leadT1ad

যে কারণে বেনজীরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এবং এর সাবেক ও তৎকালীন চাকরিরত সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে তারা এ নিষেধাজ্ঞা দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের বিজ্ঞপ্তিতে বেনজীর আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানের নামে র‍্যাবের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এই কার্যক্রম আইনের শাসন, মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) বরাত দিয়ে ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট জানায়, ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ছয় শতাধিক মানুষকে গুম এবং ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৬০০ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার (ক্রসফায়ার) পেছনে র‍্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব ঘটনার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বিরোধী দলের নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের।

নিষেধাজ্ঞায় আসা সাত কর্মকর্তার মধ্যে ছয়জনই ছিলেন র‍্যাবের সাবেক ও তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা। তালিকায় প্রথম নামটি ছিল বেনজীর আহমেদের, যিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র‍্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর আইজিপির চেয়ারে বসা এই কর্মকর্তা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী’ বলে পরিচিত ছিলেন।

র‍্যাবের প্রধান থাকাকালীন তাঁর নেতৃত্বাধীন সময়ে দেশজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বহু কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বেনজীর আহমেদের ভিসা নিষেধাজ্ঞার পেছনে ২০১৮ সালের মে মাসে কক্সবাজারের টেকনাফে পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার ঘটনার সম্পৃক্ততা উল্লেখ করা হয়। একই ঘটনায় র‍্যাব-৭-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিফতাহ উদ্দীন আহমেদের ওপরও এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

ওই সময় মানবাধিকার সংস্থাগুলো ক্রসফায়ার ও গুমের ঘটনাগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুললেও সরকারের পক্ষ থেকে সেগুলোকে আত্মরক্ষার্থে চালানো গুলি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর অবশ্য বেনজীর আহমেদ দাবি করেছিলেন, গুমের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা ভিত্তিহীন এবং তাঁর বিরুদ্ধে লবিস্ট নিয়োগ করে এই নিষেধাজ্ঞা বহাল করা হয়েছে।

আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান বেনজীর আহমেদ। এর পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধান চলাকালেই ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি সপরিবারে দেশত্যাগ করেন। তাঁর দেশ ছাড়ার পর দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তাঁর স্থাবর-অস্থাবর বিপুল সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন।

বিদেশে পলাতক থাকা অবস্থায় ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে আর্থিক অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিশ’ জারি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ জুন ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। আজ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বেনজীর আহমেদকে দ্রুতই দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

বেনজীর আহমেদ ছাড়াও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছিলেন র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল র‍্যাবের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আইজিপি হওয়া মামুন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কারাগারে আছেন।

একই তালিকায় ছিলেন র‍্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) খান মোহাম্মদ আজাদ, যিনি ২০২১ সালের ১৬ মার্চ থেকে ওই পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপর তিন কর্মকর্তা হলেন র‍্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আনোয়ার লতিফ খান।

মার্কিন নির্বাহী আদেশ ১৩৮১৮-এর আওতায় এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আইনি সুযোগ তৈরি করে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বেনজীর আহমেদের কোনো সম্পদ থাকলে তা অবরুদ্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি মার্কিন প্রশাসন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত