জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি: ভারতের টেক্সটাইল খাতে বড় চ্যালেঞ্জের শঙ্কা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি ভারতের টেক্সটাইল খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ছবি: সংগৃহীত

গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি ভারতের টেক্সটাইল খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভারতের ফার্স্টপোস্ট, ইকোনমিক টাইমস, দ্য হিন্দু বিজনেসলাইন ও বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে এই চুক্তিকে ভারতের জন্য ‘ডাবল ব্লো’ বা দ্বিমুখী ধাক্কা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন ভারত শুল্ক সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে আছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছে তুলা ও সুতা রপ্তানি কমারও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

চুক্তির ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা বা ম্যানমেড ফাইবার ব্যবহার করে বাংলাদেশে উৎপাদিত পোশাক এখন যুক্তরাষ্ট্রে শূন্য শুল্কে প্রবেশ করতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের বর্তমান শুল্ক ১৮ শতাংশ। আংশিক ছাড় পেতে ভারতকে প্রতিটি পণ্যে কমপক্ষে ২০ শতাংশ মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহার করতে হয়। যেমন, ১০ ডলারের একটি টি-শার্টে শর্ত পূরণ হলে কার্যকর শুল্ক দাঁড়ায় প্রায় ১৩.৫ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট শর্তে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় ভারতের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। তৈরি পোশাক খাতে লাভের হার মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ হওয়ায় এই সামান্য শুল্ক পার্থক্যও বড় প্রভাব ফেলবে।

বর্তমানে চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৭.৬ থেকে ৮.৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। অন্যদিকে ভারতের রপ্তানি ৩.২৬ থেকে ৯.৮৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ৯–১০ শতাংশ এবং ভারতের ৫–৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ভারতে কাঁচা তুলার ওপর ১১ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনরায় চালু হওয়ায় মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহার করে শুল্ক ছাড় পাওয়া ভারতের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

দামের ওপর নির্ভরশীল পোশাক বাজারে শ্রম খরচ বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে মাসিক শ্রম খরচ প্রায় ১০৭ ডলার, যেখানে ভারতে তা ২০০ থেকে ৩০০ ডলার। ফলে মার্কিন অর্ডার ভারতের বদলে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দাস বলেন, “আগে ধারণা ছিল ভারত যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাড়াতে পারবে। কিন্তু নতুন ঘোষণায় দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ কোটা সাপেক্ষে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে। ফলে ভারতের প্রত্যাশিত সুবিধা উল্টো অসুবিধায় পরিণত হয়েছে।” তবে ডব্লিউটিওতে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত জয়ন্ত দাসগুপ্ত মনে করেন, এটি একটি ‘ট্যারিফ রেট কোটা’ হওয়ায় এর পরিসর সীমিত থাকবে।

দামের ওপর নির্ভরশীল পোশাক বাজারে শ্রম খরচ বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে মাসিক শ্রম খরচ প্রায় ১০৭ ডলার, যেখানে ভারতে তা ২০০ থেকে ৩০০ ডলার। ফলে মার্কিন অর্ডার ভারতের বদলে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান অশ্বিন চন্দ্রন বলেন, এই চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী। প্রথমত শুল্ক সুবিধা কমছে এবং দ্বিতীয়ত এটি ভারতের তুলা ও সুতা রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশ তাদের প্রয়োজনীয় তুলা ও সুতার বড় অংশ ভারত থেকে কেনে। ২০২৪ সালে ভারত বাংলাদেশে ১.৪৭ থেকে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের সুতা এবং ৬৮৪ মিলিয়ন ডলারের কাঁচা তুলা রপ্তানি করেছে। নতুন চুক্তির ফলে বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে উৎসাহিত হবে। এতে ভারত থেকে কাঁচামাল কেনা কমে যেতে পারে। ভারতের কটন টেক্সটাইল এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক সিদ্ধার্থ রাজাগোপাল অবশ্য মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আনা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় রাতারাতি সাপ্লাই চেইন পরিবর্তন করা সহজ নয়।

চুক্তি ঘোষণার পর ভারতীয় টেক্সটাইল কোম্পানি গোকালদাস এক্সপোর্টস, কেপিআর মিল ও আরভিন্দসহ কয়েকটির শেয়ার ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এতে ভারতের ১-২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতি হতে পারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বাজারে ভারতের শুল্কমুক্ত সুবিধা এই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে পারে বলে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত মীরা শংকর বলেন, “এই চুক্তি ভারতকে কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। তাই ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমজাতীয় পণ্যে একই ধরনের সুবিধা চাইতে পারে।”

Ad 300x250

সম্পর্কিত