জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দেশে প্রকাশ্যেই চলছে পেডোফাইল ফেসবুক গ্রুপ, ছড়াচ্ছে শিশুদের ছবি

ঢাকা স্ট্রিম-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই গ্রুপগুলোর বড় অংশই গত দুই বছরের মধ্যে (২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি) তৈরি করা হয়েছে। সর্বশেষ গ্রুপটি খোলা হয়েছে চলতি মাসেই। নারী দিবসের এই মার্চ মাসটিই যেন এমন বিকৃত রুচির গ্রুপ খোলার জন্য অ্যাডমিনদের কাছে বিশেষ পছন্দের সময়।

ইয়াশাব ওসামা রহমান
শাহরিয়ার ইসলাম শোভন

গ্রাফিক: দুনিয়া জাহান

৬০ হাজার সদস্য। ৩৯ হাজার সদস্য। ২৩ হাজার সদস্য।

এগুলো তিনটি ফেসবুক গ্রুপের সদস্য সংখ্যা। কোনো নামী তারকার ভক্তদের নয় এগুলো। এই গ্রুপগুলোর লক্ষ্য অত্যন্ত জঘন্য—শৈশব পেরোনো কন্যাশিশুদের নিয়ে কিছু ‘প্রাপ্তবয়স্করা’ এই গ্রুপগুলো পরিচালনা করে। এই কন্যাশিশুদের ফেসবুক গ্রুপের বিকৃতমনা ব্যবহারকারীরা ডাকে ‘কচি’র মতো কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করে। গ্রুপগুলোর নাম এতটাই সরাসরি বিকৃমনস্ক যে জনস্বার্থে আর এসবের প্রচার রুখতে স্ট্রিম নামগুলো প্রকাশ করছে না। গ্রুপগুলোর কভার ফটোতেও দেখা যায় স্কুল ড্রেস বা সাধারণ পোশাকে থাকা অল্পবয়সী মেয়েদের ছবি।

পেজগুলোর ভেতরে ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী কন্যাশিশুদের ছবি পোস্ট করে জানতে চাওয়া হয় তাদের নিয়ে অন্যদের ভাবনা কী। এমনই এক পোস্টে দেখা যায়, স্কুল ড্রেস পরা আনুমানিক ১০ বছর বয়সী এক শিশুর ছবি দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, কক্সবাজারের কোনো হোটেলে নিয়ে যাওয়ার বয়স মেয়েটির হয়েছে কি না।

সেই পোস্টে ৮০টি মন্তব্যের বেশিরভাগই ছিল উৎসাহমূলক। হাতেগোনা কয়েকজন একে ‘ঘৃণ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্য একটি গ্রুপে ভিন্ন এক শিশুকে নিয়ে করা একই ধরনের পোস্টে ১৩টি মন্তব্যের মধ্যে মাত্র দুইজন প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

কক্সবাজার সংক্রান্ত একটি পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে ৩৩টি ‘লাইক’, ৩০টি ‘অ্যাংরি’, ৪টি ‘ওয়াও’ এবং ৩টি ‘হার্ট’ রিঅ্যাকশন রয়েছে। এছাড়া দু’টি ‘স্যাড’ রিঅ্যাকশনও ছিল। ১৫৫টি মন্তব্যের মধ্যে ক্ষোভপ্রকাশকারী মন্তব্যগুলোর বেশিরভাগই গত দুই দিনে করা। এই মন্তব্যগুলো মূলত পেজের নিয়মিত ব্যবহারকারীদের। যখন বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মাধ্যমে এই গ্রুপগুলোর অস্তিত্বের কথা ছড়িয়ে পড়ে তা ভাইরাল হয়, মন্তব্যগুলো করা হয়েছে সেই সময়।

