ad

যেখানে লেখা হয় শেষ বিদায়ের গল্প

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ২৭
যেখানে লেখা হয় শেষ বিদায়ের গল্প। স্ট্রিম গ্রাফিক

‘একটি শোক সংবাদ, একটি শোক সংবাদ। বাঘমারা এলাকানিবাসী ইমতিয়াজ আলীর পিতা আব্দুল কালাম মিয়া (ছদ্মানাম) ভোর ৬ ঘটিকায় নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেছেন..’

মসজিদের মাইকে এমন ঘোষণা শুনলে কান খাড়া করে সেই মৃত্যুসংবাদ শোনেন না, এমন মানুষ বোধহয় নেই। কারও কারও বুক থেকে বেরিয়ে আসে গভীর দীর্ঘশ্বাস—আহারে কার প্রিয়জন যেন বুক ফাঁকা করে পাড়ি দিলেন পরপারে! প্রায় প্রতিদিনই কান পাতলে শোনা যায় কবরস্থানের মাইক থেকে ভেসে আসা শোকবার্তা।

ময়মনসিংহ শহরের ভাটিকাশর কবরস্থান হাজারো মানুষের শেষ ঠিকানার গল্প বলে। আর সেই গল্পের নিত্যদিনের সাক্ষী মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল কাদের লিটন। প্রায় সাড়ে তিন একর জমির এই সরকারি কবরস্থানে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি ইমাম ও রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল, কবরস্থানের নীরবতার ভেতরে একজন পেশাদার কর্মীর দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনীর হিসাব-নিকাশ।

‘প্রথম প্রথম কবরস্থানের ভেতরে যেতে ভীষণ ভয় করত’

তিন বছর আগে ভাটিকাশর কবরস্থানের প্রধান খাদেম মো. মোসলেম উদ্দীন মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর কবরস্থানের সিংহভাগ দায়িত্ব এসে পড়ে মাওলানা লিটনের কাঁধে।

তবে শুরুর দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও শিউরে ওঠেন মাওলানা লিটন। দিনের বেলায় কবরস্থানে থাকতে সমস্যা না হলেও সন্ধ্যার পর ভয় লাগত। এ কারণে প্রথম প্রথম গোরস্থানের ভেতরে যেতে ভীষণ ভয় করত তাঁর। তখন তাঁকে সাহায্য করতেন তৎকালীন খাদেম মোসলেম উদ্দীন। মাঝেমধ্যে রাতে লিটনকে সঙ্গে নিয়ে পুরো কবরস্থান ঘুরে দেখতেন। ধীরে ধীরে ভয় কাটতে শুরু করে।

ভাটিকাশর কবরস্থান। স্ট্রিম ছবি
ভাটিকাশর কবরস্থান। স্ট্রিম ছবি

তবুও প্রায় দেড় বছর লেগেছিল ভয়টা কাটাতে। কিন্তু এখানে অনেক নাম-পরিচয়বিহীন মরদেহও আসতো বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে। বেওয়ারিশ লাশের ভয় কাটাতে সময় লেগেছিল আরও বেশি। কারণ এই মৃতদেহগুলো সাধারণত ‘স্বাভাবিক’ মরদেহের মতো ছিল না। বিশেষ করে ‘ময়নাতদন্ত করা’ মরদেহ দেখে শুরুতে ভয় পেতেন। রাতে ঘুমাতে পারতেন না, শরীরও খারাপ লাগত। মাঝেমধ্যে মন চাইত এই কষ্টের চাকরি ছেড়ে চলে যান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবিকার তাগিদে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন আব্দুল কাদের লিটন। একসময় মনের ভয়টাও কর্পূরের মতো উড়ে যায়। এখন তিনি নিজেই নতুনদের এই কাজের প্রশিক্ষণ দেন।

কবরস্থানের প্রতিটি কবর প্রায় সাত বছর পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকে

ভাটিকাশর কবরস্থানে মূলত দুই ধরনের সেবা দেওয়া হয়। একটি সাধারণ মানুষের জন্য পাবলিক সার্ভিস, আর অন্যটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় বেওয়ারিশ বা অজ্ঞাত লাশের সেবা। কেউ যদি নিজের বাড়ি কিংবা আশেপাশের এলাকায় মারা যায় এবং দাফন করার মতো নিজস্ব লোক না থাকে, তবে খবর পেলেই লিটন ও তাঁর দল সেখানে যান। গোসল করানো থেকে শুরু করে কাফন পরানো, জানাজা আর দাফন—সবকিছুর দায়িত্ব নেন।

এখানে বাঁশ, দাড়ি, কাফনের কাপড় কেনা এবং কবর খোঁড়ার জন্য আলাদা নির্দিষ্ট শ্রমিক রয়েছে। পাবলিক সার্ভিসের খরচ মানুষ তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী একেকরকম দিয়ে থাকেন। বিত্তবানরা দাফন বাবদ দুই-তিন হাজার টাকা দেন, আবার নিম্নবিত্ত বা দরিদ্রশ্রেণীর মানুষেরা নিজেদের সুবিধামতো এক হাজার টাকার মতো দিয়ে থাকেন। কিন্তু যাদের কোনো টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই কিংবা আপন বলতে কেউ নেই, তাঁদের জন্য এই সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, বেওয়ারিশ বা অজ্ঞাত মরদেহের প্রক্রিয়াটি কিছুটা ভিন্ন। পুলিশ কোনো অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে সিটি করপোরেশন থেকে দাফনের অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমতি পাওয়ার পর পুলিশ ও হাসপাতালের ডোম মরদেহটি কবরস্থানে নিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় লিটন ও তাঁর দলের কাজ। ধর্মীয় রীতি মেনে মরদেহের গোসল, কাফন ও দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। এ কাজে পুরুষদের জন্য পুরুষ কর্মী এবং নারীদের জন্য নারী কর্মী আছেন।

মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল কাদের লিটন। স্ট্রিম ছবি
মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল কাদের লিটন। স্ট্রিম ছবি

দাফনের পর নির্দিষ্ট খাতায় মৃত ব্যক্তির নাম, এনআইডি নম্বর বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য লিখে রাখা হয়। তাঁরা এই খাতাকে ‘ভলিউম বই’ বলেন। পরে সিটি করপোরেশন থেকে মৃত্যুসনদ দেওয়া হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, এখানকার প্রতিটি কবর প্রায় সাত বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে। এই সময়ের আগে সেখানে অন্য কোনো মরদেহ দাফন করা হয় না।

শীতের সময় কবরস্থানে বেওয়ারিশ লাশের চাপ বেড়ে যায়

আব্দুল কাদের লিটনের মতে, আবহাওয়ার সঙ্গে মৃতের সংখ্যারও কিছুটা সম্পর্ক আছে। তীব্র গরমের সময় হৃদ্‌রোগ বা হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষের মৃত্যু দেখেছেন তিনি। আবার প্রচণ্ড শীতেও বয়স্ক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায়। আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলে মৃত্যুর সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

শীতের সময় আরেকটি সমস্যা দেখা দেয়। রাস্তায় থাকা মানসিকভাবে অসুস্থ ও অসহায় মানুষদের অনেকে তীব্র ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে মারা যান। ফলে এই সময়ে কবরস্থানে বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যাও বেড়ে যায়।

ভাটিকাশর কবরস্থানে দাফন বেশিরভাগ সময়েই নামাজের পর দিনে সম্পন্ন করা হয়। শুধু রাতের ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত এই ৬ ঘণ্টা দাফন কাজ বন্ধ থাকে।

লিটনের ভাষ্যমতে, যেকোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আন্দোলনের সময় দূর-দূরান্তের মরদেহও এখানে নিয়ে আসা হয়। তবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি চালুর পর বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলে তাঁর অভিজ্ঞতা। এনআইডির বায়োমেট্রিক তথ্যের সঙ্গে আঙুলের ছাপ মিললে পুলিশ পরিচয় শনাক্ত করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। কিন্তু যাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না, তাঁরাই শেষ পর্যন্ত বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হন।

দুর্মূল্যের বাজারে দাফন কাজের দামেও ঊর্ধ্বগতি

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাফনের খরচও বেড়েছে। মাওলানা আব্দুল কাদের লিটনের হিসাবে, আগে যে কাফনের কাপড় ১ হাজার ৪০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা। পুরুষদের তুলনায় নারীদের কাফনের কাপড়ের দামও কিছুটা বেশি। আগে দুটি বাঁশ ৪০০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন শুধু বাঁশ কিনতেই প্রায় ১ হাজার টাকা লাগে।

কবর খননকারীর মজুরিও আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় বর্ষাকালে। বৃষ্টিতে ভাটিকাশরের বেলে মাটি নরম হয়ে চারপাশ থেকে ধসে পড়ে। কবর ঠিক রাখতে তখন ভেতরে কাঠের ফ্রেম ব্যবহার করতে হয়। শুধু এই কাঠের ফ্রেমের জন্যই বাড়তি প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ হয়।

সব মিলিয়ে বর্ষাকালে একটি মরদেহ দাফন করতে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এই বাড়তি খরচের কারণে অন্য সময়ের তুলনায় বর্ষাকালে দরিদ্র পরিবারের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। কখনো ঋণ করে বা মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে দাফনের খরচ মেটাতে হয়েছে। আবার অনেক সময় কবরস্থানের কর্মীরাই টাকা না নিয়ে কাজ করে দিয়েছেন। পরে সামর্থ্য হলে সেই টাকা শোধ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

ভাটিকাশরের মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল কাদের লিটন মানুষের চরম দুঃসময়ে পাশে থাকা বিশ্বস্ত কর্মী। দিন শেষে শহরের আলো কমে আসে। কবরস্থানের গাছপালায় নেমে আসে অন্ধকার। তখন লিটন মোনাজাতের জন্য হাত তোলেন। প্রার্থনা করেন, এই মাটির নিচে শুয়ে থাকা মানুষগুলো যেন পরপারে শান্তিতে থাকেন। চিরস্থায়ী এই শান্তির নিবাসে তিনি যেন ক্লান্তিহীন পাহারাদার।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত