স্বাধীন বাংলাদেশে গড়ে ওঠা প্রথম ব্যান্ড ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস’-এর ভোকালিস্ট ও গিটারিস্ট দস্তগীর হক আর নেই। আজ (১১ ফেব্রুয়ারি) বুধবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
গৌতম কে শুভ

স্বাধীন বাংলাদেশে গড়ে ওঠা প্রথম ব্যান্ড ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস’-এর ভোকালিস্ট ও গিটারিস্ট দস্তগীর হক আর নেই। আজ (১১ ফেব্রুয়ারি) বুধবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দস্তগীর হক দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।
দস্তগীর হকের জীবনকে বোঝার জন্য তাঁর পারিবারিক প্রেক্ষাপটকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের পরিবার যেন এক অলিখিত মিউজিক একাডেমি। বলা যায়, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের প্রারম্ভিক ইতিহাস এই পরিবারের কাছে ঋণী।
দস্তগীর হকের বড় ভাই আলমগীর হক পাকিস্তানের জনপ্রিয় পপস্টার। তাঁকে অনেকে ‘প্রাচ্যের এলভিস প্রিসলি’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় রয়েছে। তিনি স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড ‘আইওলাইটস’-এর ভোকালিস্ট ছিলেন। পরে এই ব্যান্ডের নাম পালটে হয় ‘উইন্ডি সাইড অফ কেয়ার’। অর্থাৎ, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের যে বীজ রোপিত হয়েছিল স্বাধীনতার আগেই, তার সঙ্গে এই পরিবারের যোগ ছিল সরাসরি।

এই পরিবারের আরেক উজ্জ্বল নাম নয়ন মুন্সী। তাঁকে বাংলাদেশের প্রথম ‘গিটার সেনসেশন’ বলা হয়। তিনি আজম খানের সঙ্গে স্টেজে বাজাতেন। গিটার হাতে তাঁর দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর। মাত্র ২০ বছর বয়সে কানাডায় এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর প্রভাব থেমে থাকেনি। সত্তর দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশকের শুরুতে তরুণ গিটারবাদকদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার নাম। আইয়ুব বাচ্চুর মতো শিল্পীও নয়ন মুন্সীর বাজনা দেখে গিটারিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
দস্তগীর হকদের পরিবারের মেয়েরাও ছিলেন সংগীতচর্চায় সমান সক্রিয়। বাংলাদেশের প্রথম নারী ড্রামার হিসেবে পরিচিত জর্জিনা হক ও তাঁর দুই বোন মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘থ্রি হক সিস্টার্স’। বড়বোন সুলতানা হক ছিলেন এই গ্রুপের ভোকাল ও রিদম গিটারিস্ট। ছোটোবোন রোকসানা হক বাজাতেন পিয়ানো একরডিয়ান, মাঝে মাঝে গিটারও। তবলায় আর সেতারেও ছিল ভালো দখল।
সেই সময় মেয়েদের মিউজিক্যাল গ্রুপ গড়ে তোলা ছিল সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা উদ্যোগ। পরিবারের আরেক সদস্য জামাল মুন্সীও তবলায় পারদর্শী ছিলেন। অর্থাৎ এই পরিবারে শাস্ত্রীয় সংগীত, পপ, রক—বিভিন্ন ধারার সংগীত একসঙ্গে চর্চা হতো। এটি বৃহত্তর সাংগীতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। দস্তগীর হক সেই ধারার অংশ হয়ে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের সূচনাপর্বে যুক্ত হন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়নি। যুদ্ধশেষে দেশ তখন ভাঙাচোরা। অর্থনীতি দুর্বল, অবকাঠামো বিধ্বস্ত, পরিবারগুলো ক্ষতবিক্ষত। চারদিকে অনিশ্চয়তা, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল এক অদ্ভুত রকমের আশাবাদ। মানুষ নতুন করে শুরু করতে চায়। নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সংস্কৃতিও গড়ে তোলার তাগিদ অনুভূত হচ্ছিল অনেকের মনে।

