জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টার ‘উত্তরাধিকার নোট’

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ সালেহউদ্দিন আহমেদের

নোটে তিনি বলেছেন, গত ১১ বছরে পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি ১১১ শতাংশ বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় কমেছে। এ অবস্থায় তাঁদের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা জরুরি।

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২: ২৭
সদ্য বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করে গেছেন সদ্য বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য রেখে যাওয়া ২৯ পৃষ্ঠার এক ‘উত্তরাধিকার নোটে’ (সাকসেসর নোট) তিনি এই সুপারিশ করেন।

নোটে তিনি বলেছেন, গত ১১ বছরে পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি ১১১ শতাংশ বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় কমেছে। এ অবস্থায় তাঁদের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন শেষে নতুন সরকারের জন্য এই উত্তরাধিকার নোট তৈরি করেছেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। এতে তিনি শুধু বেতন কাঠামোর কথাই বলেননি; দেশের অর্থনীতি, ব্যাংক, রাজস্ব খাতের সংস্কার এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তদারকি আলাদা করার প্রস্তাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ তাঁর নোটে আর্থিক খাতের সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একই সঙ্গে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করছে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি করছে। এতে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি হচ্ছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কমছে।

তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম’ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তদারকির কাজটি আলাদা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকির জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে তাঁর নোটে।

সরকার নীতিগত সম্মতি দিলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) এ বিষয়ে একটি ধারণাপত্র তৈরি করতে পারে বলে তিনি মত দিয়েছেন। এ ছাড়া আলাদা ব্যাংক রেজল্যুশন কর্তৃপক্ষ, আমানত সুরক্ষা করপোরেশন গঠন এবং ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য আলাদা আইন প্রণয়নের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনীতি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা

নোটে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরা হয়েছে। সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার অব্যাহত রাখা, উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পে মনোযোগ দেওয়া এবং চড়া সুদের বিদেশি ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকা নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় এখন বিদেশি ঋণের সুদের হার বাড়ছে এবং ঋণ পরিশোধের সময় কমছে। এ বাস্তবতায় বিদেশি ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাছাইয়ে অধিক সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নোটে। পাশাপাশি, ভর্তুকি যৌক্তিক করা, সরকারি ব্যয়ে অপচয় রোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

কর ব্যবস্থায় ব্যাপক ফাঁকি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম প্রসঙ্গে বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, দেশে ব্যাপক হারে কর ফাঁকি হচ্ছে এবং কর অব্যাহতির সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। আয়কর ও ভ্যাট ব্যবস্থায় ডিজিটাইজেশন এখনো অপর্যাপ্ত। কর আদায় কার্যক্রমে ন্যায্যতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। করব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে ইতিমধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

একনজরে উত্তরাধিকার নোটের মূল সুপারিশ

  • সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন।
  • বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ আলাদা করে ব্যাংক তদারকিতে পৃথক সংস্থা গঠন।
  • মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা এবং বাজার সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা।
  • কর অব্যাহতি যৌক্তিক করা এবং পুরো রাজস্ব ব্যবস্থা ডিজিটাল করা।
  • জ্বালানি, কৃষি ও খাদ্য ভর্তুকি নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক (টার্গেটেড) করা এবং অপচয় রোধ।
  • চড়া সুদের বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন এবং উচ্চ অগ্রাধিকার প্রকল্পে মনোযোগ দেওয়া।
  • রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন।
  • পুঁজিবাজারের সংস্কার সম্পন্ন করা এবং ব্যাংক কোম্পানিসহ একাধিক আইনের সংশোধন করা।

নোটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জলবায়ু অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন উন্নয়ন অংশীদার খুঁজছে সরকার। বৈদেশিক সহায়তার কার্যকারিতা বাড়াতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। তবে যেকোনো নীতিগত পরিবর্তনের আগে অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন বিদায়ী এই অর্থ উপদেষ্টা।

Ad 300x250

সম্পর্কিত