প্রায় ১১ সপ্তাহ আগের চিত্রটি ছিল এর ঠিক উল্টো। তখন প্রায় সব মন্তব্যই ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। অন্যান্য পোস্টে দেখা যায়, কন্যাশিশুর পরিচয় দিয়ে খোলা ভুয়া প্রোফাইল থেকে মানুষকে ইনবক্সে আসার বা মন্তব্য করার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। এগুলোতেও প্রচুর মানুষ সাড়া দিচ্ছে। আর আলাপচারিতা ক্রমে ইনবক্সের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আরও একটি পোস্টে জানতে চাওয়া হয়েছে, কেউ ‘মেয়েদের মাদ্রাসা গ্রুপের ভিডিও’ চায় কি না। অন্য একটি গ্রুপে ৩২ বছর বয়সী এক পুরুষের সঙ্গে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর ছবি দেখা যায়। সেখানে তারা বর-কনের সাজে সজ্জিত।

এই ধরণের পোস্টগুলো এখন নিয়মিতই চোখে পড়ছে। এরকম একটি পোস্ট শুরু হয়েছে এভাবে— ‘ছোটবোনকে নিয়ে চার দিনের জন্য কক্সবাজার যাচ্ছি’। সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে একটি শিশুর ছবি। সম্ভবত ছবিটি বিয়েবাড়ির মতো কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

গ্রুপের মন্তব্যগুলোতে এই পোস্টের প্রশংসা করা হচ্ছে। ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই ভুয়া প্রোফাইল ব্যবহার করলেও, তাদের বেশ অনুসারী রয়েছে। যেমন, রংপুর নিবাসী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ‘সোহেল বস’ নামের এক ব্যবহারকারীর প্রায় দেড় হাজার ফলোয়ার আছে। এই ধরণের একটি পেজের অ্যাডমিন ‘শুভ শান’। তার অনুসারী সংখ্যা প্রায় এক হাজার।

অনেক গ্রুপেই ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ইনবক্স বা মেসেঞ্জার গ্রুপে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে এই নেটওয়ার্কটি খোলা চোখে যতটা দেখা যায় তার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত।

ঢাকা স্ট্রিম-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই গ্রুপগুলোর বড় অংশই গত দুই বছরের মধ্যে (২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি) তৈরি করা হয়েছে। এমনকি সর্বশেষ গ্রুপটি খোলা হয়েছে চলতি মাসেই। ২০২৪, ২০২৫ এবং ২০২৬—প্রতিটি বছরের মার্চ মাসেই একটি করে এমন গ্রুপ খোলা হয়েছে। নারী দিবসের এই মার্চ মাসটিই যেন এমন বিকৃত রুচির গ্রুপ খোলার জন্য অ্যাডমিনদের কাছে বিশেষ পছন্দের সময়।

শিশু ধর্ষণের ভয়াবহতা

গত ২ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক বনের ভেতর থেকে গলাকাটা অবস্থায় সাত বছরের এক শিশুর হেঁটে আসার শিউরে ওঠা খবর সামনে আসে। শুরুতে কেউ জানত না তার সাথে ঠিক কী ঘটেছিল।

কিন্তু সবার মনে উঁকি দেওয়া চরম আশঙ্কাই সত্যি হলো। পরদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়। পুলিশের তথ্যমতে, তাকে ধর্ষণের চেষ্টাও করা হয়েছিল। এই ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে বাবু শেখ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এক প্রেস ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন জানান, শিশুটির বাবা মনির হোসেনের সাথে বাবু শেখের পূর্বশত্রুতা ছিল।

‘বাবু শেখ চকলেট দেওয়ার লোভ দেখিয়ে শিশুটিকে কুমিরা থেকে বাসে করে সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে নিয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের চূড়ায় তুলে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। শিশুটি চিৎকার শুরু করলে এবং পরিবারকে জানিয়ে দেওয়ার ভয় দেখালে, সে একটি ধারালো ছুরি দিয়ে শিশুটির গলা কেটে ফেলে রেখে চলে যায়। ...তবে শিশুটি বেঁচে যায়। ওই রক্তাক্ত অবস্থাতেই সে হেঁটে লোকালয়ে চলে আসে।’

এই ঘটনা এবং এর সাথে জড়িত ছবি ও ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

গত এক মাসে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে আরও চারটি এমন ঘটনা জনসমক্ষে এসেছে। পাবনায় এক ১৫ বছরের কিশোরী, নরসিংদীতে আরেক ১৫ বছরের কিশোরী, খুলনায় ৮ বছরের এক শিশু এবং যশোরে ৭ বছরের এক শিশু এই পাশবিকতার শিকার হয়েছে। এই কয়েকটা ঘটনা সংবাদপত্রে এসেছে। আড়ালে রয়ে গেছে কত, কে জানে!

অনেক ঘটনাই হয় ঠিকমতো গণমাধ্যমে আসেনি, অথবা একেবারেই আড়ালে রয়ে গেছে।

গত বছরের আগস্টে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে যে ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৭৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ৩০৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ জন ছিল ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশু, ৯৪ জনের বয়স ছিল ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে এবং ১০৩ জন ছিল কিশোরী। ৬০টি ক্ষেত্রে বয়স সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। একই সময়ে ৩০ জন ছেলেও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

গত বছরের মার্চ মাসে ইউনিসেফও এই বিষয়ে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিল। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি সাম্প্রতিক শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো নিয়ে বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশে শিশুদের ওপর, বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার হার যেভাবে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, তাতে আমি গভীরভাবে আতঙ্কিত।’

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি সাম্প্রতিক শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো নিয়ে বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশে শিশুদের ওপর, বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার হার যেভাবে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, তাতে আমি গভীরভাবে আতঙ্কিত।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘শিশু ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার সাম্প্রতিক ভয়াবহ এই উল্লম্ফন আমাকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করছে। এসব ঘটছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো জায়গাগুলোতেও, যে জায়গা কিনা মূলত শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশের স্থান হওয়ার কথা ছিল।’

যেভাবে এই গ্রুপগুলো শিশু-নিপীড়নের অপরাধকে উসকে দিচ্ছে

ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রুবিনা হোসেনের মতে, এই গ্রুপগুলোর প্রকাশ্য কার্যক্রম সরাসরি একটি বড় হুমকি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকের মধ্যেই এমন কিছু অন্ধকার দিক থাকে যা সমাজ কখনোই মেনে নেবে না। কিন্তু যখন এরকম কেউ অন্যদের মধ্যে একই রকম বিকৃত রুচি খুঁজে পায়, তখন তারা সেই অন্ধকার দিকগুলোকে আরও বড় পরিসরে প্রকাশ করার সাহস পায়। এভাবেই এই অসুস্থ গোষ্ঠীটি বিকশিত হয়।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘সব পেডোফাইলই জানে যে তাদের এই লালসা অত্যন্ত গভীর আর বিচিত্র এক অন্ধকার জগত... তাই তারা যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় এভাবে একজোট হয়, তখন তা চরম হুমকিস্বরূপ।’

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে অধ্যাপক রুবিনার ক্যরিয়ার বেশ দীর্ঘ। তিনি দেখেছেন এই ধরোনের ব্যক্তিরা অনেক কথাই খোলাখুলি বলেন কিন্তু এই বিশেষ বিকৃতি বা চিন্তার কথা তারা কখনোই সামনে আনেন না—‘তারা খুব ভালো করেই জানে যে এটি একটি অপরাধ।’

রুবিনা হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি এই গ্রুপগুলোকে বিনা বিচারে এভাবে চলতে দেওয়া হয়, তবে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘মানুষ এটিকে অর্থ উপার্জনের পথ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।… এটি আস্ত একটি ব্যবসায় রূপ নিতে পারে।’