স্বাধীনতার আগে ঢাকায় ৬-৭টি ব্যান্ড সক্রিয় ছিল। কিন্তু যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় কয়েকটি ব্যান্ডের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিছু ব্যান্ড ভেঙে সদস্যরা আলাদা পথে হাঁটেন, নতুন দল গঠন করেন। তখন সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও তরুণদের এক অংশের মধ্যে ‘বিটলস-ঝড়’ বইছিল। পাশাপাশি রোলিং স্টোনস, শ্যাডোস, সিসিআর, স্যানটানা, ডিপ পার্পলের গানও জনপ্রিয় ছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পাঁচ তরুণ সংগীতের টানে একত্রিত হন। গড়ে ওঠে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস’। লাইনআপ ছিল: ভোকালে দস্তগীর হক, ওমর খালেদ রুমি ও সাজ্জাদ আলী গিটার ও ভোকাল, সালাউদ্দিন খান বাজাতেন বেজ গিটার আর ড্রামসে ছিলেন শাহেদুল হুদা।
ব্যান্ডটির সংগীতচর্চার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি ছিল আত্মনির্ভর শিক্ষাপ্রক্রিয়া। সাজ্জাদ আলীর বাসায় দিনরাত প্র্যাকটিস চলত। তখন বাংলাদেশে এই ধারার সংগীত শেখার কোনো উপায় ছিল না। আজকের মতো ইউটিউব নেই, গানের বই নেই, কর্ড চার্ট নেই, নির্ভরযোগ্য লিরিকস নেই। ভরসা ছিল রেকর্ডার। গান বাজিয়ে শুনে শুনে কর্ড বের করা, শব্দ ধরে ধরে লিরিক লেখা। এই ছিল শিক্ষাপদ্ধতি। তারা সিসিআর, বিটলস, স্যানটানা, ডিপ পার্পলের গান কাভার করতেন। তখনও কিন্তু ঢাকায় কোনো ব্যান্ড বাংলায় গান গাইত না।
১৯৭২ সালের ২৪ মার্চ পূর্বাণী হোটেলে আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসের প্রথম কনসার্ট হয়। সদ্য স্বাধীন দেশের প্রেক্ষাপটে এই আয়োজনের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ছিল আলাদা। সেখানে ডিপ পার্পলের ‘হাইওয়ে স্টার’, স্যানটানার ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক ওম্যান’ এবং বিটলসের গান পরিবেশন করে তারা শ্রোতাদের দৃষ্টি কাড়েন।

এরপর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের অধ্যায় ব্যান্ডটির পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি হয়ে ওঠে। অডিশনে ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক ওম্যান’ পরিবেশন করে তারা নিয়মিত পারফর্ম করার সুযোগ পান। ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিখ্যাত ‘চ্যাম্বেলি রুমে’ তাদের শোতে বিদেশি শ্রোতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই চাম্বেলিতেই স্বাধীনতার আগে ‘ব্যান্ড মিউজিক কম্পিটিশন’ হতো।
ব্যান্ডটি তখন আলমগীর কবিরের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’র আবহসংগীতের কাজ করে প্রশংসা অর্জন করে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় চ্যারিটি কনসার্ট করে অর্থ সংগ্রহ করাও তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে।
তবে ১৯৭৫ সালে কয়েকজন সদস্য বিদেশে চলে গেলে ব্যান্ডের কার্যক্রম থেমে যায়। তবু নামটি ইতিহাসে হারিয়ে যায়নি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১ সালে গুলশান ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে সদস্যরা আবার একত্রিত হন। আবার শুরু হয় চর্চা। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছর পর প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম। সেখানে ১৩টি গানের মধ্যে ৯টি ইংরেজি গান আর চারটি বাংলা গান।
২০১৭ সালে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস’ ব্যান্ডকে নিয়ে আলোকচিত্রী ইমতিয়াজ আলম বেগ তৈরি করেন ‘মেন ফ্রম সেভেন্টি টু’ নামে ১৯ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র। সেটি স্বাধীনতার পর ঢাকার নগর-সংগীতচর্চার জন্মপর্বের দলিল।
সবশেষে, দস্তগীর হকের সংগীতজীবন ফিরে দেখলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন নতুন সময়ের কালচারের শুরুর সারির মানুষদের একজন। যারা নগর-সংস্কৃতিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছিলেন। আর তিনি এমন এক আত্মশিক্ষিত সংগীতধারার প্রতিনিধি, যা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া গড়ে উঠেছিল।
আজ বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত ‘মেইনস্ট্রিম’। বড় মঞ্চ আছে, অ্যালবাম আছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আছে। কিন্তু এই স্রোতের উৎসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, কিছু নাম আছে শুরুর বিন্দুতে। দস্তগীর হক তাঁদেরই একজন। তাঁর প্রস্থান আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় বাংলা রক-স্রোতের সেই শুরুর দিনগুলোর কথা, যখন সবকিছুই ছিল অনিশ্চিত কিন্তু স্বপ্ন ছিল অটুট।

