leadT1ad

‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারের সমালোচনায় যা বলছে সরকার

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সরকার

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নের ওপর আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—যে সিদ্ধান্তের ভার জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের একটি পক্ষে সরকার নিজেই প্রচারণা চালানো কতটা যুক্তিসংগত।

এই সমালোচনার জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে একটি দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। রোববার (১৮ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে ব্যাখ্যাটি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।

ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মন্তব্যে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের ওপর আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য সমর্থন একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। এই উদ্বেগ আলোচনার যোগ্য হলেও, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে দেখলে এ ধরনের সমালোচনার ভিত্তি নেই।’

‘গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সমর্থন কেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’—শিরোনামে দেওয়া এই ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই সংকটময় সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়; বরং তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবই প্রকাশ করে। এ জন্য সরকার ছয়টি যুক্তি তুলে ধরেছে।

‘সংস্কারই অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট’

ব্যাখ্যায় বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেবল দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা নির্বাচন তত্ত্বাবধানের জন্য গঠিত হয়নি। দীর্ঘদিনের অপশাসনের ফলে সৃষ্ট শাসনতান্ত্রিক সংকট, জনঅনাস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সরকারের জন্ম। এই সরকারের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা।

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রফেসর ইউনূস গত ১৮ মাসে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে পরামর্শ করে যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন, বর্তমান প্যাকেজ তারই ফল। তাই সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত সরকার গণভোটের সময় সেই সংস্কার থেকে নিজেকে দূরে রাখবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয় বলে ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়।

‘সুপরামর্শ গণতান্ত্রিক পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’

সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চায় সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ে নীরব থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং নেতারা তাঁদের অবস্থান তুলে ধরবেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেবেন—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রীতি।

ব্যাখ্যায় বলা হয়, গণভোট কোনো টেকনোক্র্যাটিক প্রক্রিয়া নয়; এটি জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার উপায়। সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করলে ভোটাররা আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল প্রশ্ন হলো—ভোটাররা সেই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করতে স্বাধীন কি না, বিরোধীপক্ষ প্রচারণা চালাতে পারছে কি না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য কি না। সরকার বলছে, এই শর্তগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য নেতৃত্ব অপরিহার্য’

ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই গণভোট কোনো বিমূর্ত নীতিগত প্রশ্ন নয়; এটি দীর্ঘদিনের শাসনব্যর্থতার জবাব। প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন ও তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার রাজনীতিকরণ দেশকে সংকটে ফেলেছে। এই বাস্তবতায় সংস্কারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহির প্রকাশ। যিনি নিজেই সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর নীরব থাকা অসংগত ও দায়িত্বহীন হবে।

‘আন্তর্জাতিক নজির এই পদ্ধতিকে সমর্থন করে’

ব্যাখ্যায় বলা হয়, বিভিন্ন দেশে সরকারপ্রধানরা গুরুত্বপূর্ণ গণভোটে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে ডেভিড ক্যামেরন, ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের গণভোটে অ্যালেক্স স্যালমন্ড, ২০১৭ সালে তুরস্কে রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান এবং ১৯৬২ সালে ফ্রান্সে শার্ল দ্য গলের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।

এসব ক্ষেত্রেই সরকারপ্রধানদের অবস্থানকে অগণতান্ত্রিক বলা হয়নি; বরং রাজনৈতিক জবাবদিহির অংশ হিসেবেই দেখা হয়েছে। সরকার বলছে, গণভোটের বৈধতা নেতাদের নীরবতার ওপর নয়, ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্তের সুযোগের ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি পার্থক্যের কথাও তুলে ধরা হয়। ব্যাখ্যায় বলা হয়, গণভোটের ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্বাচনী স্বার্থ জড়িত নয়। সংস্কার গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত হলে তার বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে নির্বাচিত সরকারের ওপর।

‘সরকারি প্রচারণা মানেই জোরজবরদস্তি নয়’

জেলা পর্যায়ে প্রচারণা নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, সে বিষয়ে সরকার বলছে, এসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য সংস্কারের বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব জনগণের কাছে স্পষ্ট করা, বিশেষ করে যেখানে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি রয়েছে। জনপরিসরে সরকারের উপস্থিতি বিরোধী মত দমন করে না; বরং নাগরিকদের সচেতন সিদ্ধান্তে সহায়তা করে।

‘নীতিগত লঙ্ঘন নয়, গণতান্ত্রিক দায়িত্ব’

ব্যাখ্যার শেষাংশে বলা হয়, এই সময়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সমর্থনে নয়, বরং দ্বিধা ও নীরবতায়। যে সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তা সমর্থন না করলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে।

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অবস্থান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক ম্যান্ডেট, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকার এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ব্যাখ্যায় বলা হয়, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণেরই। এটাই গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা। নেতৃত্ব সেই সিদ্ধান্ত কেড়ে নেয় না; বরং তা স্পষ্ট ও অর্থবহ করতে সহায়তা করে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত