স্ট্রিম ডেস্ক

জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও পালিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রথমবার দেশে জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটে নাগরিকেরা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের সিদ্ধান্ত জানাবেন। রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাবের ৪৭টি বিষয় সাংবিধানিক এবং ৩৭টি বিষয় আইনি সংস্কারের আওতাভুক্ত। তবে ভোটাররা সংক্ষেপে ৪টি মূল বিষয়ের মাধ্যমে সনদের ওপর নিজেদের আস্থা বা অনাস্থা জানাবেন।
সংস্কার প্রস্তাব অনুসারে পরিবর্তন আসবে কি না, তা নির্ভর করছে ভোটের ওপর। সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জোরেশোরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি একে ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা’ বলছেন। কিন্তু ভোটারদের মনে প্রশ্ন, হ্যাঁ বললে আসলে কী হবে? সংবিধানে কী এমন বদল আসবে? সংসদ, সরকার কিংবা বিচার বিভাগের কাঠামোয় কেমন পরিবর্তন দেখা যাবে?
প্রশ্ন: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার লাগাম কি সত্যিই টানা হবে?
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে একজন ব্যক্তি কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এর মানে হলো ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকার আর কারও থাকবে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলপ্রধান এবং সরকারপ্রধান থাকতে পারবেন না। এতে দলীয় প্রভাব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার মিশ্রণ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে সংবিধানে এই সংশোধনী আসবে।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি ও ক্ষমতায় কী ধরনের বদল আসবে?
‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে। এর ফলে দলের চাপমুক্ত হয়ে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারবেন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ক্ষমতা এবং ক্ষমা প্রদর্শন নীতিতে। এখন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি প্রায় কিছুই করতে পারেন না।
সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগ দিতে পারবেন। এ ছাড়া কোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে হলে কেবল সরকারের ইচ্ছাই শেষ কথা হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বা ব্যক্তির সম্মতি থাকলেই কেবল রাষ্ট্রপতি কাউকে ক্ষমা করতে পারবেন। ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় রাষ্ট্রপতির পদকে কেবল আলংকারিক পদ থেকে সরিয়ে কার্যকরী ও শক্তিশালী করবে।
প্রশ্ন: সংসদের চেহারা বা কাঠামো কেমন হবে?
বাংলাদেশের বর্তমান সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট। ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে বাংলাদেশ পাবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। নির্বাচিত এমপিরা থাকবেন নিম্নকক্ষে। আর নতুন করে ১০০ সদস্যের একটি ‘উচ্চকক্ষ’ বা সিনেট গঠিত হবে। এই উচ্চকক্ষ তৈরি হবে ‘সংখ্যানুপাতিক’ বা পিআর পদ্ধতিতে। অর্থাৎ নির্বাচনে দলগুলো যে অনুপাতে ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তাদের প্রতিনিধি উচ্চকক্ষে জায়গা পাবে।
ধরুন বিএনপি ৫০ শতাংশ ভোট পেলে উচ্চকক্ষে তাদের ৫০ জন সদস্য থাকবেন। কোনো দল ১ শতাংশ ভোট পেলেও তাদের একজন প্রতিনিধি সেখানে থাকবেন। এর ফলে ছোট দলগুলোর কথাও সংসদে শোনা যাবে। উচ্চকক্ষ আইন প্রণয়ন করতে পারবে না, কিন্তু নিম্নকক্ষের পাস করা বিল পর্যালোচনার জন্য আটকাতে পারবে। বিশেষ করে সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদন লাগবে। এতে তড়িঘড়ি করে আইন পাসের সুযোগ কমবে।
প্রশ্ন: বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নতুন কী থাকছে?
‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। ফলে রাষ্ট্রপতিকে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতাও আর প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে না। তা চলে যাবে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি স্বাধীন কমিশনের হাতে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি বা পদোন্নতির নিয়ন্ত্রণও আইন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাতে দেওয়া হবে। এতে বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ কমবে।
প্রশ্ন: নির্বাচনকালীন সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কি ফিরবে?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে। জুলাই সনদে এই ব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত হবে। তবে এর গঠন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসবে। কেবল একটি দল নয়, বরং সরকারি দল, প্রধান বিরোধী দল এবং দ্বিতীয় বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা আরও সর্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন: সংসদ সদস্যদের কি স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ বাড়বে?
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে এমপিরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারেন না। একে অনেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্তরায় বলেন। জুলাই সনদে এখানেও ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাজেট পাস এবং সরকারের প্রতি অনাস্থা ভোটের বিষয় বাদে অন্য যেকোনো বিল বা ইস্যুতে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এর ফলে দলের একনায়কতন্ত্র কমবে এবং এমপিরা নিজেদের এলাকার স্বার্থে কথা বলার সাহস পাবেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রশ্ন: নাগরিক হিসেবে আমার পরিচয়ে বা অধিকারে কোনো পরিবর্তন আসবে কি?
বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি বলে পরিচিত হন। প্রস্তাব করা হয়েছে এই পরিচয় হবে শুধু ‘বাংলাদেশি’। এতে জাতিগত বা ভাষাগত বৈচিত্র্যকে আরও বেশি সম্মান দেখানো হবে বলে মনে করা হয়। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা থাকলেও অন্য সব মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর ডিজিটাল যুগের বাস্তবতা মেনে ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবও আছে। সেই সঙ্গে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়ও জোর দেওয়া হয়েছে। জরুরি অবস্থার সময়ও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন: সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় কী পরিবর্তন আসবে?
এখন সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট থাকলেই সংবিধান বদলানো যায়। কিন্তু ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে এই প্রক্রিয়া আরও কঠিন ও জবাবদিহিমূলক হবে। তখন সংবিধান সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও লাগবে। আর সংবিধানের মৌলিক কিছু অনুচ্ছেদ বা প্রস্তাবনা পরিবর্তন করতে হলে জনগণের সরাসরি মতামত বা গণভোটের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ চাইলেই আর সংবিধানের মূল স্তম্ভে হাত দেওয়া যাবে না।
প্রশ্ন: এই সনদ বাস্তবায়নের সময়সীমা বা পদ্ধতি কী হবে?
‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ার অর্থ হলো জনগণ এই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে। তখন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হবে। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ২৭০ দিন বা ৯ মাসের মধ্যে তারা জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে বাধ্য থাকবেন। যদি তারা ব্যর্থ হন বা গড়িমসি করেন, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া খসড়াই বিল আকারে পাস বলে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে সংস্কারের দীর্ঘসূত্রতা বা রাজনৈতিক দলগুলোর গড়িমসি বন্ধ করার পথও বাতলে দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া মানে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের সূচনা। এক ব্যক্তির শাসন, বিচারহীনতা আর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার এক বড় সুযোগ। তবে কাগজে-কলমে উপস্থাপিত পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং জনগণের সচেতনতার ওপর। ১২ ফেব্রুয়ারি সেই সিদ্ধান্তের মাহেন্দ্রক্ষণ।

জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও পালিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রথমবার দেশে জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটে নাগরিকেরা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের সিদ্ধান্ত জানাবেন। রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাবের ৪৭টি বিষয় সাংবিধানিক এবং ৩৭টি বিষয় আইনি সংস্কারের আওতাভুক্ত। তবে ভোটাররা সংক্ষেপে ৪টি মূল বিষয়ের মাধ্যমে সনদের ওপর নিজেদের আস্থা বা অনাস্থা জানাবেন।
সংস্কার প্রস্তাব অনুসারে পরিবর্তন আসবে কি না, তা নির্ভর করছে ভোটের ওপর। সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জোরেশোরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি একে ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা’ বলছেন। কিন্তু ভোটারদের মনে প্রশ্ন, হ্যাঁ বললে আসলে কী হবে? সংবিধানে কী এমন বদল আসবে? সংসদ, সরকার কিংবা বিচার বিভাগের কাঠামোয় কেমন পরিবর্তন দেখা যাবে?
প্রশ্ন: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার লাগাম কি সত্যিই টানা হবে?
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে একজন ব্যক্তি কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এর মানে হলো ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকার আর কারও থাকবে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলপ্রধান এবং সরকারপ্রধান থাকতে পারবেন না। এতে দলীয় প্রভাব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার মিশ্রণ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে সংবিধানে এই সংশোধনী আসবে।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি ও ক্ষমতায় কী ধরনের বদল আসবে?
‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে। এর ফলে দলের চাপমুক্ত হয়ে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারবেন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ক্ষমতা এবং ক্ষমা প্রদর্শন নীতিতে। এখন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি প্রায় কিছুই করতে পারেন না।
সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগ দিতে পারবেন। এ ছাড়া কোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে হলে কেবল সরকারের ইচ্ছাই শেষ কথা হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বা ব্যক্তির সম্মতি থাকলেই কেবল রাষ্ট্রপতি কাউকে ক্ষমা করতে পারবেন। ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় রাষ্ট্রপতির পদকে কেবল আলংকারিক পদ থেকে সরিয়ে কার্যকরী ও শক্তিশালী করবে।
প্রশ্ন: সংসদের চেহারা বা কাঠামো কেমন হবে?
বাংলাদেশের বর্তমান সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট। ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে বাংলাদেশ পাবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। নির্বাচিত এমপিরা থাকবেন নিম্নকক্ষে। আর নতুন করে ১০০ সদস্যের একটি ‘উচ্চকক্ষ’ বা সিনেট গঠিত হবে। এই উচ্চকক্ষ তৈরি হবে ‘সংখ্যানুপাতিক’ বা পিআর পদ্ধতিতে। অর্থাৎ নির্বাচনে দলগুলো যে অনুপাতে ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তাদের প্রতিনিধি উচ্চকক্ষে জায়গা পাবে।
ধরুন বিএনপি ৫০ শতাংশ ভোট পেলে উচ্চকক্ষে তাদের ৫০ জন সদস্য থাকবেন। কোনো দল ১ শতাংশ ভোট পেলেও তাদের একজন প্রতিনিধি সেখানে থাকবেন। এর ফলে ছোট দলগুলোর কথাও সংসদে শোনা যাবে। উচ্চকক্ষ আইন প্রণয়ন করতে পারবে না, কিন্তু নিম্নকক্ষের পাস করা বিল পর্যালোচনার জন্য আটকাতে পারবে। বিশেষ করে সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদন লাগবে। এতে তড়িঘড়ি করে আইন পাসের সুযোগ কমবে।
প্রশ্ন: বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নতুন কী থাকছে?
‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। ফলে রাষ্ট্রপতিকে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতাও আর প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে না। তা চলে যাবে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি স্বাধীন কমিশনের হাতে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি বা পদোন্নতির নিয়ন্ত্রণও আইন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাতে দেওয়া হবে। এতে বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ কমবে।
প্রশ্ন: নির্বাচনকালীন সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কি ফিরবে?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে। জুলাই সনদে এই ব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত হবে। তবে এর গঠন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসবে। কেবল একটি দল নয়, বরং সরকারি দল, প্রধান বিরোধী দল এবং দ্বিতীয় বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা আরও সর্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন: সংসদ সদস্যদের কি স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ বাড়বে?
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে এমপিরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারেন না। একে অনেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্তরায় বলেন। জুলাই সনদে এখানেও ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাজেট পাস এবং সরকারের প্রতি অনাস্থা ভোটের বিষয় বাদে অন্য যেকোনো বিল বা ইস্যুতে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এর ফলে দলের একনায়কতন্ত্র কমবে এবং এমপিরা নিজেদের এলাকার স্বার্থে কথা বলার সাহস পাবেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রশ্ন: নাগরিক হিসেবে আমার পরিচয়ে বা অধিকারে কোনো পরিবর্তন আসবে কি?
বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি বলে পরিচিত হন। প্রস্তাব করা হয়েছে এই পরিচয় হবে শুধু ‘বাংলাদেশি’। এতে জাতিগত বা ভাষাগত বৈচিত্র্যকে আরও বেশি সম্মান দেখানো হবে বলে মনে করা হয়। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা থাকলেও অন্য সব মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর ডিজিটাল যুগের বাস্তবতা মেনে ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবও আছে। সেই সঙ্গে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়ও জোর দেওয়া হয়েছে। জরুরি অবস্থার সময়ও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন: সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় কী পরিবর্তন আসবে?
এখন সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট থাকলেই সংবিধান বদলানো যায়। কিন্তু ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে এই প্রক্রিয়া আরও কঠিন ও জবাবদিহিমূলক হবে। তখন সংবিধান সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও লাগবে। আর সংবিধানের মৌলিক কিছু অনুচ্ছেদ বা প্রস্তাবনা পরিবর্তন করতে হলে জনগণের সরাসরি মতামত বা গণভোটের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ চাইলেই আর সংবিধানের মূল স্তম্ভে হাত দেওয়া যাবে না।
প্রশ্ন: এই সনদ বাস্তবায়নের সময়সীমা বা পদ্ধতি কী হবে?
‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ার অর্থ হলো জনগণ এই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে। তখন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হবে। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ২৭০ দিন বা ৯ মাসের মধ্যে তারা জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে বাধ্য থাকবেন। যদি তারা ব্যর্থ হন বা গড়িমসি করেন, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া খসড়াই বিল আকারে পাস বলে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে সংস্কারের দীর্ঘসূত্রতা বা রাজনৈতিক দলগুলোর গড়িমসি বন্ধ করার পথও বাতলে দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া মানে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের সূচনা। এক ব্যক্তির শাসন, বিচারহীনতা আর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার এক বড় সুযোগ। তবে কাগজে-কলমে উপস্থাপিত পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং জনগণের সচেতনতার ওপর। ১২ ফেব্রুয়ারি সেই সিদ্ধান্তের মাহেন্দ্রক্ষণ।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের আর দুই দিন বাকি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া ‘জুলাই সনদ’ রয়েছে গণভোটের কেন্দ্রে। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ ৪টি প্রধান বিষয়ের পাশাপাশি সংবিধানের ৪৮টি সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে।
৫ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি এই খাত থেকে আসে এবং এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করেন কয়েক কোটি মানুষ। তবে ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে এ খাতের সুতা শিল্প গভীর সংকটে পড়েছে।
৮ ঘণ্টা আগে
২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করে। এতে বলা হয়, পরবর্তী সংসদ নির্বাচন হবে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত একটি জাতীয় গণভোটের সঙ্গে একসঙ্গে।
১৪ ঘণ্টা আগে
কোনো জরিপে দেখা যাচ্ছে বিএনপির জয়জয়কার, কোনোটিতে জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় উত্থান, আবার কোনোটিতে উঠে আসছে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাবনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জরিপগুলো আসলে কতটা বিজ্ঞানসম্মত? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী জরিপ আদৌ বিশ্বাসযোগ্য?
১ দিন আগে