স্বাধীন বাংলাদেশে গড়ে ওঠা প্রথম ব্যান্ড ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস’-এর ভোকালিস্ট ও গিটারিস্ট দস্তগীর হক আর নেই। আজ (১১ ফেব্রুয়ারি) বুধবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দস্তগীর হক দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।
দস্তগীর হকের জীবনকে বোঝার জন্য তাঁর পারিবারিক প্রেক্ষাপটকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের পরিবার যেন এক অলিখিত মিউজিক একাডেমি। বলা যায়, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের প্রারম্ভিক ইতিহাস এই পরিবারের কাছে ঋণী।
দস্তগীর হকের বড় ভাই আলমগীর হক পাকিস্তানের জনপ্রিয় পপস্টার। তাঁকে অনেকে ‘প্রাচ্যের এলভিস প্রিসলি’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় রয়েছে। তিনি স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড ‘আইওলাইটস’-এর ভোকালিস্ট ছিলেন। পরে এই ব্যান্ডের নাম পালটে হয় ‘উইন্ডি সাইড অফ কেয়ার’। অর্থাৎ, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের যে বীজ রোপিত হয়েছিল স্বাধীনতার আগেই, তার সঙ্গে এই পরিবারের যোগ ছিল সরাসরি।

এই পরিবারের আরেক উজ্জ্বল নাম নয়ন মুন্সী। তাঁকে বাংলাদেশের প্রথম ‘গিটার সেনসেশন’ বলা হয়। তিনি আজম খানের সঙ্গে স্টেজে বাজাতেন। গিটার হাতে তাঁর দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর। মাত্র ২০ বছর বয়সে কানাডায় এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর প্রভাব থেমে থাকেনি। সত্তর দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশকের শুরুতে তরুণ গিটারবাদকদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার নাম। আইয়ুব বাচ্চুর মতো শিল্পীও নয়ন মুন্সীর বাজনা দেখে গিটারিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
দস্তগীর হকদের পরিবারের মেয়েরাও ছিলেন সংগীতচর্চায় সমান সক্রিয়। বাংলাদেশের প্রথম নারী ড্রামার হিসেবে পরিচিত জর্জিনা হক ও তাঁর দুই বোন মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘থ্রি হক সিস্টার্স’। বড়বোন সুলতানা হক ছিলেন এই গ্রুপের ভোকাল ও রিদম গিটারিস্ট। ছোটোবোন রোকসানা হক বাজাতেন পিয়ানো একরডিয়ান, মাঝে মাঝে গিটারও। তবলায় আর সেতারেও ছিল ভালো দখল।
সেই সময় মেয়েদের মিউজিক্যাল গ্রুপ গড়ে তোলা ছিল সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা উদ্যোগ। পরিবারের আরেক সদস্য জামাল মুন্সীও তবলায় পারদর্শী ছিলেন। অর্থাৎ এই পরিবারে শাস্ত্রীয় সংগীত, পপ, রক—বিভিন্ন ধারার সংগীত একসঙ্গে চর্চা হতো। এটি বৃহত্তর সাংগীতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। দস্তগীর হক সেই ধারার অংশ হয়ে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের সূচনাপর্বে যুক্ত হন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়নি। যুদ্ধশেষে দেশ তখন ভাঙাচোরা। অর্থনীতি দুর্বল, অবকাঠামো বিধ্বস্ত, পরিবারগুলো ক্ষতবিক্ষত। চারদিকে অনিশ্চয়তা, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল এক অদ্ভুত রকমের আশাবাদ। মানুষ নতুন করে শুরু করতে চায়। নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সংস্কৃতিও গড়ে তোলার তাগিদ অনুভূত হচ্ছিল অনেকের মনে।

স্বাধীনতার আগে ঢাকায় ৬-৭টি ব্যান্ড সক্রিয় ছিল। কিন্তু যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় কয়েকটি ব্যান্ডের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিছু ব্যান্ড ভেঙে সদস্যরা আলাদা পথে হাঁটেন, নতুন দল গঠন করেন। তখন সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও তরুণদের এক অংশের মধ্যে ‘বিটলস-ঝড়’ বইছিল। পাশাপাশি রোলিং স্টোনস, শ্যাডোস, সিসিআর, স্যানটানা, ডিপ পার্পলের গানও জনপ্রিয় ছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পাঁচ তরুণ সংগীতের টানে একত্রিত হন। গড়ে ওঠে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস’। লাইনআপ ছিল: ভোকালে দস্তগীর হক, ওমর খালেদ রুমি ও সাজ্জাদ আলী গিটার ও ভোকাল, সালাউদ্দিন খান বাজাতেন বেজ গিটার আর ড্রামসে ছিলেন শাহেদুল হুদা।
ব্যান্ডটির সংগীতচর্চার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি ছিল আত্মনির্ভর শিক্ষাপ্রক্রিয়া। সাজ্জাদ আলীর বাসায় দিনরাত প্র্যাকটিস চলত। তখন বাংলাদেশে এই ধারার সংগীত শেখার কোনো উপায় ছিল না। আজকের মতো ইউটিউব নেই, গানের বই নেই, কর্ড চার্ট নেই, নির্ভরযোগ্য লিরিকস নেই। ভরসা ছিল রেকর্ডার। গান বাজিয়ে শুনে শুনে কর্ড বের করা, শব্দ ধরে ধরে লিরিক লেখা। এই ছিল শিক্ষাপদ্ধতি। তারা সিসিআর, বিটলস, স্যানটানা, ডিপ পার্পলের গান কাভার করতেন। তখনও কিন্তু ঢাকায় কোনো ব্যান্ড বাংলায় গান গাইত না।
১৯৭২ সালের ২৪ মার্চ পূর্বাণী হোটেলে আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসের প্রথম কনসার্ট হয়। সদ্য স্বাধীন দেশের প্রেক্ষাপটে এই আয়োজনের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ছিল আলাদা। সেখানে ডিপ পার্পলের ‘হাইওয়ে স্টার’, স্যানটানার ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক ওম্যান’ এবং বিটলসের গান পরিবেশন করে তারা শ্রোতাদের দৃষ্টি কাড়েন।