তাঁর মতে ‘আমাদের মিলিনিয়াল প্রজন্মের অন্তত ৭০ শতাংশ মেয়ে এই ধরণের মানুষদের (পেডোফাইল) মুখোমুখি হয়েছে—সেটা হোক আত্মীয়-স্বজন, দারোয়ান কিংবা এমনকি চালক। তাদের বেশিরভাগই এই যন্ত্রণার কথা গোপন রেখেছে। আর যারা এই অপরাধগুলো করেছিল, তারাও তাদের গোপন পাপ নিয়েই মারা গেছে। কিন্তু এখন তাদের কাছে এমন প্ল্যাটফর্ম আছে যেখানে তারা এই সব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন ঢাকা স্ট্রিম-কে বলেন, বাংলাদেশে বেশ কিছু পেডোফিলিয়া গ্রুপ সক্রিয় থাকার খবর পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, ‘পেডোফিলিয়া একটি স্বীকৃত মানসিক ব্যাধি। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেমন মাদকের প্রতি তীব্র টান অনুভব করেন, তেমনি এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন।’

‘সব পেডোফাইলই জানে যে তাদের এই লালসা অত্যন্ত গভীর আর বিচিত্র এক অন্ধকার জগত... তাই তারা যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় এভাবে একজোট হয়, তখন তা চরম হুমকিস্বরূপ।’

কামাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘অল্পবয়সী ছেলে বা মেয়েদের দেখলে তারা এই ধরণের আকর্ষণ বোধ করতে পারে। তারা যদি এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম পায় যেখানে এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়, তবে তাদের যৌন লালসা আরও তীব্র হতে পারে। এদের কেউ কেউ বাস্তবেও শিশুদের ওপর নিপীড়ন চালাতে পারে।’

এর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক কামাল বলেন, এই ধরণের ব্যক্তিদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।

‘এই ব্যাধি তৈরির পেছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, যে ব্যক্তি শৈশবে নিজে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার মধ্যে পেডোফিলিক প্রবণতা তৈরির উচ্চ ঝুঁকি থাকে। এছাড়া সমমনা সঙ্গীদের প্রভাবও একটি বড় কারণ। এরকম সঙ্গীদের মধ্যে থাকলে এই ধরণের আচরণকে স্বাভাবিক মনে হয়।’

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নুসরাত শারমিন ঢাকা স্ট্রিম-কে বলেন, পেডোফিলিয়া হলো এমন একটি মানসিক ব্যাধি যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক বা কিশোর মূলত বয়ঃসন্ধি-পূর্ব শিশুদের প্রতি (সাধারণত ১৩ বছরের কম বয়সী) যৌন আকর্ষণ অনুভব করে।

তিনি বলেন, ‘এমনকি আমাদের নিজেদের পরিচিত মহলেও এই ব্যধিসম্পন্ন ব্যক্তি থাকতে পারে। সমমনা সঙ্গীরা এই অবস্থাকে আরও উসকে দিতে পারে। এমনকি যাদের মধ্যে জন্মগতভাবে এই প্রবণতা নেই, তারাও যদি এই ধরণের ব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করে, তবে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যেও এই মানসিকতা তৈরি হতে পারে।’

তাঁর মতে, বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এমন এক আসক্তি তৈরি করছে যা নারীদের মানুষ হিসেবে নয়, বরং পণ্য বা বস্তু হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করে।

রুবিনা হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি এই গ্রুপগুলোকে বিনা বিচারে এভাবে চলতে দেওয়া হয়, তবে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘কেউ বিপথগামী যৌন আকর্ষণ নিয়ে জন্মায় না। বরং শৈশবে পাওয়া কোনো মানসিক আঘাত, সামাজিক কলঙ্ক বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো প্রতিকূল অভিজ্ঞতার কারণেই এই মানসিক ব্যাধি তৈরি হয়।"

আইন যা বলছে

ফেসবুক গ্রুপগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, পোস্টদাতাদের মধ্যে এক ধরণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার মানসিকতা কাজ করে। বিশ্লেষণ করা বেশিরভাগ আলাপচারিতাই প্রকাশ্যে ঘটছে। অর্থাৎ যে কেউ চাইলেই তা দেখতে পাচ্ছেন। এগুলো এমনকি ‘ক্লোজড গ্রুপ’ও নয়।

