জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বৈদেশিক কর্মসংস্থান: বাড়ছে না দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীর সংখ্যা

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩: ২৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে কয়েক লাখ কর্মী কাজের জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু এর অধিকাংশই স্বল্প ও অদক্ষ কর্মী। তাই কর্মস্থলে তাঁরা নানান সমস্যার মুখে পড়েন। আবার বেতন-ভাতাদিতেও তাঁরা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীদের চেয়ে পিছিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) বলছে, ২০২৫ সালে বিদেশ যাওয়া ওই কর্মীর মধ্যে মাত্র ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৬১ জন দক্ষ ও ৪৫ হাজার ২৩০ জন পেশাজীবী কর্মী ছিলেন। শতকরা হিসাবে গতবছর বিদেশ যাওয়া কর্মীর মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ পেশাজীবী ও ২২ শতাংশ দক্ষ কর্মী ছিল। আর বাকি ৭৪ শতাংশই ছিলেন স্বল্প ও অদক্ষ কর্মী। সম্প্রতি সংস্থাটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানানো হয়।

বিএমইটির তথ্য বলছে, শুধু ২০২৫ সাল নয়; ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্তও দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীর ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা গেছে।

রামরুর প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ মূলত আধাদক্ষ এবং স্বল্পদক্ষ শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে পেশাজীবী কর্মীদের সংখ্যা সবসময়ই খুবই কম। বিএমইটি থেকে দেওয়া প্রশিক্ষণের গুণগত মান, সনদের স্বীকৃতির অভাব, প্রয়োজনীয় বাজেটের অভাব, জনবলের শূন্যতা ও জনশক্তি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের অনিহার কারণেই দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে না।

এ বিষয়ে রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী ঢাকা স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা দক্ষ কর্মী তৈরি করছি না। আমরা যদি দক্ষ কর্মী তৈরি করি তাহলে আমাদের সরকারের কোনো বাজার খুঁজতে হবে না। আমাদের পুরোপুরি দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে। সেই দক্ষ কর্মী তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়েও কাজ করতে হবে। টিটিসির প্রশিক্ষণের গুণগত মান, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ট্রেইনার নিয়োগ ও রেভিনিউ বাজেট বৃদ্ধি করে দক্ষ এবং পেশাজীবী কর্মীর অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।’

কাজের ভিত্তিতে ভাগ হয় কর্মী

বাংলাদেশ থেকে যে সকল কর্মী বিদেশে কাজ করতে যায় তাদেরকে তিন ভাগে ভাগ করে বিএমইটি। এ তিন ভাগের মধ্যে রয়েছে—পেশাজীবী, দক্ষ ও স্বল্পদক্ষ কিংবা অদক্ষ কর্মী। পেশাজীবী কর্মী বলতে, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আর্কিটেক্ট, শিক্ষক, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কম্পিউটার অপারেটর, ফার্মাসিস্ট, নার্স, ফোরম্যান, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, প্যারামেডিক ও বিক্রয়কর্মীদের বোঝানো হয়। এছাড়া মেকানিক, ওয়েল্ডার, ওস্তাগার, ইলেক্ট্রিশিয়ান, রং মিস্ত্রি, পাচক, ড্রাইভার, প্লাম্বার, গার্মেন্ট শ্রমিক এবং সনদপ্রাপ্ত কেয়ারগিভাররা দক্ষ কর্মী হিসেবে বিবেচিত হন। আর কৃষক, মালি, গার্মেন্টস, দোকানপাটে সহায়ক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, গৃহকর্মী ও মিনিয়াল কর্মীদের স্বল্পদক্ষ কিংবা অদক্ষ কর্মী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগ কমী স্বল্পদক্ষ কিংবা অদক্ষ কর্মীর পেশায়ই গিয়ে থাকেন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী বাড়ানোর জন্য বাড়ানো হচ্ছে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তবে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়ানো হলেও এখন পর্যন্ত প্রশিক্ষণের মান বাড়ানো সম্ভব হয়নি। এর ফলে কর্মী যাওয়ার হার বাড়লেও বাড়ছে না দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীর সংখ্যা।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশিক্ষণকেন্দ্র নয় দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত প্রশিক্ষক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদের প্রশিক্ষণ।

এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর ঢাকা স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের কোয়ালিটি অব ট্রেনিং যুগোপযোগী মানসম্পন্ন নয়। বিগত সরকারের আমলে শুধু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষক তৈরি হয়নি। এই সরকারের আমলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি। এছাড়া যেটুকুই প্রশিক্ষণ হয় সেটার সনদও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এটার কারণে অনেক সময় এই প্রশিক্ষণটাও কর্মীরা নেয় না। সেজন্য দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীও তৈরি হয় না।’

তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী না বাড়ার পেছনে সরকারের ওপর দোষ চাপালেও সরকারের পক্ষ থেকে কর্মীদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মীদের সচেতনতার অভাবেই বাড়ছে না দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীর সংখ্যা।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব গাজী মো. শাহেদ আনোয়ার ঢাকা স্ট্রিমকে বলেন, ‘দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী না যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে যেনতেন ভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা রয়ে গেছে। আপনি একটা লোকরে কাজ শিখে যেতে বলেন, সে পরের দিন আর আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে না। আমাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে নানা ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি অনেক প্রশিক্ষণকেন্দ্রেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য দক্ষতার সনদ বাধ্যতামূলক করতে পারতাম তাহলে মানুষ বাধ্য হয়ে কাজ শিখতো। তাহলে হয়তো আমরা দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারতাম। তারপরও আমরা দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

দক্ষ ও পেশাজীবীর কর্মীর সংখ্যা প্রতিবারই একই

শুধু ২০২৫ সালই নয়; দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী হিসেবে প্রতি বছরই অল্প সংখ্যক কর্মী বিদেশ যান। রামরুর গবেষণা ও বিএমইটি থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ ও ৩ থেকে ৪ শতাংশ পেশাজীবী কর্মী বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন।

বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২১ সালে বিদেশে যাওয়া মোট জনশক্তির ২১ শতাংশ ছিল দক্ষ ও শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ ছিল পেশাজীবী কর্মী। ২০২২ সালে মোট জনশক্তির ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ দক্ষ ও শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ ছিল পেশাজীবী। ২০২৩ সালে দক্ষ জনশক্তির সংখ্যা বেড়ে হয় ২৪ শতাংশ। সে বছরই পেশাজীবীর সংখ্যাও ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। ২০২৩ সালের ধারা অব্যাহত রেখে ২০২৪ সালে ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ দক্ষ ও ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ পেশাজীবী কাজের জন্য বিদেশে গেছেন।

ভালো অবস্থানে দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীরা

বাংলাদেশ থেকে দক্ষ হয়ে ও পেশাজীবী হিসেবে বিদেশ পাড়ি দেওয়া কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে ঢাকা স্ট্রিম। তাঁরা প্রত্যেকেই জানান, তাঁরা ভালোভাবে কাজ করে দেশে অর্থ পাঠাতে পারছেন।

এই দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীদের একজন হলেন মালয়েশিয়া প্রবাসী রাকিব এন রানা। ২০১৪ সালে নির্মাণ খাতে দক্ষতা অর্জন করে তিনি মালয়েশিয়া যান। ঢাকা স্ট্রিমকে রাকিব এন রানা বলেন, ‘যারা দক্ষ হয়ে আসে তাঁরা ভালো কাজের সুবিধা পায়। আর যারা অদক্ষ অবস্থায় বিদেশে আসে তাঁরা সবচেয়ে বেশি সমস্যা বা কষ্টের কাজ পায়। আমি কাজ জানার কারণে মালয়েশিয়া পৌঁছেই কাজ পেয়ে যাই। এখন পর্যন্ত আমি দুইটা কোম্পানিতে কাজ করছি। কখনো কোনো সমস্যা কিংবা ঝামেলা হয়নি। এছাড়া যারা কাজ জানে তাদেরকে কোম্পানি থেকে বেসিকের বাইরেও মাসিক ৬ হাজার টাকা (মালয়েশিয়ান ২০০ রিংগিত) ভাতা পান। আর যারা কাজ জানে না তাদেরকে অনেক সময় বেসিক বেতনটাই ঠিকমত দেয় না।’

একই কথা জানান বাংলাদেশ থেকে পেশাজীবী কর্মী হিসেবে বিদেশ যাওয়া ইমাম হোসেইন রতন। ঢাকা স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘পেশাজীবী কর্মীদের ক্ষেত্রে সুবিধাটা হলো সে যে সেক্টরে আসে ঠিক সেই সেক্টরে একজন কর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায়। সে সেক্টরে শ্রম আইন অনুযায়ী যা যা সুবিধা রয়েছে সবগুলো সুযোগ-সুবিধাই তিনি পান। যেটা অদক্ষ কর্মীরা খুব সহজে পান না। কারণ অদক্ষ কর্মীদের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ বিদেশে খুব কম সংখ্যকই পেয়ে থাকেন। এর ফলে তাঁরা যে কাজ পায় সে কাজই তাঁদের করতে হয়।’

সৌদি আরবগামী কর্মীদেরও প্রয়োজন হচ্ছে দক্ষতা

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর যাওয়া কর্মীর একটি বড় অংশ সৌদি আরব যান। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশ যাওয়া মোট কর্মীর ৬৭ শতাংশই সৌদি আরব গেছেন। তবে দেশটিতে ৭২টি পেশায় ঢুকতে হলে দক্ষতা সনদ বাধ্যতামূলক। যে সনদটি কর্মীদের তাকামুল পরীক্ষার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।

সম্পর্কিত