এরপর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের অধ্যায় ব্যান্ডটির পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি হয়ে ওঠে। অডিশনে ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক ওম্যান’ পরিবেশন করে তারা নিয়মিত পারফর্ম করার সুযোগ পান। ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিখ্যাত ‘চ্যাম্বেলি রুমে’ তাদের শোতে বিদেশি শ্রোতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই চাম্বেলিতেই স্বাধীনতার আগে ‘ব্যান্ড মিউজিক কম্পিটিশন’ হতো।
ব্যান্ডটি তখন আলমগীর কবিরের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’র আবহসংগীতের কাজ করে প্রশংসা অর্জন করে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় চ্যারিটি কনসার্ট করে অর্থ সংগ্রহ করাও তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে।
তবে ১৯৭৫ সালে কয়েকজন সদস্য বিদেশে চলে গেলে ব্যান্ডের কার্যক্রম থেমে যায়। তবু নামটি ইতিহাসে হারিয়ে যায়নি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১ সালে গুলশান ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে সদস্যরা আবার একত্রিত হন। আবার শুরু হয় চর্চা। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছর পর প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম। সেখানে ১৩টি গানের মধ্যে ৯টি ইংরেজি গান আর চারটি বাংলা গান।
২০১৭ সালে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস’ ব্যান্ডকে নিয়ে আলোকচিত্রী ইমতিয়াজ আলম বেগ তৈরি করেন ‘মেন ফ্রম সেভেন্টি টু’ নামে ১৯ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র। সেটি স্বাধীনতার পর ঢাকার নগর-সংগীতচর্চার জন্মপর্বের দলিল।
সবশেষে, দস্তগীর হকের সংগীতজীবন ফিরে দেখলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন নতুন সময়ের কালচারের শুরুর সারির মানুষদের একজন। যারা নগর-সংস্কৃতিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছিলেন। আর তিনি এমন এক আত্মশিক্ষিত সংগীতধারার প্রতিনিধি, যা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া গড়ে উঠেছিল।
আজ বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত ‘মেইনস্ট্রিম’। বড় মঞ্চ আছে, অ্যালবাম আছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আছে। কিন্তু এই স্রোতের উৎসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, কিছু নাম আছে শুরুর বিন্দুতে। দস্তগীর হক তাঁদেরই একজন। তাঁর প্রস্থান আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় বাংলা রক-স্রোতের সেই শুরুর দিনগুলোর কথা, যখন সবকিছুই ছিল অনিশ্চিত কিন্তু স্বপ্ন ছিল অটুট।

ব্যালট পেপারে মানুষের নামের পাশে নয়, মানুষ সিল মেরেছে কুকুর, বিড়াল, গন্ডার, শিম্পাঞ্জির নামের পাশে। কোথাও এসব হয়েছে মজা করে, কোথাও আবার হয়েছে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে। চলুন, তেমনই কিছু অদ্ভুত প্রার্থীর গল্পে চোখ রাখা যাক যারা নির্বাচনের মাঠে নেমেছিল, আর কখনো কখনো মানুষের সঙ্গেই হাড্ড
১ দিন আগে
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ।
১ দিন আগে১৯৬৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এড সলিভান টিভি শোতে বিটলসের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজির গড়ে। সেদিন প্রায় ৪০ শতাংশ আমেরিকান একসঙ্গে টিভির পর্দায় দেখেছিল চার তরুণকে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ‘বিটলম্যানিয়া’।
২ দিন আগে
আজ ফিওদর দস্তয়েভস্কির মৃত্যুদিন। প্রকাশের দেড়শ বছর পরও দস্তয়েভস্কির লেখা আজকের মানুষের সংকট সম্পর্কে ঠিক ততটাই সত্য কথা বলে, যতটা বলে আধুনিক জিনতত্ত্বের কোনো বই। এই লেখাগুলো দেখিয়ে দেয় যে শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টি অনেক সময় ভবিষ্যৎকে আগেই দেখতে পায়।
২ দিন আগে