আর এখানেই আইনের ব্যর্থতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারান মো. আরাফ ঢাকা স্ট্রিম-কে বলেন, পেডোফিলিক কর্মকাণ্ড অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও কিছু ক্ষেত্রে এখনো অস্পষ্টতা বা ‘গ্রে এরিয়া’ রয়ে গেছে।

‘ভুক্তভোগী ছেলে হোক বা মেয়ে, পেডোফিলিক কর্মকাণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে সাইবার জগতে পেডোফিলিক উদ্দেশ্য বা মানসিকতা চর্চা করার বিষয়টি এখনো একটি অস্পষ্ট আইনি এলাকা। এটি নীতিগত ও নৈতিকভাবে ভুল। কিন্তু এর জন্য এখনো কোনো বিশেষ বিচার প্রক্রিয়া নেই।’

তিনি উল্লেখ করেন যে, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ এক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। তবে এরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই ফেসবুক গ্রুপগুলোতে ছবি পোস্ট করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এর বেশিরভাগ কন্টেন্টকেই সরাসরি ‘পর্নোগ্রাফি’র সংজ্ঞায় ফেলা সম্ভব হচ্ছে না।

আরাফ আরও জোর দেন যে, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও এখন ‘সেক্স অফেন্ডার রেজিস্ট্রি’ (যৌন অপরাধীদের তালিকা) তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সব অপরাধের দিকে নজর না দিলে বাংলাদেশও থাইল্যান্ড বা কম্বোডিয়ার মতো শিশু যৌন পর্যটনের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

‘বাংলাদেশে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট আইন নেই। এখন আমরা দেখছি ছয় বছরের শিশুও ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। এটি এখন জনমনে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকার এই বিষয়ে নতুন কোনো আইন বা ব্যবস্থা নেবেন সেই প্রত্যাশা বাড়ছে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারান মো. আরাফ ঢাকা স্ট্রিম-কে বলেন, পেডোফিলিক কর্মকাণ্ড অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও কিছু ক্ষেত্রে এখনো অস্পষ্টতা বা ‘গ্রে এরিয়া’ রয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরণের বিকৃত চর্চা নিষিদ্ধ করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই। সুশীল সমাজের একটি অংশ এটিকে ‘বাকস্বাধীনতা’র পরিপন্থী বলে মনে করতে পারে, কিন্তু এটি এখন সময়ের দাবি।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড লবি ডিরেক্টর এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দীপ্তি শিকদার বলেন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ অনুযায়ী পর্নোগ্রাফি তৈরি, বিতরণ বা সংরক্ষণ করা অবৈধ—‘তবে এই আইনে কিছু ফাঁকফোকর আছে। যেমন পর্নোগ্রাফি দেখা বা ভোগ করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি।’

দীপ্তি শিকদার আরও যোগ করেন, ‘কখনো কখনো পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত অপরাধে তৃতীয় পক্ষ জড়িত থাকতে পারে, কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড সবসময় এই আইনের আওতায় পড়ে না।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাইবার নর্থ ডিভিশনের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার ঢাকা স্ট্রিম-কে বলেন, যেকোনো বয়সের মানুষের ব্যক্তিগত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা একটি দণ্ডনীয় সাইবার অপরাধ, যদি সেই কন্টেন্ট ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিকভাবে মানহানিকর হয়।

তিনি জানান, এ ধরণের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কিন্তু জবাবদিহিতার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

মেটা (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) এইসব প্রবণতা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের নানা টুল ব্যবহার করছে। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে যে সেগুলো যথেষ্ট নয়। একটি গ্রুপ বা পেজ বন্ধ করা হলেই খুব দ্রুত আরেকটি সেটির জায়গা দখল করে নিচ্ছে।

সম্পর্কিত