leadT1ad

আলোচনা সভায় বক্তারা

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতে প্রয়োজন সদিচ্ছা ও সংস্কার

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

রাজধানীর বাংলামোটরে ‘রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব: সংকট ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। স্ট্রিম ছবি

অর্থনীতি ও সমাজসেবায় নারীরা অভাবনীয় সাফল্য দেখালেও রাজনীতির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনক হারে কমছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার অভাব, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং কাঠামোগত সংস্কার না হওয়াই এর মূল কারণ। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে এক গোলটেবিল বৈঠকে এমন মত দেন আলোচকরা।

‘রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব: সংকট ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এ গোলটেবিল যৌথভাবে আয়োজন করে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিম, নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম (এফডাব্লিউপিআর) ও ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ।

আলোচনায় বিশিষ্টজনরা জানান, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনগুলো নেতৃত্ব তৈরির পরিবর্তে অনুগ্রহ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নারীরা সামনের সারিতে থাকলেও ক্ষমতার অংশীদারিত্বের প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান গৌণ। এই সংকট উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্র সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের কঠোর ভূমিকা এবং সর্বদলীয় নারী ফোরাম গঠন জরুরি।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা স্ট্রিম সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, গত ২০ বছরে কৃষি ও অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ ঈর্ষণীয়। এফএও’র (জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা) তথ্যমতে, কৃষিতে ৫২ শতাংশ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীরা। পুরুষপ্রধান পরিবারের তুলনায় নারীপ্রধান পরিবারে শিশুদের পুষ্টির উন্নতি ১১২ শতাংশ বেশি। অথচ রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিম্নমুখী।

গোলটেবিল বৈঠকে কথা বলছেন ঢাকা স্ট্রিম সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ। স্ট্রিম ছবি
গোলটেবিল বৈঠকে কথা বলছেন ঢাকা স্ট্রিম সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ। স্ট্রিম ছবি

তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি আন্দোলনে নারীরা নেতৃত্ব দিলেও ক্ষমতা কাঠামোর প্রশ্নে তাঁদের পিছিয়ে রাখা হয়, যা দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির পথে অন্যতম বাধা।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেন, অর্থনীতি বা সমাজসেবায় নারীরা এগোলেও রাজনীতির গ্লাস সিলিং (অলিখিত সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধা) কিছুতেই ভাঙা যাচ্ছে না।

জুলাই সনদের ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীর বিষয়টি কোনো লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে না, এটি ন্যূনতম শুরু হওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে জনসংখ্যার অনুপাতে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নারী প্রার্থী প্রয়োজন। নারী প্রার্থীর হার নিশ্চিত না করলে আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থার প্রস্তাবও দেন তিনি।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন।

সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নারী নেতৃত্ব তৈরি না করার একটি সহজ পথ হিসেবে অভিহিত করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের পরিচালক অধ্যাপক রওনক জাহান। তিনি বলেন, সংরক্ষিত আসনের এমপিরা জনগণের ভোটে নয়, ৩০০ জন পুরুষের ভোটে নির্বাচিত হন। ফলে তারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না।

রাজনীতিতে মেন্টরশিপের অভাবে নারীদের পারিবারিক পরিচয় বা ডাইনাস্টিক (পারিবারিক) রুটের ওপর নির্ভর করতে হয় উল্লেখ করে তিনি নারীদের জন্য ‘এমিলিস লিস্ট’র (যুক্তরাষ্ট্রের সুপরিচিত পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি) আদলে গ্রুমিং বা প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের পরিচালক অধ্যাপক রওনক জাহান। স্ট্রিম ছবি
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের পরিচালক অধ্যাপক রওনক জাহান। স্ট্রিম ছবি

রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার অভাবের কথা তুলে ধরে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার করলেও তা রক্ষা করেনি। বর্তমানে সংরক্ষিত আসন পদ্ধতি অনেকটা অনুগ্রহ হিসেবে দেওয়া হয়, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে লেনদেন বা সম্পর্ক মুখ্য হয়ে ওঠে।

তিনি জানান, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নারীদের জন্য ১০০টি আসন ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সংরক্ষণের সুপারিশ করেছিল, যাতে নারীরা যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।

রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন  নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। স্ট্রিম ছবি
রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। স্ট্রিম ছবি

অনুষ্ঠানে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের অবমূল্যায়নের চিত্র তুলে ধরেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। তিনি বলেন, দলগুলো মনে করে নারীদের পেশিশক্তি নেই, তাই তাদের মনোনয়ন দেওয়া ঝুঁকির। বরং কোনো নারীর বাবা বা স্বামী এমপি-মন্ত্রী থাকলে তাকে মনোনয়ন দেওয়া নিরাপদ মনে করা হয়।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারীরা সামনে থাকলেও স্বার্থের প্রশ্নে এখন তারা পিছিয়ে যাচ্ছেন। এবার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আশা থাকলেও তা অপূর্ণ থাকার কষ্টের কথাও জানান প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। স্ট্রিম ছবি
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। স্ট্রিম ছবি

সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কোনো নারী প্রতিনিধি ছিলেন না। যে সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশকে পরিবর্তন করছে, সেখানে নারীদের মতামত নেওয়া হয়নি।

জামায়াতে ইসলামীর কিছু প্রস্তাবনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, নারীদের জন্য ৫ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা নির্ধারণ বা নিরাপত্তার অজুহাতে প্রার্থী না করা এক ধরনের পুরুষবিদ্বেষ। পুরুষরা ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচন করতে পারলে নারীরা কেন পারবে না এমন প্রশ্ন রেখে তিনি সর্বদলীয় নারী ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেন।

জাতীয় সংসদকে ধনী, ব্যবসায়ী ও পুরুষদের ক্লাব হিসেবে অভিহিত করেন সিপিবির কেন্দ্রীয় নারী সেলের সদস্য তাহমিনা ইয়াসমিন নীলা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো পিতৃতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অংশ। দলগুলো জুলাই আন্দোলনে গুলি খাওয়া তরুণদের টানতে ব্যর্থ হয়েছে। এআই ব্যবহার করে নারীদের চরিত্র হরণ ও ভিডিও বানিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানোর নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, নারীদের রাজপথে দেখলেই গালিগালাজ করার এই মেকানিজম বন্ধ হওয়া দরকার।

জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও রাজনীতিতে সরাসরি জড়ানোকে অনেকেই উপযুক্ত মনে করেন না– এই বিষয়কে বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ডা. হাবিবা আকতার চৌধুরী। দলের অভ্যন্তরে নারীর অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের কুইন। আমার স্বামী দলের নায়েবে আমির, কিন্তু আমি পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করি। তিনি জানান, জামায়াতের মজলিসে শূরার প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী সদস্য এবং দলের সিদ্ধান্তে নারীদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়।

নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের প্রতিনিধি মাহরুখ মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি, জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হুসাইন, ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশের মহাসচিব সাদিক আল আরমান ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শিব্বির আহমেদ।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাহিদুল খান সোহেল, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির প্রতিনিধি হুমায়রা নূর, এএপি বাংলাদেশের মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরা, রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী তাজনুভা জাবিন এবং ইলেকশন বিটের সাবেক সভাপতি আকরামুল হক সায়েম।

Ad 300x250

সম্পর্কিত