। কার কাছে কবি? দেশের আপামর জন সাধারণের কাছে কবি। তিনি ‘ঢাকা’র মানুষ। শিক্ষিত। রুচিশীল। তবু তিনি তত্ত্বচর্চার এমন এক পথ পদ্ধতি অনুসরণ করলেন, যে পথে তিনি সাধারণ মানুষের চিন্তার খোরাক হইতে পারেন। তিনি পাণ্ডুলিপিতে আবদ্ধ থাকতে চান নাই বলেই নিজের কাব্য কথা সুরে বেঁধে পৌঁছে দিয়েছেন প্রান্তিক ঘাসের ডগা পর্যন্ত।
তাত্ত্বিক মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানের দিকে একটু খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, তাঁরা কেবল আর্টটা করতে চান নাই। আর্টের সাথে তারা পরম ও জীবের সম্পর্কের রহস্য সন্ধান করেছেন। সেইটা কেমন? দেখেন, তিনি শুধু কি গান বেঁধেছেন? না, স্টেজেও রাতের পর রাত কাব্য করছেন, তর্ক করেছেন, বেঁধেছেন গান। তাত্ত্বিক হিসেবে তিনি বহুবিধ তত্ত্বের মোকাবিলা করেন তাঁর রচনায়। জীব তত্ত্ব, পরম তত্ত্ব, গুরু তত্ত্ব, দেহ তত্ত্ব, সংসার তত্ত্বে দেখিয়েছেন নিজের পান্ডিত্য।
তাঁর গানের বিরাট অংশজুড়ে আছে দেশপ্রেম। দেশাত্মবোধক গানে তাঁকে আমরা আলাদা এক কবি’কে খুঁজে পাই। সেখানে আমাদের শহুরে শিক্ষিত শ্রেণির রচনার মান ধরে ‘লোকজ’ কবির দেশ ধারণার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। এইক্ষেত্রে বাংলার অন্যান্য বাউল ফকিরের চেয়ে আলাদা। তিনি ধর্মতত্বের দিক থেকেও নিজেরে প্রমাণ করেছেন, নবী, রাসুল, পীর, পয়গম্বর, হাশর মেরাজ, শরিয়ত, মারেফত বিষয়ের রচনাগুলো’তে। এছাড়া প্রকৃতি রূপ, নারী প্রশ্ন, শিষ্যের করন সম্পর্কেও লিখেছেন অনেক গান।
তবে সবচে বেশি তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন বিচ্ছেদ পর্বে। এখনো তাঁর বিচ্ছেদের সুর, স্বর, শব্দ যেকোনো দরদীর হৃদয়ে তীরের মতো এসে বেঁধে। বাংলা গান, বিশেষ করে লোকজ ধারার গান যারা শোনেন তারা মাতাল রাজ্জাকের বিচ্ছেদ শোনেন নাই এমনটা প্রায় অসম্ভব। ঢাকাইয়া ইন্ডাস্ট্রি একচেটিয়া ব্যবসা করেছে মাতাল রাজ্জাকের বিচ্ছেদ গান বিক্রি করে। এখনো করছে। এখনো তাঁর গানে বুঁদ হয়ে থাকে নতুন এই প্রজন্মের শ্রোতারা। কিন্তু তাঁরা মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানকে চিনতে চান না। যারা তাঁর গান করছেন মঞ্চে, রেডিও, টেলিভিশনে, সেইসব শিল্পীরাও তাঁর পরিচয় দিতে চান না।
অবশ্য সেই সব মধ্যবিত্তীয় রুচির শিক্ষিত শিল্পীরা নিজেরাও খুব ভালো করে জানেন না যে, কে এই মাতাল রাজ্জাক। প্রায়শই দেখা যায় তাঁর গান আংশিক কিংবা বিকৃত করে গাইছেন। এমনকি ইন্ডাস্ট্রিগুলোও তাঁকে আর পরিচয় করিয়ে দিতে চান না। আর আমাদের একাডেমিগুলো তো আছেই দূরে ঠেলে দেবার জন্য। ফলে মাতাল রাজ্জাক যুগের পর যুগ আমাদের সঙ্গে থাকলেও তিনি থেকে যান আমাদের অন্তরালে। আমরা তাঁকে আবিষ্কার করতে পারি না। আমরা তাঁকে স্বীকার করতে পারি না বাংলার অন্যতম কবি হিসেবে। আমরা বলতে পারি না যে বাংলার ভাবুক, চিন্তক মাতাল রাজ্জাক আমাদের সম্পদ।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক
.png)

আজ যে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে, তিনি বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ, বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক। আমরা তাঁকে পাঠ করি কবি, সংগীতস্রষ্টা কিংবা সাম্যবাদ ও মানবমুক্তির কণ্ঠস্বর হিসেবে। তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তার এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে
১৮ ঘণ্টা আগে-c94340-256x144.webp)
৭১ বছর আগে আজকের দিনেই মুক্তি পেয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’। কিন্তু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসকে হুবহু পর্দায় তোলেননি সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্রের প্রয়োজনেই বদলে দিয়েছিলেন কিছু দৃশ্য। কেন ‘পথের পাঁচালী’ দিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, কীভাবে অর্থসংকটের মধ্যেও ছবিটি বানিয়েছিলেন, এস
২৬ আগস্ট ২০২৬
‘পদাতিক পদধূলি ঢাকিল আকাশ দিনে অন্ধকার, নাহি রবির প্রকাশ।’ জৈনুদ্দীনের ‘রসুল বিজয়’ গ্রন্থে যুদ্ধের এমন তীব্র ও জীবন্ত বর্ণনা রয়েছে। যে বাংলা কাব্য একসময় প্রধানত স্থানীয় লোককথা, পুরাণ ও ধর্মীয় আখ্যানকে ঘিরে আবর্তিত হতো, সেই কাব্যেই একসময় আরব-ফারসি উৎসের কাহিনি, ইসলামি ইতিহাস ও নবীজির জীবনকেন্দ্রিক
২৬ আগস্ট ২০২৬
রবিউল আউয়াল বিশ্বের মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। মসজিদকেন্দ্রিক ধর্মীয় আয়োজন, বিশাল শোভাযাত্রা, পরিবারের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া ও দরিদ্রদের সহায়তার মধ্য দিয়ে মুসলিমরা এই দিন পালন করে। কোনো দেশে আবার সরকারি পর্যায়েও থাকে বড় আ
২৬ আগস্ট ২০২৬